গল্পঃ খাম - ঋজু গাঙ্গুলি


খাম
ঋজু গাঙ্গুলি

ক্লাসের পর ক্যান্টিনের জমাটি আড্ডাটা সেরে মেজাজটা বেশ শরিফ ছিল মধুরিমার। সঞ্জিতের মুখে আজ একেবারে ঝামা ঘষে দেওয়া গেছে! বি.বি.সি-তে ‘শার্লক’ নাম দিয়ে শার্লক হোমসের নতুন, মানে এ-যুগীয় অ্যাডভেঞ্চারগুলো দেখানো শুরু হওয়ার পর থেকেই সঞ্জিৎ আর ওর ভক্তদের আহা-উহুতে বোর হচ্ছিল মধুরিমা। কিন্তু আজকে ক্যান্টিনের সেশনটার পর বেশ কিছুদিন শ্রীমান চুপচাপ থাকতে বাধ্য হবে।
রহস্য-রোমাঞ্চের ভক্ত অথচ হোমসকে অথরিটি হিসেবে মানে না, এমন কেউই নেই। শার্লক হোমসকে মধুরিমাও দস্তুরমতো মান্য করে। কিন্তু সঞ্জিতের বক্তব্য, হোমসের আগেও তেমন কেউ ছিল না যাকে ডিটেকটিভ সাহিত্যে বা পেশায় মডেল করা যায়, পরেও তেমন কেউ আসেনি। হোমসের পরের যুগ নিয়ে কথায় ইমন আগাথা ক্রিস্টির এরকুল পয়ঁরোর হয়ে, আর অনিরুদ্ধ সত্যজিতের ফেলুদা নিয়ে লড়ছিল ঠিকই, কিন্তু হোমসের আগের সময়টা নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। ফলে বাধ্য হয়ে মধুরিমা বেশিরভাগ সময় এই আলোচনার স্রেফ মনোযোগী শ্রোতা হলেও আজ মুখ খুলেছিল।
“তোরা কেউ এডগার অ্যালেন পো’র সৃষ্ট গোয়েন্দা দুপ্যাঁ-র কথা পড়েছিস?” জিজ্ঞেস করেছিল মধুরিমা।
একঝাঁক প্রায় ফাঁকা মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে শুরু করেছিল মধুরিমা, “পো তাঁর ফরাসি গোয়েন্দা দুপ্যাঁ-কে নিয়ে তিনটে গোয়েন্দাগল্প লিখেছিলেন, যাদের মাধ্যমে গোয়েন্দাগল্প এবং গোয়েন্দা কেমন হওয়া উচিত তার প্রায় মডেল তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। সেই তিনটে গল্পের মধ্যে একটা গল্প ছিল ‘দ্য পারলয়েন্ড লেটার’।”
নিজের অজান্তেই হালকা চশমাটাকে নাক বরাবর ওপরে তুলে বলে গেছিল ও।
“সেই গল্পটার বিষয়বস্তু ছিল একেবারে সরল। পুলিশের প্রধান দুপ্যাঁর কাছে এসে একটা মূল্যবান চিঠি উদ্ধার করার ব্যাপারে সাহায্য চান, যেটা চুরি হয়ে যাওয়ার ফলে রাজপরিবারের এক অন্যতম সদস্যকে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে হচ্ছে। চিঠিটা যে এক মন্ত্রী চুরি করেছেন এবং সেটা যে তাঁর কাছেই আছে, এ ব্যাপারে পুলিশ নিশ্চিত। কিন্তু সেই মন্ত্রীর ঘরে খানাতল্লাশি চালিয়েও চিঠিটা পাওয়া যায়নি।
“দুপ্যাঁ চিঠিটার অনুপুঙ্খ বিবরণ মন দিয়ে শোনেন, কিন্তু তখনকার মতো এই বিষয়ে কোনও আগ্রহই দেখান না। মাসখানেক পর পুলিশ প্রধান যখন আবার দুপ্যাঁর কাছে এসে তাঁর অসহায় অবস্থার কথা বলেন, তখন দুপ্যাঁ প্রায় ম্যাজিকের মতো করে চিঠিটা বের করে তাঁর হাতে দেন।”
ক্যান্টিনের পরিবেশ শান্ত হয়ে গেছে দেখে অনন্তদা বুঝেছিলেন, বাজে তর্ক বা কথা-কাটাকাটির থেকে সিরিয়াস একটা কিছু চলছে। তাই তাঁর নিঃশব্দ নির্দেশে মধুরিমার জন্যে স্পেশাল লেবু-চা অযাচিতভাবেই ওর সামনে এসে গেছিল। তাতেই চুমুক দিয়ে গল্পটা বলে গেছিল মধুরিমা।
“পুলিশকে কিছু না জানালেও তাঁর বন্ধুকে দুপ্যাঁ বুঝিয়ে বলেন যে পুলিশ সেই মন্ত্রীকে দোষী ভেবে ঠিকই সন্দেহ করেছিল। কিন্তু মন্ত্রীটি পুলিশের অনুসন্ধান-পদ্ধতি একেবারে ঠিকঠাক আন্দাজ করে সেইভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখবেন, এটা পুলিশ ভাবেনি। তাই পুলিশ যখন সম্ভব অসম্ভব সব জায়গায় চিঠিটা খুঁজেছে, তখন সেটা রাখা ছিল প্রায় চোখের সামনে আর পাঁচটা পুরনো চিঠির সঙ্গেই। শুধু এবার সেটাকে উল্টো করে তার ওপর নিজের ঠিকানা লিখে আর অন্য একটা সিলমোহর লাগিয়ে নিয়েছিলেন সেই মন্ত্রী।
“দুপ্যাঁ সেই মন্ত্রীর ঘরে তাস খেলার ছলে গিয়ে প্রথমে চিঠিটা আবিষ্কার করেন তার বয়ান থেকে। তারপর আর একদিন গিয়ে, রাস্তায় একটা গোলমাল শুনে, যেটার ব্যবস্থা দুপ্যাঁই করে রেখেছিলেন, চিন্তিত হয়ে মন্ত্রী জানালা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করলে দুপ্যাঁ আসল চিঠিটা নিয়ে একটা নকল চিঠি তার জায়গায় রেখে দেন।”
গল্পটা মধুরিমা শুধু বলেইনি, সঙ্গে ও বুঝিয়ে দিয়েছিল, হোমসের বিভিন্ন গল্পের অনেকগুলো প্লট ট্যুইস্ট শুধু যে এই গল্পটা থেকে নেওয়া তাই নয়, বরং হোমসের সেই ‘ইউ সি, বাট ইউ ডু নট অবজার্ভ’ কথাটাও এসেছে দুপ্যাঁর রহস্যভেদের বিভিন্ন অংশ থেকেই।
গল্পটা শেষ হওয়ার পর গোটা ক্যান্টিন হাততালি তো দিয়েইছিল, সঞ্জিতের মুখটাও হয়েছিল দেখার মতো। তারপরেই ওর খেয়াল হয়েছিল, জমাটি আড্ডায় এতটা সময় পেরিয়ে গেছে যে আরশিকে পড়াতে যেতেই দেরি হয়ে গেছে।


দেশপ্রিয় পার্কের পেছনে তিলক রোডের ওপর তৈরি হওয়া এই ‘এল’ শেপের বাড়িটায় আসতে মধুরিমার খুব ভালো লাগে। রাসবিহারী মোড় থেকে এই অবধি মানুষ আর গাড়ির স্রোত সামলে আসতে অবশ্য সময় লাগে অনেকটা। কিন্তু সেই সময়টা ওর খুব একটা খারাপ কাটে না। তাছাড়া, কম্পাউন্ডের ধার দিয়ে লাগানো গাছগুলো এই সময় হাওয়ায় দোলে। রাস্তা দিয়ে ব্যস্ত-সমস্ত লোকেরা হনহনিয়ে হাঁটার ফাঁকেও পুজোর কেনাকাটি বা খেলার লাঠালাঠি নিয়ে আলোচনাতে মজে থাকে।
সবচেয়ে বড়ো কথা, আরশিদের ফ্ল্যাটের তিন সদস্য মানে আরশি, তার মা অরুণা এবং আরশির বাবা প্রদীপ তিনজনেই হল বিন্দাস পাবলিক, যারা টেনশন নেওয়া বা দেওয়া কোনওটাকেই পছন্দ করে না।


কিন্তু আরশিদের ফ্ল্যাটে ঢুকেই ও বুঝতে পারল, এখানে আবহাওয়া মোটেও শারদীয় নয়, বরং রীতিমতো আষাঢ়ে। আরশি আর তার মা অরুণা, দুজনেই বেশ থমথমে মুখে আছে আজ।
পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে মধুরিমা জানে, মা-মেয়ের এই নিত্যনৈমিত্তিক খেলায় রেফারিগিরি করা মোটেই বুদ্ধির পরিচায়ক নয়। তাই ও মিষ্টি হেসে আরশিকে নিয়ে ওর ঘরে ঢুকে অঙ্কের বইটা বের করল। তারপর রোজ যেমন হয়, তেমনভাবেই অঙ্ক নিয়ে চালু কয়েকটা হালকা-পলকা গল্প বলে পড়ানো শুরু করল ও। মধুরিমা আরশির ফেভারিট দিদিমণি হয়েছে কি আর এমনি এমনি?
কিন্তু আজ মধুরিমার স্পষ্টই মনে হল, কিছু একটা বড়ো ধরনের ছন্দপতন হয়েছে। কারণ, অন্যদিনের মতো মধুরিমা আর আরশিকে চা-জলখাবার দিয়েই অরুণা টি.ভি.-র সামনে ফিট হননি, বরং আরশির ঘরের দরজার সামনে ঘুরঘুর করছেন। ব্যাপার সিরিয়াস।
তবে সেই নিয়ে এখন ভাবতে গেলে মুশকিল। কারণ, সামনের সপ্তাহ থেকে স্কুল শুধু নয়, পড়াও বন্ধ। তার আগে আরশিকে একটু এগিয়ে না দিলে কী করে চলবে?
পড়ানো শুরুর আগে আরশিকে আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম গণিতবিদ মেরি সমারভিলের গল্পটা বলছিল মধুরিমা।
১৭৮০ সালে স্কটল্যান্ডের এক অখ্যাত গ্রামে জন্মানো মেরি ছোটোবেলা থেকেই অঙ্ক করতে ভালোবাসত। কিন্তু সেই সময় মেয়েদের অঙ্ক নিয়ে মাথা ঘামানোটাকে মোটেই ভালো চোখে দেখা হত না। নিরুপায় মেরি নিজের যৎসামান্য সঞ্চয় থেকেই বীজগণিত আর জ্যামিতির বই কিনতেন, আর রাত জেগে অঙ্ক কষতেন। হাজার সমালোচনা বা বিরোধিতাতেও মেরি অঙ্ক কষা ছাড়েননি। তাঁর এই স্বভাব নিয়ে সবার কোঁচকানো ভ্রূ অবশ্য সোজা হয়ে গেছিল পরে, যখন বিভিন্ন পত্রিকায় দেওয়া অঙ্কের ধাঁধা আর সমস্যার সমাধান পাঠানোর পাশাপাশি মেরি বীজগণিতের একটা অত্যন্ত জটিল সমস্যার প্রথম সমাধান আবিষ্কার করেন এবং তারপর পুরস্কার পান। তারপর শুধু স্কটল্যান্ড নয়, গোটা ইউরোপের শিক্ষিত সমাজ মেরির কদর করতে বাধ্য হয়।
অঙ্ক কষতে কষতে যখনই মেরির মনে হত, ‘নাহ্‌, এটা আর হবে না’, তখনই তিনি হাঁটতে বেরোতেন বা পিয়ানো বাজাতেন। নয়তো উল বুনতেন। কিন্তু তিনি অঙ্কটা ছেড়ে দিতেন না। কারণ, দীর্ঘদিনের উপেক্ষা তাঁকে এটা শিখিয়েছিল, হাল ছেড়ে না দিলে শুধু অঙ্ক নয়, জীবনও একদিন বলতে বাধ্য হবে, ‘সাবাশ’!
ছাত্রীর মুখের মেঘ অনেকটাই কেটেছে দেখে মধুরিমা এবার ওকে অঙ্কের একটা চ্যাপ্টার, যেটা দিয়ে আগের দিনের পড়ানো শেষ হয়েছিল, তারই বেশ কয়েকটা অঙ্ক কষতে দিল।


আরশি অঙ্কে ডুবে যেতে মধুরিমা বাইরের ঘরে এসে অরুণার সঙ্গে পড়াতে এলেই যেমন করে তেমনভাবেই হালকা আলোচনা এবং কিছু নির্দোষ গসিপ শুরু করল নানা বিষয়ে। ও জানত, ‘কী হয়েছে’ নামক প্রশ্নটা করে অরুণার টেনশন না বাড়িয়ে বরং ওকে ধীরেসুস্থে কথাগুলো বলার সুযোগ করে দিলে ব্যাপারটা ভালোভাবে জানা যাবে। হয়তো কিছু করাও যাবে। তেমনই ক’টা হাবিজাবি কথার পর মধুরিমা প্রশ্নটা তুলল। “দিদি, আপনি কি কোনও কারণে খুব টেনশনে আছেন?”
ফল হল। অরুণার মুখ দেখে বোঝা গেল, মধুরিমাকে কথাগুলো বলার জন্যে উনি প্রায় ছটফট করছিলেন। কিন্তু তাঁর বলা কথাগুলো সোজাসুজি তুলে দিলে এই আখ্যান খুব বেশি লম্বা আর প্যাঁচালো হয়ে যাবে। তাই আমি আমার মতো করে লেখাটা চালিয়ে যাচ্ছি।
অরুণা মধুরিমাকে জানালেন, তিনি একটা বড়ো সমস্যায় পড়েছেন, যার সমাধান করার জন্যে হাতে আছে মাত্র আধঘন্টা! সমস্যাটার বিবরণ দেওয়ার জন্যে তাহলে মধুরিমার সঙ্গে আমরাও ফিরে যাই ঘন্টা আটেক আগে, যখন সকাল।


সকাল! শব্দটা ছোটো, কিন্তু ওই সময়টা যে কীভাবে কাটে তা নিচের বর্ণনা থেকেই বোঝা যাবে।
প্রদীপ অফিসে যাবেন।
আরশি বাবার গাড়িতেই যাবে স্কুলে।
মালতী, মানে ঠিকে কাজের বউ, আগের সপ্তাহে দু’দিন কামাই করার পর এই সপ্তাহেও ছুটি চেয়ে ঘ্যান ঘ্যান করছে।
কাগজওলা এসেছে টাকা নিতে এবং যথারীতি তার দেওয়া বিলটা দেখতে গিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে যে পাশের ফ্ল্যাটে দেওয়া কয়েকটা ম্যাগাজিন এই বিলে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
ধোপা বলছে যে ওয়াশিং মেশিন থেকে বের করা কাপড়গুলো এখনও শুকোয়নি। তাই সে পরে সেগুলো ইস্ত্রি করার জন্যে নিয়ে যাবে।
মোবাইল বাজছে।
ম্যাগাজিন ঘেঁটে পাওয়া রেসিপি অনুযায়ী ‘স্বাস্থ্যকর অথচ সুস্বাদু’ ব্রেকফাস্ট তৈরি করা এবং বাবা ও মেয়ের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধ করে তাদের সেটা খাওয়ানো চলছে এরই মধ্যে।


অবশেষে পৃথিবী শান্ত হল। কিন্তু ফ্ল্যাট থেকে বেরোবার সময় প্রদীপ অরুণাকে বললেন যে একটা খাম উনি খাটের ওপর রেখে গেছেন। অফিস থেকে ফিরেই ওনাকে এক জায়গায় যেতে হবে, আর সেজন্যে খামটা লাগবে। তাই সেটা যেন অরুণা খুঁজে রাখেন।
ব্যাপারটা প্রদীপ ‘আউট অফ সাইট’ হওয়া মাত্র অরুণার ‘আউট অফ মাইন্ড’ হয়ে যায়। তারপর সকালের দক্ষযজ্ঞ ও রান্নাবান্না সেরে শোয়ার ঘরে গিয়ে লেটেস্ট শারদীয়াটা হাতে নিয়ে আয়েশ করে ধপাস হতে গিয়েই তাঁর খামের ব্যাপারটা মনে পড়েছে! তারপর থেকে তিনি খামটা খুঁজে চলেছেন।
মেয়ে ফিরেছে বিকেলে। তার আগে ঘর তোলপাড় করে এবং তার পরেও যথাসাধ্য খোঁজাখুঁজি করে কোনও খাম পাওয়া যায়নি। অথচ অরুণা বেশ মনে করতে পারছেন, হ্যাঁ, একটা খাম সকালে কর্তার হাতে এবং তারপর বিছানার ওপর টানটান করে পাতা চাদরে দেখেছিলেন।


এবার দেশপ্রিয় পার্কের পুজো খুবই লো-প্রোফাইল। তবুও সেখানে প্যান্ডেল বানানোর জন্যে ব্যস্ততা, বাঁশ পড়ার আওয়াজ, পাশের মতিলাল নেহরু রোডে হঠাৎ করে বেধে যাওয়া জ্যামের ফলে সরু-মোটা নানারকম হর্নের আওয়াজ, এসব শুনতে শুনতেও মধুরিমা ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল।
একটা খাম পাওয়া যাচ্ছে না। খামটায় কী ছিল তা অরুণা জানেন না। কিন্তু সেটার জন্যে তাহলে উনি এতটা ব্যাকুল কেন?
উত্তরটা হড়বড়িয়ে অরুণাই দিলেন। প্রদীপ অফিস থেকে ফিরবেন আধঘন্টার মধ্যেই। এমনিতে শান্ত ভদ্রলোকটি বাড়ি ফিরে খাম খুঁজে না পেলে, বিশেষত সেটা যেহেতু অরুণাকেই খুঁজে রাখতে বলা হয়েছিল, বাড়িতে যা বাধবে তার কাছে সংসদের বাদল অধিবেশন নিতান্তই তুশ্চু। তাই সাহায্য চাই।
“তাছাড়া,” অপরাধী কন্ঠে অরুণা বললেন, “টেনশনে আমার মেজাজটা একেবারে ঠিক নেই, ভাই। মেয়েটা স্কুল থেকে ফেরার পর ওর সঙ্গে রোজকার মতো খোশগল্প তো করতেই পারিনি, খুব তুচ্ছ কারণেই ওর ওপর রাগারাগি করে ফেলেছি। তাই শুধু ওর নয়, আমারও মন খুব খারাপ। তুমি খামটা যেভাবে হোক খুঁজে দাও, মধু।”
শেষের কথাটা বলার সময় অরুণার গলাটা যেভাবে কেঁপে গেল তাতে মধুরিমা স্পষ্টই বুঝল, এই বাড়িতে ত্রাহি রব উঠেছে। আর হাতের কাছে মধুসূদন হয়ে আজ সে-ই উপস্থিত। কাজেই...
একটু একটু করে বেশ কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে মধুরিমা সেই খামটার সম্বন্ধে আরও কিছু তথ্য যোগাড় করল।
খামটার ওপর কোনও পোস্টমার্ক ছিল না।
বিভিন্ন বিল বা স্টেটমেন্টের সঙ্গে যেরকম সেলোফেন-উইন্ডোওয়ালা, নিচের অংশে ছাপানো ঠিকানা লেখা খাম আসে, তেমন ছিল না খামটা। আবার গ্রিটিং কার্ডের সঙ্গে যেরকম ক্যাটকেটে রঙের খাম থাকে, তেমনও ছিল না। তবে খামটা হালকা কোনও রঙের হলেও হতে পারে।
কাছ থেকে না দেখলেও মনে হয়েছিল, যেন হ্যান্ডমেড পেপার বা ওইরকম খসখসে কাগজে বানানো খাম। প্রথম দর্শনে অরুণা এজন্যে একটু অবাকই হয়েছিলেন খামটা দেখে। কিন্তু তারপর ব্যাপারটা ওঁর মাথা থেকে স্রেফ বেরিয়ে যায়।
তাহলে মোদ্দা কথাটা কী দাঁড়াল? অরুণার দেওয়া বর্ণনা থেকে এটা স্পষ্ট যে খামটা আছে বা ছিল। এটাও স্পষ্ট যে বাড়ির কর্ত্রী, যাঁকে বছর দুয়েকের পরিচয়ে কখনওই বে-আক্কেলে বা ভুলোমনা বলে মনে হয়নি মধুর, যখন ঘর তোলপাড় করে সেটা খুঁজেও কোথাও পাননি তখন খামটা গায়েব হয়েছে বেলা সাড়ে বারোটার আগেই।
কিন্তু কোথায়?


শোয়ার ঘরটা ভালো করে দেখল মধুরিমা। তিনতলার এই ফ্ল্যাটের শোয়ার ঘরে কিছুটা অতিরিক্ত প্রাইভেসি এনে দিয়েছে জানালার গা ঘেঁষে দাঁড়ানো কদমগাছটা। জানলাগুলো বেশ বড়ো বড়ো হলেও অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেমে বন্দি স্লাইডিং গ্লাস দেওয়া। অর্থাৎ, একবারে অর্ধেকটা জানালাই খোলা যায়। তার ওপর ডেঙ্গি এবং আরও নানারকম মশাবাহিত রোগের হাত থেকে বাঁচার জন্যে সেগুলোতে নেট দেওয়া। ফলে মশা শুধু নয়, কোনও পাখির পক্ষেও এসে খাটের ওপর থেকে একটা খাম গায়েব করে দেওয়া সম্ভব নয়।
বেশ। না-মানুষি ব্যাপারগুলো বাদ দেওয়া গেল। এবার তাহলে প্রশ্ন, ওই সময়ে শোয়ার ঘরে কে কে যেতে পারে।
প্রথমেই যার কথা মনে আসে সে হল মালতী, মানে কাজের বউ, ঘর মুছতে যাকে ওই ঘরে যেতেই হবে। মালতী শুধু এই ফ্ল্যাটেই নয়, এই বাড়ির আরও বেশ কিছু ফ্ল্যাটে কাজ করে। একটু মুখরা হিসেবে তাকে সবাই, মায় যেসব দিনে এই ফ্ল্যাটে মধুরিমা সকালে এসেছে সেদিন ও-ও একটু সমঝে চলে। কিন্তু মালতীর সততা প্রশ্নাতীত। তাছাড়া খামটা ও নেবেই বা কেন? বরং খামটা মাটিতে পড়ে থাকলে, ‘ও বউদি’ বলে একটি বিরাট হাঁক ছেড়ে সেটা অরুণার হাতেই ও তুলে দেবে, এটা নিশ্চিত। হ্যাঁ, টাকাপয়সা পড়ে থাকলেও মালতী সেটাই করে। তাই ওকে হিসেব থেক বাদ দেওয়া গেল।
মালতী ছাড়া আর কে ঢুকেছিল অরুণার শোয়ার ঘরে?
“জয়া,” চট করে উত্তরটা দেন অরুণা, “মানে, দেশপ্রিয় পার্কের উল্টোদিকে যে নতুন ‘হাবিবস’-এর আউটলেটটা খুলেছে, তাতে যে মেয়েটা চুল কাটে, সে।”
“সেলুনে গিয়ে চুলটা শেপ করাতে গেলে বড্ড বেশি খরচ পড়ে,” বলেন অরুণা, “তাছাড়া গতবার ওখান থেকে বেরোবার সময়য় মেয়েটা বলেছিল, ওর অভাবের সংসারে সেলুনের বাইরে এই টুকিটাকি কাজগুলো করলেও অনেকটা সুরাহা হবে। তাই...”
কথাগুলো ইতিমধ্যেই মধুরিমার কাছে হালকা হয়ে এসেছিল। কারণ, ও প্রথমেই বুঝতে পেরেছিল, জয়া এই ঘরে ঢুকেছে অরুণার সঙ্গেই। আর তখন খাটের ওপর খামটা থাকলে দু’জনের কারও না কারও চোখে ওটা পড়তই। তাছাড়া একটা খেটে খাওয়া অভাবী মেয়ে প্রথম কোনও বাড়িতে এসেই একটা খাম নেবে কেন? সে ক্লেপটোম্যানিয়াক হলে আলাদা কথা, কিন্তু সেই সম্ভাবনাটা এতই কম যে ওটাকে বাদ দেওয়াই যায়।
এ বাদে ওই সময়ে বাড়িতে ঢুকেছে ওয়াটার-পিউরিফায়ার সার্ভিসিং করতে আসা একজন, আর হাউজিং সোসাইটির তরফে একজন, যে পরশু আয়োজিতব্য প্রাক-পুজো মিটিংয়ের নোটিস দিতে এসেছিল। এরা বাইরের ঘরে বসেছে, জল খেয়েছে, কিন্তু শোয়ার ঘরে যায়নি।
তাহলে খামটা তার আগেই গায়েব হয়েছে! কিন্তু কীভাবে? আর কেন?
প্রসেস অফ এলিমিনেশনে একে একে সবাইকে বাদ দিতে গিয়ে মধুরিমা এটা পরিষ্কার বুঝতে পারল, যে সময়টায় খামটা হারিয়েছে বলে মনে হচ্ছিল, সেই সময়ের আগেই সেটা খাটের ওপর থেকে অদৃশ্য হয়েছে।
কিন্তু তাহলে সেটা কে নিতে পারে? তার থেকেও বড়ো কথা, সেটা নেওয়ার মতো জায়গায় কে কে ছিল?
প্রথমেই ধরা যাক প্রদীপের কথা। খামটা তাঁর। তিনি নিজেই সেটা নিয়ে থাকলে আবার খুঁজে পাবেন না কেন? বা গিন্নিকে সেটা খুঁজতে বলবেনই বা কেন? তাই তাঁকে এই হিসেবের বাইরে রাখতে হচ্ছে আপাতত।
অরুণাকে বাদ দেওয়াই যায়। কারণ, খামটা তিনি কোথাও রেখে দিলে সেটা এত সহজে ভুলবেন না, আর তারপর এমন মরিয়া হয়ে সেটা খুঁজতেও চাইবেন না।
কিন্তু তাহলে একমাত্র যে মানুষটি বাদ থেকে যাচ্ছে সে তো...
“আচ্ছা দিদি,” খুব শান্ত গলায়, আর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মধুরিমা জানতে চায়, “আরশি আগে বেরিয়েছিল, নাকি প্রদীপদা?”
ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে অরুণা বলেন, “ওরা তো এক সঙ্গেই বেরোল ঘর ছেড়ে। তবে হ্যাঁ, প্রদীপ লিফটে ঢুকে যাওয়ার পর আরশি হঠাৎ দৌড়ে ব্যাগ আর বোতল নিয়েই শোয়ার ঘরে ঢুকেছিল বটে। জুতো পরে ঘরে ঢোকার জন্যে আরশিকে বকেওছিলাম।”
কেউ ঘর ছেড়ে বেরোবার সময় তাকে বকার কথা শুনলে মধুরিমার খুব রাগ হয়। তাই ও ঠাণ্ডা গলায় প্রশ্ন করল, “সেই বকুনি শুনে আরশির কি মন খারাপ হয়েছিল?”
প্রশ্নের গূঢ়ার্থ অরুণা বুঝলেন। তিনিও মুখটা গম্ভীর করে বললেন, “না, বকুনিটা ও এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়েছিল। কী এমন হাতিঘোড়া ও ঘরে ফেলে এসেছিল, সেটাও বলেনি। তবে বাবা আর মেয়ে যথারীতি গুজ গুজ করতে করতেই লিফট চেপে নেমেছিল।”
গোয়েন্দাগিরি কস্মিনকালে না করলেও মধুরিমার মনে হল, ঠিক কীভাবে গোয়েন্দারা টুকরো টুকরো কথা জুড়ে একটা ছবি তৈরি করে সেটা ও বুঝতে পারছে এবার। আর তাই এতক্ষণ যে ভাবনাটা মাথায় প্রশ্রয় দেওয়ার জন্যে ও নিজেকে অপরাধীর চোখে দেখছিল, হঠাৎ সেই ভাবনাটা ছাড়া অন্য সবকিছু ক্ষীণ হয়ে এল ওর কাছে। তবুও নিঃসংশয় হওয়ার জন্যে ও এরপরের প্রশ্নটা করল, “আচ্ছা, আরশি ঘরে যাওয়ার আগে কি প্রদীপদা আর আপনার কোনও কথা হয়েছিল?”
“সকালে আর আমাদের মধ্যে কথা হয় কোথায়!” দুঃখী গলায় বলেন অরুণা, “তখন তো আমি তুর্কি নাচন নাচছি, আর তিনি কাগজ পড়ে দেশ-কাল নিয়ে মেয়ের সঙ্গে গভীর আলোচনা করছেন। তবে হ্যাঁ, লিফটে ওঠার মুখেই প্রদীপ আমাকে বলে ওই খামটা খুঁজে রাখতে।”
কথাটা বলে নিজেও থমকে যান অরুণা। তারপর একটু থেমে বলেন, “ইন ফ্যাক্ট, ওই কথাটা শোনার পরেই আরশি শোয়ার ঘরের দিকে দৌড় দিয়েছিল।”


দুপ্যাঁ নয়, পরের সিদ্ধান্তটা মধুরিমা আর অরুণা দু’জনেই সেই হোমসিয়ান তত্ত্বটি মেনে নিয়ে ফেলেন। যেটি বলেঃ ‘ওয়ান্স ইউ এলিমিনেট দ্য ইম্পসিবল, হোয়াটেভার রিমেইন্স, নো ম্যাটার হাউ ইমপ্রোবেবল, মাস্ট বি দ্য ট্রুথ।
অর্থাৎ খামটা আরশির কাছে আছে। কিন্তু কেন?
অরুণার মুখচোখ দেখে মধুরিমা বোঝে এবার একটা বিস্ফোরণ হতে চলেছে। জরুরি অবস্থা হিসেবে ও তাই আগে প্রশ্ন করে, “আপনি কি আরশিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ও খামটা দেখেছে কি না?”
অরুণা সরোষে মাথা নাড়লেও মধুরিমার মাথা প্রায় চাচা চৌধুরীর মতো কম্পিউটারের চেয়েও দ্রুত ভেবে চলেছিল, ব্যাপারটা কীভাবে সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু ও বেশি কিছু ভাবার আগেই ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজল।
অরুণাই দরজা খুললেন। প্রদীপ ক্লান্তভাবে ঘরে ঢুকে মধুরিমাকে দেখে একগাল হাসলেন।
ছেলেরা নাকি সংসারের গভীর ব্যাপারগুলো একটু দেরিতে বোঝে। হবে হয়তো। তবে এই সন্ধেয় কিন্তু প্রদীপও চট করে বুঝে ফেললেন, বাড়িতে কিছু একটা সিরিয়াস গোলমাল হয়েছে। অরুণার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রদীপ জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, “কী হয়েছে?”
মধুরিমা ইতিমধ্যে কিন্তু বুঝে ফেলেছিল, কী হয়ে থাকতে পারে। ও আরশিকে ডাকল। অরুণা ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলেন, কিন্তু চোখের ইশারায় তাকে থামিয়ে মধুরিমা বলে, “আরশি, সকালে বাবা একটা খাম রেখে গেছিল। সেটার মধ্যে যে জিনিসটা ছিল, সেটা কোথায় আছে?”
“আরে সেটা তো আমায় সকালেই ও দিয়ে দিয়েছে,” সোফায় বসে জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে বলেন প্রদীপ, “ও ভেবেছিল জিনিসটা আমার তখনই লাগবে। সেটা আনতে গিয়েই তো মেয়েটা শুধু শুধু বকুনিও খেল।”
মধুরিমা প্রমাদ গোনে। একে তো অরুণা যে সকাল থেকে এই নিয়ে ভেবে ভেবে জেরবার হয়েছেন সেটাকে পাত্তাই দেওয়া হচ্ছে না। তার ওপর জুতো পরে শোয়ার ঘরে ঢোকার জন্যে মেয়েকে দেওয়া ন্যায্য বকুনির পর আরশিই সবার সহানুভূতি পাচ্ছে। এরপর না একটা বিরাট বিপর্যয় হয়!
চটপট পরিস্থিতি ম্যানেজ করার জন্যে ও খুব স্বাভাবিক গলাতেই জানতে চায়, “কী ছিল সেই খামে?”
মুখে কিছু না বলে প্রদীপ একেবারে এল.ই.ডি. ল্যাম্পের মতো উজ্জ্বল মুখে ল্যাপটপ-কেস খুলে অরুণার হাতে একটা কার্ড তুলে দিলেন।
অরুণা যে রাগে কার্ডটা নিতেই চাইছিলেন না, সেটা ঘরে উপস্থিত আর কেউ না বুঝলেও মধুরিমা বেশ ভালোভাবেই বুঝল। কিন্তু চন্দন-রঙা কার্ডটার নিচে লাল সইটা যে ওর মতো অরুণাও দূর থেকে পড়তে পেরেছেন, সেটা বোঝা গেল যখন অরুণার চোখদুটোর মতো গলাটাও জ্বলজ্বল করে উঠল, “তুমি টিকিট জোগাড় করতে পেরেছ?”
মানানসই গলায় প্রদীপও বলেন, “পেরেছি। শো শুরু হতে আর মোটে একঘন্টা। তুমি শিগগিরি রেডি হও।”
স্বামী-স্ত্রীর এই বিশেষ মুহূর্তগুলোয় উপস্থিত থাকলে মধুরিমার খুব অস্বস্তি হয়। তাই ও আরশির দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলে, “এর মানে খামটা তো তোমার কাছেই আছে, তাই না? ওটা নিয়ে কি কিছু করেছ?”
আরশি একদৌড়ে ওর ঘরে ঢুকে স্কুলের ব্যাগটা ঘাঁটতে থাকে।
এর মধ্যেই মধুরিমার নজর পড়ে বসার ঘরে টেবিলের কাচের নিচে দেখতে পাওয়া খবরের কাগজটার দিকে। বা আরও ঠিকভাবে বলতে গেলে তারিখটার দিকে - ৫ই অক্টোবর।
রহস্যটার যেটুকু বাকি ছিল, এবার সেটাও ওর কাছে স্পষ্ট হয়।

একটু পরেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে আরশি, আর লাজুক হেসে মধুরিমার হাতে একটা খাম তুলে দেয়। চন্দন আর গেরুয়া মেশানো রঙের, হ্যান্ডমেড পেপারে বানানো যে খাম নিয়ে এত উলটপালট, সেই খামটা অবশেষে হাতে নেয় মধুরিমা। ও দেখে, খামটার ন্যাড়া গায়ে এর মধ্যেই ফুটে উঠেছে হাতে আঁকা বেশ কিছু কারুকার্য। আর খামটার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে, নানারঙের কাগজ কেটে-জুড়ে বানানো একটা ঝলমলে রঙিন ফুল।
বাহ্‌ রে! ওয়ার্ল্ড টিচার্স ডে-তে নিজের ফেভারিট দিদিমণিকে এমন সুন্দর একটা জিনিস কি আরশি এমনি এমনিই দিতে পারে? তার জন্যে একটা সুন্দর খামও তো চাই!
_____

অলঙ্করণঃ শিমুল সরকার

5 comments:

  1. অনবদ্য ঋজুদা

    ReplyDelete
  2. অনবদ্য ঋজুদা

    ReplyDelete
  3. dada ami tilak road e deshpryo park er pichonei porate jetam,pujo asa aar oi jaygatar barnona..apnr lekhata pore onek din age pouche gelam,darun..khub khub bhalo..

    ReplyDelete