গল্পঃ কুতুয়া - প্রকল্প ভট্টাচার্য


কুতুয়া
প্রকল্প ভট্টাচার্য


“ক্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ!”
কলিংবেল বাজতে মা এসে দরজা খুলে দিল। ঢুকতে ঢুকতে বুলান বলল, “আচ্ছা মা, সকলের বাড়ির কলিংবেল কী সুন্দর মিউজিক্যাল আমাদেরটাই শুধু এমন কেন?”
মা শরবতের গ্লাস বাড়িয়ে দিতে দিতে গম্ভীরমুখে বুলানকে আপাদমস্তক জরিপ করে বলল, “যে কাজের জন্য যেটা। কলিংবেলের কাজ লোককে ডেকে দেওয়া। মিউজিক শোনাবার জন্য অডিও সিস্টেম আছে। তোমার আসতে যেন একটু দেরি হল আজ?”
বুলান সতর্ক হলমায়ের মুডটা বোঝা যাচ্ছে না। বেশি নয়, মিনিট পনেরোই দেরি হয়েছে কিন্তু কারণটা মাকে কিছুতেই বলা যাবে না। তার চেয়ে প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দেওয়া ভাল।
“জান মা, আমাদের স্কুলের সায়েন্স এক্সিবিশনের জন্যে আমাদের ক্লাশ থেকে আমাকে সিলেক্ট করেছে!”
“হ্যাঁ, কালও তো বললে এই কথাটা। খুব ভালো কিন্তু তার এখন অনেক দেরি আছে। দেখি, মিস কী কী হোমওয়ার্ক দিলেন আজ?”
মুখ হাত ধুয়ে পোশাক বদলে বুলান দুধ-কর্নফ্লেক্স খেতে খেতে নেক্সট দিনের জন্য স্কুলের ব্যাগ গোছাতে বসলআবার মা ঘরে এসে ঢোকে, “বুলান, তোমার প্যান্টের পকেটে এগুলো কী?”
বুলানের বুকটা ধড়াস করে ওঠে।
“ক্কী, মা!”
“বিস্কিটের গুঁড়ো মনে হচ্ছে। পকেটে এল কী করে?”
“আজ লাঞ্চটাইমে, মানে ওই শৌভিক দিল... তখন খেলছিলাম তো গ্রাউণ্ডে, তাই পকেটে...”
“কতবার বলেছি, কেউ কিছু দিলেই হ্যাংলার মতো নিয়ে নেবে না! কেন নিয়েছ শৌভিকের বিস্কিট? তোমাকে আমরা বিস্কিট কিনে দিই না?”
“হ্যাঁ মা, আমি নিতে চাইনি ওর বার্থ ডে, তাই সকলকেই... আর নোব না মা!”
কথা না বাড়িয়ে মা ওয়াশিং মেশিনের কাছে চলে গেল। বুলান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। উফফ্‌, আর একটু হলেই ধরা পড়ে গেছিল আর কি! আরও সাবধান হতে হবে তাকে।
বুলানের মা একটা হাইস্কুলের হেডমিস্ট্রেস। খুব কড়া। নাইন টেন-এর ছেলেরা মায়ের সামনে নাকি ভয়ে কাঁপে, বুলান শুনেছে। তাই মায়ের খুব সুনাম। টিচার হিসেবেও মায়ের খুব নামডাক কিন্তু মা টিউশন পড়ায় না কারোকে। স্কুল শেষ হলেই সোজা বাড়ি চলে আসে বুলান ফেরবার একটু আগে। বলে, “আমার ফ্যামিলি আমার কাছে ফার্স্ট প্রায়োরিটি। পড়ানো আমার প্যাশন, কিন্তু সেটা সেকেণ্ডারি।”
সত্যি বলতে কী, বুলানের মনে হয় যে তার বাবাও বোধহয় মাকে একটু সমঝে চলে। একবার তার হয়ে বলতেও গেছিল, “ওহ্‌ ঝুমা, বুলানের ব্যপারে তুমি বড্ড বেশি স্ট্রিক্ট হয়ে যাচ্ছ দিন দিন! আফটার অল, হি ইজ আ চাইল্ড!”
মা ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল, “আমি জানি, হি ইজ চাইল্ড। এও জানি, কোন ব্যপারে কখন কতটা স্ট্রিক্ট হতে হয়। ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফো, চাইল্ড সাইকোলজি আমার স্পেশাল পেপার ছিল। এই বয়সে ওর ফার্ম পেরেন্টিংই দরকার। শ্লোকটা স্মরণ কর, লালয়েত পঞ্চবর্ষাণি, দশবর্ষাণি তাড়য়েত। বুলানের বয়স এখন দশ বছর। অ্যানাদার ফাইভ ইয়ার্স। তারপর তুমি তোমার ছেলে সামলিও, আই ওন্ট বদার!”
বেচারা বাবাসেই সকালে অফিসে বেরোয়, ফিরতে রাত্তির হয়ে যায়। বাড়িতেও ল্যাপ্টপ আর ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এর ওপর যদি বুলানের হোমটাস্ক, প্রজেক্ট এইসব দেখতে হত, সত্যিই পাগল হয়ে যেত। তাই তারপর থেকে মাকে আর ঘাঁটায় না।
আজ বুলানের এমন অবস্থা, উত্তেজনাও হচ্ছে অথচ খুলে বলতেও পারছে না কারোকে। কোনভাবে বাবা আজ অফিস থেকে ফেরা পর্যন্ত সাবধানে থাকতে হবে। কিন্তু বাবাও কি সল্যুশন দিতে পারবে কোন? দেখা যাক
“মা, আজ কোন টাস্ক দেয়নি স্কুলে।” স্কুলের বইখাতা গুছিয়ে বুলান বলল, “আমি কি একটু নিচে বেড়াতে যাব?”
মা ভুরু কোঁচকাল।
“হঠা নিচে যেতে চাইছ যে? এখন তো তোমার টিভিতে কার্টুন দেখবার সময়!”
ঠিক। আবার মনে মনে জিভ কাটল বুলান। বিকেলের একঘন্টা সময় তার টিভি দেখবার জন্যই বরাদ্দ। কতবার মা-ই তাকে বলেছে নিচে গিয়ে সাইকেল চালাতে, খেলতে কিন্তু বুলান নিজেই কান্নাকাটি করে এই টিভি দেখবার সময়টা আদায় করেছে। এই হাউসিং কমপ্লেক্সে তার খেলার কোন সঙ্গী নেই, একা একা সাইকেল চালাতে ভালো লাগে না, এইসব বলে।
কিন্তু এখন তো তাকে একবার নিচে যেতেই হবে মাকে সেটা বলবে কী করে! ম্যানেজ দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি বলল, “রোজ টিভি দেখতে ভালো লাগে না মা একা একাই একটু খেলে আসি, তারপর পড়তে বসব।”
যতটা সম্ভব স্বাভাবিক মুখ করে বুলান নিচে নামলওয়াচম্যান আঙ্কল আবার মাঝে মাঝে রাউন্ড দেয় দেখলেই মাকে গিয়ে লাগাবে। যাক, এখন কেউ নেই। বুলান আস্তে আস্তে তাদের কমপ্লেক্সের পেছনের গেটের বাইরে চলে এল। এইদিকে বিশেষ কেউ আসে না। বাইরে বেরোলেই পাশের প্লটে ফ্ল্যাটবাড়ি বানানো হচ্ছে তাই রাবিশ জমা হয়ে আছে কিছু। চাপাস্বরে ‘কুতুয়া!’ বলে ডাকতেই সেই রাবিশের ঢিপির পেছন থেকে একটা নেড়ি কুকুরের ছানা লেজ নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে এল।
গায়ের রঙ খয়েরি আর কালোয় মেশান, রোগা। কিন্তু চোখদুটো খুব উজ্জ্বল। আজই সকালে স্কুল যাওয়ার সময় ভ্যানটা এই গেটে এসেছিল তাই বুলানের নজর পড়েছিল। তখন একদম সময় ছিল না। সারাদিন এর কথাই ভেবেছে, একটা নামও ঠিক করেছে, ‘কুতুয়া’। স্কুলে শৌভিকের দেওয়া বিস্কিটটা পকেটে করে এনেছিল এরই জন্যে। শৌভিকও জানে বুলানের মা খুব স্ট্রিক্ট তাই সব ঘটনা শুনে জানতে চেয়েছিল, “পুষবি ভাবছিস, তো আন্টি অ্যালাও করবেন রে?”
“জানি না বাবাকে একবার রিকোয়েস্ট করব নাহলে রোজ বিকেলে নিচে এসে লুকিয়ে লুকিয়ে খেলা করে যাব
স্কুল থেকে ফিরে পেছনের গেটে এসে পকেটের বিস্কিট কুতুয়াকে খাইয়ে তবে শান্তি। কিন্তু ওদিকে তাড়া। একটু দেরি হলে মা ভ্যান আঙ্কলকে ফোন করবে আর যদি জানতে পারে যে বুলান নেমেছে অথচ বাড়ি ঢোকেনি...
যাই হোক, এখন পর্যন্ত সব তো ভালোয় ভালো কাটছে। দেখা যাক, বাবা কিছু উপায় বার করতে পারে কি না। কুতুয়াকে দেখে বুলানের এতক্ষণের দুশ্চিন্তা আর ভয় সব কেটে গেল। মাটিতে উবু হয়ে বসে মনের আনন্দে সে গল্প করতে লাগল কুতুয়ার সঙ্গে।
“শোন, তোর নাম রেখেছি কুতুয়া। কুতুয়া বলে ডাকলে সাড়া দিবি, কেমন? আমার নাম বুলান। আমি তোর বন্ধু। স্কুল থেকে তোর জন্যে যে বিস্কুটটা নিয়ে এলাম, খেয়েছিস? ভালো ছিল?”
কুতুয়া বুলানের মুখের দিকে তাকায় আর লেজ নাড়ে।
“আবার খিদে পাচ্ছে? কিন্তু এখন তো কিছু খাবার আনিনি রে!”
কুতুয়া লেজ নেড়েই চলে।
“শোন, আমায় এবার পড়তে বসতে হবে। যদি রাতে একটু রুটি লুকিয়ে আনতে পারি, তো তোকে দেব। তুই কিন্তু ঘুমোবি না, কেমন? এখানেই থাকবি। আসব আমি আবার। আর...”
বুলানের বাকি কথা আর বলা হল না। কারণ, সে দেখতে পেল ঠিক পেছনেই তার মা দাঁড়িয়ে আছে হয়তো এতক্ষণ যা যা বলেছে, সবই শুনেছেস্থির চোখে মা তাকিয়ে আছে বুলানের দিকে আর বুলান যেন স্ট্যাচু কতক্ষণ এইভাবে কেটেছে কে জানে হঠা কুতুয়া কী মনে করে সোজা এগিয়ে গিয়ে বুলানের মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে ‘কুঁইকুঁই’ করতে লাগল আর লেজ নাড়াতে লাগলমা গম্ভীর গলায় বলল, “বুলান!”
বুলান নিশ্চিত, হাইড্রোজেন বোমা ফাটবে এবার। সে ভয়ে চোখ বুজিয়ে, কান বন্ধ করে ফেলতে যাচ্ছিল কিন্তু...
কিন্তু মা বলল, “এই নোংরার মধ্যে পড়ে থাকলে তো তোমার কুতুয়ার অসুখ করবে! একটা বাকেটে একটু গরম জল, তার সঙ্গে ডেটলের শিশি আর তুলোর প্যাকেটটা নিয়ে এস। আর হ্যাঁ, আলমারিনিচের তাকে দেখবে পুরনো টাওয়েল কেচে রাখা আছে, একটা আনবে। দৌড়ে নিয়ে এস। একে পরিষ্কার করে তবে ঘরে নিয়ে যাব। কাল একবার একজন ভেট আঙ্কলকে দেখিয়ে নেব। তবে অন ওয়ান কণ্ডিশন, তুমিই কিন্তু এর সমস্ত দায়িত্ব নেবে। পারবে তো?”
আনন্দে, বিস্ময়ে বুলানের গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছিল না তবু কোনমতে বলল, “পারব মা, শ্যিওর!”
বলেই জল-টাওয়েল আনতে ছুট লাগাল।
যদি একবার পেছন ফিরে দেখত, তাহলে আরও অবাক হতদেখত, তার হেডমিস্ট্রেস, কড়া শাসন করা মা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে কুতুয়ার মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর কুতুয়া মহানন্দে কুঁই কুঁই করে লেজ নাড়াচ্ছে!

_____


অলঙ্করণঃ মানস পাল

4 comments: