গল্পঃ ঠিক আর ভুল - অনন্যা দাশ




শ্রেয়মরা যদি নতুন পাড়ায় না উঠে আসলে হয়তো ওর জীবনটা অন্যরকম হত। এই কথাটা এখন শ্রেয়ম মাঝে মাঝেই ভাবে। ক্লাস এইটের ফাইনাল পরীক্ষার পর যখন ওদের নিজেদের ফ্ল্যাটটা তৈরি হয়ে গেল তখন ওরা সবাই মিলে নতুন পাড়ায় থাকতে এল। বহুতল বাড়ির একটা ফ্ল্যাট। কিন্তু ভাড়াবাড়িতে বাড়িওয়ালা ও অন্যান্য ভাড়াটেদের নানান ঝামেলা থেকে তো মুক্তি! নতুন পাড়ায় এসেই শ্রেয়মের প্রথম আলাপ হয়েছিল বাচ্চুদের সঙ্গে। মানে বাচ্চু, সন্তু আর রাজার সঙ্গে। কীসের যেন একটা আকর্ষণ ওকে ওদের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। হয়তো ওরা একদম আলাদা বলেই ওদের প্রতি কৌতূহলটা বেশি হয়েছিল ওর। মালপত্র নিয়ে বাড়িতে ঢোকার সময়ই ওদের দেখেছিল শ্রেয়ম। আপাদমস্তক কালো জামাকাপড় পরা, মাথায় ফেট্টি বাঁধা ছেলেগুলোও ওকে দেখেছিল। দু’দিন পর স্কুল থেকে ফিরে লালাজির দোকান থেকে মা’র জন্যে কী একটা কিনে ফিরছিল। তখনই দেখতে পেল আবার ওদের। ওরাই যেচে ভাব করেতে এল। শ্রেয়ম কোনওদিন এইরকম ডোন্ট কেয়ার টাইপ ছেলেদের সঙ্গে মেশেনি আগে। তাই ওর একটু আগ্রহ হল এদের সঙ্গে মিশে দেখার।
“নতুন এসেছিস তো তোরা মেঘমালাতে?” ওদের একজন জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” হাসি হাসি মুখ করে বলল শ্রেয়ম।
আরও অনেককিছু বলেছিল ওরা সেদিন। দিদি কলেজ থেকে ফেরার সময় ওকে দেখেছিল বাচ্চুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে। শ্রেয়ম বাড়ি ফিরতেই দিদি বলেছিল, “ওই ছেলেগুলোর সঙ্গে কথা বলিস না ভাই। ওদের দেখেই মনে হচ্ছে ওরা ভালো ছেলে নয়!”
খুব রেগে গিয়েছিল শ্রেয়ম সেদিন। দিদির ওপর খুব চোটপাট করেছিল, “তুই কী করে বুঝলি যে ওরা ভালো ছেলে নয়? কিই বা জানিস তুই ওদের সম্পর্কে? তুই জানিস, ওরা সবাই ক্যারাটেতে ব্ল্যাকবেল্ট? ওরা কলেজে পড়ে।”
“কলেজে পড়ে তো ক্লাস করতে যায় না কেন? ওইরকম দাঁড়কাক সেজে সবসময় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানোর কী দরকার আছে? তাছাড়া কলেজে পড়ে মানে তো তোর থেকে বয়সে বেশ কিছুটা বড়ো। তাহলে তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় কেন? নিশ্চয়ই ওদের কোনও কুমতলব আছে!”
“ওদের আর্টস সাবজেক্ট, তাই ক্লাস বেশি থাকে না। দু’জন নাইট ক্লাসও করে। আর বন্ধুত্ব বয়স দিয়ে হয় না জেনে রাখ।”
দিদি আর সেদিন কথা বাড়ায়নি।
ক্রমে ওই শয়তানদের জালে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল শ্রেয়ম। ওদের উদাসীন ভাব, কথা বলার ধরন, পোশাক সবকিছুই ওর ভালো লাগতে শুরু করেছিল। মা-বাবা-দিদি কারও বারণ শোনেনি সে। আর সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার হল, এ পাড়াতে তো ওরা ছাড়া শ্রেয়মের আর কোনও বন্ধু নেই। বন্ধুহীন থাকতে কার ভালো লাগে?


গরমের ছুটিতে ঠিক কীভাবে লালাজির দোকানে ডাকাতির কথাটা উঠল সেটা শ্রেয়মের আর মনে নেই। লালাজির দোকান মানে পাড়ার দোকান। সবাই সেখান থেকে দরকারে জিনিস কেনে। কিন্তু লালাজি জিনিসের দাম বেশ বেশি করে রেখেছেন। জিনিসে ভেজালও থাকে প্রায়ই। লালাজিকে শায়েস্তা করতে হবে বলেই প্রস্তাবটা দিয়েছিল রাজাদা। শ্রেয়ম এখন পুরোদস্তুর ওদের দলের সদস্য। তাই ওদের প্ল্যান-পরিকল্পনা সবই ওরা ওকে বলে। লালাজির দোকান রাত দশটা অবধি খোলা থাকে। তাই ঠিক হল, দশটা বাজতে দশে ওরা গিয়ে দোকানে চড়াও হবে। তখন খদ্দেরও তেমন থাকে না। লালাজিকে ভয় পাইয়ে চড়া দাম আর ভেজালের কথা বলা হবে।
সেই পরিকল্পনা অনুসারে সাড়ে ন’টার সময় মাকে মিথ্যে কথা বলে বাড়ি থেকে বেরোল শ্রেয়ম। ওরা সবাই কালো জামাকাপড় পরেছে। মুখে বেঁধেছে কালো রুমাল। ঠিক পৌনে দশটা নাগাদ ওরা লালাজির দোকানে গিয়ে হাজির হল। বৃষ্টি পড়ছে অল্প, তাই দোকানে আর কেউ নেই। অন্য দু’জন কর্মচারী বাড়ি চলে গেছে। লালাজি নিজের চেয়ারে বসে ঢুলছিলেন। শ্রেয়ম কিছু বুঝে ওঠার আগেই যেন সবকিছু ঘটে গেল। রাজাদা পকেট থেকে একটা বন্দুক বার করে লালাজির কপালে ঠেকিয়ে বলল, “ক্যাশবাক্সে যা আছে সব এই ব্যাগে ভরে দে। নাহলে তোর ঘিলু মাটিতে গড়াগড়ি খাবে!”
ওর কথা শুনে শ্রেয়মের তো মুখ হাঁ হয়ে গেল। ওইরকম তো কথা ছিল না! এরা দোকানে ডাকাতি করতে এসেছে!
শ্রেয়ম চাপা গলায় বলতে চেষ্টা করল, “কী করছ তোমরা? এইরকম তো কথা ছিল না!”
বাচ্চুদা ওকে দাবড়ানি দিয়ে বলল, “এই চুপ! টুঁ শব্দটি করবি না। তাহলে পেটে ঢুকিয়ে দেব!”
ওর হাতে একটা ধারলো ছোরা।
লালাজি তার বিশাল বপু নিয়ে নড়েচড়ে টাকা নিয়ে ব্যাগে ভরতে না ভরতেই কীভাবে জানি পুলিশ এসে হাজির হল। কয়েকজন পুলিশ অদ্ভুতভাবে এক নিমেষে সবক’টা ক্যারাটেকারদের কাৎ করে ফেলে ক্ষিপ্র হাতে হাতকড়া এঁটে দিল ওদের হাতে। একটা রাত লকাপে ওদের সঙ্গে ছিল শ্রেয়ম। পরদিন সকালে মা আর দিদি এসে জামিনের টাকা দিয়ে ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল বটে কিন্তু বাদ সাধলেন বাবা।
শ্রেয়ম বাড়িতে ঢুকতেই বাবা ওকে দেখে চিৎকার করে উঠলেন, “ওকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করেছি! এই বাড়িতে হয় ও থাকবে বা আমি।”
মার কান্নাকাটি, দিদির কাকুতি মিনতি কোনও কিছুতেই কাজ হল না।
বাবা বললেন, “ওকে প্রথমদিন থেকেই আমরা সবাই বলে এসেছি ওই ছেলেগুলোর সঙ্গে মেলামেশা না করতে। কিন্তু ও কথা শোনেনি। আজ ডাকাতি করতে গেছে, কাল খুন করতে যাবে! না না, ও ছেলের সঙ্গে আমি কোনও সম্পর্ক রাখতে চাই না।”
“কিন্তু কোথায় যাবে ও? তুমি যাকে বাড়িতে রাখতে চাইছ না সেই ছেলেকে কী আর কোনও আত্মীয়স্বজন নিজের বাড়িতে রাখবে?” মা কেঁদে বললেন।
“আত্মীয়দের বাড়িতে রাখলে নিজেদেরই মাথা হেঁট হবে। ওর যেখানে খুশি ও যাক, শুধু আমার বাড়িতে যেন না থাকে আর। আমার সামনে যেন না আসে।” বলে বাবা শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
শ্রেয়ম বারবার ক্ষমা চাওয়াতেও কোন লাভ হল না।
বিকেলবেলা পর্যন্ত যখন বাবার রাগ কমল না তখন উপায় না দেখে দিদি আর মা ওকে নিয়ে দিদির বন্ধু সংযুক্তাদিদের বাড়ি গেল। সংযুক্তাদির জেঠু একটা অনাথাশ্রম চালান। সেখানেই শ্রেয়মকে রেখে আসা হল শেষমেশ।
“একটা মাস তুই এখানে থাক। তার মধ্যেই বাবার রাগ পড়ে যাবে দেখিস।” বলে দিদি আর মা ওকে রেখে দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে চলে গেল।
সেই থেকে শুরু হল শ্রেয়মের জীবনের এক অন্য অধ্যায়। ভোর সাড়ে চারটের সময় ঘুম থেকে উঠে বাথরুম, স্নান সেরে বাইরের কাজ, বাগানের কাজ বা ঘরের কাজে লেগে পড়তে হয়। যারা বয়সে একটু বড়ো ছোটোদেরকে তাদেরই সামলাতে হয়। এক একটা ঘরে প্রায় কুড়িজন করে ছেলেমেয়ে গাদাগাদি করে থাকা। টিভি নেই, খেলনা নেই, শ্রেয়ম এখানে আসার আগে যা যা করত তার কিছুই নেই এখানে। বাড়িতে খাবার সময় এটা খাব না সেটা খাব না করে কত বায়নাই না করত শ্রেয়ম। আর এখানে রোজ মোটা চালের ভাত, ট্যালট্যালে ডাল আর একটা তরকারি খেতে দেওয়া হয়। তাও কী বিশ্রী রান্না! কিন্তু সারাদিন কাজ করে এতটাই খিদে পেয়ে যায় যে গোগ্রাসে সেইসব খেয়ে নেয়। মাছ বা ডিম কখনও কখনও থাকে, আর মাংস খুবই কম। যেদিন মাছ বা মাংস হয় সেদিন সবার কী ফুর্তি! বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরাই অনেক ছোটো।
শ্রেয়মের বয়সী আর মোট দু’জন ছেলে আছে। তাদের মধ্যে একজন আবার বোবা। কিন্তু কী অসীম খাটতে পারে! অন্য ছেলেটার নাম বিনয়। সে কাজের ফাঁকে সময় পেলেই বই নিয়ে পড়তে বসে। শ্রেয়ম জিজ্ঞেস করতে বলল, “আমাকে পরের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষাটা দিতে হবে। আমি বড়ো হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। আমার ইচ্ছে যে যখন নিজে রোজগার করতে শুরু করব তখন জেঠুকে টাকা দেব, যাতে এখানকার বাচ্চাগুলো একটু ভালো করে থাকতে পারে। তা তুমি কোন ক্লাস?”
“নাইন,” লজ্জায় মাথা হেঁট করে বলল শ্রেয়ম।
গত রবিবার দিদি এসে বলে গেছে যে স্কুল থেকে নাকি শ্রেয়মকে টিসি দিয়ে দিয়েছে। লকাপে থাকার খবরটা পেয়ে গরমের ছুটির মধ্যেই অফিস খুলিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন প্রিন্সিপাল। অন্য ছেলেমেয়েরা যাতে ওর সঙ্গে মিশে ওর মতন না হয়ে যায় তাই তাদের বাবা-মায়েরা নাকি চাপ দিচ্ছিলেন।
এখানে অনাথাশ্রমের বাচ্চাদের দেখে খুব অবাক হয় শ্রেয়ম। এদের মা নেই, বাবা নেই, আত্মীয়স্বজন নেই, সুযোগ সুবিধা কিছু নেই। তাও বড়ো হওয়ার, কিছু করার কী ভীষণ চেষ্টা এদের আর শ্রেয়ম সবকিছু পেয়েও কী ঠিক আর কী ভুল সেটাই বুঝে উঠতে পারল না।
দিদি আর মা দেখা করতে এলেই সে জিজ্ঞেস করে, “বাবার রাগ কমেছে?” কিন্তু প্রতিবারই ওরা মাথা নাড়ে।


একমাস কবে শেষ হয়ে গেছে। শ্রেয়ম প্রায় তিনমাস হল বাড়িছাড়া। অনাথাশ্রমের ছেলেমেয়েরা যে সরকারি স্কুলটায় যায় সেটাতেই যেতে শুরু করেছে সে। ওদের কেসটা যেদিন আদালতে ওঠার কথা তার একসপ্তাহ আগে একদিন হঠাৎ বিকেলবেলা আগুন লেগে গেল অনাথাশ্রমের বাড়িটাতে। রান্না করতে করতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল শঙ্করদা। দমকল আসার আগে জ্বলন্ত বাড়ি থেকে বাচ্চাদের বার করতে করতে অনেকটাই পুড়ে গেল শ্রেয়ম।
ও যখন হাসপাতালে ভর্তি তখন বাবা এলেন ওকে দেখতে। চোখে জল নিয়ে বললেন, “সেরে উঠলেই তুমি বাড়ি ফিরে আসবে। লালাজি তোমার বিরুদ্ধে কেস তুলে নিয়েছেন। উনি বলেছেন, যে তুমি নাকি ওনার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছ যে তুমি ওদের কুমতলব বুঝতে পারনি। উনি তোমার কথা বিশ্বাস করেছেন। সেটা অবশ্য উনি আমাকে বেশ কয়েকদিন আগেই বলেছিলেন। তাও আমি তোমাকে নিতে আসিনি। আমার মনে সন্দেহ ছিল যে তুমি ঠিক আর ভুলের পার্থক্য এখনও বুঝতে পেরেছ কি না। কিন্তু এখন আর সেই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আজ তুমি যা করেছ তাতে আর না এসে পারলাম না। সেদিন আমাকে যতটা লজ্জিত করেছিলে আজকে তার চেয়ে অনেক বেশি গর্বিত করেছ।”
শ্রেয়মের চোখেও জল। সে শুধু বলল, “বাড়িটা অনেকটাই পুড়ে গেছে বাবা, মেরামত করতে হবে। পারলে ওদের কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করে দিও বাবা। তোমার বন্ধুদেরও বলে দিও একটু।”
_____

অলঙ্করণঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

No comments:

Post a Comment