গল্পঃ হরেন সমাদ্দারের ম্যাজিক - জয়দীপ চক্রবর্তী


।।এক।।


নবীনস্যার যথারীতি আজও দেরি করে ছাড়লেন। ঋক বলেছিল, “স্যার, অঙ্কটা মিলছে না যখন, আজ থাক না। পরের দিন দেখা যাবে’খন।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা। নবীনস্যার অঙ্কটার দিকে চেয়ে যেন ধ্যানস্থ হয়ে বসে রইলেন। বসে রইলেন তো বসেই রইলেন। সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় হাতে ধরা ফাউন্টেন পেনটার কালি শুকিয়ে গেল, তবুও তাঁর সম্বিৎ ফিরল না। এদিকে ঘড়ির কাঁটা দ্রুত পথ হাঁটছে। সুতনু নিশ্চিত ওর বাড়ির কাছে এসে গেছে এতক্ষণে। মাকে বলে এসেছে যদিও, সুতনু এসে গেলে একটু বসতে বলতে। কিন্তু কতক্ষণই বা বসবে। অধৈর্য হয়ে শেষে যদি একা একাই চলে যায় ও। মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠে ঋক। আর বোধহয় দেখা হবে না অমন আশ্চর্য ম্যাজিক।
হরেন সমাদ্দারের কথা ও আগে জানত না। সুতনুই ক’দিন আগে বলেছে ওকে তাঁর আশ্চর্য জাদুর খেলার কথা। সুতনু নিজেও অবশ্য তাঁর খেলা দেখেনি। চেনেও না লোকটাকে। ও আবার হরেন সমাদ্দারের কথা শুনেছে ওর ছোটোকাকার কাছে। সুতনুর ছোটোকাকা দেশে-বিদেশে ঘোরা মানুষ। লেদার গুডসের ব্যবসা। কত দেশ ঘুরেছেন। মানুষ দেখেছেন কতরকম। ঝুলিতে তাঁর হরেক কিসিমের গল্প। কোনও গল্প শুনলে ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তো কোনও গল্প শুনলে হাসতে হাসতে খিল ধরে যায় পেটে। সেই ছোটকা যখন খোলা গলায় হরেন সমাদ্দারের জাদুর খেলার প্রশংসা করেন তখন সে কথা তো মানতেই হয়। সুতনু চোখ বড়ো বড়ো করে বলছিল, “ছোটকা কী বলে জানিস?”
“কী?” আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল ঋক।
“ছোটকা বলে কোথায় লাগে তোদের কলকাতার মস্ত মস্ত সব ম্যাজিশিয়ানের খেলা। হরেন সমাদ্দারের কাছে সব নস্যি।”
“তাই?” ঋকের মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যায়।
“তাই না তো কী?” সুতনু উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে, “ছোটকা বলছে মানে তুই বুঝতে পারছিস না! অন্য জাদুকরেরা তো চোখে ধুলো দেন দর্শকদের, উন্নত প্রযুক্তিরও সাহায্য নেন অনেক সময় চিত্তাকর্ষক সব খেলা দেখাতে। কিন্তু হরেন সমাদ্দারের জাদুর খেলায় কোনও ফাঁকি নেই। যা দেখবি সবটাই আসল, সবটাই খাঁটি।”
এই হরেন সমাদ্দারের ম্যাজিক দেখারই হঠাৎ করে একটা সুবর্ণসুযোগ এসে গেছে সুতনু আর ঋকের। এ-খবর আর সুযোগ দুটোই অবশ্য এসেছে সেই ছোটকারই সৌজন্যে। কালিকাপুর উদয়ন সংঘের উদ্যোগে সমাজসেবী কালিদাস কংসারী মেমোরিয়াল হলে আজ সন্ধে সাড়ে ছ’টা থেকে জাদুকর হরেন সমাদ্দারের ম্যাজিক শো। প্যাট্রন বলে ছোটকা একটা গেস্ট কার্ড পেয়েছে। দু’জন শো দেখতে যেতে পারে সেই কার্ড নিয়ে। তা তিনি সুতনুকে বলেছেন, “আমি তো হরেন জাদুকরের খেলা দেখেছি কয়েকবার। এবার বরং তোরা দু’জনেই যা। তুই আর ঋক মিলে দেখে আয় সত্যিকারের জাদু প্রদর্শনী কাকে বলে।”
সেই কার্ডটা সুতনু আর ঋক অন্তত পঞ্চাশবার দেখেছে গত তিনদিনে। যতবার দেখেছে বুকের মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি হয়েছে একটা। মাথায় জরির কাজ করা পাগড়ি আর পরনে ঝলমলে পোশাক, কার্ডের ওপরের হরেন সমাদ্দারের রঙিন ছবিটা যেন সম্মোহিত করে দিচ্ছিল তাদের।


ঋক বাড়ি ফিরল যখন ঘড়ির কাঁটা সওয়া পাঁচটা ছাড়িয়ে গেছে। সুতনু বসেছিল মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে। ঋককে ঢুকতে দেখেই বলে উঠল সুতনু, “এত দেরি করলি তুই? এদিকে এমন গন্ডগোল যে ম্যাজিক শোটা দেখতে পেলে হয়।”
“কেন, কী হয়েছে?” একরাশ উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করে ঋক।
“কদমতলার মোড়ে বেলার দিকে কী একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে আজ। ওদিকের সব গাড়ি বন্ধ। নো বাস, নো অটো।”
“সে কী রে! তাহলে যাব কী করে?” মাথায় হাত দিয়ে বলে ঋক।
“কী করে আবার? হন্টন!”
“হেঁটে যেতে তো অনেকক্ষণ লেগে যাবে রে, প্রায় চল্লিশ মিনিট! এখনই তো সাড়ে পাঁচটা বাজে।” নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকায় ঋক।
“সেইজন্যেই তো তাড়া দিচ্ছি তোকে,” মুখ ভেংচে বলে সুতনু, “দেরি না করে চল। নাহলে পৌছনোর আগেই শো শুরু হয়ে যাবে।”
রাস্তায় বেরিয়ে আর একবার হাতঘড়ির দিকে তাকায় সুতনু। মাথা নেড়ে বলে, “বড্ড দেরি হয়ে গেল রে, ঋক। এক কাজ করি চল। পাকা রাস্তা ধরে না গিয়ে আমরা বরং দীনবন্ধুদার দোকানের পাশ দিয়ে যে সরু পায়ে হাঁটা রাস্তাটা রেললাইন টপকে কালিঝোরার জঙ্গলের দিকে চলে গেছে ওদিক দিয়ে চলে যাই। সময় আর পথ অনেকটাই কম হবে ওই রাস্তা দিয়ে গেলে।”
“কালিঝোরার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকবি এখন, এই অবেলায়?” থতমত খেয়ে বলে ঋক।
“অবেলা আবার কী!” ভরসা দেয় ওকে সুতনু, “গরমের বেলা। সন্ধে হতে প্রায় সাতটা। তাছাড়া জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তাটা নির্জন ঠিকই, কিন্তু চলার একেবারে অনুপযুক্তও তো নয়। অন্য লোক যদি ওই রাস্তায় ঢুকতে পারে, আমরা পারব না! আমরা কি অতই ভীতু নাকি? ছোটকা কী বলে জানিস?” দীনুদার দোকানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বুক চিতিয়ে বলে সুতনু।
“কী বলে?” মিনমিনে গলায় বলে ঋক।
“ছোটকা বলে, ভয় মানুষের মনে। বাইরের জগতে ভয় বলে কিছু নেই। তুই যদি মনে মনে ভয় পেয়ে যাস, গুচ্ছের ভয় পাওয়ানোর জিনিস এসে ঘিরে ধরে ব্যতিব্যস্ত করে দেবে তোকে। আর যদি ভয়টাকে মন থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে চলিস, দেখবি ভয় নিজেই ভয় পেয়ে তোর কাছে ঘেঁষতে সাহসই পাবে না আর। আমি তাই সহজে আর ভয় পাই না আজকাল। তুই কি এখনও ছুতোয়-নাতায় ভয় পাস নাকি?”
এ-কথার উত্তরে তো আর হ্যাঁ বলা যায় না। কাজেই চেষ্টা করে মুখে হাসি টেনে আনল ঋক। সুতনুর দিকে চেয়ে বলে উঠল, “ধ্যাৎ, কথায় কথায় ভয় পাওয়ার মতন অত বাচ্চা আছি নাকি আর আমরা?”
তারপর হাঁটতে লাগল নিঃশব্দে।


।।দুই।।


কালিঝোরার জঙ্গল বেশ ঘন। বহু প্রাচীন গাছ আকাশ অন্ধকার করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই জঙ্গলে। কবে থেকে কে জানে। তাদের গায়ে শেওলা। পরগাছারা তাদের শরীর আশ্রয় করে বেড়ে উঠেছে। উঁচু উঁচু গাছের নিচে ঘন ঝোপঝাড়। নানারকম ফুল ফুটে আছে সেইসব ঝোপেঝাড়ে। দু-একটা লতানো গাছে পাকা লাল টুকটুকে ফল ঝুলে ঝুলে আছে। একটা বুনো জামগাছের ডালে বসে থাকা পাখি ওদের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখতে দেখতে খিক খিক করে ডেকে উঠল। ঋকের মনে হল পাখিটা যেন বিচ্ছিরি আওয়াজ করে হেসে ওদের উপহাস করছে। কড়া চোখে সে একবার তাকালও পাখিটার দিকে, কিন্তু পাখিটা পাত্তাই দিল না তাকে। ওদের গাঁয়ের প্রায় পাশেই যে আঁশশ্যাওড়ার ঘন ঝোপটা, তার মধ্যে থেকে দুটো শেয়াল বেরিয়ে এসে ছুট্টে চলে গেল অন্যদিকে।
পায়ে চলা যে পথটা ধরে যাবার কথা বলেছিল সুতনু, সে পথটা চোখেই পড়ে না প্রায়। শুরুতে রাস্তাটা বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু জঙ্গল ঘন হয়ে যাবার পরে পথ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বলতে গেলে আন্দাজেই এগোচ্ছে এখন তারা। সুতনুর গলাতেও আগের সেই আত্মবিশ্বাসটা এখন আর নেই। সামনের আরও গভীর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে সে এবার কাঁপা গলায় বলেই ফেলল, “ঋক, যদি পথ হারিয়ে ফেলি! এই জঙ্গলের শুনেছি তিনটে মুখ। একমুখে গেলে কালিকাপুরের পথ, অন্য মুখদুটো গিয়ে উঠেছে বারুইপাড়া আর দারিকবাড়ির দিকে। ভুল করে অন্যদিকে চলে গেলে আজ আর কিছুতেই ম্যাজিকটা দেখা হবে না আমাদের।”
“সে তো বটেই, সে তো বটেই।” যে গলাটা বলে উঠল সেটা ঋক নয়।
সুতনু আর ঋক দু’জনেই চমকে উঠল গলাটা শুনে। আর তখনই একেবারে যেন জঙ্গল ফুঁড়ে লোকটা উঠে দাঁড়াল তাদের সামনে। গায়ে একটা রঙচঙে ঢিলে আলখাল্লা আর পরনে চোপা প্যান্ট। প্রথমটা লোকটাকে দেখেই বেজায় ঘাবড়ে গেল দু’জনেই। কিন্তু লোকটা এমন অমায়িক মুখে হাসতে লাগল তাদের দিকে চেয়ে যে ভয়টা ক্রমশ যেন থিতিয়ে এল। সেই লোকটাই কথা বলে উঠল প্রথম, “তোমরা বুঝি দুইবন্ধু মিলে কালিদাস কংসারী মেমোরিয়াল হলে চলেছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।” ইতস্তত ভঙ্গিতে উত্তর দেয় সুতনু।
“কিন্তু এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছ কেন? এ-রাস্তায় তো চট করে কেউ আসে না!” লোকটা ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।
“বাধ্য হয়ে,” ঋক মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, “হরেন সমাদ্দারের ম্যাজিকের আমরা যাকে বলে একেবারে অন্ধভক্ত। কিন্তু আজ রাস্তায় কী একটা অ্যাকসিডেন্টের জন্যে গাড়িঘোড়া বন্ধ। দেরি হয়ে যাবার ভয়ে এই রাস্তা ধরেছিলাম আমরা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সিদ্ধান্তটা ভুল হয়ে গেছে। আমরা বোধহয় পথ হারিয়ে ফেলেছি।”
“আসলে হরেন সমাদ্দারের জাদু দেখা আমাদের কপালেই নেই।” হতাশ গলায় বলে সুতনু।
“মন খারাপ লাগছে?” লোকটা একগাল হেসে জিজ্ঞেস করে।
এ-কথায় হাসির কী আছে ভেবে পেল না ওরা দু’জনে। মনে মনে বরং রাগ হল। ওদের কষ্টে লোকটার হাসি পাচ্ছে!
“মন খারাপ করার বোধহয় দরকার নেই।” লোকটা আবার বলে উঠল হাসিমুখে।
“কী বলছেন আপনি!” প্রতিবাদ করে ওঠে এবার সুতনু, “জানেন, কত বড়ো ম্যাজিশিয়ান উনি? ছোটকা বলেছে…”
“জানি। অনেক লোকেই এ-কথা বলে। কথাটা শুনতে আমারও বড়ো ভালো লাগে। কিন্তু কী করি বলো, আজ যে আমার ওখানে পৌছনোই হল না।”
“মানে!” বিস্মিত ঋক আর সুতনু ভালো করে তাকায় লোকটার মুখের দিকে। কে জানে কেন লোকটাকে যেন বড্ড চেনা চেনা ঠেকছে এখন। কোথায় যেন দেখেছে আগে। হঠাৎ সুতনু পকেট থেকে ছোটকার দেওয়া সেই গেস্ট কার্ডটা একটানে বাইরে বের করে আনল। কার্ডটার দিকে তাকিয়ে রইল খানিক অপলকে। তারপর অবাক হয়ে বলে উঠল, “এ কি, আপনিই…”
“হ্যাঁ। আমিই জাদুকর হরেন সমাদ্দার।”
“আপনি এখন এখানে?” ঋক জিজ্ঞেস করল।
“আমারও যে বড়ো রাস্তা দিয়ে পৌঁছনো হল না। রাস্তা তো বন্ধ। গাড়ি নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তাই আমিও ভাবলাম... কিন্তু এখন শুনছি শোটাই নাকি ক্যানসেল হয়ে গেছে আজ। উদ্যোক্তারা ঘোষণা করেছেন অনিবার্য কারনবশত…”
“ইশ!” হরেন সমাদ্দারের কথা শেষ হবার আগেই আক্ষেপে বলে ওঠে ঋক আর সুতনু। খুব মন খারাপ হয়ে যায় ওদের। এতদিনের আশা, উত্তেজনা... তারপর আজকের এই এত কষ্ট সব, সমস্ত কিছু একেবারে জলে চলে গেল।
ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে হরেন জাদুকর বোধহয় মনের অবস্থাটা পড়ে নিলেন। তারপর বললেন, “মন খারাপ কোরো না। এই তো আমাদের দেখা হয়ে গেল কেমন হঠাৎ করে। এখানে, এই জঙ্গলের গোপন মঞ্চে দাঁড়িয়েই আমি যদি আজ জাদুর খেলা দেখাই কেমন হয় তাহলে? এই খেলায় মাত্র দু’জনই দর্শকই থাকবে আজ। শুধু তোমরা। আর কেউ এই ম্যাজিক দেখার সুযোগ পাবে না। আমার জীবনের সেরা জাদু আজ তোমাদের দেখিয়ে দিয়ে যাব আমি।”
“সত্যি?” আনন্দে ঝকমক করে উঠল ঋক আর সুতনুর চোখগুলো।
“একশো বার।” বলে একটু দাঁড়ালেন জাদুকর সমাদ্দার। তারপর বললেন, “এই পোশাকে কী জাদুর খেলা মানায়?”
“ঠিক।” মাথা নাড়ে ঋক। সুতনুও সমর্থন জানায় তাকে।
হরেন সমাদ্দার আকাশের দিকে দু’হাত তুলে তিনবার তালি মারলেন। তারপর আশ্চর্য গম্ভীর গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “জাদুর পোশাক…”
মুহূর্তের মধ্যে কী জানি হয়ে গেল। হরেন সমাদ্দারের গায়ে ঝলমল করে উঠল রাজপুত্রের মতন উজ্জ্বল চোখধাঁধানো পোশাক। ঋক আর সুতনু একেবারে অবাক হয়ে গেল। এমন ঘটনা তারা দেখেছিল গুপি গায়েন বাঘা বায়েন সিনেমায়। সত্যিই যে এমন ঘটনা বাস্তবে ঘটতে পারে কল্পনাই করতে পারেনি তারা কোনওদিন। স্বতস্ফুর্তভাবে হাততালি দিয়ে উঠল তারা দু’জনেই। জাদুকর হরেন সমাদ্দার কোমর থেকে ওপর দিকটা তাদের সামনে ঝুঁকিয়ে অভিবাদন গ্রহণ করলেন। বললেন, “যে ম্যাজিক কখনও কেউ দেখেনি আমার থেকে, দেখতে পারবেও না হয়তো আর কক্ষনও, তাই দেখিয়ে দিচ্ছি আজ তোমাদের। আমি নিশ্চিত, এই জাদুর খেলা তোমরা ভুলতে পারবে না কোনওদিন।” বলেই তিনি আকাশের দিকে হাত বাড়ালেন। ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই অরণ্যে আলোর বড়ো অভাব। আমাদের অনেকের জীবনেরই মতন।”
“মানে?” অবাক হয়ে বলে ওঠে ঋক আর সুতনু।
“আর একটু বড়ো হলে বুঝতে পারবে তোমরা।” হরেন সমাদ্দার দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, “মানুষের মন অন্ধকারে ভরে গেলে সে আলোকে ঠিকমতন চিনতে পারে না আর। তখন তারও ক্ষতি, সমাজেরও ক্ষতি। এস, আমরা এই অরণ্যে আজ আলোর জন্যে প্রার্থনা করি। নাও, আমার মতন তোমরাও আকাশের দিকে হাত বাড়াও। প্রার্থনা কর যেন কাঙ্ক্ষিত সেই আলো আজ ধরা দেয় তোমাদের কাছে। অন্ধকার মাড়িয়ে তোমরা সেই আলোর পথে যেন যাত্রী হতে পার।”
তাঁর কথায় যেন সম্মোহনের সুর। ঋক, সুতনু দু’জনেই হাত বাড়িয়ে দেয় আকাশের দিকে। আর অমনি আকাশ ফুঁড়ে আলোর ঝর্না নেমে আসতে থাকে গাছের পাতার ফাঁক গলে, গাছের কান্ড গড়িয়ে... লাল, নীল, হলুদ, বাদামি, কমলা, সবুজ নানান রঙের আলো লাফাতে লাফাতে, গড়াতে গড়াতে, উড়তে উড়তে ক্রমশই ঘিরে ফেলে তাদের। আর সেই অদ্ভুত আলোকিত নতুন এক দুনিয়ায় হাজার হাজার পাখি এসে বসতে শুরু করে উঁচু উঁচু গাছের ডালে ডালে। তাদের গায়ের পাশ দিয়ে, মাথার ওপর দিয়ে রঙবেরঙের প্রজাপতি উড়তে আরম্ভ করে, জঙ্গলের শুকনো পাতা মাড়িয়ে ছুটে এসে সামনে দাঁড়ায় হরিণের পাল, ময়ূরের দল। এমনকি একটা প্রকান্ড বাঘ এসেও দাঁড়িয়ে পড়ে হরিণগুলোর গা ঘেঁষেই। অথচ হরিণগুলোর মধ্যে ভয়ের লেশমাত্র নেই। এখানে কোথাও যেন হিংসা শব্দটাই নেই। সকলের জন্যে সকলের শুধু অফুরান ভালোবাসা।
সুতনুর মনে হচ্ছিল তার শরীর যেন কেমন হাল্কা হয়ে গেছে। চাইলেই সে যেন উড়ে বেড়াতে পারবে এখন। আর মনের মধ্যেটাও একেবারে ঝকমকে। ক্লাশে তার সবচেয়ে অপছন্দের সহপাঠী রক্তিমের জন্যেও যেন মন ভালোবাসায় ভিজে উঠছে ক্রমাগত। ঋকের মনেও যেন ভালোলাগা আর ভালোবাসার একটার পর একটা ঢেউ উঠতে শুরু করল। সেই ভালোবাসায় সব খারাপ সুন্দর হয়ে যায়। সব মন্দ আনন্দময় হয়ে ওঠে আপনা-আপনিই।
কতক্ষণ যে এভাবে থাকল তারা কে জানে। হরেন সমাদ্দারের ভারী অথচ সুরেলা কন্ঠস্বরে সেই আলোর জগত থেকে ফিরে এল তারা আবার। হরেন সমাদ্দার দু’জনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “মনে রেখো, এই অনুভূতিগুলো স্বপ্ন নয়, মিথ্যে নয়। এই আলোর ভাবটাই ফুটিয়ে রেখে দিতে হবে জীবনভর। নাহলে মন থেকে ওই আশ্চর্য আলো কিন্তু হারিয়ে যাবে নিজের অজান্তেই। সাবধানে বাঁচিয়ে রেখো এই আলোটাকে। কী, পারবে তো?”
“পারব।” ঘোরের মধ্যেই বলে উঠল তারা দু’জনে।
“চলো, এবারে আমরা যাই। সন্ধে নেমে এসেছে। তোমরা সত্যি বিপদে পড়ে যাবে আরও দেরি হয়ে গেলে।” হরেন সমাদ্দার দু’হাতে দু’জনকে ধরে জঙ্গল মাড়াতে মাড়াতে জঙ্গলের প্রায় কিনারায় চলে এলেন। বললেন, “আর ঠিক দশ পা সামনে হেঁটে গেলেই দারিকবাড়ির মোড়। ওখান থেকেই বাড়ি যাবার অটো পেয়ে যাবে। কালিকাপুরের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ বলে অটোগুলো এখন দারিকবাড়ি হয়েই তোমাদের ওদিকে যাচ্ছে।”
“আপনি যাবেন না?” ঋক জিজ্ঞেস করেন জাদুকরকে।
জাদুকর হাসেন, “আমি তো জাদুবলেই উড়ে যেতে পারি এক নিমেষে। হাওয়ায় হাওয়ায় এই শরীরকে মিশিয়ে দিয়ে।”
“সত্যি?” অবিশ্বাসী গলায় জিজ্ঞেস করে সুতনু।
হরেন সমাদ্দার নিঃশব্দে হাসেন, “দেখ তাহলে। আজ তাহলে এটাই হবে আমার শেষ ম্যাজিক।”
দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে চোখ বুজিয়ে দাঁড়ান তিনি একটা ঝুপসি জলপাইগাছের নিচে। তারপর ঋক আর সুতনুর চোখের সামনেই তাঁর পালক লাগানো জরির পাগড়ি আর ঝলমলে জাদুকরের পোশাক সমেত মিলিয়ে গেলেন আতসবাজির মতন একবার হুউশ করে জ্বলে উঠেই।


।।তিন।।


ঋক আর সুতনু খবরটা পেল দারিকবাড়ির মোড় থেকে অটোয় উঠে। অটোকাকুই তাঁর পাশে বসা বয়স্ক প্যাসেঞ্জারটিকে বলছিলেন উত্তেজিত গলায়, কালিদাস কংসারী হলে আজ খেলা দেখানোর কথা ছিল জাদুকর হরেন সমাদ্দারের। বেলার দিকেই হলে চলে আসছিলেন তিনি তাঁর টিমের কয়েকজন লোককে সঙ্গে করে। স্টেজ সাজাতে নাকি অনেকক্ষন সময়ের ব্যাপার আছে তাঁদের। পথেই কদমতলার কাছে একটা পাঞ্জাব বডি ব্রেক ফেল করে তাঁদের গাড়িটাকে…
খুব আক্ষেপ করছিলেন অটোকাকু। “মস্ত জাদুকর ছিলেন হরেন সমাদ্দার। কীসব খেলাই না দেখিয়েছেন। নিজের হাতে মানুষ কেটে পাঁচ টুকরো করে জোড়া লাগিয়ে দিতেন আবার জাদুমন্ত্রে। কিন্তু লোকটাকে আজ হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময়টুকুও পাওয়া গেল না। এক্কেবারে স্পট ডেথ।”
_____

অলঙ্করণঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

1 comment: