বইকথাঃ সব লজিকের বাইরে - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী / আলোচনাঃ রূপসা ব্যানার্জি


সব লজিকের বাইরে
লেখকঃ অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
প্রকাশনাঃ পত্রভারতী
আলোচনাঃ রূপসা ব্যানার্জী


এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর লেখা ১৮টি ছোটগল্প নিয়ে প্রকাশিত এই বইটি পড়ে খুব ভালো লাগল। প্রতিটি গল্পই ভিন্ন স্বাদের। কল্পবিজ্ঞান যেমন রয়েছে, তেমন ভৌতিক ও মানবিক কাহিনিও আছে। আর আছে এমন কিছু গল্প, যা খুব সাধারণভাবে শুরু হলেও অসাধারণ একটা চমক দিয়ে শেষ হয়েছে।


আমরা দামি দামি কাঠের আসবাব দিয়ে ঘর সাজাই। সেই শখ মেটাতে কত গাছকে যে নিজের জীবন দিতে হয়, তার হিসেব কি আমরা কখনও রাখি? আমরা খুব নিশ্চিন্ত থাকি যে গাছেরা আমাদের কিছু করবে না। কারণ, ওরা প্রতিবাদ করতে জানে না। কিন্তু যদি কোনওদিন সেই ধারণা ভেঙে দেয় গাছেরা? সেদিন কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই প্রথম গল্প ‘গ্যারি ক্যাসেলের চিঠি’-তে।


আধুনিক পৃথিবী চায় নিখুঁত মানুষ। কোনওরকম ছোটোখাটো রোগ বা খুঁত থাকলে তার স্থান হবে না এখানে। একথা ভেবেই এক বিজ্ঞানী হত্যা করতে চেয়েছিলেন বংশগত রোগ নিয়ে সৃষ্ট সমস্ত মানব-ভ্রূণকে। তারপর? কীভাবে তিনি তার লক্ষ্যের দিকে এগোলেন? তিনি কি পারলেন সফল হতে? এই নিয়েই লেখা হয়েছে ‘ডঃ লিওনারড ও অ্যালোপেশিয়া’ গল্পটি।


এরপরের গল্প ‘স্বামী ভবানন্দ রহস্য’ পড়তে গিয়ে প্রথমে সত্যি কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সাধু-সন্ন্যাসীরা কি সত্যি কোনও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী? নাকি তার পেছনে অন্য গল্প আছে?


আমরা প্রতিদিন জীবনের পথে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকেই স্মৃতির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু যদি কোনও মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব বেশি সক্রিয় হয়? সে যদি হাজার লোকের ভিড়ে বহু বছর পরেও বিশেষ কাউকে সনাক্ত করে ফেলে? এরকম একটা ঘটনা আমরা দেখতে পাই ‘চেনা মুখ’ গল্পে।


দেওয়ালের রং ছিল সাদা’ গল্পটি পড়তে পড়তে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু শেষে মনে হল, আধুনিক পৃথিবীর সবকিছুই কৃত্রিম নয়। ভালো কাজে লাগাতে পারলে প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু পাইয়ে দিতে সক্ষম।


রাস্তা যখন শেষ’ গল্পটি বেশ টানটান একটা থ্রিল নিয়ে এসেছিল। কিছু একটা হতে চলেছে, তা বুঝতে পারছিলাম। অন্যায় করে হয়তো কিছুদিনের জন্য পার পাওয়া যায়, তাই বলে চিরদিনের জন্য নয়। তাই অপরাধীরা সাবধান!


এবার বলব এই বইয়ের অন্যতম সেরা গল্পের কথা। নাম ‘স্বাধীনতা’। এই শব্দের অর্থ কি আমরা সবাই ঠিকঠাক বুঝি? এই গল্পে এক ছোট্ট ছেলে আমাদের শিখিয়ে দেবে স্বাধীনতার অর্থ।


মিঃ পাই আমার খুব প্রিয় একটি চরিত্র। তাঁকে নিয়ে দুটো গল্প আছে এখানে। ‘মিঃ পাই ও সেই ওষুধ’ এবং ‘মিঃ পাই-এর এক্সপেরিমেন্ট’। দারুণ মজা পেয়েছি এই গল্পদুটো পড়ে। সত্যি যদি এমন করা যেত, খুব ভালো হত কিন্তু। অনেকের একটু শিক্ষা হত।


অচেনা হাত’ গল্পটি একদম অচেনা কনসেপ্টের উপর লেখা। আমাদের সব অঙ্গই তো মস্তিষ্কের নির্দেশ মেনে চলে। কিন্তু সেখানে যদি দুটি অঙ্গের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়, তখন কী হবে? একদম রুদ্ধশ্বাসে পড়ার মতো গল্প।


কে ছিল সে’ গল্পটি যে বিষয়ের উপরেই লেখা হোক না কেন, আমার কাছে এটা  ভারি মিষ্টি গল্প, মন কেমন করা গল্প। ভয়ের লেশমাত্র নেই এখানে।


ওয়েলেস শহরে রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার দেখতে গিয়ে অনিলিখার আলাপ হল একটি মেয়ের সঙ্গে। কে ছিল সে? বেশ ভালো লাগল গল্পটা ‘অনিলিখা ও ভূত’।


এরপরের গল্পটি ছোটো হলেও তার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক কথা। পড়েছি আর মুগ্ধ হয়েছি। এই অসাধারণ গল্পটির নাম ‘মূর্তি’।


ফ্লাইট নাম্বার ৩২’ গল্পটি কল্পবিজ্ঞান নির্ভর হলেও মানুষের মনের চিন্তা, ভাবনা, দুঃখ, অভিমানের এক সুন্দর ছবি এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।


সময় যখন চারটে চল্লিশ’ পড়ে বেশ ভালোরকম ভয় পেয়েছি। ওয়েলসের একপ্রান্তে সমুদ্রের ধারের এক বহু পুরনো ক্যাসেল দেখতে এসেছিল দুই বন্ধু। তারপর? গায়ে কাঁটা দেওয়া অভিজ্ঞতা! কী অসাধারণ বর্ণনা! দুর্দান্ত লেগেছে গল্পটা।


স্বপ্নের মধ্যে’ গল্পটা বেশ ধীরে ধীরে পড়েছি। অনেক কিছু বোঝার আছে, ভাবার আছে এই ছোট্ট গল্পটার মধ্যে। হয়তো সত্যি এমন একটা দিন আমাদের জীবনে আসতে চলেছে।


এরপরের গল্প ‘নেপোলিয়নের সূত্র’। গল্পটার নাম শুনে মনে হয়েছিল কল্পবিজ্ঞানের গল্প হবে হয়তো। কিন্তু পড়তে গিয়ে বুঝলাম এ কীসের গল্প! আমার চোখে সহজে জল আসে না। তাই হয়তো একবারে পুরোটা পড়তে পেরেছি।  আমার কাছে এই বইয়ে পড়া সবচেয়ে সেরা গল্প মনে হয়েছে এই গল্পটিকে। বড্ড বেশি কঠিন সত্য। সহ্য করতে খুব কষ্ট হয়।


শেষ গল্প ‘সব লজিকের বাইরে’ আগেও পড়েছি, এখনও পড়লাম। কিন্তু আরও বেশি করে ভালো লাগল। এর সম্বন্ধে যাই বলি, কম বলা হবে। আমি সেই ভদ্রলোকের প্রখর বুদ্ধির প্রশংসা করি। তাঁর কাজকেও সম্পূর্ণ সমর্থন করি। যে দেশে আইনের এই দশা, আমাদের বাচ্চাগুলো যেখানে এতটা নিরাপত্তাহীন, সেখানে যা হয়েছে বেশ হয়েছে।


জানি না আমার ভালো লাগার অনুভূতি কতটা স্পষ্ট করে বোঝাতে পারলাম। লেখক যে আরও কত অবাক করে দেবেন তাই ভাবছি! শেষে একটাই কথা বলব, ইস! কতদিন হল বইটা প্রকাশিত হয়েছে, আর আমি এত দেরি করে ফেললাম পড়তে?

_____

No comments:

Post a Comment