গল্পঃ অন্নদা - চুমকি চট্টোপাধ্যায়


“এই লাও খোকাবাবু, তোমার খাতা। দেখ আবার ঠিক এনেসি কিলা।”
“ওফ্ অন্নদা, তুমি না কী যে সব বল, মাথা খারাপ হয়ে যায় আমার। লাও আবার কী কথা? কিলাটাই বা কী? বল, ‘নাও’, ‘কি না’, কই বল!”
ওদিকে ঝিন্টি আর মিঠি হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে অন্নদা আর রিন্টুর কথা শুনে।
“হে হে, আজ্ঞে, পারবনি গো। জিহ্বার দোষ আসে, তাই ওমনি ধারা বেরয়। কী করি বল দিকিনি!”
“এই তো দিব্বি ‘ন’ বলছ। পারবনি, দিকিনি... কই, পারবলি তো বলছ না?”
“ও সে অতশত জালিনে বাপু। আমি যাই, বিস্তর কাজ পড়ি আসে।”
রিন্টুদের বাড়ি সারাক্ষণই জমজমাট। প্রায় চোদ্দোজন মেম্বার। এর মধ্যে বয়স্ক বলতে দাদুন-ঠাম্মা। আর অল্প বয়স বলতে রিন্টু, ঝিন্টি আর মিঠি। কুচেও আছে একজন, তাকে সবাই লাদেন বলে ডাকে। খুউব দুষ্টু সেই কুচে। ভালো নাম একটা আছে বটে, স্বর্ণাভ। কিন্তু মনে হয় লাদেনটাই ওর বেশি পছন্দ। একবার ডাকলেই সাড়া দেয়।
এই চোদ্দোজনের মধ্যেই আছে পারুলমাসি, ননীদি আর অন্নদা। এরা ছাড়া ওদের ফামিলি প্রায় অচল। মা-কাকিরা তাই বলে অন্তত।
অন্নদা এ বাড়িতে আছে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর। পুরো নাম অন্নদাচরণ পাড়ুই। অনেক কম বয়েসে এখানে এসে উঠেছিল ঘনশ্যাম নামে তখন যে ঠাকুর ছিল এ-বাড়িতে, তার হাত ধরে। উচ্চারণের সমস্যা থাকায় লেখাপড়া হচ্ছিল না। তাই দেশ থেকে কাজ করতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। অন্নদা হচ্ছে এ-বাড়ির ‘জীবন্ত মজা’।
সেই থেকে এ-বাড়ির অংশ হয়ে গেছে অন্নদাচরণ। মজার ব্যাপার হল, ওকে বাচ্চা-বুড়ো সবাই অন্নদা বলে ডাকে।  যেহেতু নামের পেছনে ‘দা’ আছে, তাই ছোটোরাও ডাকে। এই নিয়ে অনেক বকাঝকা করেছে বড়োরা। কিন্তু ওদের বক্তব্য হল, অন্নদাদা বা অন্নদাকাকা কি শুনতে ভালো লাগে? আজকালকার বাচ্চাগুলো মহাবিচ্ছু।
অন্নদার অবশ্য এ নিয়ে কোনওই মাথাব্যথা নেই। হেসে বলে, “আরে, ডাকতি দেন না মা জননীরা। ওরা ছেলেমানুষ, ওরা ভগমান। ওদের কোনও পাপ হয় না।”
অন্তুর কিন্তু অন্নদাকে বেশ ভালো লাগে। অন্তুর মামাবাড়ি এটা। মানে রিন্টু, ঝিন্টিদের পিসতুতো ভাই অন্তু। ও যখনই আসে এ-বাড়িতে, অন্নদার সঙ্গে গল্প করে। রিন্টুর একটু রাগ হয় বটে, তবে অন্তু তো মাঝে মাঝে আসে, তাই ওর সঙ্গে আর ঝগড়া করতে ইচ্ছে করে না।
অন্তু বরাবর ফার্স্ট হয় ক্লাসে। এবার অ্যানুয়াল পরীক্ষায় সেকেন্ড হয়েছে। ব্যস, আর যায় কোথায়! যেন ভূমিকম্প হয়ে পৃথিবী রসাতলে গেছে, সুনামি ডুবিয়ে দিয়েছে ভুবন।
এ-বাড়িতে এসে এই দুঃখের কথা পিসিমণি বলতেই সবাই সান্ত্বনা দিল। বলল, “সামনের বছর আবার ফার্স্ট হবে, চিন্তা নেই।”
অন্নদা ছিল সেখানে। খুব সাদামাটা মুখে জিগ্যেস করল, “আসসা অন্তুভাই, এট্টা কতা বলো দিকি, যে ফাস হইয়েসে তোমাদের কেলাসে, সে কোন কেলাসে উটল?”
“ক্লাস এইট।” গম্ভীর মুখে জবাব দেয় অন্তু।
“আর তুমি কোন কেলাসে উঠলা?”
“এইট। কেন?”
“আর যে লাস হইয়েসে সে কোন কেলাসে উটল?”
“এইট। এসব কেন জিগ্যেস করছ, অন্নদা?” বেশ অবাক অন্তু।
“এইদ্দেখ দিকিনি। ফাসও এইট, লাসও এইট। তাইলে কী তফাত হল গো? যে ফাস হল সে যদি এক কেলাস টপকে পরের কেলাসে যেত, তাহলি এট্টা কতা ছেল। এর জন্নি সেলেমেইয়ে গুলানরে বাপমায়েরা কী বকাই লা বকে!”
হা হা হা হা হা... হাসির ঝড় ওঠে ঘরে। পিসিমণি একটু গম্ভীর হয়ে গেলেও চারপাশে সকলে এত মজা করছে অন্নদার বক্তব্য নিয়ে যে বিশেষ কিছু বলার সুযোগ পেল না।
অন্তুর এই জন্যেই অন্নদাকে এত ভালো লাগে। সহজসরল মানুষ। কথাগুলো কিন্তু একটুও বাজে বলে না, উচ্চারণ যেমনই হোক না কেন। সবাই যে এত খ্যাপায়, তাতেও রাগ করে না। আজকাল সবাই তো বেশিরভাগ সময় রেগেই থাকে। ইস্, অন্নদা আমাদের বাড়িতে থাকলে বেশ হত!


সবার অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ। ঠিক হল, বাড়িসুদ্ধু সবাই সারাদিনের জন্যে বাইরে কোথাও ঘুরে আসা হবে। যাকে বলে আউটিং! অন্তুরাও চলে এল। পারুলমাসি আর ননীদিকেও যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ওরা রাজি হয়নি। শুধু অন্নদা যাচ্ছে।
দুটো গাড়িতে ভাগ করে ওরা যাচ্ছে। একটা গাড়িতে সব ছোটোরা, ছোটোকাকা, ছোটোমা আর অন্নদা। গাড়ি সিগনালে দাঁড়িয়ে। ওদের গাড়ির সামনেই একটা খুব দামী গাড়ি। রিণ্টুর গাড়ি ব্যাপারটা খুব পছন্দের। কোন গাড়ির কী দাম, কত সিসির ইঞ্জিন, মাইলেজ কত মোটামুটি সব খবরই ও রাখে।
“জানিস অন্তু, এই গাড়িটার দাম প্রায় ষোল লাখ টাকা। দারুণ গাড়ি!”
“তাই? বাব্বা!” অন্তু জবাব দেয়।
পেছন থেকে অন্নদা বলে, “তা রিল্টুবাবু, ওই গাড়িখান কি উড়তি পারে? এই যে আমরা দাঁইড়ে আসি লাল বাতিতে, ওই গাড়ি উড়ি চলি যাচ্ছে না কেন?”
“ধুস, কী যে বল না, অন্নদা! উড়তে পারে নাকি গাড়ি? ভবিষ্যতে উড়বে হয়তো। কিন্তু এখনও আসেনি ওসব আমাদের দেশে।”
“আসসা, ধরো গে যদি ওই গাড়িটায় অল্য গাড়ি গুঁতোয়, তাহলি লিচ্চয় ওই গাড়ির কিছু হবেনি? দুমড়োবেনি, মুচড়োবেনি?”
“উফফ্, অন্নদা তুমি যে কী বল না, মাথামুন্ডু নেই। তা কেন হবে? অ্যাক্সিডেন্ট হলে দোমড়াবে নিশ্চয়ই। কিন্তু সস্তার গাড়ির থেকে কম ক্ষতি হবে।”
“তাহলি আর কী হল ষোল লাখ ট্যাকার গাড়ির? তার চে আমাদের গাড়িই ভালো। ওই ট্যাকা দে গরিব মানষের কত্ত সেবা করা যায়। মানুষ কত ট্যাকা লষ্ট করে।”
“ঠিক বলেছ, অন্নদা।” অন্তু, ছোটোকাকা, ছোটোমা, ঝিন্টি, মিঠি সবাই সায় দেয় অন্নদার কথায়। এমনকি রিন্টুও মাথা নেড়ে বোঝায় যে অন্নদা ঠিকই বলেছে। অন্তু ভাবে, অন্নদার মতো বোধ কত লেখাপড়া জানা মানুষেরও নেই। তাই এত ভালো লাগে ওকে।
অন্নদা যেন একটু লজ্জা পেয়ে যায়। এত সমর্থন ওর মতো মানুষ তো সব সময় পায় না। আনন্দে চোখের কোলদুটো চিকচিক করে ওঠে।
“অন্নদা, যুগ যুগ জিও!” সব ছোটোরা এক সঙ্গে বলে ওঠে। গাড়ি ছুটতে শুরু করে কোলাঘাট ধাবার দিকে।
_____

অলঙ্করণঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

No comments:

Post a Comment