সিনেমহলঃ কং স্কাল আইল্যান্ড - ঋজু গাঙ্গুলি




সিনেমাঃ কং : স্কাল আইল্যান্ড

রিভিউঃ ঋজু গাঙ্গুলি


১৮৯৯ সাল।
ছ’বছর বয়সী একটি ছেলে তার কাকার কাছ থেকে একটা বই উপহার পেল। ১৮৬১-তে প্রকাশিত পল দু শ্যালু-এর লেখা ‘এক্সপ্লোরেশনস অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার্স ইন ইকুয়েটরিয়াল আফ্রিকা’ নামের সেই বইটায় নানা রোমাঞ্চকর ঘটনার সঙ্গে ছিল দু শ্যালু-এর চোখ দিয়ে ছেলেটির জীবনে প্রথমবারের জন্য গরিলা দর্শন। দু শ্যালু একটি অতিকায় গোরিলার কথা লিখেছিলেন বইটায়, যাকে স্থানীয় মানুষেরা তার শক্তি ও আকারের জন্য শুধু অজেয় বলেই মনে করত না, তাকে ‘আফ্রিকার জঙ্গলের রাজা’ বলেই মনে করত।
দু শ্যালু-এর মতো ছেলেটির মনেও ধারণা তৈরি হয় যে সেই দানবাকৃতি গরিলাটি মানুষের চেহারার আভাস, আর আদিম এক বন্যতার অদ্ভুত, অকল্পনীয় মিশ্রণের প্রতীক।
অনেক পরে চলচ্চিত্র জগতে যখন তার কিছুটা নামডাক হয়েছে, তখন আফ্রিকার বুকে ‘দ্য ফোর ফেদার্স’ নামের একটা সিনেমা বানাতে গিয়ে ছেলেটি, বরং লোকটি একঝাঁক বেবুনের সান্নিধ্যে আসেন। ছোটোবেলার সেই ভয় আর শিহরণ মেশানো স্মৃতিগুলো ফিরে আসে তাঁর মনে। প্রাইমেটদের নিয়ে সিনেমা করার কথা ভাবতে থাকেন তিনি।
পরের বছর হলিউডের নামকরা আরকেও স্টুডিওতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর প্রিয় প্রজেক্ট হয়ে দাঁড়ায় একটি টেরর গরিলা পিকচার বানানো।
ইতিমধ্যে ডগলাস বার্ডেনের লেখায় ততদিন অবধি ক্রিপটোজুলজিস্টদের আলোচনার বিষয় এবং ক্রিপটিড হিসেবেই বিবেচিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোমোডো ড্রাগনের কথা পড়ে তাঁর মাথায় ফিরে আসে দৈত্যাকৃতি প্রাণীদের কথা, যারা এখনও থেকে যেতে পারে প্রশান্ত মহাসাগর বা ভারত মহাসাগরের কোনও নাম না জানা দ্বীপে।
তারপর একদিন সেই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বাড়ি নিউ ইয়র্ক ইন্সিওরেন্স বিল্ডিংয়ের মাথার ওপর দিয়ে একটা হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখেন তিনি। তাঁর কল্পনায় ভেসে ওঠে এক দানবাকৃতি নরবানরের ছবি, যে ওই বাড়িটার মাথায় উঠে সভ্য পৃথিবীর শক্তির উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে!

সেই চলচ্চিত্রকার হলেন মেরিয়ন সি কুপার।
তাঁর ভাবনাগুলো জুড়ে জুড়েই মূর্ত হয়ে ওঠে কংগোর গভীর অরণ্যের পটভূমিতে খুঁজে পাওয়া এক রাজকীয় গরিলা, যার বাসভূমি হতেই পারে প্রশান্ত মহাসাগরের এক অজানা দ্বীপ, যেখানে তাকে কোমোডো ড্রাগনের প্রায় ডাইনোসর-সুলভ জ্ঞাতিদের সঙ্গে লড়ে বাঁচতে হয়।
তিল তিল করে গড়ে ওঠে তার চেহারা। অ্যামেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি থেকে পাওয়া বুল গরিলার চেহারাকে আরও সুঠাম ও বলশালী বানানো হয়। রুক্ষ, কর্কশ লোমে তার শরীরকে ঢেকে দেওয়া হয়। চোখজোড়াকে লাল আর দাঁতের সারি একেবারে প্রাণঘাতী করে দেওয়া হয়। আকার করে দেওয়া হয় বড়ো, যতটা সম্ভব তার চেয়েও বড়ো!
সেই সময়ের জনপ্রিয়তম রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যিকদের মধ্যে থাকা এডগার ওয়ালেস কল্পবিজ্ঞান বা ফ্যান্টাসি নিয়ে লিখতে চাইতেন। কিন্তু সেই লেখাগুলোর জন্য প্রকাশকেরা তেমন দাম দিতেন না বলে তাঁর একটা আক্ষেপ ছিল। কুপার তথা হলিউডের সঙ্গে এই গল্পটা লেখা নিয়ে চুক্তি করে অবশ্য খুশি হন ওয়ালেস। তবে তাঁর ১১০ পাতার ড্রাফটের ভিত্তিতে শেষ অবধি যে সিনেমাটা বেরোয়, সেটা তিনি দেখে যেতে পারেননি।
১৯৩৩ সালের ২রা মার্চ আত্মপ্রকাশ করে ‘কিং কং’।

প্রশান্ত মহাসাগরের এক অজানা ও রহস্যাবৃত দ্বীপ হল স্কাল আইল্যান্ড। সেখানকার আদিবাসীরা তাদের রাজা কং-এর উদ্দেশে বলি হিসেবে নিবেদন করেছিল সেই দ্বীপে হঠাৎ করে এসে পড়া অভিযাত্রী দলের সদস্য একটি মেয়েকে, যার নাম অ্যান ড্যারো।
কং তাকে মারেনি, বরং ভালোবেসে ফেলেছিল। তাকে বাঁচানোর জন্য সে সেই দ্বীপের ভয়াবহ প্রাণীদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল, যাদের মধ্যে ছিল একটি টিরানোসর এবং একটি দানবাকৃতি অক্টোপাস! সবথেকে বড়ো কথা, মেয়েটির কথায় নিউ ইয়র্কে পৌঁছনোর পর যখন নিজের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন অন্য যেকোনও প্রাণীর মতোই ভয়ে আর রাগে কং পালাতে চায়, আর পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাকে বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রমণ করে, তখনও কিন্তু সে নিশ্চিত করতে চায় যাতে অ্যান-এর কোনও ক্ষতি না হয়।
তাই হেলিকপ্টার থেকে ছুটে আসা অবিশ্রান্ত গুলির আঘাতে রক্তাক্ত কং যখন সেই সুউচ্চ বাড়ির মাথা থেকে নিচে পড়ে যায়, তখনও তার কাছে সুরক্ষিত ছিল অ্যান।
ভয়, রোমাঞ্চ আবার একই সঙ্গে দানবের মানবিকতার দিকে ইঙ্গিত করে সিনেমাটা শুধু সুপারহিটই হয়নি, জনমানসে উন্মাদনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রায় ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। এই জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে ঝটপট সেই বছরেই এসে পড়ে ‘সান অফ কং’।
কিন্তু তারপর সিনেমা তথা চরিত্রটি বাক্সবন্দি হয়ে যায় বহু-বহুদিনের জন্য। এর জন্য দায়ী ছিল আইনি জটিলতা। কুপার ভেবেছিলেন, চরিত্রটির ওপর সম্পূর্ণ অধিকার তাঁর। কিন্তু তাঁকে না জানিয়েই আরকেও স্টুডিও সেটিকে নিয়ে অন্য বেশ কিছু সিনেমা বানাতে সচেষ্ট হয়, ফ্রাঞ্চাইসি মারফৎ টাকা কামায় এবং শেষ অবধি কুপারের বিরোধিতা উপেক্ষা করেই চরিত্রটি বিক্রি হয়ে যায় জাপানের টোহো স্টুডিওর কাছে, যারা পরমাণু বোমা এবং বিকিনি অ্যাটলে পরীক্ষিত হাইড্রোজেন বোমার বিভীষিকা মাথায় রেখে ততদিনে এনে ফেলেছে তাদের নিজস্ব মনস্টার ‘গডজিলা’! এই দুই দানবের মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে লাভের মুখ দেখার আশায় টোহো স্টুডিও ১৯৬২-তে আমাদের উপহার দেয় ‘কিং কং ভার্সাস গডজিলা’!
টোহো থেকেই পাওয়া যায় ১৯৬৭-তে ‘কিং কং এসকেপস’।
তাছাড়া নানা স্টুডিও নানাভাবে অ্যানিমেশন, টিভি সিরিজ, মায় মিউজিকালের মাধ্যমে এই চরিত্রটির ভয়াল অথচ অপ্রতিরোধ্য আবেদনকে কাজে লাগাতে থাকে।
১৯৭৬ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে কিং কং চরিত্রটি পাবলিক ডোমেইনে চলে গেলেও ওই চরিত্রটি নিয়ে করা প্রথম দুটি সিনেমা বাদে চরিত্রটির নাম ও তৎসংক্রান্ত যাবতীয় গল্পর কপিরাইট কুপারের। কুপার এই সত্ত্ব ইউনিভার্সাল স্টুডিওকে বিক্রি করে দেন।

একে একে এই স্টুডিও থেকে রিলিজ করেঃ
  • কিং কং (১৯৭৬-এর ১৭ই ডিসেম্বর)
  • কিং কং লিভস (১৯৮৬-র ১৯শে ডিসেম্বর), যেটির প্রতি আমার কিঞ্চিৎ ব্যক্তিগত দুর্বলতা আছে। কারণ হলে গিয়ে কিং কং-এর সঙ্গে আমার সেটিই প্রথম মোলাকাত।
  • কিং কং (২০০৫-এর ১৪ই ডিসেম্বর), যার পরিচালক ছিলেন ‘লর্ড অফ দ্য রিংস ট্রিলজি’ নির্মাতা পিটার জ্যাকসন।

কিন্তু যেকোনও কারণেই হোক না কেন, সে কং-কে বড্ড বেশি নরম করে দেখানোর জন্যই হোক বা স্কাল আইল্যান্ডে একটি অভিযাত্রী দলের পৌঁছনোর বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যার অভাব, আমাদের, মানে ছোটোদের তো বটেই, এমনকি বড়োদের অত্যন্ত প্রিয় এই চরিত্র নিয়ে তেমন সলিড সিনেমা আসছিল না অনেএএএএএক দিন।
আর তারপর, মার্চ ২০১৭-য় লেজেন্ডারি পিকচার্স তাদের ‘মনস্টারভার্স’-এর অঙ্গ হিসেবে আমাদের কাছে নিয়ে আসে ‘কং: স্কাল আইল্যান্ড’।
সিনেমার গল্প এ-যাবৎ কং সম্বন্ধে আমরা যা জেনেছি তার থেকে অনেকটাই আলাদা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেফারেন্স দিয়ে শুরু হওয়া এই সিনেমার মূল ঘটনা যখন ঘটছে তখন ১৯৭৩ এবং ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন সৈন্যরা ফিরতে শুরু করেছে। ঠান্ডা লড়াইয়ে থরথর কাঁপতে থাকা পৃথিবীতে তখনও অবধি অনাবিষ্কৃত ও ঝড়ঝঞ্ঝার আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটা দ্বীপে প্রথম নজরদারির কৃতিত্ব যাতে সোভিয়েত স্যাটেলাইট না পায় সেজন্য সেই দ্বীপে পাড়ি জমালেন মনার্ক নামক মার্কিন স্ট্র্যাটেজিস্ট থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বিল র‍্যান্ডার নেতৃত্বে কয়েকজন বিজ্ঞানী। ট্র্যাকার হিসেবে তাঁদের সঙ্গে রইলেন প্রাক্তন ব্রিটিশ স্পেশ্যাল এয়ার সার্ভিসের এক ক্যাপ্টেন এবং এক ফটো জার্নালিস্ট। তাঁদের সুরক্ষা তথা লজিস্টিকাল সাপোর্ট দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রন স্কাই ডেভিলসের লেফটেন্যান্ট ক্যাপ্টেন ও তাঁর দলের ওপর।
ঝড়ের মধ্য দিয়ে সেই দ্বীপে ঢুকে তাদের বহনকারী হেলিকপ্টারগুলো দ্বীপে সিসমিক বম্ব ফেলা শুরু করল যাতে দ্বীপটার মাটির তলায় কী আছে সেটা বোঝা যায়। কিন্তু তারপরেই হেলিকপ্টারগুলো আক্রান্ত হল!
কে বা কী এমন শক্তি থাকতে পারে এই অজানা দ্বীপে, যে মার্কিন হেলিকপ্টারদের এভাবে আক্রমণ করতে পারে?
হ্যাঁ, এই গল্পে কং ১৩৪ ফিট লম্বা একটি নরবানর। আজ অবধি স্ক্রিন আলো বা কালো করা কংয়ের এটিই বৃহত্তম চেহারা!
এরপর নানা ঘটনা ঘটতে থাকে রুদ্ধশ্বাস বেগে। কং-এর সঙ্গে প্রাথমিক টক্করের পর টিকে থাকা সৈন্যরা মুখোমুখি হয় নানা বিভীষিকার এবং অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ের। কং-এর সঙ্গেও মরণপণ সংঘর্ষ হয় ওই দ্বীপের বাসিন্দা এক দানবিক অক্টোপাসের।
কিন্তু এই সিনেমার আসল ভিলেইন হল এমন এক প্রাণী, যাকে দ্বীপে থেকে যাওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সৈনিক স্কালক্রলার বলে পরিচয় দেন। এই স্কালক্রলারদের হাতেই নিহত হয়েছে কং-এর বাবা-মা এবং এদের হাত থেকে মানুষ তথা অন্য প্রাণীদের বাঁচাতে পারে একমাত্র কং, যে প্রায় অজেয় হয়েও নিঃসঙ্গ এবং যে তার প্রজাতির শেষ প্রতিনিধি।
অতঃপর নানা ঘটনা, রোমহর্ষক অভিযান এবং বেশ কিছু প্রাণের বিনিময়ে কাহিনির মুখ্য চরিত্ররা দ্বীপ ছেড়ে বেরিয়ে আসার জায়গায় পৌঁছয়। কিন্তু সেখানেও তাদের পিছু নেয় সবচেয়ে মারাত্মক স্কালক্রলারটি। আর তারপর আসে সেই মারাত্মক লড়াই!
এই সিনেমাটা শুধু যে বিশাল হিট করেছে তাই নয়, সিনেমার পোস্ট-ক্রেডিট সিকুয়েন্স, যা মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সৌজন্যে আমাদের কাছে শুধু পরিচিতই নয়, যার টানে আজকাল আমরা সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও বসে থাকি, তাতে স্পষ্টই আভাস দেওয়া হয়েছে অন্যান্য মনস্টারদের সঙ্গে কং-এর টক্কর নেওয়ার পালা হয়তো এবার সমাগত। আর সেজন্যই ২০২০-র মে-তে যে সিনেমাটা আসছে তার জন্য শুধু দর্শক বা ফ্যান নয়, সমালোচকেরাও প্রায় ওঠ-বোস করছেন।
কী আসছে তখন?
সিনেমাটার নামটা এখনও ঠিক হয়নি। তবে এটুকু বলতে পারি যে সেই সিনেমায় যার সঙ্গে কং-এর মোকাবিলা হবে, তার নিজের একটা মেগা-গিগা সিনেমা আসতে চলেছে ২০১৯-এ।
মাফ করবেন। তার নামটা আমি এখানে বলছি না। একটু সাসপেন্স রইলই নাহয়।

তাহলে ভাইয়োঁ অউর বহনোঁ, মেহেরবান, কদরদান। পপকর্নের ব্যবস্থা করুন, অর্ডার দিন পিৎজা আর প্যাস্ট্রির, কফি আর কোকের। আর তৈরি হোন বছর তিনেক পরেই আপনার সামনের স্ক্রিন ফাটানো গর্জন তোলা আমাদের অতি প্রিয় চরিত্রটিকে আবার দেখার জন্য। কারণ, ‘কং: স্কাল আইল্যান্ড’ যদি কোনও সূচক হয়, তাহলে একথা স্পষ্ট যে লেজেন্ডারি অবশেষে বুঝতে পেরেছে, ঠিক কীভাবে আমাদের চোখ-কান-মন ধাঁধিয়ে দেওয়া যায়। আশা করাই যায় যে তারা এরপরের সিনেমাগুলোতে কং-এর প্রতি সুবিচার করবে।
আসি তাহলে?
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment