জ্ঞানবিজ্ঞানঃ তবে রে ব্যাটারি - প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়



ব্যাটা ধ্যান ব্যাটা জ্ঞান ব্যাটা শক্তিখনি।
ব্যাটা বিনা আমি যেন সাক্ষী হারা ধোনি।।

সত্যি। ব্যাটারি ছাড়া কি চলে, বলুন? অবাক শক্তিধর এই বীরকে বেশ করে মুঠোবন্দি করে ফেলা গেছে। যেখানেই চলনশীল জড়বস্তু, প্রায় সেখানেই ব্যাটারির অবশ্যম্ভাবী আবির্ভাব। যে-সঞ্চিত শক্তির উপর ভর করে আপনিও অমিত শক্তিধর হয়ে উঠছেন প্রতিনিয়ত তাকে নিয়ে কত কথাই না শোনা যাচ্ছে হাটে-বাজারে। একটু দেখে নেওয়া যাক সেগুলোর কতটা গুজব, কতটা আজব। কোন মিথটা শুধুই রটে আর কোনটা সত্যিও বটে।

মিথ ১. ব্যাটারি প্রতিবারে সম্পূর্ণ ডিসচার্জ করে ফেললে সেটা কচ্ছপের আয়ু পায়।
----->
সত্য ১. পুরোপুরি ডিসচার্জ করে ফেললে লিথিয়াম ব্যাটারির (যেগুলো দেখতে আয়তঘন) কর্মক্ষমতা কমেই যায়। বরং ৪০% থেকে ৭০% অবধি ডিসচার্জ হওয়ার পরে চার্জ দিয়ে নিলে সেগুলোর আয়ু অনেকটা বাড়ে।


মিথ ২. ব্যাটারির চার্জ শেষ? ঘষ ব্যাটাকে জোরে জোরে! কিছুটা শক্তি উদ্ধার করা যাবেই।
----->
সত্য ২. ব্যাটারি জিনিসটা তো কাজ করে রাসায়নিক বিক্রিয়ায়। স্থির তড়িতে মোটেই নয়। ঘষাঘষিতে গরম হওয়ার ফলে বরং সেটার কার্যক্ষমতা কিছুটা হ্রাসই পায়।


মিথ ৩. ঠাণ্ডায় রাখলে ব্যাটারি হেব্বি চার্জ ধরে রাখতে পারে।
----->
সত্য ৩. কথাটা ভুল নয়। কারণ, ব্যবহার না করে ফেলে রাখলে, সাধারণ অ্যালকালাইন ব্যাটারি, মানে যেগুলোয় রিচার্জ করা যায় না, স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এক বছরে মাত্র ২% শক্তি হারায়। আর রিচার্জেবল ব্যাটারি? প্রতিদিনে ২% করে। কিন্তু ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখুন, এক মাস গেলেও নব্বই শতাংশ শক্তি ধরে রাখবে।


মিথ ৪. মোবাইল-টোবাইল কিনলে প্রথমবারে পুরো একশো শতাংশ চার্জ করে নেওয়া উচিত।
----->
সত্য ৪. সেটা করলে যে ব্যাটারিটার আয়ু বেড়ে যাবে তা কিন্তু মোটেই নয়। তবে, যে-যন্ত্রটা ওই ব্যাটারির শক্তিতে চলছে, ধরা যাক মোবাইল ফোন, তার ভিতরে ব্যাটারির শক্তি মাপার যে সফটওয়্যারটা রয়েছে সেটা অনেক বেশি নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে। মানে, ঠিক কত দাগ চার্জ রয়েছে সেটা সঠিকভাবে পরিমাপ করার ক্ষমতাটা বাড়ে।


মিথ ৫. ফোনে গাদা-গাদা অ্যাপস চালিয়ে রেখেছেন, ওতে তো হু-হা করে ব্যাটারি খাচ্ছে!
----->
সত্যি ৫. মোবাইলে এখন বড়সড় গেম চলছে বুঝি? এখন সেটা খেলছেন? তবে তো ব্যাটারির চার্জ কমবেই, দাদা-দিদিরা। তবে যদি ব্যাটারি-বুভুক্ষু অনেক অ্যাপ চালিয়েও রাখেন, কিন্তু আপাতত মেসেজিং-টেসেজিংয়ের মতো নিরীহ কাজ করছেন হয়, তবে মোটেই নেপথ্যে অন্য অ্যাপগুলো কাজ করছে না। আপনার মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেম সেগুলোকে আপাতত ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। অর্থাৎ, সেগুলোর জন্য ব্যাটারির দাগ কমে যাবার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে নেই।


মিথ ৬. জিঙ্গালালা! ব্যাটারির গাড়ি কিনেছি। নো পলিউশন! মানে আমি এখন পরিবেশের পরম সবুজ-বন্ধু।
----->
সত্য ৬. ব্যাটারির গাড়ি ইলেকট্রিক মোটরে চলে, তেল পোড়ানো ইঞ্জিনে নয়। তাই আপনার গাড়ি দূষিত ধোঁয়া ছাড়ছে না বটে, কিন্তু সেই গাড়ির ব্যাটারিটাকে তো চার্জ দিতে হয়। বিদ্যুৎটা উৎপাদন করতে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে কি না সেটা খোঁজ নিয়েছেন তো?
তাছাড়া তেলের গাড়ির মতো আপনার গাড়িও তো রবারের টায়ারে ভর করেই চলে। তাতে রাস্তায় রবারের ক্ষয়ে যাওয়া অংশ বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়েও জল দূষিত করে কিন্তু।
আপনার গাড়ির ব্যাটারিতে রয়েছে সিসা, নিকেল, লিথিয়াম প্রভৃতির মতো বিষাক্ত ধাতু। ব্যাটারিতে চলে বলে গাড়ির আয়ু বেশি হয় না। ব্যাটারির আয়ু তো আরও কম। মানে, সেগুলো বাতিল করার সময় পরিবেশ দূষিত হচ্ছেই।
জানেন তো, একটা ব্যাটারিচালিত গাড়ি তৈরি করতে তেলের গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি পরিবেশ দূষিত হয়। একটা পেট্রলের গাড়ি তৈরি করার সময় সাড়ে পাঁচ টন কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়, আর ব্যাটারির গাড়ি তৈরি করতে প্রায় নয় টন!
_____


No comments:

Post a Comment