প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র




পুজোস্পেশালঃ প্রকল্প ও বিকল্প - প্রকল্প ভট্টাচার্য





।।১।।


ছেলেমেয়েদের নামডাকওয়ালা স্কুলে পড়াতে কে না চায়! প্রথমের ইস্কুলের আর কিছু থাক বা না থাক, একটা গালভরা নাম আছে। শ্রীবৎস বিশ্বনাথন বিবেকানন্দ বিদ্যালয় জুনিয়র কলেজ। তা বেশ। কিন্তু গতবছর তারা যখন অডিটোরিয়াম বানাবে বলে সব গার্জেনদের কাছে অনুদান চাইল, আমি দিতে রাজি হইনি। ওদের ভালো স্টেজ আছে, খোলা। এখন ওঠানামার সিঁড়ি, ছাদ আর গ্রীনরুমসমেত অডিটোরিয়াম চাই। এদিকে গোটা স্কুলে লাইব্রেরি নেই! বলেছিলাম, “লাইব্রেরি বানান, সেটা নাচগানের থেকে আগে প্রয়োজন।”

যাই হোক, তারপর থেকে বেরসিক আর দুর্মুখ বলে প্রিন্সিপাল আর আমাকে ডেকে পাঠান না।তো আমার মতো শত্তুরের মুখে ঝামা ঘষে সেই অডিটোরিয়াম তৈরি হয়েছে। আজ সেখানে ছিল ওদের ‘ট্যালেন্ট শো’। প্রথমের ট্যালেন্ট নাকি নাটকে। ‘দ্য মাউস অ্যান্ড দ্য কুকিস’ গল্পে মাউস সাজবে।


গতকাল কাগজ কেটে ইঁদুরের মুখোশ বানিয়েছি; চোখের ফুটোয় চোখ বসছে কি না দেখে পিছনে রাবার ব্যান্ড লাগিয়ে ট্রায়াল দেওয়াও হয়েছে। মোটা দড়ি পাকিয়ে লেজ হয়েছে। তার সঙ্গে আরও কীসব গেলাস, বিস্কুট - সেগুলো মা যোগাড় করে দিয়েছে।

আজ সকালে একটু জ্ঞান দিচ্ছিলাম, “বুঝলি, এগুলোকে বলে প্রপস। বিস্কুটটা স্টেজে খাবি না কিন্তু, কথা জড়িয়ে যাবে! খাওয়ার অভিনয় করবি। আর সবকথা কেটে কেটে বলবি, মাইকে ইকো হতে পারে।”

ছেলে সব শুনল। তারপর বলল, “বাবা, স্টেজে তোমার করা একটা নাটক আমার অনেকদিন মনে থাকবে।”

একথা শুনে কার না গর্ব হয়! বললাম, “বাহ্‌, তাই? কোনটা রে?”

“ওই যে, লাস্টে তুমি গরু হয়ে গেলে!”

চারবছর আগে পয়লা বৈশাখে ‘নরক গুলজার’ নাটকে যমরাজের রোল করেছিলাম…
ছোটোরা যেমন ছোটো ছোটো জিনিস মনে রাখতে পারে, তেমনই সেগুলো সময়মতো বলে লোকজনের প্রেস্টিজ ফুটোও করে দিতে পারে!

।।২।।

ছেলে কারাটে শিখছে। আজ ছিল বেল্ট টেস্ট। পার্পল টু থেকে পার্পল ওয়ান হল। এরপরেই ব্রাউন ফোর। সে ভালো। শিখুক।
সার্টিফিকেট নিয়ে ফেরার পথে জিগ্যেস করল, “বাবা, তুমি কোন বেল্ট অবধি কারাটে শিখেছ?”
“আমি কারাটে শিখিনি রে।”
“না, আমি জানি! বাড়িতে তোমার কম্পিটিশনে জেতা একটা কাপ আছে, আমি দেখেছি! বল না বাবা, তুমি ব্ল্যাকবেল্ট?”
সত্যিটা বলেই দিলাম। “ওই কাপটা আমার ঠকিয়ে পাওয়া বাবা, ওটা দেখো না।”
“যাহ্‌, ঠকিয়ে কেউ কাপ দেয় নাকি! বল না, বাবা!”
অগত্যা, বললাম গল্পটা। আমি কারাটে শিখিনি। তবে উচ্চ মাধ্যমিকের পর তামিলনাড়ুর এক গ্রামে এসে আমাদের বাড়ির পাশে একটা ক্লাবে ভর্তি হয়েছিলাম। গ্রামের ক্লাব, প্রথাগত শেখানো হত না। কিন্তু শারীরশিক্ষা হত, ভালোই লাগত। কলেজ পেরিয়ে চাকরি নিলাম একটা স্কুলে। সেখানেও ঐ স্যারকে এনে কারাটে শেখানোর ব্যবস্থা করে দিলাম। রবিবার সকালে ক্লাশে যেতাম। ওই বয়সে স্ট্রেচিং হয় না, কিকগুলো খুব উঁচুতে উঠত না। তবুও ব্লকিং ভালো ছিল, পাঞ্চ, থ্রাস্ট, ব্লেড আর মিডল লেভেলে রাউন্ড হাউস, এই ছিল আমার সম্বল। না, কোনও বেল্ট নেই, কোনও ইউনিফর্ম নেই, কিছুই না।
তারপর আমার এক কারাটে জানা বন্ধুর খপ্পরে পড়ে একটা স্টেট লেভেল কম্পিটিশনে ফটোগ্রাফার হয়ে গেছিলাম। না না, ভালো ফটো তুলি বলে নয়, বাবার একটা দুর্দান্ত নিক্কন ক্যামেরা ছিল। সে যুগে ডিএসএলআর আসেনি, তাই আমি বনগাঁয়ে শেয়ালরাজা! গিয়ে খুব ফটো তুলছি, হঠাৎ শুনি একটা ওজনের ক্যাটাগরিতে তিনজন এসেছে, চারজন না হলে ওই বিভাগ ক্যানসেল হয়ে যাবে। বন্ধুর এক ছাত্র ছিল তাদের মধ্যে। তাই বন্ধু এসে বলল, "প্লিজ ভাই, নাম দে। তোর ওজনও ওই গ্রুপেই। তোকে লড়তেই হবে না। ফার্স্ট রাউন্ডেই বেরিয়ে আসিস, কিন্তু ক্যানসেল করিয়ে দিস না!”

অগত্যা, ড্রেস, বেল্ট পরে নামলাম। ভাবলাম, ইয়েস, সেমিফাইনালিস্ট তো হয়েই গেছি। দেখি কিছু পুরনো বিদ্যা ঝালিয়ে। ও মা, আমার দুটো কিক জায়গামতো লাগল আর আমি জিতে গেলাম! ফাইনালে! কিন্তু অনভ্যাসে ততক্ষণে আমার দম বেরিয়ে গেছে। হাঁফাচ্ছি আর কাঁধ, কোমর টনটন করছে।
ঠিক তারপরেই ফাইনাল রাউন্ড। আর প্রতিযোগী একেবারে চিতাবাঘের মতো ফিট। শেষে দাঁড়িয়ে মার খাব! ওয়াকওভার দেব! নাহ্‌, দেখাই যাক। শুরু হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের মতো একটা রাউন্ড হাউস (ছেলেটা আমার থেকে ফুট খানেক বেঁটে ছিল) এসে আমার মুখে লাগল। ব্লক বা ডাক কোনওটাই করবার শক্তি ছিল না আমার। চড়াত করে মুখে লাগল, আর…
রেফারি লড়াই থামিয়ে আমাকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন!
“কী করে, বাবা?”
“আমিও বুঝিনি প্রথমে। তারপর দেখি, দাঁতে লেগে ঠোঁটের ওপর একটু কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়েছে। আর নিয়ম অনুযায়ী কারও রক্ত বেরোলেই যে মেরেছে সে ডিসকোয়ালিফায়েড। এইভাবে ঠকিয়ে আমার কাপ জেতা। তুমি যেন এরকম কোরো না। কেমন?”
কী বুঝল কে জানে। একটু চুপ করে বলল, “বাবা, আমাকে আখের রস খাওয়াবে?”
চললাম দু’জনে সেইদিকে।

।।৩।।

শরীরটা বড্ড কাহিল। হাঁটতে চলতে কষ্ট হয়। আগে ছেলেটাকে সকালে স্নান করিয়ে দুধ-পাঁউরুটি খাইয়ে পোশাক পরিয়ে ইস্কুল-ভ্যানে তুলে দিতাম। সারাক্ষণ কত্তো প্রশ্ন, কত্তো জিজ্ঞাসা…
এখন উঠতেই পারি না সকালে। বেরোবার আগে ছেলেটা ‘আসছি বাবা’ বলে মুখ কালো করে নিজে নিজেই নেমে যায়। খারাপ লাগে আমার।
বিকেলে যখন ইস্কুল থেকে ফেরে, আমি ঘুম থেকে উঠি। একটু গল্প করি, বেছে রাখা কোনও গল্পের বই থেকে পড়ে শোনাই। তার মধ্যেই ওর ঠাকুমা, “কী হোমওয়ার্ক ছিল আজ? ম্যাথস মিস কী বললেন?” শুরু করে দেন। সত্যি, হোমওয়ার্কগুলো না করিয়ে নিলে বিকেলে খেলে ফিরেই ঘুমিয়ে পড়ে বেচারা।

আজ আবিষ্কৃত হল, ইভিএস-এর একটা টেস্ট ছিল আজ। সেটা তিনদিন আগেই মিস ডায়েরিতে লিখে দিয়েছিলেন। ছেলেও দেখায়নি, ঠাকুমাও দেখেনি। ঠাকুমার খুব মনখারাপ, “বার বার বলা সত্ত্বেও দেখাসনি!”
ছেলের মাথা নিচু। ভুলে গেছিল।
আমি বললাম, “তা টেস্টটা হল কেমন? লিখতে পেরেছিস?”
“হ্যাঁ বাবা, ভি গুড, তিনটে স্টার!”
ঠাকুমার মুখ আরও কাল হল। ছাত্র নিজে নিজেই পড়ে ভি গুড পেয়ে গেলে তাঁর পড়ানোর কী হবে! আমারও মায়া হল। বললাম, “খুব ভালো। কিন্তু এবার থেকে সব টেস্ট, হোমওয়ার্ক ঠাম্মাকে জানাবি, কেমন? ঠাম্মা একবার পড়িয়ে দিলে দেখবি সমস্ত পরীক্ষায় ভি গুডই পাবি। ঠাম্মা আমাকেও পড়াত সব পরীক্ষার আগে, জানিস তো?”
ছেলে এটা জানত না, মজা পেল। মাও দেখলাম খুশি হল।
ফ্‌... কে বলে, ম্যানেজমেন্ট শুধু অফিসের জন্যে!

।।৪।।

বৃহষ্পতিবার বিকেল থেকেই শরীরটা জুত লাগছিল না। রাতে মেলার শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই এল তেড়ে জ্বর। কিন্তু তা বলে কী চলে! শুক্রবারের ‘ইচিং পিচিং’ রিলিজ অনুষ্ঠানের জন্যেই তো এত কাণ্ড করে কলকাতা আসা! অগত্যা ডোলো-৬৫০। শুক্রবার কাটল। শনিবার ভোরবেলা কোনওমতে ইণ্ডিগোর ফ্লাইট ধরে চেন্নাই পৌঁছেছি। তখন আর মাথা কাজ করছে না। বাড়ি ঢুকে বিছানায় প্রায় অচেতন। তারই মধ্যে শুনি বই নিয়ে আলোচনা।
বইটা কোথায় রেখেছিস? টিউশন মিসের কাছে?”
“না।”
“তাহলে? স্কুলে ফেলে এসেছিস?”
“উঁহু।”
“তাহলে গেল কোথায়!”
নিরুত্তর।
“উফ্‌, কথার জবাব তো দিবি! আচ্ছা, আমি তোকে বকছি না। কিন্তু টেস্টের আগের দিন তমিড় বই হারিয়ে এলি কোন আক্কেলে!”
চোখ খুললাম। হাতের ইশারা করতেই ছেলে আমার কোলে। মা 'যত্ত আদিখ্যেতা' করে চলে গেল।
বললাম, “কী রে, তোর টেস্ট?”
“হ্যাঁ।”
“বই না থাকলে লিখবি কী করে?”
সব উত্তর জানি তো! ঠিক লিখব।”
“ভেরি গুড! কিন্তু বইটা কাকে দিয়েছিস?”
“মোহিতকে। জানো, ওর বাবা ওকে রোজ খুব মারে। বই হারিয়ে ফেলেছে বলে যদি আবার মার খায়! তুমি তো আর আমাকে মারবে না, আমি জানি। তাই টেস্ট অবধি রাখতে দিয়েছি।”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। হে নিষ্পাপ সরলতা, যেভাবে তুমি ওর শৈশবটা ঘিরে রাখছ, বাকী জীবনটাও যদি পার তাহলে সত্যিই পিতা হিসেবে আমার আর চাইবার কিছু থাকবে না। কিচ্ছু না।


।।৫।।

বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হল। এসেই শুনি শ্রীমান নাকি কী একটা প্রশ্ন করে সকলকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছেন সকাল থেকে। ঠাম্মা থেকে টিচার, প্রতিবেশিনী থেকে বিল্ডিংয়ের ওয়াচম্যান কেউ নাকি উত্তর দিতে পারেনি। অথচ উত্তরটা না জেনে তিনি ঘুমোবেন না পণ করেছেন। তাই এখন আমিই ভরসা।
এত অবধি শুনে ভাবলাম, কী রে বাবা, কোনও অঙ্ক-টঙ্ক নয় তো! বহুদিন অভ্যাস নেই, না পারলে ঝামেলা! তবুও মুখে কনফি নিয়ে প্রশ্ন করলাম, “কী রে, শুনি তোর প্রশ্ন?”

“বাবা, ড্রাগনের মুখের ভিতর তো আগুন থাকে। তাহলে সে আইসক্রীম খায় কী করে? গলে যাবে তো সব!”
এক সাথে ওঠা হাসি আর হেঁচকি দুটোকে কোনওমতে চেপে বললাম, “খুব সহজ! স্টিক হলে কাঠিসুদ্ধু খাবে, কাপ হলে কাপসুদ্ধু! গলে যাওয়ার আগেই পুরোটা পেটে।”
“ঠাম্মার ক্যাপসুলের মতো?”
“একদম!”

সন্তুষ্ট হয়ে ঘুমোতে গেল। উফ্‌, আজকের মতো সামলেছি!



।।৬।।

ছোটোদের কখনও ‘পরীক্ষা’ কথাটা বলে ভয় দেখাতে নেই। ক্লাশ টু-থ্রিতে তো একেবারেই নয়।
কে বলেছেন, তা জানি না অবশ্য। আজকাল যেমন সকলেই ডাক্তার, তেমনি সকলেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞও বটে। সেইভাবেই সকলেই জানে এটা।
আজ সকালে আমার বাড়িতে মা আর ছেলের কথোপকথন এইরকমঃ
কী রে, ওঠ! আজ তোর প-মানে, ইয়ে তো!”
আজ কী, মা?”
কিছু না। চটপট ব্রাশ করে আর একবার খাতাটা খুলে দেখে নে।”
“কোন খাতা? এইচ ডাব্লু?”
“আরে ধুর, এইচ ডাব্লু, সি ডাব্লু দুটোই। কোনটা থেকে মিস কী জিগ্যেস করে…”
“মিস আজ জিগ্যেস করবে?”
“হ্যাঁ তো! মানে, না না, সে তো অন্যদিনও। মানে, আজ করতেই পারেন, তাই না? পড়ে যাওয়া ভালো। আর শোন, যদি লিখতে দেন, ঠিক করে লিখবি!”
“কী লিখব, মা?”
“ধুত্তেরি! ঐ ইয়ের আন্সারগুলো। লিখে ভালো করে চেক করবি, কেমন? একটা নাম্বারও ছেড়ে আসবি না!”

“নাম্বার দেবে মিস?”
“দেবেই তো! ওহ্‌, না না, সে নিয়ে ভাবিস না। তুই শুধু ইয়েটার ইয়েগুলো, মানে আন্সারগুলো... আর হ্যান্ড রাইটিংটা ভালো করিস কিন্তু!”
“কেন মা, আজ কি আমার এক্সাম?”
“হ্যাঁ রে! আরে না না, এক্সাম কেন হবে! মানে... ঐ নিয়ে ভাববি না, কেমন? এই দুধ খেতে খেতে একবার খাতাটায় চোখ বুলিয়ে নে। পেন্সিল কেটে দিচ্ছি আমি। মাথা ঠাণ্ডা রাখবি, কেমন?”
“মা জানো, কাল না, মোহিত…”
“আরে, ধুত্তেরি! মোহিত না রোহিতের কথা এখন নয়। ওইসব ভুলে ইয়েতে মন দে। যাতে বেশি মার্কস পাস, খেয়াল রাখবি, কেমন?”
“ইয়ে মানে কী, মা?”
“ইয়ে মানে হল, ওই ইয়ে আর কি... এখন বুঝবি না, বড়ো হয়ে বুঝবি। নে, চল তাড়াতাড়ি!”
“মা জানো, আজ এক্সাম শেষ হলে আমাদের মিস বলেছে মাঠে নিয়ে গিয়ে…”
উফ্‌, আবার ওই কথা! বলছি না, ইয়েটা আগে শেষ কর ভালো করে!”
“তোমার আজ কী হয়েছে, মা? এত রেগে যাচ্ছ কেন?”
আমার? কই, আমার তো কিছু হয়নি! না সোনা, কিচ্ছু হয়নি। চলো, আজ তোমার ইয়েটা ভালোমতো শেষ হোক, আমিও বিকেলে তোমায় পার্কে নিয়ে যাব। ওক্কে?”
“ওক্কে মা, বাই… মা জানো, আজ আমাদের এক্সাম আছে, মিস বলেছে।”

“ওহ্‌-হো... আচ্ছা ঠিক আছে। উফ্‌, কী যে করি! হ্যাঁ, ইয়ের জন্যে অল দ্য বেস্ট সোনা!”

।।৭।।

নাহ্‌, আমাদের যুগের জোক বা ধাঁধা এযুগে একেবারেই অচল। ছেলেকে জিগ্যেস করলাম, “বল তো, সি-এইচ-এ-এল-কে কী হয়, চলকে না কল্কে?”
ছেলে গম্ভীরমুখে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, তোমাদের ইংলিশ মিস কে ছিল গো?”

তো গতকাল ছেলেকে কারাটে ক্লাশ থেকে আনতে গেছিলাম। বড়সড় চেহারা আর গম্ভীর গোঁফওয়ালা মুখ বলে এই পাড়ায় অনেকেই ভাবে আমি পুলিশে চাকরি করি। কারাটে মাস্টার দু’জনও আমায় বেশ শ্রদ্ধা করেন, এগিয়ে এসে কথা বলেন। কিন্তু কাল দেখলাম, মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলেন। আর একজন গার্জেনের সঙ্গে কী আলোচনা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। চুপচাপ অপেক্ষা করছি, ছেলে বেরোয় কখন।
পাশ থেকে রাঘবনের বাবা জানতে চাইলেন, “টুর্নামেন্টের ফীজ কি আজই দিতে হবে?”
রাঘবন আর প্রথম একই সাথে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু সে ইতিমধ্যেই প্রথমকে টপকে ব্রাউন বেল্ট। প্রথম মেরেকেটে পার্পল।
আমি তো কিছুই জানি না। “কী টুর্নামেন্ট?”
“ওদের যে কারাটে টুর্নামেন্ট হবে আসছে রবিবার? প্রথম যাবে না?”
এই রে, আমি তো জানি না কিছু!”
ততক্ষণে প্রথম বেরিয়েছে। চোখে জল। “বাবা, আমায় টুর্নামেন্টে যেতে দেবে না?”
কারাটে মাস্টার মুরুগনস্যারকে নিজেই ডেকে জানতে চাইলাম কী ব্যাপার। খুব বিনীতভাবে বললেন, “আসলে ও ঠিকমতো কাটাগুলো করতে পারছে না। মুখচোখে রাগী ভাবটাও আসছে না। দেখে মনে হছে পিটি করছে, মারপিটের ভঙ্গী হচ্ছে না। এটা বড়ো টুর্নামেন্ট, সারা চেন্নাই থেকে অনেকে আসবে। তাই আমরাও বেছে বেছে কয়েকজনকেই নিচ্ছি। ওকে এইবার নিলাম না, পরেরবার নেব।”

ফেরার পথে প্রথম আবার বলল, “বাবা, তুমি বললেও আমায় নেবে না টুর্নামেন্টে?”
না বাবা, ওঁরা মাস্টার। ওঁরা ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তুমি নিজেকে তৈরি কর, পরেরবার নিশ্চয়ই চান্স পাবে।”
“রাঘবন আমার থেকে ভালো, না বাবা? মুরুগন মাস্টার শুধু ওকেই শেখান, আমাকে শেখান না তো!”
শুধু কারাটে জানলেই কি ভাল হয়ে যায় কেউ? অনেকে অনেক কিছুতে ভালো। তুমিও কিছু বিষয়ে রাঘবনের চেয়ে ভালো, এমনকি মুরুগন মাস্টারের চেয়েও ভালো।”
এই কথা শুনে একটু যেন স্বস্তি পেল। মুচকি হেসে বলল, “ওদের গায়ে অনেক জোর, না বাবা?”
গায়ের জোর দিয়ে তো মানুষ হয় না। সে তো জন্তুজানোয়ারদেরও থাকে। মানুষের থাকে বুদ্ধির জোর। মনের জোর। তোমাকে বুদ্ধিতে বা মনের জোরে কেউ হারাতে পারলে তাকে বড়ো বলতে পার। গায়ের জোরে হারানোটা কোনও কাজের কথাই নয়।”
ততক্ষণে বাড়ি পৌঁছে গেলাম। ছেলেটা কী বুঝল কে জানে, তবে আর মনখারাপ করে থাকেনি।

।।৮।।

“বাবা, বি-এ-আর বার মানে কী?”
ইয়ে, কোথায় দেখলি?”
রাস্তায়, একটা দোকানের পোস্টারে…”
হুম্‌... মানে, ওখানে মদ বিক্রী হয়।”
তুমি যে আমাকে চকোবার খাওয়াও, তাতে মদ থাকে?”
“আরে না না, সেটা অন্য বার। তার মানে আলাদা। পোস্টারে লেখা থাকে মদের দোকানের নাম।”
“ও, বুঝেছি।”
“কী বুঝলি?”
“ওই দোকানে আইন মেনে মদ বিক্রী হয়। ‘বার অ্যাট ল’ লেখা ছিল একজনের নামের পাশে।”

।।৯।।

খেলাধুলো সেরে ছেলে ঘরে ঢুকে দেখি সোজা বিছানায় উঠতে যায়। হৈ হৈ করে উঠলাম, “কী রে, ধুলো মেখে এলি, হাত-পা ধো আগে!”
নির্লিপ্ত ছেলে উত্তর দিল, “বাবা জানো, বড়ো মানুষদের পা নোংরাই থাকে। বদমাশরা পা পরিষ্কার করে।”
এটা আবার তোকে কে শেখাল শুনি?”
তুমিই তো বল, বড়ো মানুষদের পায়ের ধুলো নিতে হয়, আর আমি নাকি পাজির পাঝাড়া!”

।।১০।।

চেন্নাই বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি গড়বার জন্য ভোট হল। খুব অ্যান্থু নিয়ে আমিও দাঁড়ালাম। তাও আবার যে সে পদে নয়, একেবারে জয়েন্ট সেক্রেটারির! যথারীতি হেরে গেলাম। বাড়ি ফিরে মুষড়ে আছি, ছেলে এসে চাঙ্গা করবার জন্য বলল, “বাবা, ভালোই হয়েছে তুমি ঐ সিক্রেটারি হওনি। তুমি পারতে না।”
তাই? কেন রে?”
তুমি তো কিছুই সিক্রেট রাখতে পার না! সিক্রেটারি হবে কী করে!”
এটা আবার তোকে কে বলল!”
“হ্যাঁ তো! কোথায় সিক্রেট রাখ! সবই তো পোস্ট করে দাও ফেসবুকে!”

।।১১।।

ঘরের বেশিরভাগ কাজকম্ম নিজের হাতে করতেই ভালোবাসি। তাতে আর কিছু হোক না হোক, পয়সা বাঁচে। এই যেমন অনেকদিন ধরে ছুরি, বঁটি এগুলো ধার দেওয়া হচ্ছিল না। শানওয়ালা আসে না নিয়মিত। তো আমিই একটা উকোপাথর এনে ওগুলোর ‘শান বাড়াব’ ভাবলাম।
সে ভাবলাম অনেকদিন ধরে, কাজটা হয় আর না! আজ ‘দুত্তেরিকা’ বলে নিয়ে বসেছিলাম। মা তখন ওষুধ খেয়ে শুয়েছে একটু, আর আমাদের ছেলের মা চেয়ারে উঠে পাখা ঝাড়ছে পুরনো গামছা দিয়ে। আর ঠিক তখনই কলিং বেল। ছেলেটা আমার পাশেই ছিল। বললাম, “দেখে আয় তো কে এসেছে।”
সে গেল। একটু পরে ফিরে এল। বললাম, “কী রে, কে?”
“মেনটেনান্স আঙ্কেল।”
মনে পড়ল, এই মাসের মেন্টেনান্সের সঙ্গে লিফট সারাবার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। দেওয়া হয়নি। বললাম, “বসতে বলেছিস?”
“হ্যাঁ বলেছি, কিন্তু উনি পালিয়ে গেলেন।”
“পালিয়ে গেলেন! কেন!”
“কে জানে! আমায় জিগ্যেস করলেন, বাবা কোথায়। আমি বললাম, বাবা ছুরিতে শান দিচ্ছে, মা পাখায় গামছা বাঁধছে, আর ঠাম্মা অনেকগুলো ওষুধ খেয়ে সেই যে ঘুমিয়েছে, আর উঠছে না!”


।।১২।।

ছেলে এসে জানাল, স্কুলে নতুন এক বান্ধবী হয়েছে, নাম ‘এসএসভি।’
বান্ধবী শুনে আর চমকাই না। কিন্তু নাম শুনে ঘাবড়ালাম। জানি এটা এমজিআর, টিভিএস-এর রাজ্য, তবুও ক্লাশ টু-এর মেয়ে নামের শর্ট ফর্ম ব্যবহার করছে…
আবার বললাম, “কী নাম বললি?”
সামনের দাঁত ফোকলা। ফুসফুসিয়ে আবার বলল, “এসএসভি!”
বললাম, “লিখে দেখা তো!”
লিখল, ‘Yashaswi’।



।।১৩।।

অনেকদিন ধরেই বলে রেখেছিলাম, আজ সময়-সুযোগ হল। ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই একটা ছোটোখাটো অ্যাকোয়ারিয়াম কিনে বাড়ি ফিরলাম।
কুল্যে ছ’খানা মাছ। কিন্তু ঝিনুক-নুড়িতে সাজানো বুদবুদ বেরোনো পাম্পসমেত কাঁচের বাক্সটা নিয়ে প্রথম অনেকক্ষণ মেতে রইল। খাবার দিল, সব জেনে বুঝে নিল। এবার থেকে ওর দায়িত্ব এটা সামলানো। বলে দিলাম আমরা।
রাত্তিরে আবার গুড নাইট বলা হল মাছগুলোকে। অনেক রাতে হঠাৎ আমাকে জিগ্যেস করল, “বাবা, সত্যি করে একটা কথা বলবে?”
“নিশ্চয়ই বলব। কী কথা রে?”
“মাছগুলো বড়ো হয়ে গেলে তুমি ওদের খেয়ে নেবে না তো?”


।।১৪।।

‘জীবনের সাধ অপূর্ণ রেখ না।’ ট্যাগলাইনটা মাথায় ঢুকে গেঁথে গেছে। আর সেটাই হয়েছে মুস্কিল!
সাড়ে ছয় বছর বয়সে অনেকরকম সাধ হয়। তার একটা হল গুলতি চালানো। আজ সকালে বাজারে নিয়ে গেছি। দেখি গুলতি নিয়ে বসেছে একজন।

নরম স্বরে অনুরোধ, “বাবা...!”
মায়া হল, দিলাম কিনে। অনেকরকমভাবে বোঝালাম, উচিত অনুচিত। তারপর খেলতে পাঠালাম। খানিক বাদে পাশের বাড়ির মালকিন হাসতে হাসতে দুটো গন্ধরাজ লেবু দিয়ে গেলেন। ওনারই গাছের।
“আপনার ছেলে গুলতি দিয়ে পাড়ল এ দুটো, জানেন! ওকে বকবেন না কিন্তু, বাচ্চা তো! আমি আসছি দেখেই ভয়ে লুকিয়েছে।”
ডাকলাম। এল। মাথা নিচু।
“তোকে যে বললাম কারও বাড়ির দিকে গুলতি চালাবি না?”
সরল চোখদুটো তুলে বলল, “বাবা, আমি তো পাশের নারকেল গাছটায় টিপ করেছিলাম!”
দুপুরে অনেকদিন পর গন্ধরাজ লেবু দিয়ে ভাত খেলাম। আহা! এইজন্যেই বলে, জীবনের সাধ অপূর্ণ রেখ না!

।।১৫।।

সারাদিন নানান কাজে ব্যস্ত থাকি। বাড়ি ফিরতে রাত দশটা বেজে যায়। কোনওমতে পিঠের ভারী ব্যাগটা নামিয়ে মোজা খুলতে না খুলতেই ছেলে হাতে করে নিয়ে আসে ঠান্ডা জলের বোতল। নিমেষে সমস্ত ক্লান্তি কেটে যায় তখন।
আজও এল। কিন্তু অন্যদিনের মতো হাসিমুখে নয়। বুঝলাম, কিছু একটা হয়েছে। পাশে বসিয়ে জানতে চাইলাম, “কী রে, মা বকেছে?”
হুঁ।”
কথা শুনিসনি নিশ্চয়ই?”
না, শুনেছি…”
ততক্ষণে চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছে প্রায়। মায়া লাগল। জড়িয়ে ধরে বললাম, “তাহলে?”
নতুন পেন্সিল বক্সটা স্কুলে হারিয়ে ফেলেছি…” বলতে বলতে কেঁদেই ফেলল বেচারা।
একটু সময় দিলাম। তারপর বললাম, “না, তুই হারাসনি। আমি জানি ওটা কোথায় গেছে।”
চোখ মুছে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। “তুমি জানো!”
হ্যাঁ, আমি জানি। ওটা কে যেন নিয়ে নিয়েছে। তাই না রে?”
দু’চোখে বিস্ময় নিয়ে বলল, “হ্যাঁ বাবা, আমি সত্যি টেবিলেই রেখেছিলুম! হারাইনি!”
আমি জানি। ছোটোরা কিছু হারায় না। সবই ওই কে যেন করে।”
কে যেনটা কে, বাবা?”
কে জানে! কিন্তু অমন একটা কে যেন আমার ক্লাশেও ছিল।”
তোমার ক্লাশেও!”
হ্যাঁ রে! আমারও কত পেন্সিল বক্স কে যেন নিয়ে নিয়েছে; ওয়াটার বটলের ছিপি কে যেন হারিয়ে দিয়েছে... জানিস, আমার তো মনে হয় সক্কলের ক্লাশেই একটা না একটা কে যেন পড়ে।”
সক্কলের ক্লাশেই? ঠাম্মার ক্লাশেও!”
মুখে হালকা হাসি ফুটেছে দেখলাম।হ্যাঁ, ঠাম্মার ক্লাশেও।”
তাহলে মা যে বকল? মা’র ক্লাশেও কে যেন ছিল?”
ছিল, নিশ্চয়ই ছিল!”
ব্যস, বলতে যা দেরি। ছুটল মায়ের কাছে। “মা, মা। তোমার ক্লাশেও কে যেন পড়ত?”
মাও সারাদিনের শেষে রাতের খাবারের যোগাড় করছিল। প্রসঙ্গ না জেনে এ হেন প্রশ্নের উত্তরে বলল, “হ্যাঁ আমার ক্লাশেও অনেকে পড়ত। হয়েছে তো? এখন আয়, রুটি খাবি।”
ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। আমিও হাসলাম। একেই নির্ঘাত মুজতবা আলি ‘গুষ্টিসুখ’ বলেছেন!
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

কচিপাতাঃ গল্পঃ ডাইনোসর পার্ক - প্রত্যক চক্রবর্তী



ডক্টর রবার্ট প্যান একদিন একটা টাইম-মেশিন বানালেন। তাতে অনেকরকম যন্ত্র ছিল। রবার্ট তাঁর বন্ধুদের মানে জ্যাকসন টেফ আর জ্যাক জনারিকে ডেকে নিলেন। তাঁরা সবাই টাইম-মেশিনে উঠে পড়লেন। ১০,০০,০০,০০০ বছর আগে চলে গেলেন সবাই। টাইম-মেশিনের ভেতর থেকে সব ঝাপসা দেখাচ্ছিল। তাই ওঁরা বাইরে নেমে এলেন। বাইরে এসে হাঁটতে হাঁটতে ওঁদের খুব জল তেষ্টা পেল। ওঁরা নদীর ধারে জল খেতে এসে দেখলেন যে নদীর দু’পাশে ঘন জঙ্গল। আর এ-জঙ্গল থেকে ও-জঙ্গল পারাপার করছে এক বিশাল স্ট্যাগোসরাসের দল। ডঃ রবার্ট ছবি তুলে রাখলেন। দুটো বাচ্চা স্ট্যাগোসরাসও ছিল। ওঁরা জল খেয়ে ওখান থেকে চলে গেলেন। সঙ্গে মাত্র একদিনের খাবারই ছিল। তা-ই খাওয়া হল।
সন্ধ্যা হয়ে গেল। তাঁবু খাটিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেন সবাই। হঠাৎ মাঝরাতে কীরকম একটা ধুপ ধুপ আওয়াজ শুনে জ্যাক জনারি মশাল জ্বেলে বাইরে গেলেন। বাইরে গিয়ে দেখা গেল একটা স্ট্যাগোসরাস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘাস খাচ্ছে। খুব একটা ক্ষতি করেনি সে। সুতরাং তাঁবুতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া গেল আবার।
পরেরদিন শিকারে গিয়ে জঙ্গলের মাঝখানে পৌঁছে গেলেন তিনজনে। সেখান থেকে ফলটল নিয়ে খাওয়া হল।
ওঁরা যখন জীপে উঠলেন যাবেন বলে তখন ওঁদের জীপটা একটি বড়ো কিছুতে ধাক্কা খেয়ে চুরমার হয়ে গেল। ওপরে তাকিয়ে দেখা গেল একটা টি-রেক্স। ওঁরা পেছনদিকে দৌড়তে লাগলেন। দৌড়তে দৌড়তে একটা ছোটো গুহা দেখতে পেয়ে ওঁরা তার ভেতরে ঢুকে পড়লেন। সেখানেই রাত কাটালেন। রাত্রে ওঁরা শুনতে পেলেন কীরকম একটা চিঁ চিঁ আওয়াজ। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন, দুটো ডিম ফুটে বাচ্চা টেরানোডন বেরিয়েছে। রবার্ট বুঝলেন যে এঁদের বাইরে থাকা ঠিক হবে না। তাই ওই বাচ্চাদের গুহার ভেতরে নিয়ে এলেন। ওদের জন্য ঘাসপাতা জোগাড় করে নিয়ে এসে গুহার ভেতর জড়ো করলেন। জায়গাটা নরম হয়ে গেল। তার ওপরেই বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ল।

সেই বাচ্চাগুলো ধীরে ধীরে বড়ো হল। তারা যখন বড়ো হয়ে উড়তে শিখল, তাদের ছেড়ে দেওয়া হল। ওরা উড়ে চলে গেল। রবার্ট বললেন, “এরকম এক জায়গায় বসে থাকলে চলবে না। আমাদের আগেকার দিনের পুরো পৃথিবীটাকে দেখতে হবে।”
পরেরদিন সকলে ওঁরা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। চারদিকে আরও কত ডাইনোসর ঘুরে বেড়াচ্ছে। করিথোসরাস, ব্র্যাকিওসরাস, ডিপ্লোডকাস, মেগার‍্যাপ্টর ও আকাশে টেরানোডন। যারা মাটিতে ছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাংসভোজী।
হঠাৎ ঘটল এক অঘটন। দূরের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল টিরানোসরাস রেক্স। ওকে দেখেই সবাই খাওয়া ছেড়ে পালিয়ে গেল। ভাগ্য ভালো মানুষদের দেখার আগেই ওঁরা পালিয়েছেন। একটা ট্রাইসেরাটপস শুয়ে ছিল। ওঁরা ওটাকে পাথর মনে করে ওর পেছনে লুকিয়ে পড়লেন। যখন সেটা একটু নড়াচড়া করল, তখন ওঁরা সতর্ক হয়ে গেলেন। তাঁরা বুঝলেন ওটা একটা বড়ো ডাইনোসর।
ভালো করে দেখে বোঝা গেল, ওটা একটা ট্রাইসেরাটপস। ট্রাইসেরাটপসের ঘুম ভেঙে গেল। ‘য়াঁ য়াঁ’ করতে করতে কোনদিকে চলে গেল। ও যে ঝোপে ঢুকল সেটা বেশি ঘন ছিল না। ও ব্বাবা, সে ঝোপের ওপাশে আরেকটা ট্রাইসেরাটপস ঘাস খাচ্ছিল! সে তার কাছে চলে গেল। ওটা ওর মা। খেয়েদেয়ে ওরা চলে গেল।
জ্যাক জনারি বললেন, “চল, আমরাও চলে যাই। সন্ধে হচ্ছে তো, নাকি?”
ওঁরা তাঁবু খাটিয়ে তাঁবুর ভেতর শুয়ে পড়লেন।


পরদিন সকালবেলা দেখা গেল তাঁবুর ভেতর একটা কাঁটাওয়ালা লেজ। সবাই দেখে খুব ভয় পেল।
পরে একটু ভয়ে ভয়ে জ্যাক জেনারি বেরিয়ে গিয়ে দেখলেন, ওটা একটা স্ট্যাগোসরাসের লেজ। ওঁরা তাঁবু তুলে ফেললেন।
ঘুরতে ঘুরতে ওঁরা একটা নদী দেখলেন। নদীতে অসংখ্য ডাইনোসর স্নান করছিল। ওরা ছিল বিরাট আকারের। ম্যাক্রুরোসরাস ওরা। ঘাস খাচ্ছিল। ওর ফসিল পাওয়া গেছে আফ্রিকায় ১০০৫ সালে। খেতে খেতে হঠাৎ চলে গেল। কিন্তু কেন? কিছু কি দেখতে পেয়েছে ওরা? নাকি কিছুর গন্ধ পেয়েছে? জলের দিকে ঝুঁকে কিছুই দেখা গেল না। জঙ্গল থেকে তো কেউ আসছে না। তবে কী হল? অবাক হলেন সবাই। পরে সব বোঝা গেল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল জল থেকে একটা বিশাল কাঁটাওয়ালা ডিমেট্রডন বেরিয়ে এল। অনাহারে তার হাড়গোড় বেরিয়ে অবস্থা খারাপ। হাঁটতে পারছে না ভালো করে। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে, ও যাকে পাবে তাকেই খাবে।


একদিন রাত্রে প্রচণ্ড ঝড় হল। গাছপালা উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে। তাঁবু খুলে যায় যায় অবস্থা। যথারীতি তাঁবু খুলে ঝড়ে উড়ে চলে গেল। লোকগুলোর কাছে আলাদা তাঁবুও ছিল না। মাথার ওপর খোলা আকাশ। তার মাঝেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। কী করবে বুঝতে না পেরে ওঁরা একটা গুহায় আশ্রয় নিলেন। গুহার মুখটা অত বড়োও ছিল না। ছোটো ছিল। কিন্তু খেতে তো হবে। ব্যাগে খাবার ছিল। তা-ই খেতে হল।
একটু বিশ্রাম নিয়ে ওঁরা পরেরদিনের জন্যে শিকার ধরতে বেরোলেন। কিছু পরে জ্যাকসনের জোরে ‘আ-আ-আ’ শব্দ শোনা গেল। রবার্ট তাঁর আরেকটা আবিষ্কার সাথে করে নিয়ে গেছিলেন - ফ্লাইং হেলমেট। ওটা পরে জ্যাকসনকে খুঁজতে বেরোলেন রবার্ট আর জ্যাক। ওঁরা জ্যাকসনকে গুহায় ফিরে যেতে দেখলেন।
যাক, জ্যাকসন ফিরে এসেছেন, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। হঠাৎ দেখা গেল নিচে একটা লোক হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটছেন। জ্যাক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?”
তিনি বললেন, “আমার নাম অলট্রাক্স। আমি এখানে দু’মাস আগে এসেছি। আমিও একজন সায়েন্টিস্ট। আমি টাইম-মেশিনে করে এখানে এসেছি।”
জ্যাক বললেন, “তুমি আমাদের সাথে থাকতে পার।”
তাঁর সাথে বন্ধুত্বও হয়ে গেল। তাঁকে কাঁচি দেওয়া হল। অলট্রাক্স চুলদাড়ি কেটে নিলেন।


একদিন ঘটল এক বিস্ফোরণ। দুনিয়ার সবথেকে উঁচু আগ্নেয় পাহাড় থেকে লাভার স্রোত বেরিয়ে এল।
পরেরদিন আগ্নেয়গিরি ঠিকও হয়ে গেল। বনজঙ্গল সব পুড়ে গেছে। দূরে একটা টি-রেক্স মরে পড়ে আছে দেখা গেল। ওর গায়ে আগুন ধরে গিয়েছিল হয়তো।
নাহ্‌, কেউ ওকে কামড়েছে। কামড়ানোর দাগ আছে ওর গলায়।
সন্ধেবেলায় খেতে খেতে ওঁরা এক টরোসরাসের গর্জন শুনতে পেলেন। এই টরোসরাস কচ্ছপের মতোই। একটা খোলসের মধ্যে থাকবে। শিকার এলেই বাইরে এসে খপ করে খেয়ে নেয়। সেদিন কেউ গুহা থেকে বেরোননি।
রাত পেরিয়ে ভোর হল। সবাই বললেন, “এবার আমাদের বাড়ি যাওয়া উচিত।”
“কিন্তু কীভাবে?” বলে উঠলেন জ্যাক। তিনি বললেন, “টাইম-মেশিন তো ভেঙে গেছে।”
হুম, একটা বাধা পড়ল।
হাঁটতে হাঁটতে ওঁরা দেখলেন, একটা ডাইনোসরের কঙ্কাল। সেটার দিকে বেশি নজর না দিয়েই চলে গেলেন তাঁরা। বেশি দূর যেতে হয়নি। অ্যাঙ্কিলোসরাসের সঙ্গে ধাক্কা! সে তো এমন তাড়া করল, ছাড়ার নামই নিচ্ছে না! দৌড়তে দৌড়তে তাঁরা একটা গাছে উঠে পড়লেন। যাই হোক, ডাইনোসরটা তলা দিয়ে চলে গেল। তারপর গাছ থেকে নেমে এলেন সবাই।


তাঁরা জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে নিয়ে নৌকো বানালেন। ছোটো নৌকো। তাতে করেই নদী পার হবেন মানুষগুলো।
নৌকো থামিয়ে দিলেন ওঁরা মাঝনদীতেই। একটা ডিপ্লোডোকাস! ও বেশিক্ষণ থাকেনি জলে। চলে গেল কিছু পরে। নৌকোতেই একটা দিন কেটে গেল।
পরেরদিন ভোরবেলা নৌকো ডাঙায় পৌঁছল। সেখানে অলট্রাক্স তাঁর টাইম-মেশিনটা ফেলে গিয়েছিলেন। সেইখানে গিয়েই অশান্তি। জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে নদীটা আরও অনেক লম্বা। কিন্তু নৌকো তার ভেতর ঢুকছে না। নেমে হাঁটাপথে এগোতে লাগলেন সবাই।
বন্দুকের গুলি শেষ। লোকগুলো খুব ক্লান্ত। তাঁরা হাঁটতে হাঁটতে একটা বড়ো মেগার‍্যাপ্টর দেখলেন। একমুঠো বালি নিয়ে রবার্ট বন্দুকের ভেতর দিলেন। তারপর বালির ঝড়। মেগার‍্যাপ্টর কিছুই দেখতে পেল না। সে পড়ে গেল।
তাঁরা অলট্রাক্সের টাইম-মেশিন দেখতে পেলেন। কিন্তু মাঝখানে একটা ডোবা আছে। হঠাৎ জ্যাক পাথরে হোঁচট খেয়ে ডোবায় পড়ে গেলেন। জ্যাক সাঁতার জানতেন না। হঠাৎ জ্যাকের টুপিটা জলের ওপর ভেসে উঠল। বন্দুকটাও। জ্যাকের জ্যাকেটটাও খুলে ভেসে উঠল।
জলের নিচে পরার পোশাক এনেছিলেন রবার্ট। সেটা পরে জলায় তলায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি টুপি, বুট, বেল্ট, বন্দুক, জ্যাকেট, তালা খুঁজে পেলেন। জলের তলায়। হঠাৎ দেখলেন বড়ো হাঙরের মতো একটা ডাইনোসর তাঁর দিকে তিরবেগে ভেসে আসছে।


হঠাৎ রবার্টের চোখ খুলে গেল। সে দেখল, সে ঘরের মেঝেতে সাঁতার কাটছে। ও বিছানা থেকে পড়ে গিয়েছিল আর হাত লেগে জলের জগ উলটে পড়ে আছে। ঘরময় জল আর তার মধ্যেই জ্যাককে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

_____