কচিপাতাঃ গল্পঃ টান - ঋত্বিক প্রিয়দর্শী


টান

ঋত্বিক প্রিয়দর্শী

আমি ঝাঁপ মেরেছিলাম। জলটা খুবই ঠান্ডা ছিল। গাটা শিউরে উঠল।
অনেক কাকুতি মিনতি করার পরও মা আমাকে জোর করে সাঁতারে পাঠাল। সাঁতারে আমার একদমই ভয় নেই যদিও। ছোটোবেলা থেকে আমি জলকে খুবই ভালোবেসে এসেছি। যতবার কোনও সমুদ্র বা নদীতে যাওয়া হত, প্রথমে আমি গিয়ে জলে ঝাঁপ মারতাম। সেই দেখে আমার বাবা-মা আমায় সাঁতারে ভর্তি করাল। আমি খুব তাড়াতাড়ি সাঁতার শিখে ফেলেছিলাম। আমার সাথে যারা শেখা শুরু করেছিল, তারা আমার অনেক পরে সাঁতার শেখে। আমি অনেক প্রাইজও পেয়েছি। আমার ক্লাসে সবচেয়ে ভালো সাঁতারু আমি।
তাই আমার হঠাৎ সাঁতারে ভয় দেখে আমার বাবা-মা জোর করে সাঁতারে পাঠাতে শুরু করে। আসলে কেন আমি সাঁতারে ভয় পেতাম ওরা কখনও সেটা বুঝবে না। আমি যখন জানতে পেরেছিলাম যে একজন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন মেয়ে-সুইমার ক্র্যাম্পের কারণে ডুবে গেছিল, তখন আমি মাত্র ছয় বছরের। সে, আমি যে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটি, সেখানেই ডুবে গিয়েছিল। সেটাও আমি জানতাম। আমি তখন একটুও ঘাবড়াইনি। কিন্তু প্রথম সমস্যাটা ঘটে দু’মাস আগে।
আমি আমার এক্সারসাইজ সেরে দু’পাক দৌড়ে দিলাম জলে ঝাঁপ। সুইমিং পুলের  চারপাশে দু’পাক দেওয়ার পর গায়ে যেন কেমন একটা ব্যথা শুরু হল। তারপর হাত-পা কাজ করা বন্ধ করে দিল। মনে হতে লাগল যেন কেউ আমায় ঠেলছে; আমাকে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি দশ সেকেন্ড আপ্রাণ নিঃশ্বাস ধরে রাখার পর মুখ ঘোরালাম। যা দেখেছিলাম, সেটা দেখলে সবচেয়ে বীর মানুষও ভয় পেয়ে যাবে। পচে যাওয়া এক মড়া মানুষের মুখ, রক্তমাংস বেরিয়ে যাওয়া এক অতিপ্রাকৃত মুখ। গা হিম হয়ে গেল। গভীর জলে ডুবে যেতে লাগলাম আমি। এক সময় মনে হল যে আবার অগভীর জলে ফিরে আসছি। মাথাটা জল থেকে তুলে যা ভেবেছিলাম দেখব তা দেখতে পাইনি। ডুবেছিলাম সুইমিং পুলে, উঠে আসি এক বিশাল সমুদ্রে। দূর অবধি নেই কোনও পাড়। অন্ধকার জল, আকাশে গভীর লাল মেঘ। ঝড় আসছে। জলের প্রথম ফোঁটাটা হাতে পড়তে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। রক্ত! জলের নিচে ঢুকলাম রক্তবর্ষার থেকে বাঁচার জন্য। নিচে চোখ পড়ল, গভীর অন্ধকার। এত অন্ধকার দেখে মনে হল যে সূর্য আর কখনও উঠবে না। আকাশে আর আলো ফুটবে না। অন্ধকারটা যেন চিরকালের মতন শুষে নেবে আলোকে। দুনিয়াতে যেন আর কিছু থাকবে না, শুধু অন্ধকার আর মৃত্যু।
মাথা তুলে শুনি যে বেল বাজছে। সাঁতারের সময় শেষ। ফেরার পথে মাকে বলার আর সাহস করিনি। পরের দিন থেকে এসব আর দেখিনি। শুধু দেখতাম, একটা মৃতমেয়ের শরীর, পুলের এক কোনায় পড়ে আছে। রোজ মনে হত যেন এগিয়ে আসছে। গত কয়েকদিন ধরে খুবই কাছে চলে এসেছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম।
আরও কয়েকদিন এরকম হওয়ার পর সাঁতার জোর করে ছেড়ে দিলাম। শুনেছি আরেকটা ছেলে ওখানে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে যায়।
আর একবার গেছিলাম সেই পুলে। সেই মেয়েটার শরীরটা ছিল না আর। ছিল এক ছেলের শরীর, আরেকটা শিকার। পুলটা লোক টানত, শিকার খুঁজত। এখনও আছে সেই পুল, অপেক্ষায়, ক্ষুধার্ত।



_____

No comments:

Post a Comment