চলো যাইঃ নীলাচলের বালুকাবেলায় - বাবিন




স্টেশন ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে যাবার পর যেই না ধাঁই কিরিকিরি করতে করতে রিক্সাটা বাঁদিকে বাঁক নিত, অমনি অনেকদূর থেকেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত সুবিশাল জলরাশি। অপার বিস্ময় নিয়ে আমরা দুই ভাই হাঁ করে চেয়ে থাকতাম সেইদিকে। ছোটো বয়সে প্রতিবছরই আমরা বাপি-মামণির সঙ্গে পুরী গিয়ে একমাস করে থাকতাম। মাসির বাড়ির দোতলায় একটা ঘর ভাড়া নিয়ে সংসার পেতে বসতাম। মাসির বাড়ি আর সমুদ্রের মধ্যে প্রায় তিন-চারশো মিটারের তফাত তো হবেই কিন্তু সেইসময় এই মধ্যিখানের ফাঁকটুকুতে একটা ভাঙাবাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
 ধু ধু করা বালির মধ্যে দিয়ে বেশ কিছুটা হেঁটে গেলে লাল রঙের একটা বাড়ি দেখা যেত। সাদা রং করা বেড়া দিয়ে ঘেরা। অনেকটা দূর্গের মতো দেখতে। সামনে সদর দরজার ওপর লেখা ছিল ‘DUTT-VILLA’আমরা পড়তাম ডাট ভিলাবাড়িটায় কোনওদিন কাউকে থাকতে দেখিনি। বন্ধ দরজা খুলে কেউ কক্ষনও বেরিয়ে আসতে নজরে পড়েনি। অথচ বাড়িটা যতবারই গেছি ঝকঝকে তকতকে দেখেছি। রীতিমতো রহস্যময় সেই বাড়ি!
মাসির বাড়ির আরেকটা মজা হল যে, বাড়িটা সমতলের বেশ কিছুটা নিচে থেকে শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, বাড়িটাতে ঢুকতে গেলে প্রথমে সিঁড়ি বেয়ে একতলা সমান নিচে নামতে হত। তারপর আবার উপরে ওঠার সিঁড়ি ধরে আমাদের দোতলায় উঠতে হত। এই যে দোতলার ঘরটায় আমরা থাকতাম, তার পেছনের দিকে একটা চাতাল ছিল। ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে সেই চাতালটায় গেলে সেখান থেকে একটা ছোট্ট লাফ মেরে বালির ওপর নামলেই ভোকাট্টা!
মামণির কড়া নির্দেশ ছিল যে দুপুরে ঘুমোতেই হবে। আর প্রতিদিন দুপুরে বাপি-মামণি ঘুমিয়ে পড়লেই আমি আর আমার ভাই ভাগলবা হয়ে যেতাম এই পেছনপথে। তবে বাইরের কেউ যাতে দরজাটা খোলা অবস্থায় দেখতে না পায় সেজন্য আমরা একটা উপায় বের করেছিলাম। দরজার ছিটকিনিটা পাশাপাশি খোলা-বন্ধ হত। আমরা দুটো মজবুত সুতো ছিটকিনির হাতলের সঙ্গে বেঁধে দু’দিকের জানালা দিয়ে এমনভাবে বের করে রেখে দিয়েছিলাম যে একটা সুতো ধরে টানলে ছিটকিনি বন্ধ হয়ে যায় আর অন্যটা ধরে টানলে খুলে যায়। একদম যাকে বলেচিচিং ফাঁক’!
দুই ভাই দুপুরের মিঠে রোদের মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম নিস্তব্ধ জনশূন্য সমুদ্রবেলায়। কত কত ঝিনুক, কড়ি, সাদা ফেনা যে কুড়িয়ে ফিরতাম তার ইয়ত্তা নেই। আজকাল শুনেছি জেলেরা নাকি খুব মিহি জাল ব্যবহার করে ছোটো মাছ থেকে শুরু করে ঝিনুক, কড়ি সব ছেঁকে তুলে নেয়। তাই বালুকাবেলায় ঝিনুক কুড়োবার মজা একদমই নেই। নির্জন দুপুরগুলোও নেই। সেই মাসির বাড়িও নেই। তার বদলে সুদৃশ্য সব হোটেল উঠে গেছে। আর হ্যাঁ, একটা পাকা রাস্তা চলে গেছে পশ্চিমে ভার্গবী নদীর মোহনা পর্যন্ত।

ছেলেবেলাকে খুঁজে পেতে একটা রিক্সা করে চললাম সেই মোহনার পথে। খানিকদূর যেতেই চিনতে পারলাম সেই হোটেলটাকে যার সামনের বিস্তৃত বালুকাবেলায় ছিল শুধুই ঝাউগাছের সারি আর কিছু ছাতার মতো আচ্ছাদন। রাশিয়ান সাহেব-মেমদের দেখেছিলাম সেখানে। তারা সঙ্গে আনতেন রাশিয়ান ক্যামেরা, ফিল্ম, দূরবীন, নানান ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী। ফিরে যাবার সময় তারা সেইসব সামগ্রী এখানেই বিক্রি করে দিয়ে যেতেন। কিছু স্থানীয় মানুষ ওদের কাছেপিঠে ঘোরাফেরা করত সেইসব জিনিস সস্তায় কেনার জন্য। ছোটোবেলায় ওদের দেখে আমাদের দুই ভাই-ই ভারি অবাক হয়ে দূর থেকে ওদের দেখতাম। তারপর সাহস করে কাছাকাছি গিয়ে ওড়িয়া মানুষগুলোর সঙ্গে ওদের কথোপকথন শুনতে লাগলাম। ও হরি, এরা তো বাংলা-ওড়িয়া দূরে থাক, ইংরেজি পর্যন্ত বুঝতে পারে না! ভারতীয়দের সঙ্গে কথা বলতে শুধুদাআরনেতএই দুটি শব্দেরই ব্যবহার কেবলমাত্র। আন্দাজ করলাম দা মানে হ্যাঁ আর নেত মানে না। এছাড়া কোনও সামগ্রীর দাম বোঝাতে হলে ওরা বালিতে কাঠি দিয়ে দাগ কেটে ইংরেজি সংখ্যায় লিখে দিতেন।
সেই সময় আমার খুব শখ ছিল ক্যামেরার। একদিন বাপিকে চেপে ধরলাম। ওদের থেকে একটা ক্যামেরা না কিনলেই নয়। বাপি প্রথমে রাজি হল না। বলল, “ওসব ক্যামেরার প্রচুর দাম। আর তাছাড়া ওরা কী জিনিস বিক্রি করবে তার কি ঠিক আছে? ক্যামেরার আমরা বুঝি কী?
অমন ধবধবে ফর্সা দেবদূতের মতো দেখতে মানুষরা যে কাউকে ঠকাতে পারে তা আমার বিশ্বাস হয়নি। তার পরদিন থেকেই জগন্নাথ মন্দিরের বাগানে নিয়ম করে রোজ সক্কালে গিয়ে ফুল তুলে সাজি ভরে দিয়ে মনে মনে বলতে লাগলাম, “হে প্রভু জগন্নাথ, একটা ক্যামেরা কিনিয়ে দাও। বাপি যেন মত পাল্টায়।”
জগন্নাথ আমার ডাক শুনেছিলেন। এক মেমসাহেবের করকমল থেকে সাতশো টাকা দিয়ে একটি জেনিট ব্র্যান্ডের এস.এল.আর. ক্যামেরা কিনেছিলাম সেবার। সেই ক্যামেরাতেই রাশিয়ান সাদাকালো ফিল্মে প্রথম ছবি তোলা আমার। ছত্রিশটা ফিল্মের স্ট্রিপ থেকে কী করে যে সাঁইত্রিশটা ছবি তোলা সম্ভব সেই কারিকুরি আমাকে নিজের হাতে শিখিয়েছিলেন সেই মহীয়সী নারীক্যামেরাটা আজও আছে এবং তা দিয়ে ছবিও তোলা যায়। অবিশ্যি ফিল্ম বোধহয় আজকাল আর পাওয়া যায় না।

দেখলাম সেইসব ঝাউবন, বিদেশিরা কিছুই আর নেই। নিভৃত সেই সাগরসৈকত হারিয়ে গেছে তারকাখচিত হোটেলের সারিতে। তবে অদ্ভুতভাবে রয়ে গেছে দত্তবাবুর সেই লাল বাড়িটি। যাকে ছোটোবেলায় আমরাডাট ভিলাবলে ডাকতাম — একইরকম রয়েছে। আগের মতোই বেড়া দিয়ে ঘেরা। লাল রঙটাও একইরকম উজ্জ্বল। আশ্চর্যজনকভাবে এখনও তার আগে-পিছে বা আশেপাশে হোটেলগুলো ভিড় জমায়নি। জানি না আর কতদিন এরকম থাকবে।
পুরী গেলে বেশিরভাগ মানুষই শুধু সমুদ্র আর জগন্নাথমন্দির দর্শনেই ব্যস্ত থাকেন কেউ কেউ অবশ্য নন্দনকানন, ধবলগিরি, উদয়গিরি, চিল্কা ইত্যাদিও ঘোরেন কিন্তু আমরা একবার গিয়েছিলাম পুরীরই খুব কাছের একটি গ্রাম — রঘুরাজপুরে এখানে পটচিত্রের কাজ হয় মুগ্ধ হয়ে সেসব দেখেছিলাম এই গ্রামের সব মানুষই পটচিত্র ও নানান হস্তশিল্পের কাজ করেন সেখানে যেতে যত্ন করে তাঁরা নিজের বাড়িতে ডেকে দেখালেন কেমন করে সেগুলো তৈরি করা হয় ছেলেবেলায় যেমন দেখেছিলাম, আজও তারা সেই একইরকম রয়ে গেছেন সময় সেখানে এতটুকু থাবা বসাতে পারেনি

ফেরার সময় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম দুটি ছেলে বালুকাবেলায় খেলা করছে। হঠাৎ লম্বায় বড়ো ছেলেটির চপ্পল দমকা জলের ঝাপটায় ভেসে গেল সমুদ্রের দিকে, আর সেটাকে ফিরিয়ে আনতে ছোটোজন দৌড় লাগাল। বড়োভাই কিছুক্ষণছোটন, ছোটনকরে ডাকতে থাকলকিন্তু ভাই সাড়া না দেওয়ায় হাত-পা ছড়িয়ে চিত্কার করে কাঁদতে বসে গেল, ‘আমার ভাই ভেসে গেল... ওকে তোমরা ফিরিয়ে আনো... শিগগির ফিরিয়ে আনো...। সন্তান গর্বে গর্বিত ওদের বাবা-মা সামান্য দূরেই দাঁড়িয়ে হাসছেন আর চোখের ভাষায় একে অপরকে বলছেন, ‘দেখেছ, দুইভাই কত ভালোবাসে নিজেদের?’



_____
ছবিঃ লেখক

No comments:

Post a Comment