গল্পঃ ইচ্ছে - নির্মাল্য সেনগুপ্ত




ইচ্ছে


নির্মাল্য সেনগুপ্ত



।।এক।।

একটা বিশাল ঘন জঙ্গল। যতদূর অবধি চোখ যায়, শুধু আকাশচুম্বী গাছপালা দেখা যাচ্ছে। মাঝখানে একটা সরু পথ, দু’দিকে কিছুটা জায়গা পর্যন্ত বড়ো বড়ো ঝোপঝাড়, সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছয় না বললেই চলে।
একজন ছ’ফুটের কাছাকাছি উচ্চতার লোক সেই রাস্তা দিয়ে পাগলের মতো এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হাঁটছিল। লোকটার খালি গায়ে নানান জায়গায় কয়েক টুকরো কাপড় লেগে রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, সেটা একটা ছেঁড়া জামার অংশ। পায়ের ট্রাউজারটাও ছেঁড়া, সেটা হাঁটুর কিছুটা নিচ অবধি নেমে শেষ হয়ে গেছে। লোকটার সারা গালভর্তি দাড়িগোঁফ, মাথার চুল উসকোখুশকো। সে বাঁ-হাত দিয়ে কাঁধের কাছের কাপড়গুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ফেলতে এগোচ্ছিল।
কিছুটা এগিয়ে সে থামল। বোঝা যাচ্ছিল, সে হাঁপিয়ে গেছে অনেকটা রাস্তা দৌড়ে আসার ফলে। তার চোখে ভয়, কারণ জঙ্গলের গভীরতা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যেকোনও মুহূর্তে কোনও হিংস্র বন্যপ্রাণী বেরিয়ে আসতে পারে। ঠোঁট দেখে বোঝা যাচ্ছে অল্প জলতেষ্টাও পেয়েছে এবার।
এমন সময় সে চমকে দেখল, সামনের ঝোপটার পেছনে দুটো চোখ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার সেদিকে নজর পড়তেই চোখের মালিক নিমেষে দৌড় মেরে রাস্তার অন্যপ্রান্তের ঝোপে অদৃশ্য হয়ে গেল। লোকটা বুঝল, কোনও জন্তু নয়, মানুষ। বা বলা যায় বাচ্চা। সে সেইদিকে দৌড় মারল।
বেশিক্ষণ লাগল না। সেই বাচ্চাটাকে না খুঁজে পেলেও লোকটা বুঝল তার চারপাশে অসংখ্য প্রায় সমবয়সী বাচ্চা। বিভিন্ন ঝোপের আড়ালে তারা লুকিয়ে আছে। তাদের শুকনো পাতায় দৌড়ে যাওয়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, নয়তো খিলখিল করে হাসি। একটু পরেই সে খপ করে ধরে ফেলল একটা বাচ্চার হাত। বাচ্চাটা তার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকাল। লোকটা কোনওক্রমে জিজ্ঞেস করল, “এই জায়গাটার নাম কী?”
তাকে অবাক করে বাচ্চাটা স্পষ্ট বাংলায় বলে উঠল, “বলব না।”
তারপর সে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে গেল সামনের একটা কাঁটাঝোপের মধ্যে।

।।দুই।।

দীপু ঘুম থেকে উঠে দেখল, বেসিনের র‍্যাকের টুথপেস্টের টিউবটা ফাঁকা। বহুদিন ধরে সে মাকে বলে যাচ্ছে টুথব্রাশটাকেও বদলে দিতে; কিন্তু সেটাও বদলাচ্ছে না। জুতোর বুরুশ এর থেকে ভালো হয় বেশি। আজ টুথপেস্টটাও শেষ। সে চোখ ডলতে ডলতে, “মা...” বলে চেঁচিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল।
“কী, নবাবপুত্তুরের ঘুম ভাঙল?” দীপুর মা পাউরুটি আর ডিম-পোচের থালা নিয়ে টেবিলের দিকে এগোতে এগোতে বললেন, “জলদি খেয়ে পড়তে বস। একমাসও বাকি নেই কিন্তু টেস্টের।”
দীপু উচ্চমাধ্যমিক দেবে এবার। সে বিজ্ঞানের ছাত্র। স্কুলে ভালো পড়াশুনার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই তার অবস্থান। বিশেষ করে ফিজিক্স এবং অঙ্কে তার দক্ষতা প্রশংসনীয়। তার বাবা রজতেন্দ্র ঘোষ একজন সায়েন্স ফিকশন রাইটার। ফলে ছোটো থেকেই দীপুর প্রচুর উৎসাহ বিজ্ঞানে। উচ্চমাধ্যমিকের জন্য পড়াশুনা তার মোটামুটি শেষ। সে নিয়ে তার চিন্তা নেই। আপাতত তার সব চিন্তা সে দাঁত কীভাবে মাজবে।
“খেতে তো দিয়ে দিলে। এদিকে দাঁতটা মাজব কী দিয়ে? একফোঁটা পেস্ট নেই।”
“বাহ্‌, তাহলে আর কী। দাঁত মাজারও দরকার নেই।”
“উফফ্‌ মা, কবে থেকে বলছি আমার জন্য একটা ব্রাশ আনো, আজ পেস্টও শেষ।”
“ঠিক আছে, ফুলপ্যান্টটা পর, সামনের দোকান দিয়ে নিয়ে এস। অনেক বড়ো হয়েছ, এবার নিজের কাজ নিজে করতে শেখ তো, যাও।”
হালকা রাগে গজগজ করতে করতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট পকেটে গুঁজে দীপু বেরিয়ে পড়ল। ঘুম থেকে উঠে না খেয়ে এসব কার ভালো লাগে?

রোববার, পাড়ার মোড়ের দোকানটা বন্ধ। মানে এখন বাজারের দিকে যেতে হবে। আধঘণ্টার ধাক্কা। নাহ্‌, আজকের দিনটা ভালো শুরু হয়নি।
মিনিট কুড়ি বাদে একটা নতুন চেরি রেড রঙের টুথব্রাশ আর একটা পেস্ট কিনে যখন সে দোকান থেকে বাড়ির দিকে রওনা দিল, দেখল সামনের ল্যাম্পপোস্টের সামনে একটা সাদা চেক শার্টের উপর কালো বোতাম ছেঁড়া কোট আর টেরিকটের প্যান্ট পরা একটা লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার চোখে একটা অদ্ভুতদর্শন চশমা, কাঁচটা ঘষা। চোখদুটো প্রায় দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তার দৃষ্টি দীপুর দিকেই। দীপু পাত্তা না দিয়ে এগোল বাড়ির দিকে। এতক্ষণে ডিম-পোচটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। পাউরুটিগুলোও শুকনো খটখটে। নাহ্‌, আজ সত্যিই দিনটা খারাপ।
কিছুদূর এগোনোর পর দীপুর সামান্য অস্বস্তি হল। সে রাস্তার ডানদিকে তাকাতেই দেখতে পেল সেই সাদা চেক শার্টের ভদ্রলোক তার পাশে পাশে হেঁটে আসছেন। দীপু এমনিতে সাহসী ছেলে। ফুটবল মাঠে তার নাম আছে। পাড়াতে কেউ খুব একটা তার পেছনে লাগে না গায়ের জোরের জন্য। সে এগিয়ে গেল ভদ্রলোকের দিকে।
“কিছু বলবেন?”
লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর পকেট থেকে নস্যির কৌটোর সাইজের একটা দু’দিক স্বচ্ছ জিনিস বের করল। তারপর সেটা তাক করল দীপুর ডানচোখের দিকে। ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে দীপু আপত্তি জানানোর সময়ই পেল না। সে তার চোখে একটা ব্যথা অনুভূতি করতেই হাত দিয়ে চোখটা চেপে ধরল।
“হয়েছে, মিলে গেছে রেটিনা। তোমাকেই দরকার ছিল।”
দীপু এক চোখ চেপে ধরে বিরক্তিভরে মাথা তুলে বলল, “এটা কী করলেন?”
ভদ্রলোক হাসিমুখে বলল, “এটা একটা রেটিনা স্ক্যানার। আমার বানানো। একটা বিশেষ সংখ্যক রড কোষওয়ালা রেটিনা খুঁজছিলাম। তোমার বয়স এবং চুলের পরিমাণ দেখে বুঝলাম তোমার থাকতে পারে। বলতে পার কাকতালীয়, সায়েন্স এভাবে বহুবার কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে। আমার তোমাকেই দরকার। আমি হলাম বৈজ্ঞানিক শান্তনু সাঁপুই।  দুটো ঘণ্টা দিতে পারবে আমায়?”
দীপু বুঝল, সে যা ভেবেছিল তাই ঠিক। ভদ্রলোক পাগল। চোখের ব্যথাটা না কমলে এরপর সে কড়া উত্তর দিত। কিন্তু ব্যথাটা মিলিয়ে গেছে। সে মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে না, আমার পরীক্ষা সামনে। সময় নেই, চলি।”
এই বলে সে হনহন করে হেঁটে এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে।

।।তিন।।

বিকেল প্রায় শেষের দিকে। যদিও জঙ্গলে সময় বোঝা অসম্ভব, তবুও একদম আকাশের দিকে তাকালে দুপুর-বিকেল-সন্ধে এগুলোর আঁচ পাওয়া যায়। লোকটা কাহিল হয়ে এবার বসে পড়ল। আর দম নেই; আর সে হাঁটতে পারছে না।
কিছু কৌতূহলী চোখ অনেকক্ষণ ধরেই তার পিছু করছিল। এখন তারা বুঝল যে এ তাদের ক্ষয়ক্ষতি করতে পারবে না। এবার তারা বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে লোকটার সামনে এসে জড়ো হল। সে মাথা তুলে দেখল প্রায় জনা পনেরো বাচ্চা। সকলের খালি গা, নিচে চওড়া বিভিন্ন রঙভর্তি পাতা, শেকড় দিয়ে বুনে পরা। আদিবাসী বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এরা বাংলা জানল কী করে
সে একটা বাচ্চার দিকে তাকিয়ে একটু চেঁচিয়ে বলল, “তোমার নাম কী?”
উত্তর এল, “সপ্তক।”
“আর তোমার?”
“ঋষি।”
“সুনীল।”
“অর্ণব।”
আর অবাক হয়ে লাভ নেই। লোকটা সামান্য হেসে বলল, “গল্প শুনবে?”
সবার মাথা নড়ে উঠল একে অপরের দিকে চেয়ে। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা শোনা গেল। এবার তারা আস্তে আস্তে এগিয়ে এল তার দিকে। প্রথমে সামান্য ভয়ে ভয়ে, তারপর সবাই মিলে গোল করে বসল তার সামনে।
“ভয় নেই, আমি কামড়াই না।”
“তুমি এখানে কী করছ? কোথা থেকে এলে?” সপ্তকের প্রশ্ন।
“বলছি। আগে বল, এই জায়গাটা কোথায়?”
“এটা? এটা তো আমাদের খেলার জায়গা।” অর্ণবের উত্তর।
“তোমাদের বাবা-মা কোথায়?”
“বাড়িতে।” ঋষি বলল।
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এদের থেকে কোনও তথ্য এখনই পাওয়া যাবে না। বন্ধুত্ব করতে হবে আগে। সে বলে উঠল, “কলকাতা শহরের নাম শুনেছ?”
পনেরোটা ঘাড় নড়ে উঠল দু’দিকে।
“তবে শোনো...”

।।চার।।

দীপু স্কুলে যাচ্ছিল। অন্যান্য দিন সে রিকশা করে স্কুলে যায়। কিন্তু সে একটা ঘড়ি কিনবে বলে ঠিক করেছে। তাই টাকা জমাচ্ছে। হেঁটে গেলে দশ টাকা বাঁচে। যদিও এমনভাবে জমাতে থাকলে বহুদিন লেগে যাবে, তবুও চেষ্টা করতে দোষ কী?
দীপু গত তিনদিন ধরেই তার স্কুল যাওয়ার পথের বিভিন্ন জায়গায় শান্তনু সাঁপুইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। না, সে তাকে কোনওরকম বিরক্ত করেনি আর। কিন্তু করুণ মুখে তাকিয়ে থেকেছে তার দিকে। যাওয়ার এবং আসার সময়ও। আজও সাইকেল গ্যারাজের পাশে সে দেখল, শান্তনুবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। মায়া হল তার। নিশ্চয়ই ভদ্রলোকের কেউ নেই। মাথায় গণ্ডগোল হয়েছে। দেখার নেই কেউ। সে আজ এগিয়ে গেল তার দিকে।
“কী ব্যাপার বলুন তো? এভাবে রোজ ফলো করছেন কেন আমায়?”
“তুমি কী সায়েন্সের স্টুডেন্ট?” শান্তনুবাবু উৎসুক দৃষ্টিতে তাকে প্রশ্ন করলেন।
“হ্যাঁ, তাতে কী?”
“ফিজিক্স ভালো লাগে?”
এ কী! লোকটা তার দুর্বলতা জেনে ফেলল কী করে? রেটিনা থেকে?
“হ্যাঁ, তাতে কী?”
শান্তনুবাবু দীপুর দু’কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তাহলে একটিবার চল আমার ল্যাবরেটরিতে। কথা দিচ্ছি, তুমি নিরাশ হবে না। অ্যাস্ট্রোফিজিক্স কেমন লাগে তোমার? স্পেস সায়েন্স?”
দীপুর চোখ চকচক করে উঠল। ভদ্রলোক কী সত্যি এই বিষয়ে কিছু জানেন? কোনও ল্যাবরেটরি কি সত্যি আছে? নাকি গুল ঝাড়ছেন? তার কি বিশ্বাস করা উচিত?
“দু’ঘণ্টা, ঠিক দু’ঘণ্টা নেব আমি তোমার থেকে। তার বদলে পুরস্কৃত করব। বেশি টাকাপয়সা নেই আমার। এককালে প্রচুর ছিল। রিসার্চে সব বেরিয়ে গেছে। তবুও দেব। বল, তুমি কী চাও?”
দীপু ফস করে বলে উঠল, “ঘড়ি। দেড়শো টাকা দাম।”
“দেব, চল তাহলে। এস, ট্যাক্সি ধরি।”

আধঘণ্টার মধ্যে বাগবাজার ঘাটের পাশে একটা পুরনো বাড়ির সামনে ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। তিনতলা বনেদি বাড়ি। অযত্ন এবং সময়ের প্রকোপে ছালচামড়া উঠে গেছে তার। শান্তনুবাবু একটা লম্বা চাবি দিয়ে দরজা খুললেন। বড়ো একটা ঘর। ডাইনিং টেবিলের উপর আগের দিনের ডাল শুকিয়ে লেগে থাকা থালা, স্টিলের গ্লাস। দেওয়ালে একটা বিশালাকৃতি ঘড়ি। শান্তনুবাবু একটা সুইচ টিপলেন। ঘরের কোনার একটা টিউবলাইট বেশ কয়েকবার প্রতিবাদ করে অবশেষে জ্বলে উঠল। কিন্তু তার তেজ এতই কম যে তার থেকে রোদের ফলে অনেক বেশি আলো রয়েছে ঘরে।
শান্তনুবাবু একটা চেয়ার টেনে বসতে বললেন দীপুকে। দীপু বসল।
“তোমার নামটা জানা হয়নি এখনও।”
“দীপক, দীপক ঘোষ। ডাক নাম দীপু। বাবার নাম রজতেন্দ্র ঘোষ। মায়ের নাম...”
“আচ্ছা আচ্ছা, দীপু। চল, এবার যাওয়া যাক ল্যাবরেটরিতে। একটু হাঁটতে হবে, মিনিট দশেক। অসুবিধে নেই তো?”
দীপু মাথা নেড়ে উঠে দরজার দিকে যাচ্ছিল। শান্তনু মাথা নেড়ে বললেন, “না না, বাইরে না, বাড়িতেই।”
“বাড়ির ভেতরে দশ মিনিট হাঁটা?”
“হ্যাঁ, সুড়ঙ্গে। আমার ল্যাবরেটরি মাঝগঙ্গার নিচে।”
দীপুর বুকটা ধক করে উঠল।

।।পাঁচ।।

ঠিক তেরো মিনিট একটা অন্ধকার সরু সুড়ঙ্গ দিয়ে হাঁটার পর দীপু বুঝল এবার সে একটা ফাঁকা বড়ো জায়গায় এসেছে। সুইচের আওয়াজ হল। সে অবাক হয়ে দেখল, বিশাল একটা ঘর। তার স্কুলের হলঘরটা তিন-চারবার ঢুকে যাবে এর ভেতর।
“এটা গঙ্গার নীচে?”
“হ্যাঁ, এদিকের দেওয়ালটার ও-পাড়ে দক্ষিণেশ্বর। ওদিকটা হল বেলুড়। এস আমার সাথে।”
শান্তনুবাবু আরেকটা সুইচ টিপলেন। প্রচুর হ্যালোজেন একসাথে জ্বলে উঠল। দীপু দেখল, একটা বিশাল অদ্ভুতদর্শন মেশিন। দু’দিক দিয়ে অর্ধবৃত্তাকার গোলাপি রঙের ধাতু নিচ থেকে শুরু হয়ে উপরে শেষ হয়েছে এবং তার মাঝখান থেকে দুটো রড বের হয়ে পেছনের দেওয়ালের সাথে একটা লোহার ফুটবল আকৃতির গোলককে ধরে রেখেছে। গোলকটা থেকে একটা পাইপ বেরিয়ে এসে একটা চৌকো ছ’ফুটের বাক্সর মধ্যে প্রবেশ করেছে। পুরো যন্ত্রটা একটা কাঁচের আচ্ছাদনের মধ্যে রাখা। যন্ত্রটার সামনে একটা স্ট্যান্ডের উপর সুইচবোর্ড। তাতে বিভিন্ন রঙের বোতাম।
“এটা কী?”
শান্তনুবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “নক্ষত্র কাকে বলে?”
ক্লাস ফোরের প্রশ্ন। দীপু গড়গড় করে বলে উঠল, “নক্ষত্র হল একটা গোলক যা নিজস্ব অভিকর্ষ দিয়ে প্রচুর প্লাজমা ধরে রেখেছে। হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাসের সংমিশ্রণ। সবসময় হাইড্রোজেন হিলিয়াম গ্যাসে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে বিশাল পরিমাণ তাপ বিকিরিত হচ্ছে। আমাদের সবথেকে কাছের নক্ষত্র হল সূর্য।”
দীপু থামল।
“কারেক্ট। আর যখন সব হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়ে যায়?”
“তখন মরে যায় নক্ষত্র।”
“হ্যাঁ। ফলে কী সৃষ্টি হয়?”
“এটা থিওরি। ব্ল্যাকহোলের কনসেপ্ট যেটা।”
“একদম ঠিক। এবার শোনো, ব্ল্যাকহোলের আকর্ষণ ক্ষমতা এতটাই হয় যে আলো সেখান থেকে বেরোতে পারে না। সবথেকে ছোটো ব্ল্যাকহোলের সাইজ একটা পরমাণুর সমান, কিন্তু ওজন একটা পাহাড়ের কাছাকাছি। ব্ল্যাকহোল সময়কে অবধি টেনে নিতে পারে। ফলে কেউ যদি ব্ল্যাকহোলের ভেতর যায় সে অতীত বা ভবিষ্যতে চলে যাবে।”
“এগুলো অল্পবিস্তর জানি আমি।”
“হ্যাঁ, এবার কথা হচ্ছে ব্ল্যাকহোল সৃষ্টির জন্য নক্ষত্রের সাইজ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ হতে হয়। সূর্য এতই ছোটো নক্ষত্র যে সে কোনওদিন ব্ল্যাকহোল হতে পারবে না।”
“আচ্ছা। এটা জানতাম না।”
শান্তনুবাবু বললেন, “এটা নিয়েই আমি গবেষণা করি। সূর্যর আয়তনের তুলনায় ভর কম বলেই সে ব্ল্যাকহোল হতে পারে না। অসমিয়াম নামের একটি ধাতু আছে যার ঘনত্ব সবথেকে বেশি। আমি একটা ছোট্ট জায়গায় হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে কৃত্রিম নক্ষত্র তৈরি করি এবং মিশিয়ে দিই এই অসমিয়াম ধাতু। ফলে নক্ষত্রটি শেষ হওয়ার ফলে তৈরি হয় একটি ছোট্ট ব্ল্যাকহোল। এই দ্যাখো...”
শান্তনুবাবু একটা সুইচ টিপতেই লোহার বলটা মাঝামাঝি অংশ থেকে খুলে যায়। অমনি পুরো যন্ত্রটা নড়তে শুরু করে। দীপু দ্যাখে, বলটা খোলার পর কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারটাও অস্বাভাবিক।
“প্রচণ্ড আকর্ষণ। এই বিশেষ প্রক্রিয়ার কাঁচ না থাকলে এই পুরো ঘরসমেত গঙ্গানদী অবধি টেনে নিত। এত ক্ষমতা। এইটুকু ব্ল্যাকহোলের ওজন হল সাঁইতিরিশ হাজার টন! এই যে স্ট্যান্ড দুটো দেখছ, যা ওকে ধরে আছে, এটা তৈরি গ্রাফেন দিয়ে। পৃথিবীর সবথেকে দৃঢ় পদার্থ। স্টিলের থেকে দশ গুণ বেশি দৃঢ়।”
দীপু মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সব। এবার সে শান্তনুবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে কেন ডাকলেন?”
“বলছি।” সান্তনু সাঁপুই এগিয়ে গেলেন তার যন্ত্রের সামনে। বললেন, “এই মেশিনটা আমার নিজে হাতে বানানো। অ্যালগোরিদমের সাহায্যে আমি সময়কে ব্ল্যাকহোলের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ করার প্রোগ্রাম বানিয়ে ফেলেছি। এটা একটা টাইম মেশিন। গল্পের মত নয়, সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আবিষ্কৃত। এর জন্যেই আমার তোমাকে চাই। রেটিনার গল্পটাই শুধু মিথ্যে ছিল দীপু। আসলে আমার দরকার ছিল একজন তোমার বয়সী ছেলে, যার প্রচুর সাহস। তুমি যাবে অতীতে। দু’ঘণ্টা পর আবার ফিরিয়ে আনব।”
দীপু আনন্দে পাগল হয়ে গেল। সত্যি সে টাইম ট্র্যাভেল করতে পারবে? তার বাবার একটা গল্প ছিল এই নিয়ে লেখা। সেটা পড়ার পর দু’দিন ধরে সে ভেবে এসেছে, যদি সত্যি হত এমন।
“কী করতে হবে আমায়?”
শান্তনুবাবু তার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গেলেন সেই চৌকো বাক্সের দিকে। দরজা খুলে গেল।
“আমি জানি না তুমি এক্সাক্টলি কত সালে পৌঁছবে। আমি দু’ঘণ্টা পর ফিরিয়ে আনব তোমায়। প্রসেসে কোনও অসুবিধে হলে ব্যাক-আপও আছে।”
“কী ব্যাক-আপ?”
“আমি গিয়ে নিয়ে আসব।”
বাক্সটার দরজা খুলে গেল। ভেতরটা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। দীপু ঢুকে গেল ভেতরে। তার একটা খটকা লাগছিল। সে প্রশ্ন করল, “একটা শেষ প্রশ্ন।”
“বল।”
“আমাকে কেন? মানে বয়সটা কেন নির্ভর করছে?”
শান্তনুবাবু চুপ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন একটা। তারপর বললেন, “একটা জিনিসই আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি খালি। তা হল পৃথিবী এবং ব্ল্যাকহোলের ভেতরের সময়ের পার্থক্য। এর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় এই দু’ঘণ্টায় তোমার বয়স বেড়ে যাবে কুড়ি বছর। কোনও প্রাপ্তবয়স্ক কেউ হলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যেত না।”
“মানে?”
“মানে তুমি যখন ফিরবে তখন তোমার বয়স হবে আটতিরিশ, শারীরিকভাবে।”
“না!” দীপু বিস্ফারিত চোখে বলল, “তবে কিছুতেই যাব না আমি। আমি বড়ো হতে চাই না। দরকার নেই আমার!”
দীপু বাক্স থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। তাকে অবাক করে শান্তনু সাঁপুই তার বুকে জোরে ধাক্কা মারলেন। তারপর একটা রিমোটের বোতাম টিপে দিলেন।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। একটা আলোর পিণ্ড বাক্স থেকে ব্ল্যাকহোল অবধি যাওয়া পাইপের ভেতর দিয়ে হুস করে চলে গেল অন্ধকারে। আর কিছু দেখা গেল না।

।।ছয়।।

লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থামল। সব বাচ্চারা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। লোকটা বলল, “তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরতে দেখলাম এই জঙ্গলে। চেহারা বদলে গেছে পুরো। আমার বয়স আসলে আঠারো। তোমাদের থেকে একটু বড়ো আমি। এটা কোন সাল তোমরা বলতে পারবে? আমি বুঝতে পারছি না কত বছর আগে এসে পড়েছি।”
সপ্তক তাকিয়েছিল দীপুর দিকে। হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল। তারপর কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল বাতাসে।
“এ কী! এ কী!” দীপু ভয় পেয়ে ছিটকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে দেখল সব বাচ্চা একের পর এক অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে!
“কী হচ্ছে এটা? কী হচ্ছে? আমি কি স্বপ্ন দেখছি?” দীপু ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল।
“না, তুমি তা দেখছ না।”
দীপু পেছন ফিরে দেখল একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। সারা মুখে পাকা দাড়ি, মুখে অসংখ্য বলিরেখা।
“আপনি কে?”
“আমি বৈজ্ঞানিক শান্তনু সাঁপুই। তোমাকে ফেরানোর জন্য এসেছি।”
“এ কী অবস্থা আপনার!”
“হ্যাঁ, আমি আর ফিরতে পারব না। তোমাকে ফেরাতে হবে।”
“এগুলো কী হচ্ছে? আমি কোথায়? এটা কোন শতাব্দী? এরা অদৃশ্য হয়ে গেল কেন?”
“হিসাবে একটু গণ্ডগোল হয়ে গেছিল দীপু। তুমি কলকাতাতেই আছ। কিন্তু অতীতে নয়, এটা সাত হাজার খ্রিস্টাব্দ। তুমি পাঁচ হাজার বছর ভবিষ্যতে এসে গেছ।”
দীপু নিথর হয়ে তাকিয়ে রইল বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিকের দিকে।
“এই যুগে পৃথিবীতে কোনও কিছুই আর প্রাকৃতিক নেই। এই যে জঙ্গল দেখছ, এগুলোও মানুষের তৈরি করা। পৃথিবীতে আর কিছুই বাস্তবে হয় না। সবকিছু ভার্চুয়াল।”
“আর বাচ্চাগুলো?”
“রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটা পড়েছিলে? ‘খোকা মাকে শুধায় ডেকে’?”
“হ্যাঁ, বিখ্যাত কবিতা।”
“ওটার শেষ লাইনটা কী ছিল?”
“ইচ্ছে হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।”
“হ্যাঁ। পৃথিবীর জনসংখ্যা শেষমাত্রায় এসে পৌঁছেছে। এখন আর কোনও বাচ্চা জন্ম নেয় না। সরকার থেকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব তো ধ্বংস হতে পারে না। সেটা তো মানুষের জন্মগত।”
“তাহলে?”
“তাই এমন টেকনোলজি আবিষ্কার করা হয়েছে যে প্রতিবছর মানুষ দু’ঘণ্টা সময় পাবে ঘুমোনোর। এই ঘুমের সময় তাদের কল্পনায় তৈরি হবে তাদের সন্তান। তারা দেখতে পারবে তাদের সন্তানরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, খেলাধুলো করছে। পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত বাস্তবরূপে তাদের কাছে থাকবে। কিন্তু আসলে কল্পনা, তাদের মনের মাঝের ইচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার হল, মানুষ এত আধুনিক হয়ে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে তারা আর কিছু আধুনিকতা চাইছে না। তাই তাদের কল্পনার সন্তানদের রূপ বা অবয়ব হচ্ছে আদিবাসীদের মতো। পৃথিবী সৃষ্টির সময়ের রূপ। দু’ঘণ্টা শেষ। সবার ঘুম ভাঙার সময় এসে গেছে। তাই মিলিয়ে যাচ্ছে এরা।”
দীপু দেখল আর একটা বাচ্চাও নেই। কোনও হাসিমুখ বা কৌতূহলী চোখ আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। ফাঁকা একটা জঙ্গল বুকে নিয়ে মনমরা হয়ে পড়ে আছে আধুনিক পৃথিবী।
হঠাৎ সে দেখল তার হাত-পা ঝাপসা হয়ে আসছে। দেহের নিচের অংশ আর নেই। সে একবার তাকাল শান্তনুবাবুর দিকে। তারপর মিলিয়ে গেল।


।।সাত।।

রজতেন্দ্রবাবু ঘুম থেকে উঠলেন। তার চোখের সামনে একটা বিশাল স্ক্রীন। তাতে লেখা ‘ইওর টাইম ইজ ওভার। নাউ টাইম টু বাথ।’
চোখ রগড়ে তিনি তার ডিজিটাল ডায়েরিটা হাতে নিলেন। আজ গল্পটা জমা দিতে হবে। ডায়েরির ওপরে লেখা - দীপক ঘোষ, ক্লাস টুয়েলভের ছাত্র, সাহসী, ফিজিক্সের প্রতি ভালোবাসা। শান্তনু সাঁপুই, বৈজ্ঞানিক, ব্ল্যাকহোল, টাইম মেশিন, ইত্যাদি।
_____


অলঙ্করণঃ স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায় ও আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment