মূল পাতাপ্রচ্ছদঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত


শুভেচ্ছা বার্তা




কচিপাতাঃ গল্পঃ সেই বাঁশি - ঋত্বিক প্রিয়দর্শী


সেই বাঁশি
ঋত্বিক প্রিয়দর্শী


হ্যাঁ, এখন শিলিগুড়িতে কালকে সকালবেলায় আলিপুরদুয়ারে পৌঁছব,” বলে ফোনটা কেটে দিলাম।
আমি একজন সাধারণ উকিল এবার যাচ্ছি আলিপুরদুয়ারে একটা জরুরি কেসে ভেবেছিলাম, কেসটা মিটলে তিনদিন লেপচাখা বলে একটা গ্রামে ঢুঁ মেরে আসব

তিনদিন পর...
ট্যাক্সি! বলে ডাকলাম একটা ট্যাক্সিকে
লোকটা বলল, “কহা যানা হ্যায়?”
সদরবাড়ি
তিন সৌ রুপেয়,” লোকটা জবাব দিল
তিনশো টাকা!মনে মনে ভাবলাম, ‘পাঁচবছর আগেই তো গেছিলাম সদরবাড়ি আশি টাকায়!’
সৌ দুঙ্গা বস,বলতেই গাড়িটা এগোতে লাগল। দেড় সৌ নহি দো সৌ দুং...বলতে বলতে গাড়িটা বেরিয়ে গেল।
শেষপর্যন্ত একটা অটো ধরে যেতে হল সদরবাড়ি। জায়গাটা বেশ ভালো মনে হল। পরেরদিন সকালবেলায় এককাপ চা খাওয়ার পর পিঠে ব্যাগটা তুলে বেরোলাম লেপচাখা যাওয়ার পথে। রাস্তায় যখন উঠছিলাম তখন মনে হল যে ব্যাগে দুই প্যাকেট ক্রিম বিস্কুট নেওয়া উচিত ছিল
মেঘগুলো হঠাৎ ডেকে উঠল আমায় সঙ্কেত দিছিল যে একটু পরে বৃষ্টি নামবে ব্যাগ থেকে বের করে রেনকোটটা গায়ে দিলাম লেপচাখায় পৌঁছতে লাগল তিনঘন্টা কিন্তু পৌঁছানোর পর বুঝতে পারলাম যে না, হাঁটাটা সার্থক হয়েছে।
জামাকাপড় ছেড়ে বেরোলাম যখন, তখন সূর্যাস্ত হবে হবে করছে সামনের বেঞ্চে পাদুটো ছড়িয়ে বসে পাহাড়ের দিকে তাকালাম সূর্যটা অস্ত যাচ্ছে। আকাশটা হলদে কমলা থেকে আস্তে আস্তে গাঢ় নীল হয়ে উঠেছে বাতাসে একটা ঘুম ঘুম ভাব চলে এসছে।
বাইরের সোলার ল্যাম্প-পোস্টটা হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল বেশি আলো নেইটিমটিম করে আলোটা জ্বলছে আমি ঘরে গেলাম।
ল্যাপটপের ঘড়িতে দেখি এগারোটা বাজে ল্যাপটপটা বন্ধ করে যেই কম্বলটা গায়ে দিয়েছি, শুনলাম এক মধুর বাঁশির আওয়াজ মনে হল যে এত সুন্দর বাঁশির সুর জীবনে আমি শুনিনি মনটা কেমন জড়িয়ে উঠল মনে হল, দরজাটা এক্ষুনি খুলে বেরিয়ে যাই আমি ওই বাঁশির সুরের উৎসের কাছে আমি ছুটে যাই
পরেরদিন রাত্তিরেও ওই আওয়াজটা শুনেছিলাম আমি কাউকে আর জিজ্ঞেস করিনি।

পরের রাত...
আমার একটা খুব বাজে স্বভাব আছে ঘুমে হাঁটার। বুঝতে পারছিলাম যে আমি ঘর থেকে বেরিয়েছি গায়ে শীত লাগছিল। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে দেখি যে আমি পাহাড়ের একটা অচেনা জায়গায়! পূর্ণিমার রাত, পুরো জঙ্গলটা যেন জেগে উঠেছে চাঁদের আলোয়। তখন আমি শুনতে পাই সেই মধুর বাঁশির শব্দ। দেখি একটা বাচ্চা ছেলে সাত-আট বছরের, মুখে একটা বাঁশি। গরু চরাচ্ছে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কে, আর এখানে কী করছ?”
সে তার বাঁশি থেকে মুখ না ঘুরিয়ে একভাবে বাঁশি বাজাতে লাগল মুখে একটা হাসি নিয়ে। চোখ খুলে দেখি কয়েকজন গ্রামের লোক, “আপনি ঠিক আছেন?” আমাকে জিজ্ঞেস করছে।
তারপর যখন আমি লেপচাখা থেকে বেরবো তখন আমি ওদের জিজ্ঞেস করলাম যে কে ওই ছেলেটা?
ওরা বলল, “দশবছর আগে একটি রাখালছেলে ছিল সে খুব সুন্দর বাঁশি বাজাত একদিন ও গরু চরিয়ে বাড়ি ফিরছিল, তখন ও একটা ধ্বসে মারা পড়ে। সেইদিন থেকে রাত্তিরে ওর বাঁশির আওয়াজ সবাই শুনতে পায়

_____

অলঙ্করণঃ ঋত্বিক প্রিয়দর্শী

কচিপাতাঃ গল্পঃ ডাইনোসরের খোঁজে - রজতাভ রুদ্র


ডাইনোসরের খোঁজে
রজতাভ রুদ্র


ভারতের পাঞ্জাবের একটি সুন্দর গ্রামে ছিল একটা সবুজ বাগান। সেই বাগানের পাশে একটা বড়ো দালান ঘর ছিল। সেই দালানে বাস করত তিনভাই ও তাদের মা-বাবা। সবথেকে ছোটভাইয়ের নাম ছিল রামু। মেজভাইয়ের নাম ছিল রতন ও সবথেকে বড়ভাইয়ের নাম ছিল রাখাল।
তারা তিনভাই তখনও ছোটো ছিল। রামুর ডাইনোসরের কমিকস পড়ার অনেক আগ্রহ ছিল। রতনের ডাইনোসরের ফসিল খোঁজার ভীষণ শখ ছিল আর রাখালের ডাইনোসরের ছবি আঁকার শখ ছিল।
দিন গেল, বছর গেল, রামু, রতন আর রাখাল বড়ো হল। তখন তারা সবসময় ডাইনোসরের ভিডিও গেম খেলত। তাদের স্বপ্নে সবসময় ডাইনোসর আসত। তখন তাদের মা-বাবা চিন্তা করল, তাদের মনে হয় সবসময় খারাপ স্বপ্ন আসে। কিন্তু তারা ভুল চিন্তা করছিল। তাদের সবসময় মজার স্বপ্ন আসত। তখন তারা বড়ো বড়ো ওঝা ডেকে পাঠাল। তখন তিনভাইয়ের মনে হল তারা তাদের মজার স্বপ্নকে মা-বাবার কাছ থেকে দূরে রাখবে। তখন তিনভাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে ডাইনোসরের খোঁজে লেগে পড়বে। তখন রামু, রতন আর রাখাল নিজের নিজের ডাইনোসরের কমিকস, ভিডিও গেম, ক্যামেরা ও সারা বিশ্বের ডাইনোসরের মানচিত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কিছু সময় পরে তাদের মা-বাবা এসে কান্নাকাটি করতে লাগল।
তার কিছুদিন পরে তারা রেলস্টেশনে গেল। তারা ট্রেনের টিকিট নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তারা প্রথমে ভারত থেকে শুরু করে অনেক জায়গায় ঘুরল। তারা অনেক ডাইনোসরের স্ট্যাচুর ছবি তুলেছিল। ডাইনোসরের মিউজিয়ামে গিয়ে অনেক জ্ঞান অর্জন করল ডাইনোসরের ব্যাপারে। তারা বিশ্বের সব জায়গায় ঘুরেছিল। কিন্তু আসল ডাইনোসরকে দেখেনি। তারা দুটি জায়গা ঘুরল না। সে দুটো জায়গা হল আফ্রিকার গভীর জঙ্গল ও জুরাসিক পার্ক।
তারা প্রথমে আফ্রিকায় গেল। অনেক পশুপাখিকে দেখল কিন্তু ডাইনোসরকে দেখল না। শেষে জুরাসিক পার্কে গিয়ে ডাইনোসরের দর্শন পেল। তারা অনেক ডাইনোসর দেখল যেমন, টি-রেক্স, ট্রাইসেরাটপস, স্টেগোসরাস ইত্যাদি আরও অনেক ডাইনোসরের খোঁজও করল, আবার অনেক ডাইনোসরের বন্ধুও হল। তারা একটা অসহায় ডিপ্লোডোকাসের বাচ্চাকে পালতে লাগল। তখন থেকে তাদের অনেক বই ছাপতে লাগল আর তখন থেকেই মানুষ ওদেরকে ‘ডাইনোসর সন্ধানী’ নামে জানতে লাগল।
তখন ভারতের পাঞ্জাবে ওদের মা-বাবারা মনে মনে ভাবল, আমরা তাদের স্বপ্ন থেকে দূরে সরাতে চেয়েছিলাম। যদি আমরা তাদের স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দিতাম তাহলে তারা বিখ্যাত হতে পারত না।
_____


অলঙ্করণঃ রজতাভ রুদ্র

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ অনুষ্কা মন্ডল



শিল্পীঃ অনুষ্কা মন্ডল
তৃতীয় শ্রেণী, বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল গার্লস স্কুল

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ প্রত্যক চক্রবর্তী


শিল্পীঃ প্রত্যক চক্রবর্তী
৪র্থ শ্রেণী, ওয়েলকিন ন্যাশনাল স্কুল
বারুইপুর, কলকাতা

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ রজতাভ রুদ্র

কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি


শিল্পীঃ রজতাভ রুদ্র
৪র্থ শ্রেণী, রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ বিদ্যানিকেতন

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ অহনা শ



শিল্পীঃ অহনা শ
সপ্তম শ্রেণী, বর্ধমান মডেল স্কুল

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ সৃজিত সরকার



শিল্পীঃ সৃজিত সরকার
৪র্থ শ্রেণী, ওয়েলকিন ন্যাশনাল স্কুল

গল্পঃ সাহেবি স্কুলের ভূত - বাবিন



       
দূর থেকে স্কুলবাড়িটাকে দেখে কেন জানি আমার গাটা ছমছম করতে লাগল যদিও কোনও কারণ নেই তার শুনেছিলাম, ভয় জিনিসটা এইরকমই ছোঁয়াচে অথচ প্রথম যখন এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরটার সেরা স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করাতে গিয়েছিলাম, তখন কিন্তু গথিক স্থাপত্যে তৈরি এই বাড়িটা দেখে ভারি মুগ্ধ হয়েছিলাম শুনেছিলাম, ইংরেজ আমলে তৈরি এই স্কুলটা সাহেবরাই এই শৈলশহরটা তৈরি করেছিল তাদের ছেলেমেয়েরা এই স্কুলে পড়ত এককালে আজকাল পয়সাওয়ালা পরিবারের ছেলেমেয়েরা এইখানে আসে আমার স্ত্রীর ভারি শখ মেয়েকে কনভেন্ট স্কুলে পড়াবে সরকারি কলেজের অধ্যাপককে আর যাই হোক পয়সাওয়ালা মোটেই বলা চলে না তবুও ওর পীড়াপীড়িতেই মেয়েকে এই স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম
মেয়ে যখন বাড়িতে ফিরে ঘটনাটা প্রথমবার বলে, আমরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলামযে কেউ উড়িয়ে দেবেকারণ, দিনেদুপুরে এমন দৃশ্য যে আজকাল দেখা সম্ভব সেটা কেই বা বিশ্বাস করবে? আমি এই শহরের একটা কলেজে বায়ো-সায়েন্স পড়াই। সবকিছুকেই বিজ্ঞানের চোখে দেখতে ভালোবাসিতাই মেয়েকেই একটু অতিরিক্ত কল্পনাপ্রবণ ভেবে বকেঝকে দিলামওর মাকে বলে দিলাম টিভিতে আজগুবি সিরিয়ালগুলো দেখা বন্ধ করে দিতে
যদিও আমার মেয়ের বয়স দশ, তবুও ওর পাকা পাকা কথা শুনলে অবাক লাগে ওদের বয়সে আমরা কত সরল আর বোকা ছিলামওর বেশ কয়েকটি বন্ধু আছে যারা মাঝে মাঝেই ফোন করে এটা সেটা গপ্পো করেসেইদিনের পর থেকে মাঝে মাঝেই শুনতাম বন্ধুদের সঙ্গে অদ্ভুত ওই ঘটনাটা নিয়ে আলোচনা করছেআমি বা আমার স্ত্রী দু’জনেই ব্যাপারটাকে অগ্রাহ্য করতে লাগলামভেবেছিলাম বাচ্চাদের ব্যাপার তো, কয়েকদিনেই ওরা অন্য কোনও নতুন বিষয়ে মজে যাবে
কিন্ত আমাদের ভুলটা দিন পনেরোর মধ্যেই ভেঙে গেলএবার মেয়ে আতঙ্কিত হয়ে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলআমি কলেজ থেকে ফিরতেই ওর মা চিন্তিত সুরে বলল, তুমি একবার মেয়ের স্কুলে যাও তোব্যাপারটাকে এত হালকাভাবে নিলে আর চলবে না নির্ঘাৎ কেউ ওর সঙ্গে বদমাইশি করছে
এতদিন গুরুত্ব দিইনি, এবার মেয়ের পাশে বসে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “সত্যি করে বল তো টুপুর, কী হয়েছিল ভয় পাস না, আমি তো আছিসব খুলে বল
মুখ দেখে মনে হল ও ভীষণ ভয় পেয়েছে

প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে দেখা করতে হলে আগে থেকে সময় চেয়ে নিতে হয়তাই স্কুলে ফোন করে ব্যাপারটা হালকা করে জানিয়ে বললাম, প্রিন্সিপ্যালের উপস্থিতিতে ওই এলাকাটার সিসি টিভির রেকর্ডিং দেখতে চাই আমিআমাকে জানতে হবে আমার মেয়ে ঢোকার আগে ও পরে আর কোন কোন মেয়ে ওই ওয়াশরুমে ঢুকেছিলআমি আগামীকাল কলেজে ছুটি নিয়ে স্কুলে যাব
প্রাইভেট স্কুলের একটা ভালো ব্যাপার যে অভিভাবকদের কথা মনোযোগ সহকারে শোনা হয় ওরাও অতি ভদ্রভাবে এবং যথেষ্ট লজ্জিত সুরে জানাল, আপনার মেয়ের অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত আপনি আগামীকাল সকাল এগারোটা নাগাদ স্কুলে আসুন
স্কুলে যেতেই আমাকে খাতির করে একজন পিওনের সঙ্গে প্রিন্সিপ্যালের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হলউনি নিজের রুমে ছিলেন না তখন পিওন আমাকে বসতে বলে এসি চালিয়ে দিয়ে চলে গেল খুব সুন্দর সাহেবি স্টাইলে সাজানো ঘরটি কাঠের মেঝে, কাঠের দেওয়াল মেঝেতে পুরু কার্পেট দেওয়ালে বেশ কিছু ছবি উপর থেকে ঝুলন্ত মৃদু বাদামি আলোতে ঘরে একটি আলো-আঁধারির পরিবেশ আমি গদি-আঁটা চেয়ারে আরাম করে বসে মনে মনে খানিকটা তর্কবিতর্কের জন্য তৈরি হচ্ছিলামকারণ আমি জানি যে, স্কুলের সুনাম অক্ষুন্ন রাখার জন্য এই সমস্ত আজগুবি বোগাস ব্যাপারকে ওরা ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করবেঅবিশ্যি আমারও বিশ্বাস, এটা কোনও দুষ্টু মেয়ের কারসাজি কিন্তু কাদের কীর্তি সেটা আমাকে জানতে হবে পরবর্তীকালে আর কেউ যাতে আমার মেয়ের সঙ্গে এইধরনের মশকরা না করে সেটা নিশ্চিত করাও এই সাক্ষাত্কারের উদ্দেশ্য
তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যেই রুমের লাগোয়া রিফ্রেশ রুম থেকে যে মহিলা বেরিয়ে এলেন তাঁকে দেখেই আমার মনের মধ্যের লড়াই করার ইচ্ছেটা চলে গেল শুনেছিলাম, প্রিন্সিপ্যাল এক মারাঠি ভদ্রমহিলা সুনন্দা থুবে কিন্তু ভদ্রমহিলাকে দেখে ব্রিটিশ বলে ভুল হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয় অপূর্ব সুন্দরী বললে যেন কিছু কম বলা হয় ধবধবে ফর্সা রং টানা টানা নাক একঢাল চুল বোধহয় এইমাত্র স্নান করে বাড়ি থেকে এসেছেন, চুল ভিজে ছিল বলে এখনও বাঁধতে পারেননি কিন্তু সেই অসামান্য রূপের মধ্যেও কোথাও যেন একটা বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে আপনা থেকেই একটা শ্রদ্ধার ভাব বেরিয়ে এল অন্তর থেকে যথাসম্ভব ভদ্র ও বিনীত ভঙ্গিতে ওঁকে সমস্যার কথাটা খুলে বললাম
উনি আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বেশ পরিষ্কার, সাহেবদের মতো অ্যাকসেন্টে ঝরঝরে ইংরেজিতে বললেন, এত বড়ো স্কুল, বুঝতেই পারছেন সবাইকে আমার পক্ষে চেনা সম্ভব নয় আপনার মেয়েকে আমি ঠিক চিনি না তবে এই যে ঘটনাটার কথা বলছেন এরকম অভিজ্ঞতা তো আগে কেউ কখনও বলেনি
আমি দৃঢ় সুরে বললাম, “বুঝতে পারছি ঘটনাটা চাউর হলে আপনাদের স্কুলের বদনাম হবে কিন্তু আমিও আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত যে ও মিথ্যে বলছে না আর আমি এটাও বলছি না যে ঘটনাটা ভৌতিক আমার ধারণা, কোনও সিনিয়ার স্টুডেন্ট আমার মেয়েকে ভয় দেখাচ্ছে সেই কারণেই গত কালকের দুপুর বারোটা নাগাদ সিসি টিভির ফুটেজটা একটিবার দেখতে চাই
প্রিন্সিপ্যাল নিজের চেয়ারটা একটু টেনে এগিয়ে এসে আমার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখেছে আপনার মেয়ে?
সাহস পেয়ে আমি বলতে থাকলাম, কিছুদিন আগে আমার মেয়ে, অহনা ওর মাকে বলেছিল, স্কুলের বন্ধুদের মুখে ও শুনেছে ডরোথি নামে একটি মেয়ে নাকি এখানে আত্মহত্যা করেছিলএই গল্পটা শোনার পরদিন আমার মেয়ে টিচারকে বলে ক্লাসের মাঝেই একবার ওয়াশরুম যাবে বলে বের হয় মেয়ের মুখেই শুনেছি, ওদের ওয়াশরুমে ঢুকলে লম্বা প্যাসেজ আর তার দু’পাশে চারটে চারটে মোট আটটা পৃথক পৃথক টয়লেটওয়াশরুমে ঢুকে ও দেখে বাঁদিকের একটি টয়লেটের দরজা খোলাএকটি মেয়ে বসে কমোডের ওপরপরনে স্কুলের ইউনিফর্ম
“অদ্ভুত ব্যাপার এই যে দুবছর আগে স্কুলের ইউনিফর্মের রং এবং প্যাটার্ন বদলানো হয়অথচ এই মেয়েটি পুরনো প্যাটার্নের ইউনিফর্ম পরেমাথায় লম্বা চুলসেই চুল মুখের ওপর নামানোতাই ওর মুখটা দেখা যাচ্ছে নাহাত-পা ধোঁয়া ধোঁয়া মতোঅহনা প্রচন্ড ভয় পেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসেপরে বন্ধুদের সঙ্গে ফিরে গিয়ে আর ওই মেয়েটিকে দেখতে পায়নি
গতকাল ওয়াশরুমে ঢুকে ও আবার মেয়েটিকে দেখতে পায়মেয়েটি ভেতরে প্যাসেজের সামনেই দাঁড়িয়েলম্বা চুল দিয়ে মুখটি ঢাকাআর ওর হাত-পা ধোঁয়া ধোঁয়া মতো, আবছা
লম্বা কথা বলে আমি একটু থেমে দম নিয়ে আবার বলতে থাকি, দেখুন ম্যাডাম, আমি বলছি না যে এটা ভৌতিক ব্যাপার কিন্তু আমার মেয়ে প্রচন্ড আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে আমার পাক্কা বিশ্বাস কোনও সিনিয়ার স্টুডেন্টের দুষ্টুমি এসব কাইন্ডলি যদি সিসি টিভি...”
প্রিন্সিপ্যাল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বিষণ্ণ সুরে বললেন, জানেন, ডরোথি বলে একটি মেয়ে সত্যিই পড়ত এই স্কুলেবছর তিন আগে ও ক্লাস টেনের ফাইনাল দিয়েছিলখুবই হাসিখুশি ছিলসামান্য পাগলাটে গোছেরওকিন্তু কীভাবে বা কেন মারা গেছে সেটা আজও সবাই জানতে পারেনিআমি কিন্তু জানি কারণটা
আমি হতবাকস্কুলের প্রিন্সিপ্যালই যদি এমন কথা বলেন তাহলে...
আমি বললাম, তার মানে? আপনি কি বলতে চান ডরোথির ভূত... আপনি কী বলছেন জানেন?
আমার বিস্ময়কে অগ্রাহ্য করে ভদ্রমহিলা বলে চললেন, ডরোথি বড্ড একা ছিল ওর কোনও বন্ধু ছিল না আপনার মতোই এক ভদ্রলোক সপরিবারে এই শহরে আসেন চাকরিসূত্রে তাঁরও একটিই মেয়ে ছিল, সুজান এই স্কুলেই পড়ত ডরোথির সঙ্গে সুজানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দু’জনের কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারত না অথচ ভদ্রলোকের ছিল বদলির চাকরি দুবছর পর তিনি অন্য কোথাও চলে যান এই শহর ছেড়ে ডরোথি আবার একা হয়ে গেল ওকে কেউ বুঝত না বোঝার চেষ্টাও করেনি এই বন্ধু-বিচ্ছেদের ব্যথা ও সহ্য করতে পারে না
ভদ্রমহিলা ছলছল চোখে শূন্যের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন এবার আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “কাল আপনি ফোন করার পর কথাটা আমার কানে আসে আপনার মেয়ের ছবি আমি ফাইল খুলে দেখলাম অবিকল সুজানের মতো দেখতে!”
আমার মেয়েকে সুজানের মতো দেখতে! স্তম্ভিত হয়ে আমি বলার চেষ্টা করি, দেখুন ম্যাডাম, সবকিছুরই একটা ব্যাখ্যা থাকে, বিজ্ঞানের বাইরে তো কিছু হয় না!
উনি ক্লান্ত সুরে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, “উঁহু, এমনও অনেক কিছু আছে যার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নাবিশ্বাস না হয় আপনি নিজের চোখেই দেখুন
উত্তেজিতভাবে প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম আমার দিকে দুটি ফাইল এগিয়ে দিলেন প্রথম ফাইলের ওপর লেখা ডরোথির নাম মলাট উল্টাতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি উজ্জ্বলবর্ণা হাসিখুসি লম্বাচুলের মেয়ের ছবি নিচে নাম লেখা ডরোথি পরের ফাইলটা সুজানের মলাট খুলতেই ভিরমি খাবার জোগাড়! টুপুরের মুখ অবিকল বসানো মেয়েটির!
স্খলিত পদে প্রিন্সিপ্যালের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলাম পেছন থেকে করিডরে কেউ আমার নাম ধরে ডাক দিলেন, মিস্টার শ!
ঘুরে তাকিয়ে দেখি লম্বা, কঠিন মুখের অধিকারিণী শ্যামলা এক মহিলা আমার দিকে চেয়ে আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই উনি বললেন, “সরি, একটু লেট হয়ে গেল আসুন, ভেতরে আসুন আসলে সকালে ক্লাসগুলো ঠিকঠাক শুরু হল কি না আমাকে একবার নজরদারি করতে হয় তো
“আপনি?” আমি বিহ্বল হয়ে প্রশ্ন করি
আমি সুনন্দা থুবে ভদ্রমহিলা করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বলেন, প্রিন্সিপ্যাল, জোসেফ কনভেন্ট স্কুল
আমি হাঁ করে ওঁর মুখের দিকে চেয়ে বাঁ-হাতটি প্রিন্সিপ্যালের রুমের দিকে বাড়িয়ে বলি, তাহলে উনি কে ছিলেন?
ভদ্রমহিলা আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে বলেন, কে? কার কথা বলছেন?
ভদ্রমহিলার সঙ্গে প্রিন্সিপ্যালের রুমে ঢুকে হতচকিত আমি বোঝার চেষ্টা করি ব্যাপারটা কিন্তু মাথায় কিস্যু ঢোকে না ঘর খালি কেউ নেই ওখানে অথচ এইমাত্র আমি বেরিয়েছি রুম থেকে আমার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে কেউ ওই ঘর থেকে বেরুতে পারবে না ওয়াশরুমের দরজা খোলা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ওখানেও কেউ নেই
উনি বোধহয় আমার বিভ্রান্ত দৃষ্টির অর্থ বুঝতে পেরে আবার বললেন, “আপনি কি অন্য কারও সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছেন? আমিই এই স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল আপনি কাল ফোন করেছিলেন হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন আর বলবেন না, ওসব স্কুলের সিনিয়ার স্টুডেন্টদের দুষ্টুমি আর কি আমি বলে দিয়েছি, কেউ আর আপনার মেয়ের সঙ্গে দুষ্টুমি করবে না তবে আমি আপনার মেয়েকেও বলে দিয়েছি, তুমি একা একা একদম ওয়াশরুমে যাবে না যখনই যাবার দরকার হবে, সঙ্গে আরও দু-তিনজন বন্ধুকে নিয়ে যাবে
নজর পড়ে দেয়ালে টাঙানো অপরূপ সুন্দরী এক মহিলার ছবির দিকে আশ্চর্য, আগে জানি না কেন খেয়াল করিনি! সেইদিকে আঙুল তুলে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করি, ইনি?
একজন পিওন এসে আদেশের অপেক্ষা করছিল প্রিন্সিপ্যাল তাকে দুকাপ চা আনতে বলে আমার দিকে ফিরে বললেন, উনি আগে এই স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন ভেরি স্যাড কেস, স্যার
একটু থেমে আনমনে টেবিলে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ফাইলদুটো নাড়াচাড়া করতে করতে বলেন, “একটিই মেয়ে ছিল স্বামী অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছিলেন মেয়েটিও সবসময় মনমরা হয়ে থাকত বেশিদিন বাঁচেনি ক্লাস টেনে পড়তে পড়তেই... মেয়ের শোকে ভদ্রমহিলাও...”
অজ্ঞান হয়ে যাবার আগে আমার মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এল, “আমি জানি, ওঁর মেয়ের নাম ডরোথি!
চেয়ারে কাত হয়ে এলিয়ে পড়তে পড়তে আবছা শুনতে পাচ্ছিলাম প্রিন্সিপ্যাল সুনন্দা থুবে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে প্রায় চিত্কার করে বলছেন, “মিঃ শ, মিঃ শ! হোয়াট হ্যাপেন্ড? মিঃ শ! আর ইউ ওকে? হাউ ডু ইউ নো দ্যাট ডরোথি? স্ট্রেঞ্জ!”
_____

অলঙ্করণঃ মানস পাল

গল্পঃ আনন্দময়ী হোম - মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী



অ্যাই ছোটু, পাঁচ নম্বরে কচুরি দুটো।
ছোটু, সাতে চা চারটে।
ছোটু, দুইয়ে ডাল।
অনেকক্ষণ ধরে রাজু শুনে চলেছে আর ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে তারই বয়সী আরেকটা ছেলে এই শীতেও একটা হাফশার্ট-হাফপ্যান্ট পরা আর মালিকের প্লাস দোকানের সিনিয়র কর্মচারীদের ডাকে তাদের ফরমায়েশমতো কাজ করছে। সমানে দৌড়োচ্ছে আর কাস্টমার সামলাচ্ছে। তাদের খাওয়া হয়ে গেলে কেমন সটাসট টেবিল পরিষ্কার করে পরের কাস্টমারদের বসাচ্ছে।
রাজন্য ওরফে রাজু বাবা-মায়ের সাথে বিদেশে থাকে। এই প্রথম দেশে এসেছে তা নয়, তবে এই প্রথম রাস্তার ধারের আধা পরিচ্ছন্ন কচুরির দোকানে খেতে ঢুকেছে। দোকানটায় ঢোকার মুখেই বিশাল সাইজের দুটো কড়াইয়ে কচুরি ভাজা হচ্ছে রাজু এই প্রথম উনুন দেখল তাও আবার অত বড়ো বড়োচারদিকে কেমন গন্ধ ভাজা ভাজামতো, মাছি ভন ভন করছে, টেবিলগুলো একটা নোংরা ন্যাকড়া দিয়ে মুছছে বসার জন্য একটা বেঞ্চ পাতা কোনও গ্লাভস-টাভস না পরেই লোকে খাবার সার্ভ করছে। আবার যারা খাচ্ছে তারাও দিব্যি হাত-টাত না ধুয়েই গপাগপ কচুরি মুখে পুরছে। অর্ডার নিচ্ছে আধময়লা জামাকাপড়ের একজন মানুষ কিন্তু সাপ্লাই দিচ্ছে ছোটু নামের সেই ছেলেটা।
রাজুরা সকালে কিছু না খেয়ে বের হয়েছে বাবা-মায়ের প্ল্যানই ছিল এমন একটা দোকানে ব্রেকফাস্ট করবে। রাজুকে বারে বারে বুঝিয়েছিল এমন করে খাওয়াটা নাকি দারুণ মজার। রাজুর কিন্তু একটুও মজা লাগছে না। তাও খেতে বাধ্য হচ্ছে কারণ, এরপর যে কোথায় খাওয়া হবে কেউ নাকি জানে না। রাজুরা ওর কাকা-কাকিমা আর তাদের যমজ ছেলেমেয়ের সাথে বেরিয়েছে। বড়োদের ইচ্ছে যেদিকে দু’চোখ যায় যাবে, কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম মানা নেই যেখানে ইচ্ছে খাবে, কোথাও একটা রাত কাটালেই হল। আজকাল রাত কাটানোর মতো ভালো হোটেলের অভাব আছে নাকি? তবে রাস্তার ধারের এইসব দোকান যাকে বড়োরা হোটেল বলছে, আরেকটা কী যেন, ধাবা না কী এসবে খাওয়ার মজাই নাকি আলাদা। রাজু জানে, ওর মতামত কেউ চায় না বড়োরা যেটা ডিসিশন নেবে সেটাই হবে। মা, যে নাকি ওই দেশে সবসময়ে রাজুর হাত ধোওয়া নিয়ে পিটপিট করে, যেখানে হাত ধুতে পারে না হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করায়, সেই হেন মাও দিব্যি হাত ধোওয়া-টোওয়ার তোয়াক্কা না করে খাচ্ছে আর সমানে খাবারগুলোর প্রশংসা করছে এবং ফিরেও দেখল না রাজু হাত ধুল কি না, ওর হ্যান্ড স্যানিটাইজার চাই কি না। বাবা, কাকা, কাকিমা তো খাচ্ছে বটেই, এমনকি ওই পুঁচকি পুঁচকি ভাইবোনগুলোও কেমন বেঞ্চির ওপর নিলডাউন হয়ে কুপ কুপ খাচ্ছে কচুরি আর ছোলার ডাল।
বেচারা রাজু উপায় নেই বুঝে খেতে থাকে কচুরিযদিও ব্রেকফাস্ট মানেই তার কাছে হয় দুধ, সিরিয়াল, নাহলে প্যানকেক, সসেজ, অমলেট বা ব্রেকফাস্ট স্যান্ডউইচ। উইকএন্ডে বাড়িতে মা কখনও কখনও লুচি বানায়, কিন্তু সে দিনগুলোতে বড়ো কষ্ট হয় রাজুর। মাকে বললে রেগে আগুন হয়ে যায় অথচ রাজুর কেন জানি লুচি-টুচি ঠিক ভালো লাগে না।
যাই হোক, অতি কষ্টে দুটো কচুরি খাবার পর দেখে বড়োরা মিষ্টি খাচ্ছে। তাদের অবশ্য ততক্ষণে চার-পাঁচ প্লেট করে কচুরি-ডাল খাওয়া শেষ। রাজু মিষ্টি ভালোবাসেকাজেই ভালোবেসেই খেল সবই করছে কিন্তু চোখ ঘুরছে ওই ছোটুর সাথে সাথে। এরই মধ্যে এক ভদ্রলোক ছোটু নামের ছেলেটাকে কিছু টাকা মনে হয় টিপস হিসাবে দিয়েছেন। ছেলেটাও সেটা পকেটে রেখেছে ওমা, দোকানের মালিক সেটা দেখতে পেয়ে কাছে ডেকে ওই একদোকান লোকের সামনে ছেলেটাকে জোরে থাপ্পড় মেরে কেড়ে নিল টাকাটা! কেউ একটা কোনও কথা না বলে যেমন খাওয়াদাওয়া করছিল করতে থাকল। দৃশ্যটায় রাজুরই চোখে জল আসছিল অপমানে। তাকে যদি কেউ এমন করত? কত প্রশ্ন মনে আসছে রাজুর আচ্ছা, এই ছেলেটার শীত করে না? ছেলেটা স্কুলে যায় না? ওর কি এই কাজ করতে ভালো লাগছে? ও ব্রেকফাস্ট করেছে? এত কথা মনে হচ্ছে, কিন্তু জিজ্ঞেস করে কাকে? বাবারা তো তখন চা সহযোগে দেশের পরিস্থতি নিয়ে ধুন্ধুমার লাগিয়েছে যেন এই টেবিলে যে ডিসিশন নেওয়া হচ্ছে সেটাই ঠিক আর সেই পথে চললে তবেই দেশের ভালো হবে। মা আর কাকিমা অবশ্য নিচু গলায় কীসব শাড়ি, পার্টি নিয়ে আলোচনা করছে। খানিকক্ষণ রাজু মন দিয়ে দেখল বড়োরা এমনকি ছোটো ভাইবোনও নিজেদের নিয়ে মশগুল। খাওয়া শেষ হতে না হতেই কাকা, কাকি ওদের দু’জনের মোবাইল ধরিয়ে দিয়েছে ভাইবোনদের ফলে তারা মন দিয়ে কী দেখে যাচ্ছে বড়োদের কত সুবিধা। নাহ্‌, রাজু অনেকক্ষণ উঁকিঝুঁকি দিয়েছে, ছোটু বলে ছেলেটা আপাতত দোকানের পেছনদিকে কী জানি করছে। রাজু এক পা এক পা করে যেতে থাকল দেখল কেউ খেয়াল করছে না তাকে অতএব এটাই সুযোগ।
দোকানের পেছনদিকটা কিন্তু দোকানের সামনের থেকেও নোংরা। চারদিকে রান্নাঘরের, তারপর বাসন ধোওয়া জল ফলে কাদা কাদা হয়ে আছে। এককোনায় ডাঁই করা সব্জির খোসা, চায়ের পাতা বেশ পচা পচা গন্ধ সব মিলিয়ে। আর দেখে ছোটু বসে বসে বড়ো বড়ো বাসন মাজছে ব্রাউন রঙের রাফ মতো কী যেন দিয়ে মায়ের মতো সাবান দিয়ে নয়। একবার করে টিউবওয়েল পাম্প করে জল নিচ্ছে, আবার বসে বাসন মাজছে। রাজু একটু সময় দাঁড়িয়ে দেখল তারপর সব ভুলে চলে গেল ছোটুকে হেল্প করতে। এতক্ষণ বেশ খারাপ লাগছিল নোংরা গন্ধ, বাজে জলে তার পায়ের দামী স্নিকার্স ভিজে যাচ্ছে বলে কিন্তু তারই বয়সী একটা ছেলে এভাবে কাজ করছে দেখে আর থাকতে পারল না রাজু। সে গিয়ে টিউবওয়েল পাম্প করতে শুরু করতেই ছোটু মানা করল একগাল হেসে, “তুমি পারবে? তোমার জুতো ভিজে যাবে তো!”
“হ্যাঁ যাবে কিছু নেই
রাজু জানে ওর বাংলাটা একটু পুওর। জীবনে প্রথম মা-বাবার বকুনিকে উপেক্ষা করে এমন কাজ করতে পারছে, সেটাই বা কম কী রাজুর কাছে? ঘটাং ঘটাং করে পাম্প করতে থাকে, দু’জনেই অকারণ হাসে। ওদের দেখে রান্না ঘরের ভেতর থেকে বড়ো কর্মচারীরা উঁকি মারে
“হোই ছোটু, হাত চালা“ ধমক উড়ে আসে।
বাসন ধোওয়া হলে ক’টা কচুরি, তার ওপর একটু ডাল কোনও প্লেট-টেট ছাড়াই নিয়ে কল-পাড়ে খেতে বসে ছোটু। বসল ঠিকই, কিন্তু একটার বেশি খেল না।
“তোমার নাম কি ছোটু? নিজের বাচনভঙ্গী নিজেরই কানে লাগে রাজুর
ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে দেখে বুঝল ছেলেটা ওর কথা একবর্ণও বোঝেনি তাই আবার ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল। এবারে উত্তর পেল, “না, আমার নাম গজানন। গণেশঠাকুর জান? তার নাম। দোকানের মালিক ছোটু বলে, তাই সবাই ছোটু ডাকে তোমার নাম কী?
“রাজু
“তুমি কি বিদেশে থাক?
“হ্যাঁ। আমি কি তোমায় প্রশ্ন করতে পারি?
“কী?
“তোমার শীত করে না? স্কুলে যাও না?
“নাহ্‌, কাজ করতে করতে গরম লাগে আর স্কুলে গেলে খাব কী?
ব্যাপারটা রাজুর বোধগম্য হল না। “মানে?
“মা নেই তো, আর বাবাও চলে গেল আমি তো সবার বড়ো। ছোটো ভাইবোন তিনটেকে খাওয়াতে হবে না?
ওরা কথা বলতে বলতে রাজু দেখল ওর খুড়তুতো ভাইবোনের সাইজের দুটো, আরেকটা আরও ছোটো আধা কাপড় পরা বাচ্চা এসে উপস্থিত আর গজানন ওরফে ছোটু নামের ছেলেটা কচুরিগুলো ওদের দিয়ে নিজে পেট ভরে জল খেয়ে নিল টিউবওয়েল থেকে।
এর মধ্যেই রাজুর বাড়ির লোকজনও খোঁজ করে রাজুকে ওই নোংরা পরিবেশ থেকে উদ্ধার করল। আর হোটেলের বড়ো কর্মচারিরাও ছোটুকে ধমকে আবার কাজে টেনে নিল। এখন তো কচুরির পাট শেষ, দুপুরে ভাত খাওয়ার খদ্দেররা আসবে কাজেই ছোটুকে তো কাজে দরকার। কারণ, গজানন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোকেদের ডেকে আনবে, সাথে সকালের কাজগুলো তো আছেই। রাজুর যে কত কথা জানার ছিল আবার যা দেখল সেগুলোকে মনে মনে হিসেব কষে মেলাতেও হবে।
গাড়িতে যেতে যেতে চুপ করে ভাবতে থাকে রাজু ঠাকুমার কাছে কতরকমের গল্প শুনেছে এই ক’দিনে তাতে গণেশঠাকুরের গল্পও শুনেছে। যেহেতু গজ মানে হাতির মতো আনন মানে মুখ, তাই গণেশঠাকুরের অন্য নাম গজানন। আর এটাও বুঝল, যেহেতু ওই ছেলেটা তার ভাইবোনদের সবার বড়ো তাই গণেশঠাকুরের নামে নাম। সব ঠাকুরের আগে গণেশঠাকুরের পুজো করতে হয় কিনা। আর ওই বাচ্চাগুলোই তার মানে ছোটুর ভাইবোনেরা। এই অবধি তো হিসেব মিলল কিন্তু দোকানের মালিক কেন গজাননকে ঠিক করে খেতে দেয় না? বা ও তো কাজ করে দিচ্ছে, তাহলে ওর ভাইবোনগুলোকে অ্যাট লিস্ট একবেলা তো খেতে দিতেই পারে! অবশ্য দুপুরের খাওয়ার সময়ের আগেই তো ওরা চলে এল দুপুরে কী হয় সেটাও তো রাজুর জানা হল না। রাজুর মন কেমন করতে লাগল ওর দাদামশায়ের কাছে যেতে মন চাইল একমাত্র তিনিই বোধহয় ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন আর কেমন করে গজাননকে হেল্প করতে পারত রাজু বলে দিতে পারতেন। কিন্তু এখন তো রাজু ফেরবার কথা বলতেই পারবে না। বড়ো রাস্তায় রাজুদের গাড়ি ছুটছে হু হু করে চারপাশে কেমন সবুজ মাঠ, ধানক্ষেত জানালা দিয়ে হাঁ করে দেখছিল রাজু।
গাড়িতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল রাজু নিজেও টের পায়নি। মা যখন ঘুম ভাঙাল ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। একটা সুদৃশ্য রিসর্টে তাদের গাড়ি দাঁড়ানো এখানেই থাকা হবে বুঝল রাজু। ঘুম ভাঙতেই ক্ষিদেয় পেট চুঁই চুঁই করে।
দুটো তিনটে দিন ওদের বেশ কাটল। মা, কাকিমা ব্যাপক খুশি কারণ, রান্না নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে না শুধু অর্ডার করার অপেক্ষা, ভালো ভালো মনপসন্দ খাবার হাজির হচ্ছে। বাড়িতেও রান্না করতে হয় না, কিন্তু সেখানে তো অ্যাট লিস্ট বলে দিতে হয় কোন সময় কী রান্না হবে। তায় প্রচুর পরিমাণে হ্যান্ড ক্রাফ্টেড জিনিস কিনেছে দু’জন মিলে। শাড়ি, গয়না, ঘর সাজানোর কী কীসব। রাজু নিজের মনে ঘুরে বেড়িয়েছে আর হিসেব কষে গেছে। লক্ষ করেছে বাবা-মায়ের কথা একবারে শুনে নিলেই ওরা খুশি থাকছে আর কোনও কিছু নিয়ে ডিস্টার্ব করে না। কাজেই সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, ব্রাশ করা, চান-খাওয়া সব ঠিক ঠিক করে করেছে রাজু। এক তো গজাননকে দেখে ভয় হয়েছে, মা বাবা না থাকলে তারও তো ওইরকম দশা হতে পারে আর দুই, গজাননকে হেল্প করতে গেলে নিজেকে ডিসিপ্লিনড হতে হবে। বড়োদের কথা না শুনলে তারাই বা ওর কথা শুনবে কেন?
বাবার মুড ভালো দেখে ফেরার পথে নিজের আর্জি পেশ করল রাজু, “বাবা, ক্যান উই গো টু দ্যাট হোটেল থিঙ্গি আগেন?
“কোন হোটেল?
“দ্যাট হোটেল হোয়্যার উই হ্যাড খচুরি, হোয়াইল উই ওয়্যার কামিং হিয়ার
“ওরে ওগুলোকে কচুরি বলে, খচুরি না। ওই হোটেলে আবার খাবি?
“হোয়াট এভার, ক্যান উই বাবা? প্লিজ!”
বাবা কী বুঝল কে জানে হ্যাঁ বলে দিল রাজুর কথায়।
রাজু এবারে দেশে আসার পর থেকে কত লোক ওকে মানি দিয়েছে গিফ্ট হিসেবে মা বলে দিয়েছে ওগুলো সব রাজুর ও ওর ইচ্ছেমতো স্পেন্ড করতে পারবে। রাজু কাউন্ট করে দেখেছে টোটাল টোয়েন্টি ফাইভ থাউসেন্ট রুপিস আছে ওর রাজু যদিও সঙ্গে এনেছে কিন্তু কোথায় বা খরচ করবে ও? কাজেই রাজু এটাই ঠিক করেছে ও সবটা টাকা গজাননকে দিয়ে দেবে আর প্রথম যেদিন এই রিসর্টে এল, সেই রাতেই খাবার সময়ে কিছুটা ইচ্ছে করে, কিছুটা ধাক্কা লেগে রাজু এবং ওর ভাইবোনদের জামাকাপড়ে মাংসের ঝোল মেখে গেছিল। মা, কাকি ফেলে দিতে গেলে রাজু চ্যাঁ ভ্যাঁ করেছিল ওটা নাকি ওর খুব ফেভারিট, পরতে না পারলেও ফেলতে দেবে না। আসল উদ্দেশ্য কিন্তু রাজুর অন্য ছিল।

প্রায় সন্ধে নাগাদ রাজুরা যখন গজাননদের হোটেলে পৌঁছল, তখন চা-বিস্কুট ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাচ্ছে না দোকানে। দোকানের মালিক আর গজানন ছাড়া আর কর্মচারীও কেউ নেই দোকানে। রাজুরা আসতেই গজানন চিনতে পেরেছে রাজুকে। ওরা যখন চা খাচ্ছে মালিক তখন কোনও কাজে দোকানের বাইরে গেল। রাজু দেখল এই সুযোগ চট করে প্যাকেট করা জামাকাপড়গুলো আর টাকাগুলো গজাননকে দিয়ে বলল, “তুমি ইউস কোরো
আগের দিনের ঘটনা মনে পড়তেই গজাননকে চট করে প্যাকেটটা লুকিয়ে ফেলতেও বলল। গজানন ওই ঘটনায় অভ্যস্ত কাজেই রাজু বলার আগেই ও লুকোচ্ছিল। রাজুর সঙ্গে থাকা বড়োরা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল রাজু ওদেরকে সবটা এক্সপ্লেন করল। আর মাথা নিচু করে বলল, “সরি, তোমাদের জিজ্ঞেস না করেই আমি ডিসিশন নিয়ে ওকে দিয়ে দিলাম
একে একে রাজুর মা, বাবা, কাকু, কাকিমা ওকে জড়িয়ে ধরে ওরা কতটা প্রাউড রাজুর এই কাজে সেটা বললআর প্রমিস করল, এবার থেকে ওরাও রাজুর মতোই গজাননদের নিজের সাধ্যমতো হেল্প করবে। আর সেটা আজ থেকেই শুরু, এই গজাননকে দিয়েই অতএব বাবা, মা, কাকা, কাকিমাও নিজেদের পার্স উপুড় করে দিল। এবারে আর রাজুকে কোনও বাধা দিল না কেউ রাজু তার বন্ধু গজাননকে জড়িয়ে ফটো তুলে, বাই করে রওনা দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে যদিও আর কখনও দেখা হবে কি না সেসব ভেবে মন খারাপ হচ্ছিল রাজুর।
এমন একটা কাজ করতে পেরে, বড়োদের সাহায্য পেয়ে আনন্দে ডগমগ রাজু বাড়ি ফিরে দেখে ওর দাদুন এসেছেন। অতএব দাদামশায়, দাদুন দু’জনকে একসাথে হৈ হৈ করে শোনাল রাজু গজাননের গল্প ওর সাথে তোলা ছবিটাও দেখাল। বাবাদের কাছ থেকে গজাননদের দোকানটার লোকেশন জেনে নিয়ে বেশ রহস্য করে করে গল্পের মতো করে পুরোটা বলল রাজু। দাদা, দাদুন, ঠাম্মা সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেন রাজু ছোটো হলেও খুব বড়ো মনের পরিচয় দিয়েছে।

পরদিন সকালে একটা ফোন পেয়ে বাড়িতে হুলুস্থুল দাদুন নাকি অসুস্থ বোধ করছেন আর তাই ডেকে পাঠিয়েছেন সবাইকে। মা টেনেটুনে রাজুকে ঘুম থেকে তুলে সবাই মিলেই দৌড়ল দাদুনের বাড়ি। কিন্তু তখন কি আর জানত সেখানে কী সারপ্রাইস অপেক্ষা করে আছে? দাদুনের বাড়ি গিয়ে দেখে দাদুনের শরীর খারাপটা বানানো উনি ইচ্ছে করেই মিথ্যে বলেছেন সেটা না হলে তো আর কেউ এমন দৌড়ে দৌড়ে আসত না। মিথ্যে বলার জন্য অবশ্য দাদুন মাফ চেয়ে নিলেন সবার কাছে। তবে দাদুনের অনেকদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছে রাজু। কীভাবে? রাজু গজাননকে হেল্প করায়, ওর সমস্ত ইনফরমেশন দেওয়ায় দাদুন গিয়ে গজানন আর ওর ভাইবোনদের নিয়ে এসেছেন নিজের কাছে।
অগাধ সম্পত্তির মালিক দাদুন অনেকদিন ধরেই এইরকম ছেলেমেয়েদের জন্য একটা থাকার, খাওয়ার, পড়াশোনা শেখার শেল্টার করবেন বলে ভেবেছিলেন। যেখানে ওরা থাকবে, চাইলে বাড়ি যেতে পারবে বা ওদের বাবা-মায়েরা দেখা করতে পারবে। ওদের মানুষের মতো মানুষ করার, সুস্থ সুন্দর একটা জীবন দেবার চেষ্টা করবেন দাদুন। দিদুন মারা যাবার পর একদম একা হয়ে গিয়েছেন দাদুন গত রাতে রাজুর কাছে গজাননের কথা শুনে ওঁর মনে হয় এদের দিয়েই শুরু করার কথা। যেমন ভাবা তেমনি কাজ দোকানের মালিক যে খুব সহজে আসতে দিয়েছে গজাননকে তা নয়। তবে দাদুনের খুব বুদ্ধি আর কত মানুষের সাথে যোগাযোগ! সেইসব কাজে লাগিয়ে দাদুন উদ্ধার করেছেন গজাননদের। রাজুর আর বিদেশ ফিরতে মন খারাপ রইল না। এবার থেকে চাইলেই তার নতুন বন্ধু গজাননের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে আর যখনই এদেশে আসবে দেখা তো হবেই।
রাজুর সাজেশনে ওদের নতুন আস্তানার নাম হল ‘আনন্দময়ী হোম’, দিদুনের নামে।

_____

অলঙ্করণঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত