গল্পঃ আনন্দময়ী হোম - মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী



অ্যাই ছোটু, পাঁচ নম্বরে কচুরি দুটো।
ছোটু, সাতে চা চারটে।
ছোটু, দুইয়ে ডাল।
অনেকক্ষণ ধরে রাজু শুনে চলেছে আর ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে তারই বয়সী আরেকটা ছেলে এই শীতেও একটা হাফশার্ট-হাফপ্যান্ট পরা আর মালিকের প্লাস দোকানের সিনিয়র কর্মচারীদের ডাকে তাদের ফরমায়েশমতো কাজ করছে। সমানে দৌড়োচ্ছে আর কাস্টমার সামলাচ্ছে। তাদের খাওয়া হয়ে গেলে কেমন সটাসট টেবিল পরিষ্কার করে পরের কাস্টমারদের বসাচ্ছে।
রাজন্য ওরফে রাজু বাবা-মায়ের সাথে বিদেশে থাকে। এই প্রথম দেশে এসেছে তা নয়, তবে এই প্রথম রাস্তার ধারের আধা পরিচ্ছন্ন কচুরির দোকানে খেতে ঢুকেছে। দোকানটায় ঢোকার মুখেই বিশাল সাইজের দুটো কড়াইয়ে কচুরি ভাজা হচ্ছে রাজু এই প্রথম উনুন দেখল তাও আবার অত বড়ো বড়োচারদিকে কেমন গন্ধ ভাজা ভাজামতো, মাছি ভন ভন করছে, টেবিলগুলো একটা নোংরা ন্যাকড়া দিয়ে মুছছে বসার জন্য একটা বেঞ্চ পাতা কোনও গ্লাভস-টাভস না পরেই লোকে খাবার সার্ভ করছে। আবার যারা খাচ্ছে তারাও দিব্যি হাত-টাত না ধুয়েই গপাগপ কচুরি মুখে পুরছে। অর্ডার নিচ্ছে আধময়লা জামাকাপড়ের একজন মানুষ কিন্তু সাপ্লাই দিচ্ছে ছোটু নামের সেই ছেলেটা।
রাজুরা সকালে কিছু না খেয়ে বের হয়েছে বাবা-মায়ের প্ল্যানই ছিল এমন একটা দোকানে ব্রেকফাস্ট করবে। রাজুকে বারে বারে বুঝিয়েছিল এমন করে খাওয়াটা নাকি দারুণ মজার। রাজুর কিন্তু একটুও মজা লাগছে না। তাও খেতে বাধ্য হচ্ছে কারণ, এরপর যে কোথায় খাওয়া হবে কেউ নাকি জানে না। রাজুরা ওর কাকা-কাকিমা আর তাদের যমজ ছেলেমেয়ের সাথে বেরিয়েছে। বড়োদের ইচ্ছে যেদিকে দু’চোখ যায় যাবে, কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম মানা নেই যেখানে ইচ্ছে খাবে, কোথাও একটা রাত কাটালেই হল। আজকাল রাত কাটানোর মতো ভালো হোটেলের অভাব আছে নাকি? তবে রাস্তার ধারের এইসব দোকান যাকে বড়োরা হোটেল বলছে, আরেকটা কী যেন, ধাবা না কী এসবে খাওয়ার মজাই নাকি আলাদা। রাজু জানে, ওর মতামত কেউ চায় না বড়োরা যেটা ডিসিশন নেবে সেটাই হবে। মা, যে নাকি ওই দেশে সবসময়ে রাজুর হাত ধোওয়া নিয়ে পিটপিট করে, যেখানে হাত ধুতে পারে না হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করায়, সেই হেন মাও দিব্যি হাত ধোওয়া-টোওয়ার তোয়াক্কা না করে খাচ্ছে আর সমানে খাবারগুলোর প্রশংসা করছে এবং ফিরেও দেখল না রাজু হাত ধুল কি না, ওর হ্যান্ড স্যানিটাইজার চাই কি না। বাবা, কাকা, কাকিমা তো খাচ্ছে বটেই, এমনকি ওই পুঁচকি পুঁচকি ভাইবোনগুলোও কেমন বেঞ্চির ওপর নিলডাউন হয়ে কুপ কুপ খাচ্ছে কচুরি আর ছোলার ডাল।
বেচারা রাজু উপায় নেই বুঝে খেতে থাকে কচুরিযদিও ব্রেকফাস্ট মানেই তার কাছে হয় দুধ, সিরিয়াল, নাহলে প্যানকেক, সসেজ, অমলেট বা ব্রেকফাস্ট স্যান্ডউইচ। উইকএন্ডে বাড়িতে মা কখনও কখনও লুচি বানায়, কিন্তু সে দিনগুলোতে বড়ো কষ্ট হয় রাজুর। মাকে বললে রেগে আগুন হয়ে যায় অথচ রাজুর কেন জানি লুচি-টুচি ঠিক ভালো লাগে না।
যাই হোক, অতি কষ্টে দুটো কচুরি খাবার পর দেখে বড়োরা মিষ্টি খাচ্ছে। তাদের অবশ্য ততক্ষণে চার-পাঁচ প্লেট করে কচুরি-ডাল খাওয়া শেষ। রাজু মিষ্টি ভালোবাসেকাজেই ভালোবেসেই খেল সবই করছে কিন্তু চোখ ঘুরছে ওই ছোটুর সাথে সাথে। এরই মধ্যে এক ভদ্রলোক ছোটু নামের ছেলেটাকে কিছু টাকা মনে হয় টিপস হিসাবে দিয়েছেন। ছেলেটাও সেটা পকেটে রেখেছে ওমা, দোকানের মালিক সেটা দেখতে পেয়ে কাছে ডেকে ওই একদোকান লোকের সামনে ছেলেটাকে জোরে থাপ্পড় মেরে কেড়ে নিল টাকাটা! কেউ একটা কোনও কথা না বলে যেমন খাওয়াদাওয়া করছিল করতে থাকল। দৃশ্যটায় রাজুরই চোখে জল আসছিল অপমানে। তাকে যদি কেউ এমন করত? কত প্রশ্ন মনে আসছে রাজুর আচ্ছা, এই ছেলেটার শীত করে না? ছেলেটা স্কুলে যায় না? ওর কি এই কাজ করতে ভালো লাগছে? ও ব্রেকফাস্ট করেছে? এত কথা মনে হচ্ছে, কিন্তু জিজ্ঞেস করে কাকে? বাবারা তো তখন চা সহযোগে দেশের পরিস্থতি নিয়ে ধুন্ধুমার লাগিয়েছে যেন এই টেবিলে যে ডিসিশন নেওয়া হচ্ছে সেটাই ঠিক আর সেই পথে চললে তবেই দেশের ভালো হবে। মা আর কাকিমা অবশ্য নিচু গলায় কীসব শাড়ি, পার্টি নিয়ে আলোচনা করছে। খানিকক্ষণ রাজু মন দিয়ে দেখল বড়োরা এমনকি ছোটো ভাইবোনও নিজেদের নিয়ে মশগুল। খাওয়া শেষ হতে না হতেই কাকা, কাকি ওদের দু’জনের মোবাইল ধরিয়ে দিয়েছে ভাইবোনদের ফলে তারা মন দিয়ে কী দেখে যাচ্ছে বড়োদের কত সুবিধা। নাহ্‌, রাজু অনেকক্ষণ উঁকিঝুঁকি দিয়েছে, ছোটু বলে ছেলেটা আপাতত দোকানের পেছনদিকে কী জানি করছে। রাজু এক পা এক পা করে যেতে থাকল দেখল কেউ খেয়াল করছে না তাকে অতএব এটাই সুযোগ।
দোকানের পেছনদিকটা কিন্তু দোকানের সামনের থেকেও নোংরা। চারদিকে রান্নাঘরের, তারপর বাসন ধোওয়া জল ফলে কাদা কাদা হয়ে আছে। এককোনায় ডাঁই করা সব্জির খোসা, চায়ের পাতা বেশ পচা পচা গন্ধ সব মিলিয়ে। আর দেখে ছোটু বসে বসে বড়ো বড়ো বাসন মাজছে ব্রাউন রঙের রাফ মতো কী যেন দিয়ে মায়ের মতো সাবান দিয়ে নয়। একবার করে টিউবওয়েল পাম্প করে জল নিচ্ছে, আবার বসে বাসন মাজছে। রাজু একটু সময় দাঁড়িয়ে দেখল তারপর সব ভুলে চলে গেল ছোটুকে হেল্প করতে। এতক্ষণ বেশ খারাপ লাগছিল নোংরা গন্ধ, বাজে জলে তার পায়ের দামী স্নিকার্স ভিজে যাচ্ছে বলে কিন্তু তারই বয়সী একটা ছেলে এভাবে কাজ করছে দেখে আর থাকতে পারল না রাজু। সে গিয়ে টিউবওয়েল পাম্প করতে শুরু করতেই ছোটু মানা করল একগাল হেসে, “তুমি পারবে? তোমার জুতো ভিজে যাবে তো!”
“হ্যাঁ যাবে কিছু নেই
রাজু জানে ওর বাংলাটা একটু পুওর। জীবনে প্রথম মা-বাবার বকুনিকে উপেক্ষা করে এমন কাজ করতে পারছে, সেটাই বা কম কী রাজুর কাছে? ঘটাং ঘটাং করে পাম্প করতে থাকে, দু’জনেই অকারণ হাসে। ওদের দেখে রান্না ঘরের ভেতর থেকে বড়ো কর্মচারীরা উঁকি মারে
“হোই ছোটু, হাত চালা“ ধমক উড়ে আসে।
বাসন ধোওয়া হলে ক’টা কচুরি, তার ওপর একটু ডাল কোনও প্লেট-টেট ছাড়াই নিয়ে কল-পাড়ে খেতে বসে ছোটু। বসল ঠিকই, কিন্তু একটার বেশি খেল না।
“তোমার নাম কি ছোটু? নিজের বাচনভঙ্গী নিজেরই কানে লাগে রাজুর
ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে দেখে বুঝল ছেলেটা ওর কথা একবর্ণও বোঝেনি তাই আবার ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল। এবারে উত্তর পেল, “না, আমার নাম গজানন। গণেশঠাকুর জান? তার নাম। দোকানের মালিক ছোটু বলে, তাই সবাই ছোটু ডাকে তোমার নাম কী?
“রাজু
“তুমি কি বিদেশে থাক?
“হ্যাঁ। আমি কি তোমায় প্রশ্ন করতে পারি?
“কী?
“তোমার শীত করে না? স্কুলে যাও না?
“নাহ্‌, কাজ করতে করতে গরম লাগে আর স্কুলে গেলে খাব কী?
ব্যাপারটা রাজুর বোধগম্য হল না। “মানে?
“মা নেই তো, আর বাবাও চলে গেল আমি তো সবার বড়ো। ছোটো ভাইবোন তিনটেকে খাওয়াতে হবে না?
ওরা কথা বলতে বলতে রাজু দেখল ওর খুড়তুতো ভাইবোনের সাইজের দুটো, আরেকটা আরও ছোটো আধা কাপড় পরা বাচ্চা এসে উপস্থিত আর গজানন ওরফে ছোটু নামের ছেলেটা কচুরিগুলো ওদের দিয়ে নিজে পেট ভরে জল খেয়ে নিল টিউবওয়েল থেকে।
এর মধ্যেই রাজুর বাড়ির লোকজনও খোঁজ করে রাজুকে ওই নোংরা পরিবেশ থেকে উদ্ধার করল। আর হোটেলের বড়ো কর্মচারিরাও ছোটুকে ধমকে আবার কাজে টেনে নিল। এখন তো কচুরির পাট শেষ, দুপুরে ভাত খাওয়ার খদ্দেররা আসবে কাজেই ছোটুকে তো কাজে দরকার। কারণ, গজানন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোকেদের ডেকে আনবে, সাথে সকালের কাজগুলো তো আছেই। রাজুর যে কত কথা জানার ছিল আবার যা দেখল সেগুলোকে মনে মনে হিসেব কষে মেলাতেও হবে।
গাড়িতে যেতে যেতে চুপ করে ভাবতে থাকে রাজু ঠাকুমার কাছে কতরকমের গল্প শুনেছে এই ক’দিনে তাতে গণেশঠাকুরের গল্পও শুনেছে। যেহেতু গজ মানে হাতির মতো আনন মানে মুখ, তাই গণেশঠাকুরের অন্য নাম গজানন। আর এটাও বুঝল, যেহেতু ওই ছেলেটা তার ভাইবোনদের সবার বড়ো তাই গণেশঠাকুরের নামে নাম। সব ঠাকুরের আগে গণেশঠাকুরের পুজো করতে হয় কিনা। আর ওই বাচ্চাগুলোই তার মানে ছোটুর ভাইবোনেরা। এই অবধি তো হিসেব মিলল কিন্তু দোকানের মালিক কেন গজাননকে ঠিক করে খেতে দেয় না? বা ও তো কাজ করে দিচ্ছে, তাহলে ওর ভাইবোনগুলোকে অ্যাট লিস্ট একবেলা তো খেতে দিতেই পারে! অবশ্য দুপুরের খাওয়ার সময়ের আগেই তো ওরা চলে এল দুপুরে কী হয় সেটাও তো রাজুর জানা হল না। রাজুর মন কেমন করতে লাগল ওর দাদামশায়ের কাছে যেতে মন চাইল একমাত্র তিনিই বোধহয় ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন আর কেমন করে গজাননকে হেল্প করতে পারত রাজু বলে দিতে পারতেন। কিন্তু এখন তো রাজু ফেরবার কথা বলতেই পারবে না। বড়ো রাস্তায় রাজুদের গাড়ি ছুটছে হু হু করে চারপাশে কেমন সবুজ মাঠ, ধানক্ষেত জানালা দিয়ে হাঁ করে দেখছিল রাজু।
গাড়িতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল রাজু নিজেও টের পায়নি। মা যখন ঘুম ভাঙাল ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। একটা সুদৃশ্য রিসর্টে তাদের গাড়ি দাঁড়ানো এখানেই থাকা হবে বুঝল রাজু। ঘুম ভাঙতেই ক্ষিদেয় পেট চুঁই চুঁই করে।
দুটো তিনটে দিন ওদের বেশ কাটল। মা, কাকিমা ব্যাপক খুশি কারণ, রান্না নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে না শুধু অর্ডার করার অপেক্ষা, ভালো ভালো মনপসন্দ খাবার হাজির হচ্ছে। বাড়িতেও রান্না করতে হয় না, কিন্তু সেখানে তো অ্যাট লিস্ট বলে দিতে হয় কোন সময় কী রান্না হবে। তায় প্রচুর পরিমাণে হ্যান্ড ক্রাফ্টেড জিনিস কিনেছে দু’জন মিলে। শাড়ি, গয়না, ঘর সাজানোর কী কীসব। রাজু নিজের মনে ঘুরে বেড়িয়েছে আর হিসেব কষে গেছে। লক্ষ করেছে বাবা-মায়ের কথা একবারে শুনে নিলেই ওরা খুশি থাকছে আর কোনও কিছু নিয়ে ডিস্টার্ব করে না। কাজেই সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, ব্রাশ করা, চান-খাওয়া সব ঠিক ঠিক করে করেছে রাজু। এক তো গজাননকে দেখে ভয় হয়েছে, মা বাবা না থাকলে তারও তো ওইরকম দশা হতে পারে আর দুই, গজাননকে হেল্প করতে গেলে নিজেকে ডিসিপ্লিনড হতে হবে। বড়োদের কথা না শুনলে তারাই বা ওর কথা শুনবে কেন?
বাবার মুড ভালো দেখে ফেরার পথে নিজের আর্জি পেশ করল রাজু, “বাবা, ক্যান উই গো টু দ্যাট হোটেল থিঙ্গি আগেন?
“কোন হোটেল?
“দ্যাট হোটেল হোয়্যার উই হ্যাড খচুরি, হোয়াইল উই ওয়্যার কামিং হিয়ার
“ওরে ওগুলোকে কচুরি বলে, খচুরি না। ওই হোটেলে আবার খাবি?
“হোয়াট এভার, ক্যান উই বাবা? প্লিজ!”
বাবা কী বুঝল কে জানে হ্যাঁ বলে দিল রাজুর কথায়।
রাজু এবারে দেশে আসার পর থেকে কত লোক ওকে মানি দিয়েছে গিফ্ট হিসেবে মা বলে দিয়েছে ওগুলো সব রাজুর ও ওর ইচ্ছেমতো স্পেন্ড করতে পারবে। রাজু কাউন্ট করে দেখেছে টোটাল টোয়েন্টি ফাইভ থাউসেন্ট রুপিস আছে ওর রাজু যদিও সঙ্গে এনেছে কিন্তু কোথায় বা খরচ করবে ও? কাজেই রাজু এটাই ঠিক করেছে ও সবটা টাকা গজাননকে দিয়ে দেবে আর প্রথম যেদিন এই রিসর্টে এল, সেই রাতেই খাবার সময়ে কিছুটা ইচ্ছে করে, কিছুটা ধাক্কা লেগে রাজু এবং ওর ভাইবোনদের জামাকাপড়ে মাংসের ঝোল মেখে গেছিল। মা, কাকি ফেলে দিতে গেলে রাজু চ্যাঁ ভ্যাঁ করেছিল ওটা নাকি ওর খুব ফেভারিট, পরতে না পারলেও ফেলতে দেবে না। আসল উদ্দেশ্য কিন্তু রাজুর অন্য ছিল।

প্রায় সন্ধে নাগাদ রাজুরা যখন গজাননদের হোটেলে পৌঁছল, তখন চা-বিস্কুট ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাচ্ছে না দোকানে। দোকানের মালিক আর গজানন ছাড়া আর কর্মচারীও কেউ নেই দোকানে। রাজুরা আসতেই গজানন চিনতে পেরেছে রাজুকে। ওরা যখন চা খাচ্ছে মালিক তখন কোনও কাজে দোকানের বাইরে গেল। রাজু দেখল এই সুযোগ চট করে প্যাকেট করা জামাকাপড়গুলো আর টাকাগুলো গজাননকে দিয়ে বলল, “তুমি ইউস কোরো
আগের দিনের ঘটনা মনে পড়তেই গজাননকে চট করে প্যাকেটটা লুকিয়ে ফেলতেও বলল। গজানন ওই ঘটনায় অভ্যস্ত কাজেই রাজু বলার আগেই ও লুকোচ্ছিল। রাজুর সঙ্গে থাকা বড়োরা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল রাজু ওদেরকে সবটা এক্সপ্লেন করল। আর মাথা নিচু করে বলল, “সরি, তোমাদের জিজ্ঞেস না করেই আমি ডিসিশন নিয়ে ওকে দিয়ে দিলাম
একে একে রাজুর মা, বাবা, কাকু, কাকিমা ওকে জড়িয়ে ধরে ওরা কতটা প্রাউড রাজুর এই কাজে সেটা বললআর প্রমিস করল, এবার থেকে ওরাও রাজুর মতোই গজাননদের নিজের সাধ্যমতো হেল্প করবে। আর সেটা আজ থেকেই শুরু, এই গজাননকে দিয়েই অতএব বাবা, মা, কাকা, কাকিমাও নিজেদের পার্স উপুড় করে দিল। এবারে আর রাজুকে কোনও বাধা দিল না কেউ রাজু তার বন্ধু গজাননকে জড়িয়ে ফটো তুলে, বাই করে রওনা দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে যদিও আর কখনও দেখা হবে কি না সেসব ভেবে মন খারাপ হচ্ছিল রাজুর।
এমন একটা কাজ করতে পেরে, বড়োদের সাহায্য পেয়ে আনন্দে ডগমগ রাজু বাড়ি ফিরে দেখে ওর দাদুন এসেছেন। অতএব দাদামশায়, দাদুন দু’জনকে একসাথে হৈ হৈ করে শোনাল রাজু গজাননের গল্প ওর সাথে তোলা ছবিটাও দেখাল। বাবাদের কাছ থেকে গজাননদের দোকানটার লোকেশন জেনে নিয়ে বেশ রহস্য করে করে গল্পের মতো করে পুরোটা বলল রাজু। দাদা, দাদুন, ঠাম্মা সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেন রাজু ছোটো হলেও খুব বড়ো মনের পরিচয় দিয়েছে।

পরদিন সকালে একটা ফোন পেয়ে বাড়িতে হুলুস্থুল দাদুন নাকি অসুস্থ বোধ করছেন আর তাই ডেকে পাঠিয়েছেন সবাইকে। মা টেনেটুনে রাজুকে ঘুম থেকে তুলে সবাই মিলেই দৌড়ল দাদুনের বাড়ি। কিন্তু তখন কি আর জানত সেখানে কী সারপ্রাইস অপেক্ষা করে আছে? দাদুনের বাড়ি গিয়ে দেখে দাদুনের শরীর খারাপটা বানানো উনি ইচ্ছে করেই মিথ্যে বলেছেন সেটা না হলে তো আর কেউ এমন দৌড়ে দৌড়ে আসত না। মিথ্যে বলার জন্য অবশ্য দাদুন মাফ চেয়ে নিলেন সবার কাছে। তবে দাদুনের অনেকদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছে রাজু। কীভাবে? রাজু গজাননকে হেল্প করায়, ওর সমস্ত ইনফরমেশন দেওয়ায় দাদুন গিয়ে গজানন আর ওর ভাইবোনদের নিয়ে এসেছেন নিজের কাছে।
অগাধ সম্পত্তির মালিক দাদুন অনেকদিন ধরেই এইরকম ছেলেমেয়েদের জন্য একটা থাকার, খাওয়ার, পড়াশোনা শেখার শেল্টার করবেন বলে ভেবেছিলেন। যেখানে ওরা থাকবে, চাইলে বাড়ি যেতে পারবে বা ওদের বাবা-মায়েরা দেখা করতে পারবে। ওদের মানুষের মতো মানুষ করার, সুস্থ সুন্দর একটা জীবন দেবার চেষ্টা করবেন দাদুন। দিদুন মারা যাবার পর একদম একা হয়ে গিয়েছেন দাদুন গত রাতে রাজুর কাছে গজাননের কথা শুনে ওঁর মনে হয় এদের দিয়েই শুরু করার কথা। যেমন ভাবা তেমনি কাজ দোকানের মালিক যে খুব সহজে আসতে দিয়েছে গজাননকে তা নয়। তবে দাদুনের খুব বুদ্ধি আর কত মানুষের সাথে যোগাযোগ! সেইসব কাজে লাগিয়ে দাদুন উদ্ধার করেছেন গজাননদের। রাজুর আর বিদেশ ফিরতে মন খারাপ রইল না। এবার থেকে চাইলেই তার নতুন বন্ধু গজাননের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে আর যখনই এদেশে আসবে দেখা তো হবেই।
রাজুর সাজেশনে ওদের নতুন আস্তানার নাম হল ‘আনন্দময়ী হোম’, দিদুনের নামে।

_____

অলঙ্করণঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

8 comments:

  1. অতি সুন্দর গল্প, বাচ্চারা এবং বড়রা দুই বয়েসি লোকেদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় আছে এই গল্পটিতে । আরও এই ধরনের লেখা পড়বার আশা রইলো

    ReplyDelete
  2. কী মিষ্টি গল্পটা! :)

    ReplyDelete
  3. কী মিষ্টি গল্পটা! :)

    ReplyDelete
  4. কী মিষ্টি গল্পটা! :)

    ReplyDelete
  5. বেশ লাগল... এটা যদি বাস্তবে হয়।

    ReplyDelete
  6. খুব ভাল লাগল। এমন আরও চাই।

    ReplyDelete
  7. বাহঃ সুন্দর গল্প। অহেতুক জ্ঞান দেওয়া নেই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। ছোটদের দৃষ্টিকোণ থেকে লিখতে পারা সহজ নয়। কিন্তু গল্পকার সেটা সুন্দরভাবে করতে পেরেছেন :)

    ReplyDelete