প্রবন্ধঃ মহাদেশকথা - রাখি পুরকায়স্থ


মহাদেশ কথা
রাখি পুরকায়স্থ


সৌরজগতের আটটি গ্রহের মধ্যে সূর্য থেকে দূরত্ব অনুযায়ী তৃতীয় স্থানাধিকারী এবং পঞ্চম বৃহত্তম গ্রহ ‘পৃথিবী’। আজ পর্যন্ত সম্পাদিত বৈজ্ঞানিক অন্বেষণের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, সমগ্র ব্রহ্মান্ডে জীব ও উদ্ভিজ্জ প্রাণের একমাত্র ঠিকানা আমাদের পৃথিবী। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে United Nations - Department of Economic and Social Affairs - Population Division কৃত সমীক্ষা ‘2017 Revision of World Population Prospects’ অনুযায়ী, প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন মানুষ এবং ২০১১ সালে বিজ্ঞান পত্রিকা PLoS Biology প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন ± ১.৩ মিলিয়ন জৈব প্রজাতি আমাদের এই নীল গ্রহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে। পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় ৭১% লবণাক্ত জলের মহাসাগর দ্বারা আবৃত। অবশিষ্টাংশ স্থলভাগ, যা নিয়ে গঠিত হয়েছে বিভিন্ন মহাদেশীয় অঞ্চল।
মহাদেশ বলতে পৃথিবীর অতিকায় ভূখন্ডসমূহকে বোঝায়। The Myth of Continents: A Critique of Metageography বইটির লেখকদ্বয় ভূগোলবিদ Martin W. Lewis এবং ঐতিহাসিক Karen Wigen মহাদেশের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘মহাদেশ বলতে বোঝায় একাধিক বৃহৎ, অবিচ্ছিন্ন এবং সতন্ত্র ভূমিখন্ড যা আদর্শ প্রাকৃতিক অবস্থায় বহু বিস্তৃত জলরাশি দ্বারা পরস্পর থেকে পৃথকভাবে অবস্থান করে।’
পৃথিবীতে প্রচলিতভাবে স্বীকৃত সাতটি মহাদেশ রয়েছে। তবে সেই সাতখানা মহাদেশের সবক’টি উপরোক্ত সংজ্ঞানুযায়ী সুবিশাল জলভাগ দ্বারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন স্বতন্ত্র ভূমিখন্ড নয়। তাদের অনেকেই স্থলভাগ দ্বারা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত। বৃহত্তম থেকে ক্ষুদ্রতম আয়তনের অনুপাতে সাজালে, মহাদেশগুলো হল - এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অ্যান্টার্কটিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া। দ্বীপগুলোকে সাধারণত পার্শ্ববর্তী মহাদেশের অঙ্গ বলে মনে করা হয়। যেমন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহকে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন একটি ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল ‘ওশেনিয়া’ (Oceania) সৃষ্টি করা হয়েছে।
পৃথিবীর গোড়ার দিকে কিন্তু এই সাতটি মহাদেশ পৃথক অবস্থায় ছিল না। ১৭৫ মিলিয়ন বছর আগে এই সাতটি মহাদেশ সংযুক্ত অবস্থায় ছিল। প্যান্থলসা (Panthalssa) নামক একটিমাত্র মহাসমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত সেই একক মহাদেশ (Supercontinent)-এর নাম ছিল প্যানজিয়া (Pangaea/Pangea)। সময়ের সাথে ক্রমশ সেই একক মহাদেশটি ভেঙে আজকের সাতটি টুকরো মহাদেশ তৈরি হয়েছে। চলো, এবার সেই সাতটি মহাদেশকে ভালো করে চিনে নেওয়া যাক।


এশিয়া



উত্তরের হিমায়িত সুমেরু থেকে দক্ষিণের উষ্ণ নিরক্ষীয় অঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত পৃথিবীর বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ এশিয়া। National Geographic Society প্রকাশিত National Geographic Family Reference Atlas of the World অনুসারে, এশিয়া মহাদেশটি ৪৪,৫৭৯ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে। এটি ভূপৃষ্ঠের ৮.৭% ও স্থলভাগের ৩০% জুড়ে অবস্থিত। ২০১৫ সালের জনসমীক্ষা অনুযায়ী, আনুমানিক ৪.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার এই মহাদেশে বিশ্ব-জনসংখ্যার প্রায় ৬২% মানুষ বাস করেন। পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর এবং উত্তরে উত্তর মহাসাগর এশিয়াকে বেষ্টন করে আছে। এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশ আসলে একটি অবিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের অংশ যাকে একত্রে ইউরেশিয়া বলা হয়। কোনও স্পষ্ট ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা না থাকায় ইউরোপের সাথে এশিয়ার পশ্চিম সীমান্ত ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে সাধারণভাবে স্বীকৃত পশ্চিম সীমানা অনুযায়ী সুয়েজ খাল, ইউরাল নদী এবং ইউরাল পর্বতমালার পূর্বে এবং ককেশাস পর্বতমালা, কাস্পিয়ান সাগর  কৃষ্ণ সাগরের দক্ষিণে অবস্থান করছে এশিয়া। ইউরোপ ও আফ্রিকা উভয়ের সাথেই আফরো-ইউরেশিয়া মহাদেশীয় ভূমির অংশীদার এশিয়া মহাদেশ। পশ্চিমদিকে এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যকার সীমানাটি হল লোহিত সাগর, সুয়েজ উপসাগর এবং সুয়েজ খাল। আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্গত মিশরদেশের সিনাই উপদ্বীপ (Sinai Peninsula) এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে স্থলযোটক (Land Bridge) হিসেবে কাজ করছে। উত্তর-পূর্বে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ বেরিং প্রণালী  (Bering Strait) মহাদেশটিকে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ থেকে পৃথক করে রেখেছে। এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ অঞ্চল ওশেনিয়ার মধ্যেকার সীমানা সাধারণত মালয় দ্বীপপুঞ্জের কোনও এক স্থানে স্থাপন করা হয়।
মৃত সাগর
এশিয়া মহাদেশ একটি বৈচিত্রময় ভৌগলিক অঞ্চল। এশিয়ার উত্তরাংশ প্রাচীন পর্বতমালা এবং স্থিতিশীল মালভূমি দ্বারা গঠিত। মহাদেশের মধ্যভাগে অতিকায় হিমালয় পর্বতমালা আধিপত্য বিস্তার করে আছে। সাথে রয়েছে তিব্বত মালভূমি, যা উত্তরে চীন পর্যন্ত প্রসারিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রয়েছে বেশ কিছু দ্বীপ, যার মধ্যে কয়েকটি আবার আগ্নেয়গিরিজাত। সমগ্র এলাকা জুড়ে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং ভূমিকম্প একটি অতি সাধারণ ঘটনা। আরেকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয়, এশিয়া মহাদেশ নানান ভৌগলিক ক্ষেত্রে চরমসীমা অর্জন করেছে। হিমালয় পর্বতমালার অন্তর্গত ৮,৮৪৮ মিটার উচ্চতায় মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গ পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪২০ মিটার নিচে অবস্থিত মৃত সাগর পৃথিবীর নিম্নতম স্থলভূমি এবং তুষারাচ্ছন্ন উত্তর সাইবেরিয়া পৃথিবীর অন্যতম শীতলতম স্থান। পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত ১৩৮ কোটি জনসংখ্যাবিশিষ্ট গণপ্রজাতন্ত্রী চীন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র। উত্তর এশিয়া থেকে পূর্ব ইউরোপে সম্প্রসারিত ১৭,০৭৫,৪০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দেশ।
১৯৯৯ সালে প্রকাশিত Confucius Lives Next Door: What Living in the East Teaches Us About Living in the West গ্রন্থটিতে মার্কিন লেখক Thomas Roy Reid দাবি করেছেন, এশিয়া মূলত প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা থেকে উঠে আসা একটি ধ্রুপদি নাম। তার বিপুল আকার এবং অনন্য সাধারণ বৈচিত্র্য জানান দেয়, প্রকৃতপক্ষে ভৌত ভূগোলের চেয়ে মানবীয় ভূগোলের সাথে এশিয়ার সম্পর্ক আরও বেশি গভীর। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে জাতিগোষ্ঠী, ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, অর্থনীতি, ঐতিহাসিক বন্ধন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বহু প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা এবং চীন সভ্যতার পীঠস্থান এই এশিয়া মহাদেশ। সেই সাথে খ্রিস্ট ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, ইহুদী ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, কনফুসীয় ধর্ম, তাও ধর্মমত, জৈন ধর্ম, শিখ ধর্ম, জরাথ্রুস্টবাদ সহ বিশ্বের মূলধারার অধিকাংশ ধর্মের জন্মস্থান ছিল এশিয়া।



আফ্রিকা



আয়তন ও জনসংখ্যা উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ আফ্রিকা। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত April Pulley Sayre লিখিত Africa (Volume 8 of The Seven Continents Series) বইটি পড়ে জানা যায়, মহাদেশটি সমগ্র ভূপৃষ্ঠের ৬% ও মোট স্থলভাগের ২০.৪% জুড়ে রয়েছে। মাদাগাস্কার দ্বীপরাষ্ট্র সহ পার্শ্ববর্তী দ্বীপপুঞ্জগুলোকে নিয়ে হিসেব করলে মহাদেশটির আয়তন প্রায় ৩০.৩ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। ৫৪টি সম্পূর্ণ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র (দেশ), ৯টি অধীনস্থ অঞ্চল এবং বিতর্কিত হলেও কার্যত স্বাধীন ২টি রাষ্ট্রে ছড়িয়ে আছে আফ্রিকা মহাদেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সমীক্ষা ও পরিসংখ্যান সংস্থা Population Reference Bureau দ্বারা প্রস্তুত 2016 World Population Data Sheet অনুযায়ী, আনুমানিক ১.২ বিলিয়ন মানুষ এই মহাদেশের বাসিন্দা, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬%। আফ্রিকাকে প্রায় মাঝ বরাবর বিভক্ত করে দিয়ে চলে গেছে নিরক্ষরেখা। তাই মহাদেশটির বেশিরভাগ অংশ ক্রান্তীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ যা উত্তরের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল থেকে দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত। বিভিন্ন বৃহৎ জলখন্ড আফ্রিকা মহাদেশকে বেষ্টন করে আছে। উত্তরে ভূমধ্যসাগর, উত্তর-পূর্বে সুয়েজ খাল  লোহিত সাগর, পূর্বে ভারত মহাসাগর, এবং পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর ঘিরে আছে আফ্রিকাকে। উত্তর-পূর্ব কোণে সিনাই উপদ্বীপের মাধ্যমে এশিয়া মহাদেশের সাথে সংযুক্ত রয়েছে আফ্রিকা। ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশ খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে মাত্র ১৪.৩ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে ইউরোপ। মাঝে কেবল জিব্রাল্টার প্রণালী (Strait of Gibraltar)।
নীলনদের তীরে জিরাফ
ভৌগলিক ক্ষেত্রে আফ্রিকা একটি বিচিত্র মহাদেশ। রুক্ষ ঊষর মরুভূমি, সতেজ সবুজ বৃষ্টিবন (Rainforest) ও শুষ্ক তৃণভূমি (Savannah) দ্বারা আচ্ছাদিত উচ্চ মালভূমি মহাদেশটির অধিকাংশ ভূপ্রকৃতি জুড়ে রয়েছে। উত্তরে বিস্তৃত সাহারা মরুভূমিতে বিশ্বের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া নিরক্ষরেখা বরাবর অবস্থান করছে একটি বৃষ্টিবন বলয়। পূর্ব আফ্রিকায় রয়েছে গ্রেট রিফট উপত্যকা (Great Rift Valley), যেখানে প্রথম মানব প্রাণের উদ্ভব ঘটে। সেই উপত্যকায় রয়েছে বিশাল হ্রদ এবং জলপ্রপাত। মহাদেশটির নানা স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি আগ্নেয়গিরি। আশ্চর্যের বিষয়, নিরক্ষরেখার নিকটবর্তী অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও, পূর্ব আফ্রিকার পর্বতশৃঙ্গগুলো সারা বছরই তুষার-মুকুট পরে থাকে! বিশ্বের দীর্ঘতম নদী, ৬৮৫৩ কিলোমিটার লম্বা নীল নদ মহাদেশটির উত্তর-পূর্বপ্রান্ত বরাবর বইছে। বিশাল আয়তন এবং বিচিত্র জলবায়ুর কারণে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদ্ভিদ এবং প্রাণীর আশ্রয়স্থল এই মহাদেশ। বর্তমানে আফ্রিকায় ৭ হাজারেরও বেশি প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, মাছ এবং পাখি রয়েছে। প্রায় ১ লক্ষ প্রজাতির পোকামাকড়ও রয়েছে সেখানে। এই মহাদেশে পৃথিবীর স্থলভাগের বৃহত্তম প্রাণী (আফ্রিকান হাতি) এবং সবচেয়ে লম্বা প্রাণী (জিরাফ) পাশাপাশি বসবাস করে।
আফ্রিকাকে মানবজাতির আঁতুড়ঘর বলে মনে করা হয়। অধিকাংশ জীবাশ্মনৃতত্ত্ববিদ (Paleoanthropologist)-দের মতে, পৃথিবীর বুকে আফ্রিকা মহাদেশেই প্রথম মানব-বসতি গড়ে উঠেছিল। এখান থেকেই মানব প্রজাতির উদ্ভব ও উত্তরণ ঘটে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ৮০ লক্ষ থেকে ৫০ লক্ষ বছর আগে এখানেই লেজবিহীন বাঁদর জাতীয় প্রাণী বা বনমানুষ (The Great Apes) থেকে আদি মানবেরা বিবর্তিত হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নৃবিজ্ঞানীরা এখানে Australopithecus afarensis, Paranthropus boisei, Homo erectus, Homo habilis, Homo ergaster প্রভৃতি আদি মানব প্রজাতির জীবাশ্ম এবং প্রায় ৭ মিলিয়ন বছর আগের মানব বসতির চিহ্নসমূহ খুঁজে পেয়েছিলেন। বিজ্ঞানীদের মতে, আনুমানিক ১ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo Sapiens) অর্থাৎ আধুনিক মানুষের উৎপত্তি ঘটে এবং এখান থেকেই তারা ক্রমশ পৃথিবীর অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকার পূর্বদিকে ইথিওপিয়া অঞ্চলে প্রায় ২ লক্ষ বছরের পুরনো হোমো স্যাপিয়েন্সের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। বর্তমানে মহাদেশটি জাতিগত, সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত বিপুল বৈচিত্রে সমৃদ্ধ।


উত্তর আমেরিকা



আয়তনের দিক থেকে বিচার করলে এশিয়া ও আফ্রিকার পরে উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মহাদেশ। সুমেরুবৃত্ত থেকে কর্কটক্রান্তি অঞ্চল অবধি প্রসারিত মহাদেশটির আয়তন প্রায় ২৪,৭০৯,০০০ বর্গ কিলোমিটার, যা পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় ৪.৮% এবং মোট স্থলভাগের প্রায় ১৬.৫%। জনসংখ্যার বিচারে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের পরে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম মহাদেশ উত্তর আমেরিকা। ২০১৩ সালের জনসমীক্ষা থেকে জানা যায়, প্রায় ৫৬৫ মিলিয়ন মানুষ অর্থাৎ, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫% মানুষ এই মহাদেশের মূল ভূখন্ডের নিকটবর্তী দ্বীপপুঞ্জগুলো (বিশেষত ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ) সহ ২৩টি স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাস করেন। সম্পূর্ণ উত্তর আমেরিকা উত্তর গোলার্ধের মধ্যে এবং তার প্রায় সবটুকুই পশ্চিম গোলার্ধের মধ্যে অবস্থান করছে। মহাদেশটি উত্তরে উত্তর মহাসাগর, পূর্বে আতলান্তিক মহাসাগর, দক্ষিণে ও পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় সাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত। উত্তর-পূর্বে গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্ক প্রণালী দ্বারা আইসল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং উত্তর-পশ্চিমে এশিয়ার মূল ভূখন্ড থেকে আলাস্কা সংকীর্ণ বেরিং প্রণালী দ্বারা পৃথক রয়েছে। উত্তর আমেরিকা অতি সংকীর্ণ পানামা স্থলযোটক (Isthmus of Panama, a land bridge)-এর মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকার সাথে যুক্ত রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালি
উত্তর আমেরিকার জলবায়ু, বন্যপ্রাণী এবং ভূপ্রাকৃতিক গঠন অত্যন্ত বৈচিত্রপূর্ণ। ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ডেথ ভ্যালির চূড়ান্ত মরুসদৃশ তাপমাত্রা, আলাস্কার তুষার-আচ্ছাদিত ম্যাকিনলি পর্বত (বা দেনালি পর্বত) কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মিষ্টি জলের হ্রদ (বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম) লেক সুপেরিয়র – বৈচিত্র্যে এই মহাদেশ কারও থেকে পিছিয়ে নেই। উত্তর আমেরিকায় দুটি প্রধান পর্বতমালা রয়েছেঃ ‘রকি পর্বতমালা’, যা মহাদেশটির পশ্চিমে একটি বড়ো ভৌগলিক অন্তরায় সৃষ্টি করেছে এবং পূর্বে অবস্থিত অতি পুরাতন ‘আপ্পালাচিয়ান পর্বতমালা’। এ দুটি পর্বতমালার মধ্যে বিস্তৃত রয়েছে প্রধানত মিসিসিপি-মিসৌরি নদী অববাহিকা দ্বারা পুষ্ট, গ্রেট প্লেইনস (Great Plains) নামে বিশাল উর্বর প্রেইরি ও স্টেপ সমভূমি। গ্রান্ড ক্যানিয়ন (Grand Canyon) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত একটি গিরিখাত। এই গিরিখাতের মধ্য দিয়ে কলোরাডো নদী বয়ে চলেছে। পৃথিবীর স্থলভাগের মধ্যে দীর্ঘতম এই গিরিখাতের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৪৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ২৯ কিলোমিটার এবং অনেক জায়গায় তা প্রায় ১.৮ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর!
আনুমানিক ৪০,০০০ থেকে ১৭,০০০ বছর আগে এক প্রাচীন এশীয় জনগোষ্ঠী সর্বশেষ বরফযুগে অর্থাৎ উইসকনসিন হিমবাহ পর্যায় (Wisconsin Glacial Stage)-এ বেরিং স্থলযোটক (Bering Land Bridge) অতিক্রম করে সাইবেরিয়া থেকে উত্তর আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। তাদের উত্তর আমেরিকার প্রথম বাসিন্দা বলে মনে করা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এখানে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে। এদের জনসংখ্যাই বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় প্রভাবশালী। বর্তমান যুগের সাস্কৃতিক ও জাতিগত বিন্যাসে ঔপনিবেশিক ইউরোপিয়ান, আদিবাসী আমেরিকান, আফ্রিকান দাস এবং তাদের বংশধরদের প্রভাব স্পষ্টরূপে বিদ্যমান। মহাদেশটির উত্তরাংশে ইউরোপীয় প্রভাব এবং দক্ষিণাংশে আদিবাসী আমেরিকান ও আফ্রিকানদের শক্তিশালী প্রভাব লক্ষ করা যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে অধিকাংশ উত্তর আমেরিকানরা মূলত ইংরেজি, স্প্যানিস এবং ফরাসী ভাষায় কথা বলেন। তাছাড়া সেখানকার সমাজ এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলোতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব প্রতিফলিত হয়


দক্ষিণ আমেরিকা



আয়তনের দিক থেকে বিচার করলে, দক্ষিণ আমেরিকা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মহাদেশ। মহাদেশটির আয়তন ১৭,৮১৪,০০০ বর্গকিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় ৮%। জনসংখ্যার নিরিখে দেখলে, দক্ষিণ আমেরিকা পৃথিবীতে পঞ্চম স্থান অধিকার করে আছে। ২০১৫ সালের জনসমীক্ষা থেকে জানা যায়, প্রায় ৪১ কোটি ১৫ হাজার মানুষ এই মহাদেশের ১২টি স্বাধীন রাষ্ট্র ও ৩টি অধীনস্থ অঞ্চলে বসবাস করেন। নিরক্ষরেখা ও মকরক্রান্তি রেখার দুই পাশ জুড়ে মহাদেশটির বিস্তৃতি। দক্ষিণ আমেরিকা পশ্চিম গোলার্ধে অবস্থিত। তার বেশিরভাগ অংশ দক্ষিণ গোলার্ধে। উত্তর গোলার্ধে রয়েছে তার অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাংশ। পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, উত্তরে ও পূর্বে আতলান্তিক মহাসাগর এবং উত্তর-পশ্চিমে উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় সাগর মহাদেশটিকে বেষ্টন করে আছে। মহাদেশটি উত্তর-পশ্চিমে পানামা স্থলযোটকের মাধ্যমে মধ্য ও উত্তর আমেরিকার সাথে যুক্ত। দক্ষিণ আমেরিকার সর্বদক্ষিণস্থ প্রান্ত হর্ন অন্তরীপ (Cape Horn)-এর দক্ষিণে রয়েছে ড্রেক প্যাসেজ (Drake Passage), যা মহাদেশটিকে আন্টার্কটিকা মহাদেশ থেকে বিচ্ছন্ন করেছে।
দক্ষিণ আমেরিকায় তিনটি প্রধান ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল রয়েছে। পূর্বে অবস্থিত ব্রাজিলীয় উচ্চভূমি এবং উত্তরের গায়ানা উচ্চভূমি মহাদেশটির স্থিতিশীল ভৌগলিক অন্তঃস্থল গঠন করেছে। পশ্চিমে অবস্থিত আন্দিজ পর্বতমালা বিশ্বের দীর্ঘতম পর্বতমালার স্থান দখল করে আছে। উত্তরে ভেনেজুয়েলা থেকে দক্ষিণে ঝঞ্ঝা-তাড়িত টিয়েরা দেল ফুয়েগো দ্বীপ পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে প্রায় ৭,২৫০ কিলোমিটার প্রসারিত রয়েছে এই পর্বতমালা। নদী-জল ক্ষরণের ভিত্তিতে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নদী আমাজনের অববাহিকা সহ এক বিশাল নদীতন্ত্র বিস্তৃত রয়েছে উত্তর ও পূর্বের উচ্চভূমি এবং পশ্চিমের আন্দিজ পর্বতমালার মাঝে। আমাজন বিধৌত অঞ্চলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো বৃষ্টিবনের সন্ধান মেলে, যা আমাজন বৃষ্টিবন (Amazon Rainforest) নামে খ্যাত। পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলির আশ্রয়স্থল এই আমাজন বৃষ্টিবন। মহাদেশটি লামা (Llama) এবং আলপাকা (Alpaca) নামক আশ্চর্য প্রাণীদের বাসস্থান, যারা মূলত বন্যপ্রাণী হলেও প্রায় ৫০০০ বছর আগে গৃহপালিত জন্তুতে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬,৯৫৯ মিটার উচ্চতায় চিলি সীমান্তের কাছাকাছি আর্জেন্টিনার একঙ্কাগুয়া পর্বত (Mount Aconcagua) শুধুমাত্র এই মহাদেশেরই সর্বোচ্চ স্থান নয়, পশ্চিম গোলার্ধের সর্বোচ্চ স্থানও বটে।
আনুমানিক ৪০,০০০ থেকে ১৭,০০০ বছর আগে যে প্রাচীন এশীয় জনগোষ্ঠী সর্বশেষ বরফযুগে অর্থাৎ উইসকনসিন হিমবাহ পর্যায়ে বেরিং স্থলযোটক অতিক্রম করে সাইবেরিয়া থেকে উত্তর আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়েছিলেন, মনে করা হয় তাদেরই একাংশ দক্ষিণ আমেরিকায় এসে প্রথম বসতি স্থাপন করেন। অতি প্রাচীন কারাল সভ্যতা, তিওয়ানাকু সভ্যতা, উয়ারি সভ্যতা, চিমু সভ্যতা এবং ইনকা সভ্যতার পীঠস্থান এই দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ। বর্তমানে অবশ্য মহাদেশটির জনসংখ্যায় আদিবাসীদের চেয়ে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদের বেশি আধিপত্য লক্ষ করা যায়। এখন আদিবাসী আমেরিকান, ইউরোপীয় এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষেরা মিলেমিশে রয়েছেন এ মহাদেশের আনাচে কানাচে। স্প্যানীয় ও পর্তুগীজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পরেও দক্ষিণ আমেরিকার জনগণের ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতিতে ইউরোপীয় প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ব্রাজিলীয়রা পর্তুগীজ ভাষায় কথা বললেও মহাদেশের অন্যান্য অধিবাসীরা প্রধানত স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে থাকেন।



অ্যান্টার্কটিকা



বিশ্বের দক্ষিণতম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বিরাট দীর্ঘস্থায়ী হিমবাহ এবং হিমশীতল আবহাওয়ায় মোড়া এই মহাদেশে ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরু অবস্থিত। দক্ষিণ গোলার্ধের কুমেরু অঞ্চলে কুমেরু বৃত্তের দক্ষিণে দক্ষিণ মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় এই মহাদেশ অবস্থান করছে। আয়তনের বিচারে, ১,৪০,০০,০০০ বর্গকিলোমিটার ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট এই মহাদেশ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম মহাদেশ। আমেরিকা ভিত্তিক National Centres for Environmantal Information-এর মতে, বিশ্বের শীতলতম ও শুষ্কতম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা এবং এর গড় উচ্চতা ও বায়ুপ্রবাহবেগও মহাদেশগুলির মধ্যে সর্বাধিক। British Antarctic Survey: Natural Environment Research Council-এর মতে, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উত্তরে প্রসারিত এলাকা বাদে, এই মহাদেশের প্রায় ৯৮% অঞ্চল গড়ে ১.৯ কিলোমিটার পুরু বরফের চাদরে আবৃত। সে কারণেই মহাদেশটি এমন আশ্চর্য উচ্চতা লাভ করেছে। এই মহাদেশের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন −৮৯ ডিগ্রী সেন্টিগ্রড পর্যন্ত পৌঁছেছে। এমনকি গ্রীষ্মকালেও তাপমাত্রা কদাচিৎ হিমাঙ্ক অতিক্রম করে। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ২০০ মিলিমিটার হওয়ায় এই মহাদেশকে ‘শীতল মরুভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়।
'শীতল মরুভূমি' অ্যান্টার্কটিকা
আয়তন ও শুষ্কতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মরু অঞ্চল। স্বভাবতই এ মহাদেশের কোনও স্থায়ী বাসিন্দা নেই। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে প্রতিকূল আবহাওয়াবিশিষ্ট এবং বসবাসের পক্ষে অবাঞ্ছিত ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে একটি। তবুও সারাবছর প্রায় ১,০০০ থেকে ৫,০০০ মানুষ এই মহাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রে সাময়িকভাবে থেকে কাজ করে চলেছেন। সেখানকার হিমায়িত ভূমিতে খুব কম প্রাণী ও গাছপালা বেঁচে থাকে। প্রবল শৈত্যের সাথে লড়াই করতে সক্ষম উদ্ভিদ ও প্রাণীই সেখানে টিকে থাকতে পারে। অ্যান্টার্কটিকার স্থানীয় জৈব ভান্ডারে রয়েছে বিভিন্ন প্রকার শৈবাল, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, ক্ষুদ্রাকৃতি উদ্ভিদ, মাইট জাতীয় পোকা, নেমাটোড জাতীয় কৃমি, জল বসবাসকারী আটপেয়ে অতি ক্ষুদ্রাকার প্রাণী টার্ডিগ্রেড, পেঙ্গুইন, সিল, অন্যান্য আণুবীক্ষণিক জীব এবং তুন্দ্রা উদ্ভিদসমূহ। মজার ব্যাপার হল, এটিই একমাত্র মহাদেশ যার ভূখন্ডে কোনও সরীসৃপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।


ইউরোপ



বৃহত্তর ইউরেশিয়া মহাদেশীয় ভূখণ্ডের পশ্চিমাংশ নিয়ে ইউরোপ মহাদেশটি গঠিত। আয়তনের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম মহাদেশ ইউরোপ। মহাদেশটির আয়তন প্রায় ১০,১৮০,০০০ বর্গকিলোমিটার, যা ভূপৃষ্ঠের ২% এবং স্থলভাগের ৬.৮% জুড়ে রয়েছে। United Nations - Department of Economic and Social Affairs - Population Division কৃত সমীক্ষা ‘2017 Revision of World Population Prospects’ অনুযায়ী ইউরোপের জনসংখ্যা প্রায় ৭৪০ মিলিয়ন অতিক্রম করেছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১%। জনসংখ্যার হিসাবে ইউরোপ বর্তমান বিশ্বে তৃতীয় স্থানাধিকারী। ইউরোপের ৫০টি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে রাশিয়া এখন অবধি আয়তন এবং জনসংখ্যা উভয়দিক থেকেই বৃহত্তম দেশ। রাশিয়ার ভূভাগ ইউরোপ এবং এশিয়া উভয় মহাদেশেই আছে। ইউরাল পর্বতমালা পর্যন্ত রাশিয়ার ৪০% ইউরোপ মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ভ্যাটিকান সিটি আয়তনে ইউরোপের ক্ষুদ্রতম দেশ। উত্তর দিকে উত্তর মহাসাগর, পশ্চিমে অতলান্তিক মহাসাগর, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর ইউরোপকে ঘিরে রয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়া যেহেতু একই ইউরেশিয়া ভূখন্ডের অঙ্গ, তাই ইউরোপের সাথে এশিয়ার কোনও স্পষ্ট ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নেই। এশিয়ার সাথে ইউরোপের পূর্ব সীমান্ত তাই ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে সাধারণভাবে স্বীকৃত পূর্ব সীমানা অনুযায়ী, ইউরাল এবং ককেসাস পর্বতমালা, ইউরাল নদী, কৃষ্ণ সাগর, কাস্পিয়ান সাগর এবং তুর্কী প্রণালীর জলপথের পশ্চিমে ইউরোপের অবস্থান।
ইউরোপ প্রধানত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা (Westerlies) বিরাজ করে। তবে উপসাগরীয় প্রবাহ (Gulf Stream)-এর কারণে পৃথিবীর চারপাশে একই অক্ষাংশে অবস্থিত অন্যান্য এলাকার তুলনায় এ মহাদেশের জলবায়ু বেশ উষ্ণ। ইউরোপের ভূতত্ত্ব অতিশয় বৈচিত্রময়। স্কটিয় উচ্চভূমি থেকে হাঙ্গেরির ঢালাই সমভূমি পর্যন্ত এই মহাদেশজুড়ে বিভিন্ন ভূদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল উচ্চভূমি ও পার্বত্য দক্ষিণ ইউরোপ এবং পূর্বে ইউরাল পর্বতমালা থেকে পশ্চিমে আয়ারল্যান্ডের মধ্যে একটি সুবিশাল, আংশিকভাবে জলমগ্ন, উত্তর ইউরোপীয় সমতলভূমি (Northern European Plain)-এর মধ্যে প্রাকৃতিক বৈপরীত্য। এই দুটি অঞ্চল পিরেনিজ, আল্পস এবং কার্পেথীয় পর্বতমালা দ্বারা বিভক্ত। স্ক্যানডিনেভীয় পর্বতমালা এবং ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের পর্বতময় অংশ দ্বারা উত্তর ইউরোপীয় সমতলভূমি পশ্চিম সীমানা চিহ্নিত করা হয়। উত্তর ইউরোপীয় সমতলভূমিকে আংশিকভাবে জলমগ্ন করে রেখেছে এমন অগভীর জলখন্ডগুলি হল - কেল্টীয় সাগর, উত্তর সাগর, বাল্টিক সাগর এবং বারেন্টস সাগর।
আল্পস
ইউরোপ মহাদেশে মানুষ বসবাস করছে সম্ভবত ১ লক্ষেরও বেশি বছর থেকে। ইউরোপ, বিশেষ করে প্রাচীন গ্রিস পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জন্মস্থান। পঞ্চদশ শতকের গোড়া থেকে, বিশেষত উপনিবেশবাদ শুরু হবার পর থেকে আন্তর্জাতিক বিষয়গুলিতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে ইউরোপ। ষোড়শ থেকে বিংশ শতকের মধ্যে শক্তিশালী ইউরোপীয় দেশগুলি বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা, আফ্রিকা, ওশেনিয়া এবং এশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে গ্রেট ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের ফলে পশ্চিম ইউরোপ এবং পরবর্তীতে বৃহত্তর বিশ্বে আমূল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ঐতিহাসিক কারণে ইউরোপের রাজনৈতিক সীমা অবশ্য বেশ কয়েকবার বদলে গেছে। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর দুটি বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধ, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য ও নাজি জার্মানির পতন এবং পূর্ব ইউরোপে কমিউনিজমের পতনের পর।



অস্ট্রেলিয়া



আয়তনের নিরিখে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম মহাদেশ অস্ট্রেলিয়া মোট ৮৫,৬০,০০০ বর্গ কিলোমিটার ভূভাগ দখল করে আছে। তবে এই মহাদেশের অন্তর্গত সমনামী প্রধান দেশটি কিন্তু বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম দেশ। ২০১৬ সালের জনগণনা অনুসারে এই মহাদেশে বাস করেন প্রায় ৩ কোটি ৯৯ লক্ষ মানুষ। অস্ট্রেলিয়া মূল ভূখণ্ড বা দেশ থেকে মহাদেশীয় অংশটিকে আলাদা করে বোঝাতে এই মহাদেশকে ভৌগলিক পরিভাষায় সাহুল (Sahul), অস্ট্রালিনিয়া (Australinea) বা মেগানেশিয়া (Meganesia) নামেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়া দেশ, তাসমানিয়া, নিউ গিনি, সারেম ও সম্ভবত টিমোর ও পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলিকে নিয়ে এই মহাদেশ গঠিত। নিউজিল্যান্ড দেশটি অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের অঙ্গ কি না তা যথেষ্ট তর্কসাপেক্ষ বিষয়। অনেক ভূবিজ্ঞানীর মতে নিউজিল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের অংশ নয়। এটি একটি জলের নীচে তলিয়ে যাওয়া পৃথক মহাদেশ জিয়াল্যান্ডিয়ার অংশ। এখন নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া উভয়কে অস্ট্রালেশিয়া (Australasia) বা ওশেনিয়া (Oceania) নামে এক বৃহত্তর অঞ্চলের অংশ বলে মনে করা হয়। ১৯৮৩ সালে প্রাকাশিত Ernst Löffler, A.J. Rose, Anneliese Löffler এবং Denis Warner লিখিত Australia: Portrait of a Continent বইটি পড়ে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াকে মহাসাগর বেষ্টিত একটি ‘দ্বীপ-মহাদেশ’ বলে উল্লেখ করা হয়। মহাদেশটিকে পশ্চিমদিকে ভারত মহাসাগর এবং পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগর বেষ্টন করে আছে। অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড ও নিউগিনির মধ্যে রয়েছে আরাফুরা সাগর  টরেস প্রণালী এবং অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড ও তাসমানিয়ার মধ্যে রয়েছে বাস প্রণালী—এই জলভাগগুলি দ্বারা বিভাজিত একটি মহাদেশীয় সোপানে (Continental Shelf) এই মহাদেশ অবস্থিত।
দ্য আউটব্যাক
প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর অস্ট্রেলিয়া-নিউগিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাকি বিশ্বের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এই সময়ে মহাদেশটির জলবায়ুতে অনেক পরিবর্তন ঘটে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রবণতা ছিল শুষ্কতার দিকে। সে কারণেই অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রে আজ অবস্থান করছে একটি সুবিশাল, মসৃণ, শুষ্ক সমতলভূমি যা The Outback বলে পরিচিত। সেই ঊষর মরু অঞ্চল পৃথিবীর উষ্ণতম স্থানগুলির মধ্যে একটি। উপকূলীয় অঞ্চলের নিকটে অবশ্য সিক্ত, উর্বর ভূমি, গ্রীষ্মমন্ডলীয় বৃষ্টিবন এবং মনোরম বেলাভূমির সন্ধান মেলে। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত Dent Barrett লিখিত Australian Environments: Place, Pattern and Process বইটি পড়ে জানা যায়, ‘ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান’ ভূ-গাঠনিক পাতের কেন্দ্রস্থলে এই মহাদেশের অবস্থিত। তাই এটিই একমাত্র মহাদেশ যেখানে কোনও সক্রিয় আগ্নেয়গিরি নেই। দীর্ঘকালের ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতার ফলে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশজুড়ে এক অত্যাশ্চর্য জৈব ভান্ডার গড়ে উঠেছে যা পৃথিবীতে অনন্য। মহাদেশটির প্রায় ৫৭০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে ৮০% স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ এবং উভচর সারা বিশ্বে আর কোথাও মেলে না। কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রাণী হল - ক্যাঙ্গারু, প্লাটিপাস, কোয়ালা, ডিংগো, ওয়ালাবি এবং ওয়ামব্যাট। এই মহাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো প্রবাল প্রাচীর এবং প্রাকৃতিক আশ্চর্য, দ্য গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ (The Great Barrier Reaf)-এর ঠিকানা। দ্য গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ হচ্ছে পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রবাল প্রাচীর যা ২,৯০০-এর বেশি একক রিফ এবং ৯০০টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। ‘কোরাল পলিপস’ নামে কোটি কোটি ক্ষুদ্র জীবদেহ দ্বারা এই প্রবাল প্রাচীরের কাঠামো গঠিত হয়েছে। আনুমানিক ৩,৪৪,৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ২,৩০০ কিলোমিটার প্রসারিত এই প্রবাল প্রাচীর অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের উপকূল ঘেঁষা কোরাল সাগরে অবস্থিত। মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর যে কয়েকটি বস্তু দৃশ্যমান তার মধ্যে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অন্যতম।
দ্য গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ
২০০৮ সালে প্রকাশিত Jim Allen এবং James O’Connell লিখিত "Getting from Sunda to Sahul"- In Islands of Inquiry: Colonisation, seafaring and the archaeology of maritime landscapes গ্রন্থটি পড়ে জানা যায়, প্রায় ৪৫,০০০ বছর আগে সুন্দা থেকে আগত মানুষ দ্বারা পূর্ব ওয়ালাশিয়া, টিমোর (যা সেই সময় সাহুল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল), সাহুলের অবশিষ্টাংশ ও বিসমার্ক দ্বীপপুঞ্জে প্রথম জনবসতি গড়ে ওঠে। সেই সময় কয়েকশো লোক অপেক্ষাকৃত উন্নত জলযানের মাধ্যমে এই মহাদেশে এসে জনবসতি গড়ে তুলেছিলেন। সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয়রা এই মহাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। বর্তমানে এই মহাদেশের বাসিন্দাদের মধ্যে ইউরোপীয়, বিশেষত ব্রিটিশ বংশোদ্ভূতদের আধিপত্য লক্ষ করবার মতো। বিগত ৫০ বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ৫ মিলিয়নেরও অধিক মানুষ এখানে পাকাপাকিভাবে বসতি স্থাপন করেছেন।


বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশ অনন্য। প্রতিটির নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, জলবায়ু, ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস এবং মহোত্তম পরিচয় আছে। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব অভিনব আকৃতি রয়েছে। কয়েকটি মহাদেশ নিজেদের মধ্যে স্থল দ্বারা সংযুক্ত, কয়েকটি আবার মহাসাগরীয় জলভাগ দ্বারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। মহাদেশগুলোর এহেন ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও সেই আদিকাল থেকে প্রতিটি মহাদেশেই মানব সভ্যতার একই আশ্চর্য ধারাবাহিক অগ্রগতির ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। আর তখনই যেন ভৌগোলিক-রাজনৈতিক বাধা ভুলে আমাদের মনের অন্তস্থলে বেজে ওঠে বিশ্ব মানবতার মিলনের সুর।
বন্ধুরা, তোমরা এখন ভালো করে জানো, বিশ্বের সাতটি বৈচিত্র্যে ভরা মহাদেশ কোথায় অবস্থিত। এখন শুধু সঠিক পথ চিনে সেই সাতটি মহাদেশ পাড়ি দেবার অপেক্ষা। আশা করি তোমাদের সেই স্বপ্নের মহাদেশ অভিযান ভীষণ কৌতূহল-উদ্দীপক ও উত্তেজনাপূর্ণ হবে।
_____


ছবিঃ আন্তর্জাল





No comments:

Post a Comment