চলো যাইঃ ছুটির বাঁশি - মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী




অ্যামেরিকায় ছুটিছাটা একটু কমই। কাজেই কোনোক্রমে একটা দিন জুটলেই মন উড়ু উড়ু। মে মাসের শেষ সোমবার পালিত হয় মেমোরিয়াল ডে। আজ অবধি যত নারীপুরুষ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতিতে, শহীদ দিবস। মে মাসে বেশ ঠাণ্ডার আমেজ কাটিয়ে গরমকালের মতো আবহাওয়ার শুরু। কাজেই শনি-রবির পর একটা দিন ছুটি থাকলে সকলেই খুশিতে মেতে ওঠেন। বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে হয় কাছেপিঠে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, নাহলে বার-বে-কিউ পার্টির আয়োজন করা। কিছু না কিছু হবেই। বলা ভালো, এটাই অলিখিত সামারের শুরু আর শুরুতেই লং উইকএন্ড।
যদিও আমি আবার একটু বেশিই সচেতন বা বলা ভালো স্পর্শকাতর কিছু বিষয়ে। যেমন, শহীদ দিবস পালন না করলেও ওই দিনটিকে আর পাঁচটা আনন্দের ছুটির দিন ভাবতে একটু খারাপই লাগে। আমার এক বন্ধু বহুদিন আগে আমায় বলেছিলেন, “If you think this is a national barbecue day, think about them who had lost someone.”
কথাটা মনে গেঁথে গিয়েছে বলে আমি চেষ্টা করি ওই দিনটায় তেমন হুল্লোড়ের কিছু না করতে। ঘরে রইলাম, পরিবারের সকলে মিলে গল্প করলাম কি সিনেমা দেখলাম। আর হ্যাঁ, আমার যেমন ঘরের কাজ করতে করতে একটা সময়ের পর মনে হয় ছুটি পাবার কথা; যারা বাইরে যায় রোজ, তাদেরও কিন্তু মন চায় একটা দিন ঘরে শুয়ে বসে কাটাতে। কাজেই একটা দিন ঘরে থাকাই ভালো আর তার ওপর এমন সব সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বেশিরভাগ দোকানপাট রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকে। কথাটা আমাদের জন্য খুবই বিস্ময়ের। তাই না? আমরা তো জানি উৎসবের দিনে বরং বেশি করে রাস্তায় বেরোনোর কথা। না, এদের বক্তব্য, যারা দোকানগুলোতে কাজ করে তারাও যাতে এই দিনগুলো নিজের পরিবারের সাথে উদযাপন করতে পারে তার জন্যই সব বন্ধ। তাই আগের শনি-রবিতে ঘরের প্রয়োজনীয় বাজার-হাট মোটামুটি করে রেখে দিলাম। এমনকি, শুক্কুরবারে বেশ কিছু রান্নাও করে ফ্রিজে পুরে রাখলাম।


ঝলমলে রোদেলা দিনে বেশ সক্কাল সক্কাল আমার বানানো আলুর পরোটা উদরস্থ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমরা বলতে আমি, আমার স্বামী রাজর্ষি, মেয়ে সুকন্যা ও পারিবারিক বন্ধু সৌমিত। বেরিয়ে তো পড়লাম। কিন্তু যাব কোথায়? আগের রাতে আমি আর সুকন্যা আমাদের পাশের রাজ্য পেনসিলভেনিয়াতে বেশ কিছু ন্যাশনাল পার্ক, বোটানিকাল গার্ডেন ইত্যাদির কথা ইন্টারনেটে দেখছিলাম। মোটামুটি ঘন্টা দেড়-দুইয়ের দূরত্বে বেশ ক’টা জায়গা মনেও ধরেছিল। রাস্তায় বের হয়ে মনে ধরল অ্যামিশ ভিলেজের কথা। ২০১০ সালে প্রথমবার গেছিলাম সেখানে এবং তারপরই অ্যামিশ ভিলেজ নিয়ে ভূতের গল্প লিখে ফেলি। বৈচিত্রময় অ্যামিশদের জীবনযাত্রা দেখবার জন্যই সেখানে যাওয়া। বড়োদের অন্তত একবার দেখার মতো ব্যাপার। ছোটোদের জন্য তেমন আকর্ষণীয় হবে না। যেহেতু আমরা সকলেই প্রায় সেই দলেরই রয়েছি, অতএব গাড়ির মুখ ঘুরে গেল অ্যামিশ ভিলেজের উদ্দেশ্যে।


ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে অ্যানাব্যাপ্টিস্ট মুভমেন্টের ফলে অ্যামিশ, মেননাইটস আর ব্রেথেনদের মতো গ্রুপগুলোর জন্ম হয়। এইসব খ্রিস্টান ধর্মান্ধ গ্রুপগুলোর আচরণের মধ্যে মিল থাকলেও এদের মধ্যে অ্যামিশরা সবচেয়ে গোঁড়া। সেটা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে যে আজকের এই অত্যাধুনিক যুগেও তারা সেই প্রাচীন শতাব্দীতেই পড়ে আছে। আজও তারা ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করে, বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না, নিজেদের কাপড়জামা নিজেরাই চরকা কেটে তৈরি করে। অ্যামিশ মেয়েরা একরঙা পোশাক পরে। তাদের ছিটের পোশাক পরা মানা। পোশাকও সেই আদ্যিকালের পা অবধি ঝুলের ম্যাক্সি ধরনের লম্বা হাতার জামা, তার ওপর অ্যাপ্রন, মাথায় টুপি। মেয়েদের মোট চারটি পোশাক থাকে। তাদের পোশাকের রং দেখে বিবাহিত না অবিবাহিত বোঝা যায়। ছেলেমেয়েদের পোশাকে চেন বা সেই জাতীয় কিছু ব্যবহার হয় না। বোতাম কিম্বা হুক দিয়ে আটকানো। অ্যামিশ মহিলারা কোনওরকম গয়না পরে না। তারা চুল কাটে না; লম্বা চুল বিনুনি করে খোঁপা করে টুপি দিয়ে ঢেকে রাখে। তারা সলিড কালারের পোশাক পরে; ছিটের পোশাক পরে না। ছেলেদের পোশাকে শাদা, কালো, ব্রাউন - এই তিনটি মাত্র রংই থাকে। প্যান্টে অবশ্যই সাসপেন্ডার লাগানো থাকে। এরা সাইকেল চালায় না। কারণ, সাইকেল বাড়ির থেকে দূরে নিয়ে যায়। তাই পা দিয়ে ঠেলে চালানো দু’চাকার স্কুটার ব্যবহার করে স্বল্প দূরত্ব যেতে। শরীর খারাপের এমার্জেন্সি না হলে আকাশযানে চড়ে না। হয়তো কেউ কেউ ঘুরতে বেড়াতে যায়, তাও বাসে বা গাড়িতে। তবে সেটাও আঙুলে গোনা কয়েকটিমাত্র জায়গায়। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না, কারণ বিদ্যুৎ পরিবারকে আলগা করে দেয়। যদি ঘরে একটিমাত্র আলো জ্বলে তাহলে পুরো পরিবার একই ঘরে একই সাথে বসে থাকতে বাধ্য।


এ হেন অ্যামিশরা ১৭২০ সাল নাগাদ ইউরোপ থেকে অ্যামেরিকায় চলে আসে এবং বসতি গড়ে তোলে। পূর্ব অ্যামেরিকার পেনসিলভেনিয়া রাজ্যের ল্যাঙ্কেস্টার কাউন্টিতে* অ্যামিশদের সবথেকে বড়ো বসতি। এছাড়া অ্যামেরিকার আরও কিছু রাজ্যে এবং কানাডাতেও অ্যামিশদের দেখা যায়। ল্যাঙ্কেস্টার কাউন্টির প্রায় সব চাষের জমিই এদের অধীনে। ফলত এদের টাকাপয়সার বিন্দুমাত্র অভাব নেই। তবে ওই প্রাচীন যুগকে আঁকড়ে পড়ে আছে এখনও। একটামাত্র ঘরওয়ালা স্কুলে যায়, যেখানে ক্লাস এইটের ওপরে পড়ানো হয় না।


এখন ল্যাঙ্কেস্টার হল অ্যামিশদের সবচেয়ে পুরনো আর জনবহুল এলাকা। আধুনিক জগতের মানুষজন অ্যামিশদের দেখতে যায় কী করে এমন ইন্টারনেটের যুগেও ওরা সেই প্রাচীন শতাব্দীতে বেঁচে রয়েছে। সেখানে অ্যামিশদের বাড়ির ভেতরটা কেমন হয়, তাদের রান্নাঘর, শোবার ঘর, সেলাইয়ের ঘর এবং বেসমেন্টে সামার কিচেন, এছাড়াও ওয়ান রুম স্কুল, তাদের তৈরি জ্যাম, জেলি, পাইয়ের দোকান, তাদের হস্তশিল্প, কামারের দোকান, তাদের ফার্ম, এনিম্যাল সহ ফার্ম এইসব মডেল করে রাখা আছে। সেগুলো গাইডের সাথে দেখে আর তাদের পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বাড়িঘর মানুষজনদেরও দেখে।
তারা আজও সেই মোমের বা তেলের বাতি জ্বালায় রাত্রে। শীতের সময় শুধুমাত্র কাঠের চুল্লি দিয়ে ঘর গরম করে। কালো কালো ঘোড়ায় টানা গাড়িতে করে ঘোরে। একটা বিশেষ মরসুমে বিয়ে করে, বলা বাহুল্য শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যেই। বিয়ের পর পুরুষেরা দাড়ি রাখে ‘বিবাহিত পুরুষ’ বোঝানোর জন্য। একেকটা পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক। কারণ, আজকের যুগেও সাত-আটটি করে সন্তান জন্মায়। জন্ম নেয় তারা বাড়িতেই। ধাইমা আসে, তার হাতেই। একেকটি পরিবারের বংশ পরম্পরায় প্রায় পঞ্চাশ-ষাট একর জমি। তবে জমি ভাগ হয় না। শুধু আগের প্রজন্ম যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় ওই জমিরই একধারে তার জন্য আলাদা বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়; বড়ো বাড়িতেই আরেকটা ঘর না করে।
ল্যাঙ্কেস্টার বা তার আশেপাশে অ্যামিশ ভিলেজ ঘুরতে যাওয়া লোকজনদের থাকার জন্য অনেক ব্যবস্থা আছে। কিছু কিছু অবিকল অ্যামিশরা যেভাবে থাকেন সেভাবেই করা। অত্যাধুনিক ব্যবস্থাও আছে অবশ্য। মানুষজনের ঘুরতে বেড়াতে যাতে সুবিধা হয়। দিনের বেলা যেমন তেমন, রাতের বেলায় অমন ধু ধু করা চাষের জমি, সাথে সেই পুরনো ধাঁচের বাড়িগুলোতে নিভু নিভু আলো, আলোর চেয়ে বুঝি অন্ধকার সৃষ্টি করে বেশি।
২০১০ সালে এই ছিল মোটামুটি আমাদের অভিজ্ঞতা। এবারে সেখানে পৌঁছে দেখি পরিবর্তন অনেক। প্রথমত অমন ফাঁকা জায়গা বেশ জমজমাট হয়েছে। কত নতুন দোকানপাট, হোটেল ইত্যাদি গড়ে উঠেছে আশেপাশে! প্রচুর ট্যুরিস্ট ভিড় করেছেন। তাদের কারও কারও আচরণ যথেষ্ট বেখাপ্পা। আমরা পৌঁছেই পুরো এলাকা ঘুরে দেখার বাস ট্যুরের জন্য টিকিট কাটতে গেলাম। জানা গেল বিকেল পাঁচটার আগে টিকিট নেই। আমরা তো সারাদিনের জন্যেই এসেছি। অতএব বিকেল পাঁচটায় হলেই বা ক্ষতি কী? সুতরাং টিকিট সংগ্রহ করলাম। টিকিট বিক্রি হচ্ছিল গিফট শপের মধ্যে এবং সেখান থেকেই এক একজন গাইড কিছু দর্শকের গ্রুপ করে নিয়ে পায়ে হেঁটে মডেল ঘর বাড়িগুলো দেখাচ্ছে। টিকিট কাটার একটু পরেই এই হেঁটে ঘোরার ট্যুরটা শুরু হল। কিন্তু কিছু দর্শক কোনও কিছু না জেনেই ছোটো বাচ্চাদের নিয়ে উপস্থিত। তারা তাদের ইন্টারেস্টের কিছু না পেয়ে এমন চ্যাঁ ভ্যাঁ কথাবার্তা শুরু করেছিল, যাতে গাইডের কথা চাপা পড়ে যাচ্ছিল বারংবার। ফলে বাকিদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। আর সবথেকে লজ্জার কথা এই গ্রুপটা বাঙালি।
যাই হোক, সৌমিত প্রথমবার সব দেখল। সুকন্যারও প্রায় কিছুই মনে ছিল না। আমরা আবার করে দেখলাম। শুধু এই কয়েক বছরে অ্যামিশদের পরিবর্তন চোখে পড়বার মতো। আগেরবার দেখেছিলাম ওদের জামাকাপড় কালো, অ্যাশ, সাদা বা ব্রাউন। সেখানে এবারে দেখলাম গাঢ় নীল, হাল্কা সবুজ, হাল্কা বেগুনি, গাঢ় বেগুনি, মেরুন এমন সব রংয়ের জামা পরা। শুধু মেয়েদেরই নয়, পুরুষদের পোষাকেও রঙের ছোঁয়া। এমনকি, ছিটের পোশাকও পরেছে কেউ কেউ। শুনলাম, আজকাল নাকি অ্যামিশরা আর মোমেরবাতি জ্বালায় না; প্রোপেন গ্যাসের আলো জ্বালে। আর সেই গ্যাস আধুনিক জগতের মানুষজনই সাপ্লাই দেন ওদের। সামনেই ছিল ফার্ম অ্যানিমালদের ঘর। ঘোড়াদের খাবার খাওয়াল সুকন্যা। শূকরগুলো ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে; মুরগিগুলো কিচিরমিচির করছে। এসব দেখে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম মডেল স্কুল ঘরে। সেখানে আবার একজন অ্যামিশ দিদিমণি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যেমনটি সত্যিকারের স্কুলেও ঘুরে ঘুরে পড়ান। তিনি প্রতিটা ডেস্কের ওপর একটুকরো কাগজ রাখছেন যাতে অ্যামিশদের পেনসিলভেনিয়া ডাচ ভাষায় কিছু বাক্য লেখা। পাশে ইংরেজি বাক্যও দেওয়া। তবে বোঝা গেল ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে যে, কাগজে সঠিক বাক্যের পাশে সঠিক উত্তর দেওয়া নেই। সেটা বোর্ডে দেখানো আছে। সেই অনুযায়ী কাগজের বাক্যগুলো সাজাতে হবে। শেষে দিদিমণি এসে চেক করছেন ঠিক হল কি না আর ছোট্ট একটা অ্যামিশ ভিলেজের সোনালি রঙের স্টিকার সেঁটে দিচ্ছেন। বেশ খানিকটা ঘুরে ফিরে বাকি সব দোকানপাটগুলো দেখে আবার ফিরে এলাম যেই গিফট শপ দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেইখানে। অবশ্যই পছন্দসই বেশ কিছু গিফট কেনা-টেনা হল। অ্যামিশদের হাতে তৈরি জিনিসপত্রের ছবি-টবিও নেওয়া হল। তখন বাজে মাত্র একটা। বিকেল পাঁচটা অবধি কী করা যায়? এদিকে সূয্যিমামা তো বেশ ভালোই তেজ দেখাচ্ছেন। কাজেই মাঠে-ঘাটে এত সময় ধরে ঘোরা আমাদের কম্ম নয় বুঝলাম। দুপুরে কিছু খেতেও হবে। যদিও গাড়িতে আসার সময়ে টুকটাক কফি, চিপস খাওয়া হয়েছে। আর সকালে তো ভরপুর। তা বলে কি এত সময় সেসব পেটে থাকে? অতএব একটু শহরের দিকে চললাম। নিজেদের পছন্দসই খাবারের দোকান খুঁজে নিয়ে বেশ আরাম করে খাওয়াদাওয়া হল। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, এদেশে বহু মানুষেরই কিন্তু KFC বা ম্যাকডোনাল্ডস কিম্বা পিৎজা হাট এগুলো থাকে পছন্দের তালিকার একেবারে শেষে। কারও কারও তো তালিকাতে থাকেই না। আমরাও প্রায় সেই দলে।


খাওয়া তো হল। হাতে এখনও অনেকটা সময়। অতএব চললাম স্ট্র্যাসবার্গ রেল-রোড দেখতে। কী এটা? পশ্চিম গোলার্ধে অবস্থিত সবথেকে প্রাচীন, অদ্যাবধি কাজ করে যাওয়া রেল-রোড। পেনসিলভেনিয়ার সবথেকে পুরনো পাবলিক ইউটিলিটিও বটে। ১৮৩২ সালে শুরু হওয়া এই রেল-রোড এখনও সেই আদি দলিল অনুযায়ী চলে। এমনকি সেই নামটাই অবিকৃত ব্যবহার করে চলেছে। বর্তমানে অবশ্য হেরিটেজ রেল-রোড হিসেবেই রয়েছে। তবে এখন চারটি কার্যক্ষম ঐতিহাসিক স্টিম লোকোমোটিভস চালানো হয়। কাঠের সুসজ্জিত কোচগুলোতে টিকিট কেটে আজও চড়া যায় এবং মজাদার রাইড হিসেবে উপভোগ করা যায়। রাস্তার অপর পারে রয়েছে রেল-রোড মিউজিয়াম। অবাক করা তথ্য হল, এই স্ট্র্যাসবার্গ রেল-রোড কিন্তু বাস্তবে প্যারাডাইস পেনসিলভেনিয়াতে রেল-রোড মিউজিয়ামের সাথে অ্যামট্র্যাক ফিলাডেলফিয়া টু হ্যারিসবার্গ মেইন লাইনের যোগসূত্র। এ-যাত্রায় অবশ্য আবার যেহেতু সময়মতো অ্যামিশ ভিলেজে ফিরতে হবে বাস ট্যুরের জন্য তাই ট্রেনে চড়াও হল না, মিউজিয়াম দেখাও হল না। ২০১০-এর অভিজ্ঞতাই রইল আপাতত ঝুলিতে। তবে রেল-রোড মিউজিয়ামের গিফট শপ বা প্ল্যাটফর্মের ওপর যে সমস্ত গিফট শপ রয়েছে তাতে ঢুকে টুকটাক কেনাকাটি হল বৈকি।
আবার ফিরে এলাম অ্যামিশ ভিলেজে। আমরা হলাম দিনের শেষ বাস ট্যুরের যাত্রী। কাজেই এই সময়ে দেখি ভিড় বেশ পাতলা হয়ে গেছে। সন্ধ্যে ছ’টা অবধি খোলা থাকে ঠিকই, কিন্তু এই পড়ন্ত বিকেলে আর নতুন করে কেউ আসে না এখানে। শুধু যারা আগে এসেছে তারাই ঘুরছে মাঠে বা বসে জিরোচ্ছে গাছের ছায়ায়। আর বাসে যারা আমাদের সহযাত্রী হবে তারা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদেরই মতো, বাসে ওঠার অপেক্ষায়।


সময়মতোই সবাইকে তুলে নিয়ে বাস চলল অ্যামিশ পাড়ায়। বাসের ড্রাইভার কেটি একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা। তিনিই আমাদের সব বলতে বলতে নিয়ে চললেন। আগের বারে যেহেতু নিজেরাই গাড়ি নিয়ে অ্যামিশ পাড়ায় ঘুরেছিলাম, বেশ কিছু তথ্য অজানাই ছিল। দেখলাম, রাস্তার এক পারে অ্যামিশদের বসবাস, অন্য পারে অ-অ্যামিশিও বাড়ি। এখানকার ভাষায় ‘ইংলিশ হাউস’। আজও ঘোড়া বা খচ্চর দিয়ে চাষের কাজ করা হয়। রবিবারে চার্চের কাজ ছাড়া অন্যসব কাজ বন্ধ থাকে। একটা মাঠে দেখলাম ছোটো ছেলেমেয়ে দু’জনে গাছের চারা হাতে করে করে পুঁতছে। অ্যামিশরা বিয়ে করে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে শুধুমাত্র মঙ্গল আর বৃহস্পতিবারেই। কারণ? ওই সময়েই নতুন ফসল সব গুদামজাত করা হয়। তারপরই তো শীতকাল, আর সে সময়ে চাষ-আবাদের কোনও কাজ হবে না। চার্চ বলে যেহেতু আলাদা কোনও বাড়ি নেই, তাই কোনও একজনের বাড়িতে আয়োজন করা হয়। সবারই একবার করে টার্ন আসে। এবারে রবিবারে চার্চের দিন ব্যস্ততা মারাত্মক থাকবেই। কাজেই বিয়ে মঙ্গল-বৃহস্পতিবারে। বিয়ের পর শীতকালটা মেয়ে-জামাই মেয়ের বাড়িতেই থাকে। বসন্তকালে শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। গরু, ভেড়া, মুরগি এমনকি দেখলাম হরিণও পালে এরা দুধ, উল, ডিম, মাংস এসবের জন্যে। অ্যামিশরা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং এদের খাওয়াদাওয়ার কোনও বাছবিচার নেই। ফলে প্রত্যেকেই বেশ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। চলার পথে অ্যামিশ গ্রোসারি দেখলাম। ৯০ মিনিটের বাস যাত্রার মাঝে একটু বিরতি। এক জায়গায় অ্যামিশ দম্পতির দোকানে দাঁড়ায় বাস। সেখানে তাদের তৈরি চিজ, নন অ্যালকোহলিক ড্রিঙ্ক রুট বিয়ার, মাখন দেওয়া অত্যন্ত সুস্বাদু রুটি প্রেটজেল (এটি সাধারণ প্রেটজেলের থেকে একটু ভিন্ন স্বাদের), গ্রিলড চিকেন, ডোনাট, এমন সব বিভিন্ন খাবার ছাড়াও আরও অনেকরকম অ-অ্যামিশিও জিনিস রয়েছে। ঘোড়ার নাল জুড়ে জুড়ে কত কী তৈরি করে রেখেছে! আর দোকানের ঠিক বাইরে চারটে কুকুরছানা, বিক্রীর উদ্দেশ্যে। সুকন্যা যেমন ওদের দেখে বিগলিত, ওরাও দেখি সুকন্যাকে দেখে আহ্লাদে গদগদ। বেশ কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে অ্যামিশদের তৈরি প্রেটজেল, রুট বিয়ার, তাদের ফলানো স্ট্রবেরি ইত্যাদি কিনে আবার বাসে বসা অ্যামিশ ভিলেজে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে। কৌতূহলী আমি বাস-ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম যে, এই যে অ্যামিশরা নন-অ্যামিশদের সাথে মেলামেশা করছে, নিয়মিত তাদের দেখছে, কতরকম মানুষ তাদের কত ধরনের পোশাক, কত গয়না, কতরকমের অত্যাধুনিক গ্যাজেট তাদের হাতে এতসব দেখে অ্যামিশরা প্রলুদ্ধ হয় না? উত্তর যদিও ‘না’ পেলাম তবুও খটকা একটা রইলই। ফিরতি পথে লক্ষ করলাম, বাস যখন অ্যামিশদের গাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে, ছোটো ছোটো অ্যামিশ বাচ্চারা হাত নাড়াচ্ছে দর্শকদের উদ্দেশে। যেটা আগের বারে একেবারেই দেখিনি। সেবারে দেখেছিলাম ওরা পাত্তাই দিত না। এখন কোনটি অ্যামিশ বাড়ি, কোনটি ইংলিশ তফাৎ করে ফেলতে পারছি। বাইরে থেকে বাড়িগুলো দেখতে একই হলেও যে বাড়িতে সবুজ রংয়ের টানা পর্দা সেগুলি অ্যামিশ বাড়ি। পর্দায় কোনও সজ্জা নেই। যেহেতু ঘরে পাখা বা এসি কিছুই চলবে না তাই ঘর ঠাণ্ডা রাখতে মোটা পর্দা ব্যবহার করে। বেশ কয়েকজন যুবককে দেখলাম চোখে কালো সানগ্লাস পরে ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছে। শুনলাম কিছু অ্যামিশরা নাকি সেলফোনও ব্যবহার করছে। অথচ অ্যামিশদের পাড়ায় একটা ফোন বুথ থাকে। নিজস্ব বাড়িতে কোনও ফোন থাকে না। গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে পুরো পরিবার বসা, কোনও কোনও পরিবার অবশ্য খোলা গাড়িতেও যাচ্ছে, যেটা ওদের স্প্রিং ওয়াগন। সমস্ত দেখেশুনে আমার উপলব্ধি এটাই হল যে, আর কয়েক প্রজন্ম পর অ্যামিশরা হয়তো ঠিক এমনটা থাকতে পারবে না। মূলস্রোতে পুরোপুরি মিশে না গেলেও কিছুটা আধুনিক জীবনধারাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়ে যাবেই।
বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। এদিনের মতো ঘোরা শেষ। কতক ঘুমোতে ঘুমোতে, কতক ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি পৌঁছলাম।
_____


তথ্য সংগ্রহ :: উইকিপিডিয়া ও অ্যামিশ ভিলেজের গাইড।
*In the United States, a county is a political and geographic subdivision of a state, usually assigned some level of governmental authority.

No comments:

Post a Comment