গল্পঃ বল্টু আর হুমদো মেনি - সায়ন্ন্যা দত্তদাশ


সায়ন্ন্যা দত্তদাশ

তখনও ভ্যানটা আপ ডাউন, আপ ডাউন হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশটা কালোপানা। যখন তখন বৃষ্টি এসে যাবে। আর কতদূর রাস্তা ভগবান জানে বাবা। দু’পাশে সারি সারি কলাগাছ। আপল-ঢাপল জমি। দূরে দূরে ধানক্ষেত। অল্প কিছু জংলা গাছপালা আর পানাপুকুর ছাড়া আর তো কিছুই নেই। জামাইষষ্ঠী খেতে এসে এ তো মহাযন্ত্রণায় পড়া গেল! কোমরের কাছটা টনটন করছে। এইরকম রাস্তা! বাপরে! বিয়ের সময় টের পায়নি। ঘুরপথে এসেছিল বাস। আর এ হল সাইকেল ভ্যান। নাচতে নাচতে হাড়গোড় গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার জোগাড় যেন! মনটা খারাপ হওয়া মাত্রই নিজেকে রাবড়ি, মিহিদানার লোভ দেখাল বল্টু। শ্বশুরবাড়ির এ-এলাকায় ওই দু’খান জিনিস সরেস! আহা, জামাইষষ্ঠী যখন তবে তো পেটপুর্তি হবেই। রাবড়ি রাবড়ি ভাবতে ভাবতে খিদেটা চনমনিয়ে উঠল বল্টুর।

ভ্যান থেকে সদ্য নেমেছে বল্টু। নামা যদিও নয়, কোনওক্রমে লাফ দিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে পড়া। গতকালই বৃষ্টি হয়েছে এখানে। গ্রীষ্মকালেও কাদা! ভ্যানওয়ালা বলল, পরপর চারদিন বৃষ্টির পর এইরকম হাল রাস্তাঘাটের। তো সেই কাদাপত্তর বাঁচিয়ে একটু ঘাস ঘাস দেখে নেমে পড়ল বল্টু। সবথেকে ছোটো শালা, ‘জামাইবাবু, জামাইবাবু’ হেঁকে বীরবিক্রমে একরকম ঝাঁপিয়ে পড়ল বল্টুর ওপর। তারপর হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেল ভেতরে। ঢোকার মুখে উঁচু চৌকাঠ। অবশ্যই তাতে ধাক্কা খেল সে। ব্রহ্মতালুর কাছটা টুপ্পু করে ফুলে রইল লুকিয়ে। হাত বোলাতে বোলাতে কাঁচুমাচু চোখে তাকিয়ে রইল সে। শাশুড়িমা গোয়ালঘরে ধুয়ো দিচ্ছিলেন। একগলা ঘোমটা টেনে এসে দাঁড়ালেন জামাইবাবার সামনে। জিজ্ঞেস করলেন, “তা বাবাজীবন, কষ্ট হয়নি তো পথে?”
বল্টু মাথা নেড়ে সলজ্জভাবে ‘না’ জানিয়ে দিল। শাশুড়ি অদ্ভুতভাবে সেটা বিশ্বাস করে নিয়ে একখানা চাটাই পেতে বসতে দিলেন দালানে। উল্টোমুখে একটা হুমদোমতো মেনি বসে রয়েছে। ক্ষিদেয় বল্টুর পেট চাঁ চাঁ করছে। নাক টেনে টেনেও কোথাও কোনও রাবড়ি অথবা মিহিদানার গন্ধ পেল না সে। এমনকি পুকুরের মাছভাজা অথবা চপ বেগুনিও অ্যাবসেন্ট! কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। নিশ্চয়ই পরে ভারী কিছু আয়োজন আছে। এখন তাই ফাঁকা রাখতে দিচ্ছে। ধুনোটুনো দেওয়া হয়ে গেলে সন্ধেবাতি পড়ল। শ্বশুরমশায় বিরাট একখানা গোঁফে তা দিয়ে পাশে এসে বসলেন। জর্দার গন্ধ ম ম করছে চারপাশে। ধুম করে একখানা চাপড় দিলেন পিঠে। গলা হাঁকড়ে বললেন, “কই গো! বাবাজীবনকে জলবাতাসা দাও।”
একে তো ব্যথায় সারাশরীর টনটন করছিল, তার ওপর থাপ্পড় পড়তে মনে হল হাড়গুলো বুঝি সত্যিই গুঁড়ো হয়ে যাবে! জামাই বলে কথা, সবার সামনে তো ‘উফ্‌ আফ্‌’ ঠিক নয়। সেও যতটা সম্ভব গম্ভীর হয়ে খাবারের অপেক্ষায় বসে রইল। মনে মনে ভাবল, এই থাপ্পড় সে সুদে আসলে পুষিয়ে নেবে ঠিক। কেজিখানেকের কমে থামবেই না।

প্রমাণ সাইজের বাতাসাগুলো কড়মড় করে চিবিয়ে খেয়ে ঢকঢকিয়ে দু’গ্লাস জল খেল বল্টু। কোথায় মিহিদানা, রাবড়ি - সত্যিসত্যিই একথালা মুড়ি আর পাঁচ-ছ’টি বাতাসা বৈ কিছুই দেয়নি এরা! কী নিষ্ঠুর! কী নির্দয়! বলে কিনা, আজ নিরিমিষ খেতে হয়। পেট ঠান্ডা রাখতে হয়। বাতাসা-মুড়িতে পেটে থল পড়ে। এই এত পথ ঠেঙিয়ে জলবাতাসা খেতে এসেছে সে! সেই কবে কাল ভোর হবে, তবে হবে খাওয়া? আজ রাতে ভাতের সাথেও নিরিমিষ! জামাই এল, পুকুরের মাছ নেই? দেশি ডিম নেই? তেলকই নেই! কচি পাঠাঁর ঝোল নেই! দই নেই! মিহিদানা নেই! এই হল জামাই খাতির! হুহ্‌! আর কক্ষনও সে আসবে না এখানে।

গিন্নি দিব্যি ঘুম দিচ্ছেন। আধছটাক চাঁদের আলোয় ঘর ভেসে যাচ্ছে। কোথাও একটু মেঘের আড়াল নেই। একপশলা বৃষ্টির পর ফুরফুরে বাতাস আসছে পুকুরপাড় ঘেঁষে। খিদেতে পেট গুড়গুড় করছে বল্টুর। নিরিমিষ খাবারে পেট ভরে কারুর? ওই পাঁচফোড়নের পোস্ত আর আদা-জিরের ঝোল! ম্যা গো! অমন পটলভাজার মুখে নুড়ো জ্বেলে দিই! খালি পেটে ঘুম কি আর আসে, সে যতই বাতাস মিঠে হোক?
সুড়সুড় করে মশারি সরিয়ে নেমে পড়ল বল্টু। কিছু খেতে পেলে হয়। এইভাবে রাতভোর খিদে পেটে শুয়ে থাকা যায়! ঘরের এদিক-সেদিকে কিছু না কিছু থাকবে নিশ্চয়ই। নিঃশব্দে ঘরময় ঘুরে বেড়াল খানিকক্ষণ। কিন্তু নাহ্‌, কোথাও কিসসুটি নেই। খানকয় মাটির পুতুল, নকল ফুল, স্টিলের বাসনকোসন আর বেশ কিছু কাঁথাকুথি গুছিয়ে রাখা তাকে। তা বাদে জাবদা পালঙ্ক, জলের কুঁজো আর চকচকে কাঁসার গেলাস রয়েছে মাটিতে। খাবার বলতে হাওয়াবাতাস ছাড়া কিচ্ছুটি নেই। মনের দুঃখে খিলটা নামিয়ে দালানে নেমে এল সে। দু-তিনটে লম্বা হাই তুলেছে কি তোলেনি অমনি সেই হুমদো মেনিটা পায়ের কাছে এসে ফোঁস করে ‘ম্যাও’ ডেকে উঠল!
তা ঘর পাহারা দিতে লোকে কুকুর-টুকুর পোষে শুনেছি। এ আবার জলজ্যান্ত হোঁতকা মেনি! হুশ হুশ করে দু’বার পা ছুঁড়ল বল্টু। মেনিটা লেজ তুলে কীসব শুঁকে নিয়ে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়ল। বল্টুর তখন মাথার ঠিক নেই। খিদেতে ব্রহ্মতালুর ব্যথাটা পুনরায় চাগাড় দিয়ে উঠল। ছোঃ! এই হল জামাই খাতির! বাতাসা আর নিরিমিষ ভাত? পটলভাজা, আলুপোস্ত! এমন জানলে গোবরডাঙা ছেড়ে আসত সে?
এখন যখন এসে পড়েইছে, রাতটা তো কাটাতে হবে! নিরিমিষ দেখে রাগে এই চারটি ভাত খেয়েছিল বল্টু। ভেবেছিল, বৌ অভিমানটা বুঝবে। তা তিনি বোঝা তো দূর, উল্টে নিজেই অখাদ্যগুলো খেয়েদেয়ে দিব্যি ঘুম দিচ্ছেন! সবই কপালের ফের। নইলে নতুন শ্বশুরবাড়িতে খাবার খুঁজে ফিরতে হয় তাকে!
খেতে বসে শুনেছিল ছোটোশালা মানে ঘনশ্যাম ওরফে ঘনা নাকি জংশন থেকে একহাঁড়ি রাবড়ি কিনে এনেছে। সে গুপ্তধন রান্নাশালেই রয়েছেন কোথাও। খুঁজেপেতে দেখতে হবে। একবার পেয়ে গেলে রাতটা অন্তত কেটে যায়। কায়েতবাড়ির ছেলে চুরি করলে পাপ হয় বটে, তবে কিনা এই যে প্রথম তেমন তো আর নয়! আগেও তো কতবার রাতের বেলা কলাটা, মুলোটা লোকের বাগান থেকে এনেছে-টেনেছে। সমস্যাটা হল, এ হচ্ছে নিজের শ্বশুরবাড়ি। জামাই রাবড়ি চুরি করছেন সে দৃশ্য কি মনোরম হবে? ধরা না পড়লে তো ব্যাপার কিছুই নয়, কিন্তু জানতে পারলে নেহাত নাক কেটে বুঁচিয়ে যাবে। আর এধারমুখো হওয়া যাবে না আর কী!
এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে বল্টু রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে নিজেই টের পায়নি। আহা, পেটের জ্বালা বড়ো জ্বালা। ঘুম অবধি পালিয়ে যায়। কেবল বুক আইঢাই। কেবল উসুখুসু। একটুও স্বস্তি নেই যেন। রাবড়ি না খাওয়া অবধি জীবনে যেন আর শান্তিটি নেই।
এমনিতেই নাকের বেজায় জোর বল্টুর। দূরের দূরের খাবার শুঁকে বলতে পারে কোথায় ভোজ চলছে। সুতরাং সেই নাকখানাই বাগিয়ে ধরে রাবড়ির অনুসন্ধান করতে লাগল বল্টু। রান্নাঘরে আলো তেমন নেই। বরং একটা আবছা অন্ধকারমতো বেশ। অল্প যেটুকু চাঁদের আলো তেরছা হয়ে দুয়ারগোড়ায় পড়েছে, সেটুকুই একমাত্র আলো। ওতেই হাতড়ে হাতড়ে রাবড়ি খুঁজতে শুরু করল সে। খুব সাবধানে কয়েকটা বাসনকোসন নেড়েচেড়ে বুঝল, সে বস্তু এখানে নেই। নাক টেনে লম্বা শ্বাস নিল আরেকবার। নাহ্‌, বাতাসে একটা দুধেল গন্ধ চনমনিয়ে ভাসছে! তিনি কাছেপিঠেই আছেন নিশ্চিত। একটা বড়োসড়ো ঝুড়ি উল্টো করে রাখা আছে চালের বস্তার পাশে। সন্দেহবশত সেদিকে এগোতেই গন্ধটা প্রবল হয়ে নাকে ধরা দিল বল্টুর। ওহ্‌, এ বিরহ আর সহ্য হয় না যেন! কই কই, সে জিনিস? এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে যেই না ওপরে তাকিয়েছে অমনি দেখে মাটির হাঁড়ি সরেস একখান কলাপাতা গলায় ঝুলে রয়েছে শিকের ওপর।
পরম মমতায় হাঁড়িখানা পেড়ে মাটিতে বসতে যাবে সে আর অমনি পেছনের ঝুড়িটায় পা লাগতেই কী যেন একটা জন্তু লাফ দিল বল্টুর গায়ে। প্রাণের মায়া কার না নেই! তবুও হাঁড়ির মায়া ত্যাগ করা কঠিন। বল্টু হাঁড়িসহ লাফ দিল বস্তার গায়ে। আর একটা বেশরকম শব্দ হল তায়। একে চারধার নিস্তব্ধ তায় এই লাফালাফির ফলস্বরূপ বাড়িসুদ্ধু লোক জেগে উঠল দুর্ভাগ্যবশত। বল্টু মনে মনে রামনাম করল। আজ আর রক্ষা নেই তার।  অন্ধকারে চালের বস্তার পেছনে লুকিয়ে সে যতদূর সম্ভব ঠাকুরদেবতার নাম ভাবছিল মনে মনে। হঠাৎ খড়খড় করে জোরদার শব্দ পেল সে। সামান্য একটু উঁকি পেড়ে দেখে সেই হুমদো মেনি লাফালাফি করছে রান্নাঘরে। রাগে, দুঃখে, ভয়ে চোখ বুজে ফেলল সে। আজ বেরুনোর সময় এই আনামুখোটা পিছু নিয়েছিল বলেই যত কান্ড হচ্ছে! একফোঁটা রাবড়ি তো পেটে গেল না, উল্টে কিনা সম্মানটুকুও চলে গেল বলে প্রায়!

হুলস্থূলের মধ্যে কেউ আর নতুন জামাইয়ের খোঁজ করেনি। হুমদো মেনির মুখে কর্তাবাবুর সাধের জিওলমাছ দেখে হাড়েপিত্তিতে জ্বলে গিয়ে সে মেনিকে লাঠিপেটা করে দেশান্তরী করা হয়েছে রাতারাতি। পরের দিন কইয়ের গঙ্গাযমুনা হবে বলেই ঝুড়িচাপা দিয়ে রাখা ছিল মাছগুলো। কিন্তু অত বড়ো ঝুড়ি কী করে মেনি একাই উল্টে দিল, সে কথা উঠতে গিন্নিমা স্বয়ং বলেছেন,  “লোভে কী না হয়! নিশ্চয়ই তক্কে তক্কে ছিল। সুযোগ পেয়েই উল্টে দিয়েছে। এমন হ্যাংলা, লোভীর এ-বাড়িতে স্থান নেই। অতএব দূর করে দাও!”
খানিকবাদে বৌয়ের যখন ঘুম ভেঙেছে, তখন বল্টুর খোঁজ পড়েছে। বল্টু খানিক বাদেই এসে পড়েছে অকুস্থলে। বলেছে, জোর পেয়ে গিয়েছিল আর কী! নইলে এই বনবাদাড়ে যায়!
সেই তালতলা পেরিয়ে উত্তুরের পুকুরপাড়ে রাবড়ির হাঁড়িখানা শেষ করে সবে পুকুরে হাত ধুচ্ছে বল্টু। আকাশে তখনও একটুকরো চাঁদ লেগে আছে। আহাহা, অমৃতের মতো স্বাদ! ভাগ্যিস মেনিটা মাছমুখে দাঁড়িয়ে ছিল দোরগোড়ায়। তাই তো পেছনের দরজা দিয়ে চুপচাপ পালাতে পেরেছিল সে। গুষ্টিসুদ্ধু যখন মেনিকে শাপশাপান্ত করছে তখন বল্টু মহানন্দে রাবড়ি চেটে খাচ্ছে।

ভোরের দিকে শুতে গেল সবাই। বল্টুর তখন চোখ জুড়ে আসছে। বৌ মুখ ফুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে আবার। বল্টু বাইরের দিকে মুখ করে রাবড়ির কথাই ভাবছে, হঠাৎ জানালার বাইরে তীব্র আক্রোশে একটা জোররকম ‘ম্যাঁও’ শুনতে পেল সে। মেনি তো দেশান্তরী! তবে?
মনের ভেতরেও একটা করে মেনি থাকে কিনা, দোষ করলেই ফুঁসে ওঠে। বল্টু নাককান মোলা দিয়ে চুপিচুপি বলল, “মাফ করে দে, বাবা। আমিই চোর একশোবার মানছি। কী করি, পেটের দায় ছিল যে!”
_____

অলঙ্করণঃ শিমুল সরকার

No comments:

Post a Comment