গল্পঃ হরগৌরী সংবাদ - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


হরগৌরী সংবাদ
সহেলী চট্টোপাধ্যায়


দুর্গাঃ (জামাকাপড় গোছাতে গোছাতে) এই পুজো এলেই মুড অফ হয়ে যায় আমার। এত গরমের মধ্যে আমার যেতে ইচ্ছে করে না।
শিবঃ এ যে ভূতের মুখে রামনাম শুনছি! তাহলে কি এবার যাবে না?
মনে মনে চিন্তায় পড়ে গেলেন মহাদেব। ভাবতে লাগলেন, যদি না যায়, চারদিন আর মজা করে একা থাকা যাবে না। একা থাকার কত মজা। ইচ্ছেমতো টিভি দেখ, কেউ রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে না। রাত জেগে কাগজ পড়ব, বই পড়ব, গান শুনব, ফেসবুক করব, সিনেমা দেখব। কেউ বন্ধ কর, বন্ধ কর বলে চিল্লাবে না। আমার ইচ্ছে হলে বাজার যাব নয়তো যাব না। নিজে নিজে রান্না করব। দুটো রেঁধে দেয় বলে দুর্গার বড্ড কথা!
তার ওপর দুর্গার আদরের সিংহমশাই মাঝে মাঝে তাঁর ঘরে ঢুকে উৎপাত করে। আদর করে গা চেটে দেয়। ভীষণ ভয় লাগে শিবঠাকুরের। এতদিন ধরে দেখছেন তবুও ওকে বিশ্বাস হয় না। হাজারবার বারণ করা সত্ত্বেও দুর্গা ওকে বাঁধবেন না। বলেন, কিছু করবে না। মহাদেবের মোটেও ভরসা হয় না দুর্গার আশ্বাসে। আরে, কিছু করে দিতে কতক্ষণ! তারপর তো হাসপাতালে ছুটতে হবে। ক’টা ইঞ্জেকশন নিতে হবে কে জানে!
শিবঃ না না, তুমি চলে যাও। না গেলে মর্ত্যবাসীর মন খুব খারাপ হয়ে যাবে। তুমি যাও বলেই চারদিন তবুও একটু আনন্দের মুখ দেখে। কত দুঃখ সহ্য করে থাকে। আমি ব্যাগ গুছিয়ে দেব না হয়।
দুর্গাঃ আমি বাড়িতে না থাকলে তোমার খুব সুবিধা হয় সেটা আমি জানি। নিশ্চিন্তে থাক, আমি যাব না বলছি না। বলেছি যেতে ভালো লাগে না, গরম লাগে। এত লোকজন ভিড় করে দেখতে আসে, আমার আর ভালো লাগে না। সব জায়গায় তো কুলারও লাগায় না। এত কষ্ট হয়! তারপর এই পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা! অসহ্য!
শিবঃ তোমার সন্তানদের জন্য ক’দিন একটু কষ্ট করতে পারবে না?
দুর্গাঃ প্রতিবার তো ওদের কথা ভেবেই যাই। কিন্তু ওরা আমার জন্য কী করছে?
শিবঃ কত জাঁকজমক আর আয়োজন করে প্রতিবার, আর বলছ কিছু করে না!
দুর্গাঃ ওসব লোকজনকে  দেখানোর জন্য। হাজার হাতের দুর্গা করছে, কখনও লম্বা দুর্গা করছে, কখনও এত ছোটো করছে যে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখতে হচ্ছে। আমাকে নিয়ে এসব মশকরা আমার ভালো লাগে না। তুমি চিন্তা করতে পার, হাজার হাতের দুর্গা বানাচ্ছে! আমার দশটা হাত নিয়েই আমি নাজেহাল হয়ে যাচ্ছি। এমনিতেই টেলারিংয়ের দোকানের মেয়েগুলো আমার মুখের ওপর ঝাঁপ বন্ধ করে দেয়। বলে, দোকান বন্ধ। কেউ কেউ হাতজোড় করে বলে, আপনার জামা বানানো আমাদের কর্ম নয়। দোকানগুলোতেও দশটা হাতের জামা পাওয়া যায় না। আমি নিজেই বানাই নিজের জামা। হাজারটা হাতের জামা কী করে বানাব? আমারও তো বয়েস হয়েছে। চোখেও ভালো দেখি না। ওদের প্যান্ডেলে আমি থাকব না। ইচ্ছে করলে আমি সব নষ্ট করে দিতে পারি।
শিবঃ হ্যাঁ, তা আর জানি না! কিন্তু রাগ করে কোনও গোলমাল পাকিও না। যে যা করে এই চারদিন একটু সহ্য কোরো। আচ্ছা, চোখের সমস্যা হয়েছে যখন চশমা কেন করাওনি? ভালো কোনও আই স্পেশালিষ্ট দেখালে না কেন?
দুর্গাঃ অশ্বিনীকুমারদের দেখিয়েছি। কিন্তু তিন চোখের চশমা কেউ করে না বলছে।
শিবঃ তাহলে তো খুব সমস্যা হয়ে গেল। আচ্ছা দেখছি, চিন্তা করো না। কিন্তু অসুর বধের সময় তোমার হাজার হাত হয়েছিল। তাই ওরা বানিয়েছে।
দুর্গাঃ সে কবেকার কথা! আমিই ভুলে গেছি। হাজারটা হাত নিয়ে ঘোরা বড্ড কষ্টের।
শিবঃ এখনকার দিনে কেউ কি কারোর কষ্টের কথা চিন্তা করে? ছাড়ো। ছেলেমেয়েরা কী করছে? তোমার গোছানো কমপ্লিট? দুটো হাত রেখে বাকি আটখানা হাত তুলে রাখবে এখন থেকে।
দুর্গাঃ ওরা স্কুল থেকে ফিরেই কোচিং। সেই রাত করে ফিরবে। আমি সারাদিন একা একা থাকি। তুমিও তোমার বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে থাক, কোনও খবরই রাখ না। বাকি আটখানা হাত তুলে রাখলে কাজগুলো যে তাড়াতাড়ি হবে না!
শিবঃ সে কি! রাত ন’টা বাজতে চলল এখনও প্রাইভেট কোচিং! কেন, স্কুলে কি পড়াশোনা কিছুই হয় না যে রাতদিন বইয়ের বস্তা পিঠে কোচিংয়ে ছুটতে হবে? বলি, ছুটি দেবে তো চারদিন?
দুর্গাঃ অনেক করে বলে রেখেছি। চারদিনের বেশি একদিনও দেবে না। এখন দিনের মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই সবার অফিস-স্কুল-কলেজ থাকে।
শিবঃ ওই জন্যই আমি জীবনে স্কুল-কলেজ-অফিস করিনি কখনও। নইলে আমার কি যোগ্যতা ছিল না?
দুর্গাঃ আমার মায়ের একদম ইচ্ছে ছিল না এরকম বাঘছাল পরা জামাই। চাল নেই, চুলো নেই, একখানা ভালো জামাও নেই, রোজগার নেই।
শিবঃ এখন এই প্রসঙ্গ কি না তুললেই নয়? তোমার মায়ের মনের কষ্ট দেখে বাঘছাল বদলে আমি রাজবেশ পরেছিলাম। আমাকে ভারি সুন্দর দেখিয়েছিল সেই রাজবেশে। রায়গুণাকার ভারতচন্দ্র সে কথা লেখেনি?
দুর্গাঃ হ্যাঁ, তারপর সেটা এমন জায়গায় তুলে রাখলে আর খুঁজেই পাওয়া গেল না। কিন্তু ভারতচন্দ্র লেখেনি, লিখেছে সাধক কবি রামপ্রসাদ।
শিবঃ তুমি সব গুলিয়ে ফেলছ। ভারতচন্দ্র লিখে গেছে।
দুর্গাঃ আমার মনে হচ্ছে রামপ্রসাদ লিখেছে।
শিবঃ তুমি ভুল বলছ। তোমার মনে হয় সোডিয়াম, পটাশিয়াম বেড়ে গেছে।
দুর্গাঃ আচ্ছা থাক। যে কেউ একজন লিখেছে। এত পুরনো কথা মাঝে মাঝে ভুলে যাই। আচ্ছা, তুমি কি সঙ্গে করে ভালো জামাকাপড় নিয়ে এসেছিলে সেদিন?
শিবঃ তুমি একটু করে ব্রাহ্মীশাক খেয়ো। হ্যাঁ, নারায়ণ একটা ব্যাগে করে ভালো জামাকাপড় এনেছিল। তোমার মা আমার ছাইমাখা চেহারা দেখে তোমাকে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে রইল। বলল, এই ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে হতে পারে না। তখন সবার মাথায় হাত। এত আয়োজন বুঝি পণ্ড হয়। তখন নারায়ণ বলল, আমি একটা ব্যাগে ভালো জামাকাপড় এনেছি। পরে দেখ ফিট হয় কি না। আমি পরে আয়নায় দেখলাম বেশ মানিয়েছে।
দুর্গাঃ তারপর কী হল?
শিবঃ তোমার মায়ের আমাকে দেখে ভালো লাগল। তারপর বিয়ের পর নারায়ণ আবার সব জামাকাপড়, গয়না-টয়না ফেরত নিয়ে চলে গেল। কত কাল আগের কথা!
দুর্গাঃ ছিঃ ছিঃ! জিনিস দিয়ে আবার কেউ ফেরত নিয়ে যায়? নারায়ণ এত সেজেগুজে থাকে কিন্তু কানের ময়লা পরিষ্কার করতে ভুলে যায়।
শিবঃ বলল, তুমি তো আর পরবে না, আমায় দিয়ে দাও। হ্যাঁ, উনি ওইরকমই। সবাই নিজের বাইরেটা পরিষ্কার রাখে। মধু কৈটভ ওনার কানের ময়লা থেকে জন্ম নিল। ব্রহ্মাকে বিরক্ত করতে লাগল। ব্রহ্মা নারায়ণের ঘুম ভাঙাতে না পেরে তোমাকে ডাকল। তুমি নারায়ণের ঘুম ভাঙালে। মধু কৈটভকে মারার পর নাম হল নারায়ণের, আর তোমাকে সবাই ভুলে গেল।
দুর্গাঃ সব মনে আছে আমার। যাক গে, তুমিও বেশ সেজেগুজে থাকলে বেশ ভালো হত। এত সাধারণভাবে থাকো বলেই লোকে তোমাকে ভুল বোঝে।
শিবঃ সবাই কি একরকম হবে নাকি? তাছাড়া আলমারিগুলো সব তোমাদের জামাকাপড়েই ঠাসা।
দরজায় কলিং বেলের শব্দ হয়।
দুর্গাঃ যাই, ওরা ফিরল মনে হয়। রাত পোহালেই মহালয়া। কাল থেকে লাগেজ গোছাব। ইস, এই ক’দিন বড্ড ধকল যায়। কিচ্ছু ভালো লাগে না।
গজগজ করতে করতে দুর্গা উঠে গেলেন দরজা খুলতে। হই হই করতে করতে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী আর বীণাপাণি ঢুকলেন। দেখে মনে হয় কারোরই বয়স বেশি নয়। খুব বেশি হলে দশ।
বীণাপাণির আজ গানের ক্লাস ছিল। খুব টায়ার্ড।
লক্ষ্মী মহাদেবের গলা জড়িয়ে ধরল।
শিবঃ কী ব্যাপার সোনা-মা, আজ এত আদর কেন বাপিকে?
কার্তিক আর গণেশ এসে থেকেই হুড়োহুড়ি করছে একটা ফুটবল নিয়ে। দুর্গা ধমকে ওঠেন।
দুর্গাঃ কাতু-গণু, যা না, বাইরে গিয়ে খেল না! পুরো বাড়িটা তোরাই ভাঙবি দেখছি। এই স্কুল সেরে কোচিং সেরে ফিরলি, কখনও কি মনে হয় না একদণ্ড বসে জিরোই? একটু বাপি-মার সাথে কথা বলি? এসেই বল পেটাপেটি!
শিবঃ থাক গে। কতটুকু সময়ই বা বাড়িতে থাকে!
মুখে বললেও মনে মনে বিরক্ত বোধ করেন বেশি শব্দ হলে। মেয়ে দুটি বরং অনেক ঠাণ্ডা।
লক্ষ্মী তখনও বাবার গলা জড়িয়ে।
বীণাপাণিঃ তুই অনেকক্ষণ খেয়েছিস বাপির আদর। এবার আমি খাব। যা এখান থেকে।
বলেই বাবার কোলে বসে পড়ল।
বকুনির চোটে কার্তিক আর গণেশ মায়ের কোলের কাছে গিয়ে বসল। দুর্গা গণেশকে কোলে নিয়ে বসেন। কার্তিক দু’হাত বাড়িয়ে।
কার্তিকঃ আমাকেও নাও।
মা দুর্গা কার্তিককেও কোলে নেন। লক্ষ্মীর মুখ মহাদেবের কানের কাছে।
লক্ষ্মীঃ বাপি, কানে কানে বলব একটা কথা?
শিবঃ হ্যাঁ মা, বল।
লক্ষ্মীঃ আমি না, অঙ্কে শূন্য পেয়েছি।
লক্ষ্মী আস্তে বললেও সবাই শুনতে পেয়ে গেল। কার্তিক আর গণেশ হেসে ফেলল। বীণাপাণিও মুখ টিপে হাসছে। দুর্গাও ঠিক শুনতে পেয়ে গেলেন।
দুর্গাঃ তবে রে বদমাইশ মেয়ে! তুমি অঙ্কে শূন্য পেয়েছ! সারাদিন সাজগোজ করলে এই হয়! এবার তোমাকে আর মামাবাড়ি নিয়ে যাব না। বাবার কাছে থেকে অঙ্ক কষবে।
শিবঠাকুর খুব ভয় পেয়ে গেলেন। অঙ্ককে তিনি মারাত্মক ভয় পান।
শিবঃ আহা, ছেলেমানুষ, পরেরবার ঠিক ভালো করবে। এবার খেতে দাও তো।
বীণাপাণিঃ তুই চিন্তা করিস না দিদি। আমি তোকে সব দেখিয়ে দেব।
দুর্গাঃ চল, খেতে যাই। আজ আমি চাউ বানিয়েছি।
বাচ্চারা ইয়েএএএ করে চেঁচিয়ে উঠল।
শিবঃ যাহ! ডিনারের বারোটা বেজে গেল।
এই খাদ্যবস্তু তিনি দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। কেঁচোর মতো দেখতে।
দুর্গাঃ তোমার জন্য আমি আলাদা করে রুটি আর আলুর দম বানিয়েছি।

সবার খাওয়াদাওয়া শেষ। রাত বাড়ছে। বাচ্চারা যে যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। দুর্গা আর শিব নিজের ঘরে এলেন। দুর্গা মশারি খাটাচ্ছেন।
শিবঃ কটা দিন কষ্ট করে কাটিয়ে দাও। তোমরা ফিরলে বেড়াতে যাব দূরে কোথাও।
দুর্গাঃ না, আমি কোথাও যাব না এই কৈলাস ছেড়ে।
শিবঃ হ্যাঁ, এই বেড়াতে যাওয়ার বড্ড হ্যাপা। সব গোছাতে হয়, আর খালি চিন্তা হয় এই বুঝি কিছু ভুলে গেলুম। ঠিকঠাক পোঁছতে পারব তো? তারপর আবার ফিরে আসতে পারব তো? আর রাস্তায় যদি অ্যাক্সিডেন্ট হয়?
দুর্গাঃ তুমি বড্ড বাজে চিন্তা কর। এত নার্ভাস হওয়া ভালো নয়। বিশেষ করে যখন দুর্গতিনাশিনী তোমার সঙ্গে আছেন।
শিবঃ সে কি আর সাধ করে হই! এইরকম গিন্নি যার, সে তো সবসময় নার্ভাস থাকবে। এই বুঝি মা কালী হয়ে বুকের ওপর উঠে দাঁড়াল। এই বুঝি সিংহটা আমাকে কামড়ে দিল। এই বুঝি রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। এই বুঝি আমায় ছিন্নমস্তা রূপ দেখাল। যেটা দেখে আমার সবচেয়ে ভয় করে। আবার বুঝি আমাকে ভিক্ষা চাইতে হবে। দেবী দয়া করলে দুটো খেতে পাব। ঘুম পাচ্ছে খুব। চল, গুড নাইট। রেডিওতে মহালয়ার সময় আমাকে ডেকে দিও।
দুর্গাঃ রেডিওটা চালিয়ে দেব’খন। আমাকে আবার এখন জেগে বসে থাকতে হবে। আমার হয়েছে যত জ্বালা। বসে না থেকে জামাকাপড় সব সেলাই করে ফেলি। আমার জামা তো আমাকেই সেলাই করতে হয়। একটু পরে ঘুমোব।
দুর্গা সেলাই মেশিন চালিয়ে দিলেন। শিবঠাকুর ভাবছেন, ইচ্ছে করলে দুর্গা পাশের ঘরে গিয়েও সেলাই মেশিন চালাতে পারেন। কিন্তু ঠিক তাঁর ঘুমের সময়ই কানের কাছেই শব্দ করা চাই। এই না হলে দুর্গা!  আবার আলোটা জ্বেলে রেখেছেন।


কিছুদিন পরের কথা। স্থানঃ কৈলাস।
শিবঃ (ব্যস্তভাবে পায়চারি করতে করতে) এই রে, বিজয়া দশমী এসে গেছে! এত তাড়াতাড়ি দিনগুলো কেটে গেল! আমার অর্ধেক পুজোসংখ্যা এখনও শেষ হয়নি! দুর্গা আসার পর আর কিছু পড়া হবে না। আমি এখন কী করি! আগে ঘরদোর সব পরিষ্কার করে ফেলি। দুর্গা আবার রাগ করবে। বাচ্চাগুলো এসেই কুরুক্ষেত্র করবে। আজকালকার যা ছেলেপুলে! উফ!


কিছুক্ষণ পর।
শিবঃ এই তো বেশ সাফ করে ফেলেছি। বাহ! নিজের হাতে কাজ করার আনন্দই আলাদা। ওই ডোর বেল বাজছে। দুর্গা ছাড়া আর কেউ নয়। এত অধৈর্য হয়ে বেল টেপে একজনই। যাইইইইইইই...। বেলটা বুঝি গেল! এই দু’মাস আগে সারিয়েছি নিজের হাতে।
মহাদেব দরজা খুলতেই দুর্গা ধপাস ঢুকে পড়লেন।
দুর্গাঃ আমার ব্যাগপত্র সব ভেতরে ঢুকিয়ে দাও। আর পাচ্ছি না। অনেকটা পথ টেনে এনেছি।
শিবঃ কিন্তু তুমি তো গাড়িতেই এলে। ছেলেগুলোকে বল না কেন? আমি এখন পারব না। তবে ওরাই বা কত পারবে! ছোটো ছোটো ছেলে। আমিই পারছি না।
দুর্গাঃ আরে, ছেলেরা কোথায়! তারা ব্রহ্মাদাদুর বাড়ি গেছে। লক্ষ্মী তো মামার বাড়ি। সামনে ওর পুজো আছে। শপিং করবে বলে রয়ে গেল। আর সরো এসেছে, কিন্তু লাইব্রেরিতে নেমে গেছে। অনেকদিন বই পড়া হয়নি, তাই মুড অফ।
শিবঃ (ট্রলিব্যাগ টানতে টানতে) আহা, লক্ষ্মী একা একা আসতে পারবে? বাহ! সরো-মা কত্ত পড়াশোনা করে।
দুর্গাঃ বাকিগুলোও যদি এমন হত! এতদিন কামাই হয়েছে না? ভালো করে সবক’টাকে বসাতে হবে। নিশ্চয়ই, লক্ষ্মী তো একা একাই যাতায়াত করে। একমুহূর্ত স্থির নয় গো। এই এখানে তো পরমুহূর্তেই দেখি অন্যদিকে।
শিবঃ হ্যাঁ, যেমন মা তার তেমন মেয়ে। তা মহিষাসুরকে বলতে পারতে লাগেজ সব পৌঁছে দিত ভেতর অবধি। ব্রহ্মার বাড়ি গেল কেন? স্কুলের কী হবে?
দুর্গাঃ বলেছিলাম, কিন্তু ও রাজি হয়নি। আমাদের গাড়ি আর চালাবে না মনে হয়। নতুন লোক দেখতে হবে। স্কুল তো কাল, লক্ষ্মীপুজোর পর থেকে। আরে, গেছে ভালো হয়েছে। এলে আর দেখতে হত না। শান্তিতে বসে দুটো যে কথা বলছি, সে উপায় থাকত না। পিতামহ ব্রহ্মা বয়স্ক হয়েছেন। কতক্ষণ সামলাতে পারেন দেখা যাক।
শিবঃ ঠিকই বলেছ। আমার তো মাঝে মাঝে ভয় লাগে ওদের দেখলে। কনভেন্টে পাঠিয়ে দাও। তুমি নিশ্চয়ই ছেলেবেলায় এইরকম দুরন্ত ছিলে। তাই ছেলেরা এইরকম হয়েছে।
দুর্গাঃ দেখ, অনেকদূর থেকে এসেছি। এখন বাজে কথা বলবে না। ওরা একদম বাবার মতো হয়েছে। কনভেন্টে পাঠালে আরও দুষ্টু হবে। তবুও চোখের সামনে আছে একরকম।
শিবঃ তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু মহিষাসুরের হঠাৎ কী এমন হল? বছরের অন্য সময় তো ওর টিকিও দেখা যায় না। বছরে একবার গাড়ি নিয়ে বেরোয়। তা এখন থেকে সেটাও করবে না! স্ট্রেঞ্জ!
দুর্গা চুপ করে আছেন।
শিবঃ আরে, হল কী বলবে তো!
দুর্গাঃ আরে, চুপ কর না! খালি বক বক! এতখানি জার্নি করে এসেছি খুব কষ্ট হচ্ছে। অনেকক্ষণ প্যারেড করতে হয়েছে। গরমের মধ্যে কী কষ্ট! কৈলাস ছেড়ে তো কোথাও নড়লে না। আমাদের কষ্ট তুমি কী করে বুঝবে? এক গ্লাস জল দাও না! তোমার দেখছি সব বুদ্ধিসুদ্ধি চলে যাচ্ছে। খালি গাঁজা টানলে হবে?
শিবঃ গরম যখন এতই বেশি লাগে তাহলে এত ঝকমকে ড্রেস পরেছ কেন? এতরকম গয়না! সুতির জিনিস পরতে পার না? আবার চুল খুলে রেখেছ! গরমের আর দোষ কী? শরবত দিচ্ছি। একটু ধৈর্য ধর। কৈলাসে এসেও গরম করছে! কী শুনছি!
দুর্গাঃ চুল খুলে রাখব না! তাহলে পার্লারে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে হেয়ার স্পা করালাম কেন? আরও কীসব যেন করলাম। ঠিক মনে পড়ছে না। লক্ষ্মী এলে জিজ্ঞাসা করব।
শিবঃ যা ইচ্ছে কর গে যাও। আমি এসব বুঝিও না, আর বুঝতেও চাই না। চা না শরবত? কোনটা খাবে?
দুর্গাঃ হ্যাঁ, তা হলে মন্দ হয় না। গলাটা শুকিয়ে গেছে। শরবত দাও একটু। হোয়াটস অ্যাপে আমাদের ছবিগুলো দেখলে?
শিবঃ হ্যাঁ, ওটা আছে বলেই আমি আমার ছেলেমেয়েদের মুখ দেখতে পাই। না হলে ভুলেই যেতাম কাকে কেমন দেখতে। এমন কালের স্কুল আর কোচিং হয়েছে যে সামনে বসে যে দুটো কথা বলব তার উপায় নেই। যাই হোক, আমার ছবিগুলো দেখে তোমরা তো কেউ কোনও মন্তব্য করলে না! একটা মানুষ এত আশা করে ছেলেমেয়েদের নিজের নিজস্বী তুলে পাঠাল, তা কেউ একবারও বলল না, বাবা ভালো লাগছে তোমাকে।
দুর্গাঃ ওই ছবিগুলো আবার ফেসবুকে পোস্ট করনি তো?
শিবঃ কেন, করলেই বা কী হয়েছে?
দুর্গাঃ ইস! একদম যা তা ছবি উঠেছে। তুমি সেলফি একদম তুলতে পার না। সবক’টা হাঁড়ির মতো মুখ মনে হয়। ছবিটা একটু দূর থেকে তুলতে হয়! এরকম হাঁড়িমুখের ছবি আর পাঠাবে না।
শিবঃ তুমি একটা বই লিখে ফ্যাল সেলফি কীভাবে তুলতে হয়। এই নাও, শরবত হয়ে গেছে। মর্ত্যবাসী কেমন আছে? (ট্রেতে করে শরবত আনলেন দু’গ্লাস)
দুর্গাঃ ওই আগের মতোই। বারবার ভূমিকম্প হয়। আমি এবার প্যারেড করেছি।
শিবঃ কেন? প্যারেড কেন?
দুর্গাঃ আরে, এবার থেকে মর্ত্যবাসী নিয়ম করে দিয়েছে। বিসর্জনের দিন বিশেষ শোভাযাত্রা হবে। ঠিক প্যারেডের ভঙ্গিতে নিয়ে যাওয়া হবে শোভাযাত্রা। যেমন ২৬ শে জানুয়ারি, ১৫ই আগস্ট হয়। টিভিতে দেখায় যেমন।
শিবঃ আচ্ছা। এইবার কিছুটা বুঝতে পেরেছি।
দুর্গাঃ (শরবত একটু মুখে দিয়ে) ইস, এত চিনি ঢেলেছ! মর্ত্যবাসীরা দিন দিন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। ভক্তির চেয়ে বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে আড়ম্বর আর জাঁকজমক। পুজো কোথায়, এ তো প্রতিযোগিতা! তোমাকে বলে লাভ নেই। তুমি কিছু বুঝবে না।
শিবঃ হ্যাঁ, আমি তো মূর্খ তাই কিছুই বুঝি না। তোমাকে কতবার বলেছি যে অতদিন থাকতে যেও না ওখানে। তা সে শুনলে তো! সবার পুজো হয় একদিনের জন্য। কিন্তু তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে চার-পাঁচদিনের জন্য একেবারে পাতা পেড়ে বসে পড়। শুধু প্যারেড কেন, তোমাকে আরও কত কী করতে হয় দ্যাখ। শরবতটা ভালোই হয়েছে, কিন্তু তোমার খুঁত একটা ধরা চাইই।
দুর্গাঃ টিভিতে, রেডিওতে সারাক্ষণ পুজো পুজো করে এমন হিড়িক তোলে যে পুজোর সমস্ত আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যায়। আমারও আগে কত আনন্দ হত যে এইবার মর্ত্যে যাব। এবার খুব বৃষ্টি হয়েছে। যা তোরা আনন্দ করে মর!
শিবঃ সামনের বার আরও বৃষ্টি হবে। রেনকোট, ছাতা সব মনে করে নেবে।
দুর্গাঃ তোমাকে আর আবহাওয়ার খবর শোনাতে হবে না। তাড়াতাড়ি রান্না শুরু কর। আমি কিন্তু ভাতে ভাত খাব না বলে দিচ্ছি। যদি মুখে না তুলতে পারি তাহলে দক্ষযজ্ঞ করব। তাই মন দিয়ে করবে।


শিবঠাকুরকে এবার উঠতেই হবে। তাঁর আয়েশের দিন শেষ হয়ে গেছে। ব্যাজার মুখে রান্নাঘরে গেলেন। খানিকপরে মাও গেলেন রান্নাঘরে। তিনি যে অন্নপূর্ণা। সবার মনের কথা বুঝতে পারেন। এটাও জানেন, শিবঠাকুরকে একা রান্নাঘরের দায়িত্বে রাখা মোটেও নিরাপদ নয়। আমরাই বা আর কৈলাসে থেকে কী করব? চল, বাড়ি যাই।
_____

অলঙ্করণঃ সুজাতা চ্যাটার্জী

2 comments: