গল্পঃ গিফট - মৌসুমি চট্টোপাধ্যায়



কিকুর জন্মদিন জানুয়ারির চব্বিশে। এ বছর তার কেকের ওপর আটখানা ক্যান্ডেল বসবে। এটা কিকুর হিসেবে আছে। কিকু জানে গ্র্যামি মানে মাম্মার মা, আগেরদিন রাত বারোটা বাজলেই স্কাইপ করবে পুনে থেকে। অত রাতেও সুন্দর করে লিপস্টিক আর কাজল পরা। কেমন বাচ্চা মেয়েদের মতো গলা করে হ্যাপি বার্থ ডে সং গাইবে। ক্যুরিয়ারে পাঠিয়ে দেবে টয়, না হলে গেমস না হয় স্পোর্টস কিট। ঠামিও যে আসবে সকালবেলা সেটাও কিকুর জানাই আছে। নতুন গুড়ের পায়েস আর নতুন জামা নিয়ে। দাদাভাই ট্রেনে চড়ে এত দূর আসতে পারে না। তাই একটা বড়ো ব্রাউন পেপারের প্যাকেট ঠামির হাতেই পাঠিয়ে দেয়। নিজের আঁকা ছবি দেওয়া সুন্দর কার্ড আর গল্পের বই। বাংলা, ইংলিশ দু’ভাষার বই। কিকু সব নিজে পড়তে পারে না। বাংলা বই পাপা পড়ে দেয় মাঝে মাঝে। ইংলিশগুলো মাম্মা।
বার্থ ডেতে স্কুল খোলা থাকলে যেতেই হয়। মাম্মা না হলে খুব রাগ করে। ফ্রেন্ডদের জন্য গুডি ব্যাগ আর সুইটস্ নিয়ে যায়। রিসেসের সময় সিস্টার পার্ল সবাইকে ডেকে বার্থ ডে সং গাইতে বলে। তারপর সন্ধেবেলা পাপা আর মাম্মার সাথে ক্লাবে যায়। ওদের কমপ্লেক্সের বন্ধুরা, পাপা-মাম্মার বন্ধু আর তাদের চিলড্রেনদের নিয়ে পার্টি হয়। কতরকম গেমস হয়, ম্যাজিক শো, পাপেট শো, বাউন্সিং মিকি… দারুণ মজা। বাড়ি ফেরার সময় গাড়িতে জায়গা হয় না এত এত গিফট!
কিকুর মন খুব খারাপ। এবারের বার্থ ডেতে মাম্মা নেই। সিক্স মান্থসের জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে অফিসের কাজে। গ্র্যামি আসবে কয়েকদিন পরে। একমাস থাকবে কিন্তু এখন কিকু, পাপা আর দুলালদাদাই আছে বাড়িতে। মাম্মা অনেক অনেক গিফট কিনে দিয়ে গেছে। পাপাকে বলে গেছে এবারের পার্টির থিম হবে মিনিয়ন। সবাই মিনিয়ন টি-শার্ট, মিনিয়ন ক্যাপ পরবে। কেকটাও মিনিয়নই হবে। তিন-চারজন আঙ্কল মিনিয়ন সেজে খাবার সার্ভ করবে। পাপা তো এসব ভালো পারে না, তাই বলেছিল, “এসব আমার দ্বারা হয় না মিলা, এসব বাদ দাও এবারে। তুমি ফিরে এলে আমরা সেলিব্রেট করব না হয়।”
মাম্মা রেগে গেল। বকা দিল পাপাকে। বলল, “তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না কুশল। বার্থ ডেতে সেলিব্রেট না করে পরে করলে মোটেই তেমন মজা হয় না। কী বল্, কিকু?”
কিকুও অমনি ঢক ঢক করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে দিল।


একটা বড়ো ফিল্ডে অনেকগুলো মিনিয়নের সাথে কিকু আর তোজো খেলছে। একটা বড়োওও হট এয়ার বেলুন উড়ে যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। গ্র্যামি গান গাইছে, ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু কিকু…’
“কিকু, আর কত ঘুমোবি? ওঠ ওঠ।” পাপা ডাকতে কিকু ধড়মড় করে উঠে বসতেই পাপা একটা বেয়ার হাগ করে কিসি দিল। "হ্যাপি বার্থ ডে বলব না রে। শুভ জন্মদিন বলছি। ওই  দেখ কে এসেছে!”
ঠামি দাঁড়িয়ে আছে একমুখ হাসি নিয়ে। কিকু দৌড়ে গিয়ে ঠামিকে জড়িয়ে ধরল। ঠামিও খুব আদর করে দিল কিকুকে। ব্রাশ করে, চান করে এল কিকু। ঠামি এবারে কী সুন্দর একটা টি-শার্ট এনেছে! রেড কালার আর বুকের কাছে কী একটা অ্যানিমেলের ছবি। খুব ফানি দেখতে।
“এটা কী অ্যানিমেল পাপা?” চামচ দিয়ে পায়েস খেতে খেতে কিকু প্রশ্ন করল।
“ওরে কিকু, এ হল হাঁসজারু।” পাপা হেসে উঠে বলল। "দেখ এর হাফটা হাঁস আর বাকিটা শজারু।”
“মানে ডাক আর পর্ক্যুপাইন? ওরা কেমন করে জুড়ে গেল?” কিকু জিজ্ঞেস করল।
অমনি ঠামি আর পাপা কেমন একসাথে বলল, “হাঁস ছিল, শজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
                                          হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানি না।
...হা হা হা…”
তারপর ঠামি দুটো বই বার করে দিল। কী মজার নাম! আবোল তাবোল আর হ য ব র ল। পাপা ওর দিকে তাকিয়ে এবার জিগ্যেস করল, “কিকু শোন, এবারে যদি আমরা একটু অন্যরকম করে তোর জন্মদিনটা কাটাই কেমন হয়?”
“পাপা, স্কুল?”
“গুলি মার স্কুলকে, চল্ কেটে পড়ি।”


গাড়িটা সাঁ সাঁ করে ছুটছে। কখন শহর ছাড়িয়ে এসেছে ওরা। বড়ো বড়ো বাড়ি-দোকান আর দেখা যাচ্ছে না। মাঠের পর মাঠ সবুজ আর হলুদ কার্পেটের মতো। ছোটো ছোটো মাটির বাড়ি। নাংগু-পাংগু বাচ্চারা হাঁ করে গাড়ি দেখছে। বক উড়ে যাচ্ছে। পেছনের সীটে কিকু আর ঠামি। পাপা আর দুলালদা সামনে। পাপা গাড়ি চালাতে চালাতে সব চেনাচ্ছে কিকুকে। ঠামি কমলালেবু ছাড়িয়ে দিচ্ছে। একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চা আর পটল বিস্কুট খাওয়া হল। মাম্মা থাকলে কিছুতেই খেতে দিত না।
“কিকু, প্রতিবছর জন্মদিনে তোকে সবাই গিফট দেয়। এবারে তুই সবাইকে গিফট দিবি। দেখবি তাতে কত আনন্দ!” বলতে বলতে তাদের গাড়িটা একটা নদী পেরলো। তারপর নদীর ধারে একটা সুন্দর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। ওমা! ওই তো দাদাভাই! সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠে একটা চেয়ারে বসে আছেন আর ওঁকে ঘিরে বসে আছে ছোটোবড়ো কিছু ছেলেমেয়ে। কিকুদের দেখে ওরা ছুটে এল।
ঠামি বলল, “এই দেখ, কিকু এসেছে তোদের সাথে দেখা করতে। কিকু, এরা হল পাপুন, বাবলা, টুসি, ডালিয়া… আর এরা রাজুদা, নীলুদা, মণিদি আর এই পুঁচকেদুটোর নাম গজা আর টিপু।”
আস্তে আস্তে ওই বিরাট বাড়ির এদিক ওদিক থেকে আরও কতজন ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এল। এলেন দাদাভাইয়ের মতো, ঠামির মতো কয়েকজন বুড়োমানুষ। পাপা বলল, দাদাভাই আর ঠামির বন্ধুরা মিলে এই বাড়িটা তৈরি করেছে। এখানে যে বাচ্চারা থাকে তাদের যেমন কেউ নেই, ওই বুড়োমানুষগুলোও একা। তাই এরা ঠিক করেছে সবাই মিলে একটা ফ্যামিলি হয়ে একসাথে থাকবে। বড়োরা ছোটোদের লেখাপড়া, গান, আঁকা শেখান আর ছোটোরা বুড়োমানুষগুলোর সাথে গল্প করে, মজা করে, পিঠ চুলকে দেয়, হাত ধরে বেড়াতে নিয়ে যায়।
তারপর আর কী। এদের সবাইকে পেয়ে কিকু আনন্দে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে অস্থির। কেউ কিকুকে সাইকেল চালাতে, পেয়ারা গাছে ওঠা শেখাচ্ছে। কেউ দেখাচ্ছে তার পোষা খরগোস। বিক্রমদাদু ছিপ দিয়ে কেমন মাছ ধরলেন! শেখরদাদু রুমাল আর তাসের ম্যাজিক দেখিয়ে অবাক করে দিলেন। সবাই মিলে নদীর ধারে বসে খিচুড়ি, আলুভাজা আর টম্যাটোর চাটনি দিয়ে দারুণ পিকনিক হল। পাপা অনেক ড্রইং বুক, কালার, ক্রিকেট ব্যাট, চেস বোর্ড আর সফট টয় এনেছিল। বড়োদের জন্য সোয়েটার, চাদর। কিকু একে একে সবাইকে সেসব গিফট নিজের হাতে যখন দিল তখন যে কী ভালো লাগছিল!


পাপা এবার গাড়ি নিয়ে ফিরছে। কিকু বসে আছে চুপচাপ। পাপা জিগ্যেস করল, “কী কিকুবাবু, কেমন লাগল তোমার বার্থ ডে সেলিব্রেশন?”
কিকুর মুখ হাসিতে ভরে গেল, “এই জন্মদিনটা আমার সবচেয়ে ভালো জন্মদিন হয়েছে পাপা।”
_____

অলঙ্করণঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

No comments:

Post a Comment