গল্পঃ বুবকার নেইমামা - বৈশাখী ঠাকুর


বুবকার নেই-মামা
বৈশাখী ঠাকুর



দুপুরে কিছুতেই ঘুম আসছিল না বুবকার। গরমের ছুটিতে প্রতিবারের মতো এবারও তারা এসেছে মামাবাড়িতে। সারাদিনটা একরকম কাটলেও দুপুরগুলো বড্ড বোর হয় বুবকা। দিম্মা-দাদানের বয়স হয়েছে, না ঘুমোলে চলে না। মাও তার ছোটোবেলার বন্ধু মিতামাসির বাড়ি গল্প করতে চলে যায়। বুবকা পড়ে থাকে একা। দুপুরে ঘুমনোর অভ্যাস তার একেবারেই নেই। আসলে এইসময় যে তার ইস্কুল থাকে। ফিরতে ফিরতে তার পাঁচটা হয়। তাই তার এইসময় ঘুম আসে না। কিন্তু সে একা একাই বা কী করে? চুপিসারে উঠোনে নেমে আসে। জামরুলগাছের ফাঁক দিয়ে খানিক রোদের নক্সা দেখে। খানিক দেখে কাঠবেড়ালিদের দৌড়ঝাঁপ। তাদের আওয়াজ নকলের চেষ্টা করে। ঢিল ছুঁড়ে জামরুল পাড়ে। আর কী করে? আর কী করতেই বা পারে একলা এই তপ্ত দুপুরে? যদি একটা তার খেলার সঙ্গী থাকত। সবার মামাবাড়িতে মামা, মাসি, তাঁদের ছেলেমেয়ে কত কে আছে। কিন্তু মা একমাত্র সন্তান হওয়ায় সে এইসব সুখ থেকে বঞ্চিত। মা অনেক বলেছে, দিম্মা-দাদানকে তাদের ওখানে গিয়ে থাকতে। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে তারা এই ভিটেমাটি ছেড়ে নড়তে চায় না। খানিক এদিক ওদিক করার পর ধীর পায়ে উঠোন থেকে ঘরে ঢোকে বুবকা। কাঁহাতক আর বাইরে গরমে বসে থাকা যায়। আর যা বিতিকিচ্ছিরি গরম পড়েছে!
দোতলায় ওপরে একটা বড়ো হলঘরের মতো ঘর আছে। সেখানে ফুল স্পীডে পাখা চালিয়ে সে নিজে নিজেই বল নিয়ে খেলতে শুরু করল। বুবকা বলটাকে ক্রমাগত মাটিতে বাউন্স খাইয়ে দেখছে একটানা কতবার সে এইভাবে ক্রমান্বয়ে চালাতে পারে একবারও মিস না করে। হঠাৎ বুবকার মনে হল, তার সঙ্গে আরও কেউ যেন একটা গুনছে সে কতবার বাউন্স করাচ্ছে বলটাকে। তারপর মনে হল, হয়তো মনের ভুল। সে খেলায় মন দিল। ক্রমাগত ষাটবার করার পর সে আর পারল না। ওমনি বুবকা যেন একটা বিস্ময়সূচক আওয়াজ শুনতে পেল, যাহ্‌! চকিতে সে শ্যেনদৃষ্টি বোলাল চারদিকে। কই, কোথাও কেউ নেই তো! তাহলে! পরমুহূর্তেই বুবকা দেখল, বলটা আচমকা নিজে থেকে শূন্যে উঠে মেঝে থেকে লাফিয়ে আবার শূন্যে খানিক উঠে ফের মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। অদৃশ্যভাবে বলটাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে। বুবকা সবে ক্লাস ফাইভে উঠেছে। দশ বছর বয়স তার। খুব বেশি বড়ো সে হয়নি। অত সাহসও তার বুকে নেই। তার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। তার কেবল মনে হতে লাগল, সে ছাড়া আর যেন কেউ রয়েছে এ-ঘরে। সে তার অস্তিত্ব বুঝতে পারছে, কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না। বুকটা ঢিপঢিপ করতে শুরু করল। গলা শুকিয়ে এল বুবকার। তারপরেই সে শুনতে পেল কে যেন ঠিক তার পাশ থেকে বলছে, “ধুর, বুবকা! ভয় কীসের! বোকা ছেলে! আমি তো তোমার বন্ধু হতে চাই। তুমি মামাবাড়িতে এসেছ অথচ মজা করতে পারছ না, দেখে আমার খুব খারাপ লাগল। তাই তো তোমার সাথে খেলব, মজা করব, হই-হুল্লোড় করব বলে এলাম। আর তুমি কিনা ভয় পেয়ে গেলে!”
সেই অদৃশ্য বন্ধুটার কথার মধ্যে, গলার মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যে বুবকার ভয় নিমেষে উবে গেল। কেমন হালকা লাগছিল নিজেকে। আনন্দও হচ্ছিল। তার সাথে একটা কৌতূহলও কাজ করছিল।
“তা বন্ধু, তোমার নাম কী?”
“অতীন।”
অতীন নামটা কিঞ্চিত চেনা চেনা ঠেকল বুবকার। তাদের ইস্কুলেও তো কত ছেলের কতরকম নাম আছে। সেখানেই হয়তো শুনে থাকবে। এখন অবশ্য এইসব নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। একটা বন্ধু যে নিদেনপক্ষে জোগাড় হয়েছে, এই না অনেক! তার নাম নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে।
“তা বন্ধু, আমায় দেখা দাও। না হলে তোমার সাথে খেলি কী করে? কোথায় লুকিয়ে আছ বল দেখিনি।”
“না বন্ধু। আমি দিনের আলো সহ্য করতে পারি না। তোমার আমার সাথে খেলতে কোনও অসুবিধে হবে না। তুমি দেখে নিও।”
তাই সই। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। বুবকা খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বন্ধু এত ভাল খেলতে পারে যে বুবকার তার সাথে খেলে সত্যিই ভালো লাগছিল। তার নির্জন দুপুরগুলো নিয়ে আর কোনও অভিযোগ রইল না। উপরন্তু সে অপেক্ষা করে থাকে এমন একটা সময়ের জন্য। কারণ, বন্ধু যে নির্জন নিরিবিলি না হলে তার সাথে খেলতেই আসে না। একটু আড়াল পেলেই সে দোতলার হলঘরে উঠে যায়। ওই হলঘরের প্রতি এখন বুবকার দুর্বার আকর্ষণ। ওই হলঘরই কখনও হয় তাদের ফুটবলের মাঠ, কখনও ক্রিকেটের পিচ, তো কখনও ভলিবলের কোর্ট। স্বাদ বদলাতে ক্যারাম-লুডো-দাবাও বাদ যায় না। অদৃশ্য বন্ধু তো সবেতেই ওস্তাদ। এখন তো মামার বাড়ির মজাই আলাদা। তবে বুবকা দেখেছে তার সাথে সেই অদৃশ্য বন্ধুর অনেক মিল আছে। দু’জনেই ক্রিকেট বেশি ভালোবাসে এবং পছন্দের খেলোয়াড়ও সব এক। এমনকি দু’জনেরই বাঁহাত বেশি ভালো চলে। ক্যারাম খেলার সময় স্ট্রাইকার মারার কায়দাও এক। কেমন অবাক হয়ে যায় বুবকা।
এদিকে ছুটিও ফুরিয়ে এল। আর দু’দিন বাদেই বুবকা ফিরে যাবে তার বাড়িতে। শেষ দু’দিন বন্ধুর সাথে চুটিয়ে খেলে নিতে হবে। কিন্তু সেদিন মায়ের একটু শরীর খারাপ লাগাতে মা আর পাড়ায় গল্পের মজলিশে যোগ দিতে বেরোল না। বুবকা পড়ল ভারি মুশকিলে। বন্ধুর কাছে সে যায় কী করে? তবে মায়ের একটু চোখ লাগতেই বুবকা চুপিসারে উঠে এল ওপরে। কিন্তু  এ তো মা। দিম্মা-দাদান নয় যে কানেও কম শোনে, চোখেও কম দেখে। ঠিক টের পেয়েছে বুবকা ওপরে উঠে কার সাথে কথা বলছে এবং খেলছে বহাল তবিয়তে। এক ফাঁকে ওপরে উঠে এসে আড়ি পেতে উঁকি মারছিল হলঘরে। তখনই হল যত বিপত্তি।
“কার সাথে কথা বলছিস তুই, বুবকা?”
“কই, কারও সাথে না তো!”
“ওমা! আবার মিথ্যে কথা বলছিস!”
“আরে না না, আমি নিজের সাথেই কথা বলে খেলছিলাম। মনে মনে ভেবে নিচ্ছিলাম আর একজন কেউ আমার সাথে রয়েছে। এই ভেবে খেলছিলাম তো!”
“কক্ষনও না। আমি দেখেছি তোর দিকে কে একটা বলটা ছুঁড়ে দিচ্ছে।”
“ধুর! ঘুমের ঘোরে তুমি কী দেখতে কী দেখেছ, তার ঠিকঠিকানা আছে!”
“তুই আমাকে বোকা পেয়েছিস? কোথায়, তোর বন্ধুকে ডাক। একবার দেখি তাকে।”
“ও দিনের আলো সহ্য করতে পারে না। কাউকে দেখা দেয় না ও।”
“বাহ্‌! ভালো গল্প বানাতে শিখেছিস তো! চল, তুই নিচে চল। মাকে সব বলতে হবে। কোথাকার কোন অজানা অচেনা ছেলেকে ঘরে ঢোকাচ্ছিস। কী সাহস রে তোর! দুটো বুড়োবুড়ি এখানে একা থাকে। কিছু হয়ে গেলে তখন!”
নিচে গিয়ে ফের শুরু হল পুলিশি জেরা। দিম্মা–দাদানই শেষে তাকে উদ্ধার করল। দিম্মা জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তোর বন্ধুটার একটা নাম তো আছে? কী নাম বল তো?”
“ও নাম বলেছে অতীন।”
নামটা বলতেই বাড়ির আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে গেল। মা যে কিনা এতক্ষণ খুব রাগ করছিল তার ওপর, সেই মাও কেমন চুপ করে গেল। দাদান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। সজল চোখে তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুই ঠিক শুনেছিস, দাদুভাই?”
“হ্যাঁ গো! ওর সাথে আমার কত মিল গো। আমরা দু’জনেই বাঁহাতে খেলি। ক্রিকেট বেশি ভালোবাসি।”
শুনেই কেমন ডুকরে কেঁদে উঠল দিম্মা। মায়ের চোখের কোনা চিকচিক করছিল। বুবকা তো ভেবে থই পাচ্ছে না যে কী এমন অপরাধ সে করে ফেলল। সে ফ্যাল ফ্যাল করে একবার এর মুখ থেকে ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তারপর কান্নামিশ্রিত গলা থেকে সে যা উদ্ধার করল তা হল যে তার মায়ের একটা যমজ ভাই ছিল। তার মতো বয়সে খেলতে গিয়ে একটা বিষধর সাপের কামড়ে মারা যায়।
দাদান-দিম্মা প্রায়ই বুবকার মতো তার অস্তিত্ব টের পায়। তাই তারা এখান ছেড়ে কোথাও যেতে রাজি নয়। এইসব শুনে বুবকার কিন্তু মনে মনে ভারি আনন্দ হল। যাক, তাহলে তার একটা মামা ছিল! আহা, এখনও আছে তো! বুবকার নেই-মামা। মামাবাড়ি এলেই এবার থেকে নেই-মামার সাথে খেলতে পারবে। পুরনো অ্যালবাম ঘেঁটে মা তাকে তার মামার ছবি দেখাল। বুবকার মনে হল, তার চেহারার সাথে বেশ মিল আছে।
ফিরে যাবার দিন বুবকার তার নেই-মামার জন্য মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। এত সুন্দর একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছিল দু’জনের! কিন্তু নেই-মামা ফিসফিস করে তার কানের কাছে এসে বলে গেল, “আবার আসবে তো ছুটি পড়লেই? তখন আবার আমরা দু’জনে একসাথে খেলব। এখন ইস্কুল গিয়ে মন দিয়ে লেখাপড়া কর। কেমন?”
বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল বুবকা। তার এখন থেকে মামার বাড়ি আসার আকর্ষণই যে আলাদা!
_____

অলঙ্করণঃ সুজাতা চ্যাটার্জী

No comments:

Post a Comment