গল্পঃ অধিকার - প্রতীক কুমার মুখার্জী




শাটারের তালাগুলো গায়ের জোরে টেনেটুনে দেখে নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে, বগলে গোঁজা খবর-কাগজটা বান্ডিল পাকিয়ে লাইটার জ্বালালেন সরকারবাবু। এবার রোজকার মতো দশ মিনিটটাক চলবে হাতজোড় করে রাজ্যের হেভি ওয়েট দেবদেবীগণের আরাধনা। সিকিউরিটির ভার ওনাদের, পরদিন দোকান খোলা অবধি। প্রায় আরতির ঢংয়ে সেই ‘মেকশিফট’ মশাল নাচতে নাচতে তালাগুলি একবার করে স্পর্শ করবে, আর সঙ্গে চলবে মধুর সুরের চড়াই উতরাই - সজলনেত্রে মন্ত্রপাঠ। শেষ হলে ‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব বল দেখি’ ভঙ্গিতে সরকারের অপসারণ সেদিনকার মতো।
রাধাবাজার স্ট্রীটে তার দাদুর তৈরি ছোট্টখাট্টো ছয় বাই সাতের খুপরি ‘মনোরমা ওয়াচ কোং’ বাড়তে বাড়তে আজ হাজার স্কোয়ার ফিটের ঝাঁ চকচকে মনোরমা’জ। ছ’জন স্টাফ নিয়ে ঘড়ি মেরামত থেকে ওভারহলিং, হাল ফ্যাশানের ডিজিটাল থেকে ক্রোনোমিটার লাগানো অত্যাধুনিক ঘড়ি বিক্রি হয় এখানে। দু-তিনখানা বিদেশি ঘড়ি কোম্পানির ডিলারশিপ নিয়ে রেখেছেন সরকারবাবু। বিদেশি বলতে এখনও যে দেশপ্রেমী বাঙালির নালে ঝোলে একাকার অবস্থা, সে কথা ওনার বিলক্ষণ জানা আছে। রাধাবাজারের শয়ে শয়ে দোকানের জমজমাট ঘড়ির বাজারে সরকারবাবুর দোকানের বেশ রমরমা।
রমাপতি সরকার, মনোরমা’জ-এর একাধিপতি, যাকে বলে পাইপয়সা গুনে একান্তভাবে নিজগুণে দাদুর তৈরি দোকানের উন্নতিসাধন করতে করতে আজ এখানে। বলাই বাহুল্য, এসব করতে গিয়ে জীবনে অনেক কাজই করে ওঠা হয়নি। বিয়েও যেমন করা হয়নি, সেরকম নিজের আচার-আচরণ আর চলনেবলনেও আধুনিকতার রুজ পমেটমের প্রলেপ পড়েনি। আজকালকার জিনস, টি, ব্লেজার থেকে সভ্যতার চরম স্তর বারমুডা (দ্বীপপুঞ্জ নয়)-এর মারপ্যাঁচ বোঝেন না তিনি। তিনি আছেন সেই আদ্যিকালের কাছার কাছাকাছি। গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি, ধোপ ভাঙা ধুতি, চকচকে পাম্প শু আর বগলে ছাতা। কুলীন ব্যবসায়ী বন্ধুকূলে তিনি ‘এক্কেবারে যা তা’-র দলেই পড়েন এখনও।
রমাপতিবাবুর না আছে সংসার, না আছে শখ আহ্লাদ, না আছে জামাকাপড়ের নেশা। নেশা বলতে চা। দিনে কম করে তিরিশ পেয়ালা চা পেটে ঢালেন তিনি। খবরের কাগজটিকে রোজ এতবার পড়েন যে দোকান বন্ধ করার সময় সেটিকে জ্বালাতে গেলে মনে কোনওপ্রকার জ্বালা হয় না। তাই ওটি দিয়েই সারাদিন মগজশুদ্ধি আর বাড়ি যাওয়ার সময় মন্ত্রশুদ্ধি। রেডিও টিভির নেশা নেই বললেই চলে। শুধু মোহনবাগানের খেলা থাকলে রমাপতি উসুখুসু, আনচান করতে থাকেন। বাড়ির টিভিতে গুটিকয়েক চ্যানেল টিমটিম করছে। তার মধ্যে খবর, খেলা আর পুরনো বাংলা সিনেমার চ্যানেল। বাড়িতে এক্কেবারে রুটিনবাঁধা খাবারের তালিকা ধরানো আছে হারুর মায়ের কাছে। আর সেটা এতই কাঠখোট্টা যে হারুর মাও মাঝেমাঝে গজগজিয়ে ওঠে, “কী যে রোজ ডাল আলুভাতে চাবাও বুঝি না বাপু। মাছ-মাংস, ডিম কি বাজারে ওঠে না? শাক-আনাজও আনতে পার তো দু’তিন আটি!”
হারুর মা হল রমাপতির গ্রাম সম্পর্কিত পিসি। হারু তার দোকানে কাজ করে, আর তার মা হেশেলটা মোক্ষমভাবে বেঁধে রেখেছে। যতই তিনি দোকানের প্রবল প্রতাপশালী মালিক হন, যতই হারু সহ অন্যান্য কর্মচারীরা তার সামনে থরহরি, পিসি তাকে রেয়াত করে কথা বলে না। বলে বটে, কিন্তু ভালোবাসাটা একেবারেই নিখাদ। তাই তিনি কিছু বলার কথা ভাবতেও পারেন না তাকে। এইভাবেই অনাড়ম্বর জীবন কাটে রমাপতি সরকারের।
এই তো আগের সপ্তাহের ঘটনা। পিসি আবিষ্কার করেছে যে রমাপতির পাঞ্জাবিতে একখানা সিকি সাইজের ফুটো। আর যায় কোথায়? “ও রমা, বাবা এক কাজ কোরো। তোমার তো মেলা টাকা, আর সেই টাকা খাবে ভূতে। তুমি হারুকে মেরে যক বানাও। তারপর সন্নিসি হয়ে যেদিক পানে চোখ যায় বেরিয়ে পড় দিকি। আর যাওয়ার আগে আমায় গ্রামে পাঠিয়ে দিও বাপু।”
সরকারবাবু গোফ চুমড়ে, গলা খাঁকরে, খানিক কনফিডেন্স এনে বলেন, “রমাপতি সরকার এমনি এমনিতর হয়নি গো পিসি। কীভাবে যে বড়ো করেছি দোকানটাকে। বাজে খরচ করলে আজ পারতুম?”
শুনে মুখটা অবিকল ফজলি আমের মতো লম্বা করে সাইরেন বাজাল পিসি, “ইইইইসস, পেটে খাওয়া নেই, বাড়িতে পরিবার নেই, উনি গরুখাটা খেটে মরছেন। টাকা ভরে ভরে জাজিম বানাও একখান। ওতে চড়েই ঘাটে যেও।”
এরপর আর কথা চলে না। সুতরাং রমাপতি রণে ভঙ্গ দিলেন।
কিন্তু এহেন রমাপতি সরকারেরও একখানা জম্পেশ বিলাসিতা আছে। হাল আমলের নয়, বিগত ছাব্বিশ বছর ধরে চলে আসছে এই রুটিন। ঝড়জল, শীত, গ্রীষ্ম কোনওদিন এই অভ্যাসের নড়চড় হয়নি এত বছরে একদিনও। তার দোকান শনিবার আধা বেলা আর রবিবার পুরোপুরি বন্ধ। রবিবার বাড়ি থেকে পারতপক্ষে বেরোন না সরকারমশাই। কিন্তু প্রতি শনিবার তার যেন নিশিতে ডাকার অবস্থা হয়। শ্যামাপোকা যেমন মরণ জেনেও আগুনে ঝাঁপ দেয়, সেভাবে তিনিও ছুটে চলেন তার একমাত্র গন্তব্যে। এ ব্যাপারে তার পার্থিব কোনও কিছুর সাথে আপোশ নেই। নেহাত যদি বিছানা থেকে ওঠার শক্তি না থাকে তবেই। তা সেরকম হয়েছে এই এত বছরে মাত্র সাড়ে তিনদিন!
হেটেই ফেরেন দোকান থেকে রোজ। রাধাবাজার থেকে পথচলতি হাজার হাজার মানুষ এর ভিড়ে পা মিলিয়ে টি বোর্ড, সেখান থেকে রাস্তা, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ পেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ। আবার রাস্তা পেরিয়ে ইডেন হসপিটাল রোড ধরে কলেজ স্ট্রীট পাড়ায় ফিরে বাড়িতে কড়া নাড়তে তার লাগে পাক্কা চল্লিশ মিনিট। শুধু ফি শনিবার সকাল থেকেই বাবুর ফুরফুরে মুডের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল সকলে। আড়ে-ঠোরে ফিসফাস চলে পরিচিত মহলে, “আজ যা চাইবার চেয়ে নে। আজ শনিবার, বাবু আজ কল্পতরু!”
তা রমাপতি যান কোথায়? শনিবার দোকান বন্ধ করে একখানি ট্যাক্সি ধরে সোজা ভবানীপুরের ‘ফুডিজ গ্যালোর’ রেস্তোরাঁয়। আয়োজন বিশাল কিছু নয়। দুটো চিকেন কবিরাজি, তার সাথে ডবল ডিমের একটা বাদশাহি পোচ আর কুরকুরে, মশলাদার, ধোঁয়া ওঠা মোটা মোটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সাথে এক কাপ কড়া ব্ল্যাক কফি। সরকারবাবুর নিজের ভাষায়, “ভয়ানক টেস্ট, এ জিনিস আর কোত্থাও মিলবে না ভূভারতে!” শুধু এইটুকুর জন্যে ছাব্বিশ বছর ধরে রমাপতির মনপ্রাণ দুই ভাগ। একদিকে এই রেস্তোরাঁ আর একদিকে সারা দুনিয়া। আগে ছিল সাদামাটা একটা ছোট্ট হোটেল। নাম ছিল ‘খাওয়াদাওয়া’। মালিক ভুজঙ্গ লাহিড়ী মশাইয়ের সাথেও দোস্তি হয়ে গেছিল, আর নিয়মিত যাতায়াত হেতু বেয়ারাদের সাথেও।
আগে এই হাল ফ্যাশনদুরস্ত রেস্তোরাঁ ছিল কালিপড়া একটি হলঘর। সেখানে তেলকালির ফেসপ্যাক মাখা পুরনো লম্বা ডাঁটিওয়ালা পাখার নড়বড়ে চক্কর। জোরে চললে মনে হত যেন জটায়ু বনাম রাবণের মিড-এয়ার কমব্যাট চলছে। চেয়ারগুলো ল্যাগব্যাগ করত। ভুজঙ্গবাবুও হাতপাখা হাতে বেয়াড়া বেয়ারাদের চোখ গরম করতেন। তখন বেয়ারাদের বয় বলার দস্তুর ছিল। আর লোকে এসে দু’চার পয়সায় প্রায় লাঞ্চ সেরে ফিরত। কাচি সিগারেটের টিন নিমেষে খালি হয়ে যেত, আর চপ-কাটলেট সহযোগে চলত রাজা-উজির মারা, নির্ভেজাল আড্ডা।
তবে এখন বয়রা আর বয় নেই। ভ্রূ নাচিয়ে ‘হ্যালো’ বা ‘এক্সকিউজ মি’ বললেই তারা সব কাজ করে দেবে, আর ‘স্যার’ আর ‘ম্যাডাম’-এর সুনামিতে আপনি হাবুডুবু খাবেন। সময়ের সাথে সাথে সব পাল্টেছে। পাল্টায়নি শুধু খাবারের অসাধারণ স্বাদ। লাহিড়ীবাবু এখন কাউন্টারের অনেকটা উপরে বসেন, ফটো ফ্রেমের ভেতর। চারদিকের কালিমা টেম্পার হারিয়েছে ডিসটেম্পারের পরতে। পাখার বদলে ফিনফিনে এসির শিরশিরে বাতাস, কাউন্টারে কোট-প্যান্ট আর বো পরিহিত চটপটে ক্যাপ্টেনের কাপ্তেনি, আলো, কাচ, সঙ্গীতে আপাদমস্তক ভোল পালটে ‘খাওয়াদাওয়া’ আজকের ‘ফুডিজ গ্যালোর’। ভুজঙ্গবাবুর ছেলে ঝকঝকে পোষাক আর হলিউডি বোলচালে গাড়ি হাঁকিয়ে মাঝেমধ্যে মালিকানা জাহির করে যান। দেখে কেন জানি না, এক অজানা বিরক্তিতে বিব্রত হন রমাপতিবাবু।
তাও যেন রমাপতির সব্বাই চেনা। প্রতিটা টেবিল-চেয়ার, প্রতিটা মানুষ, সবকিছু। আর সেজন্যেই এখানে এলে তার মনে হয় এখানে তারই রাজ্যপাট চলে। তিনি ঢুকে তার নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলেই কুকের কাছে খবর চলে যায়, ‘টাইমবাবু টেবিলে এসে গেছে, খাবার রেডি কর।’ এটাই রমাপতির অধিকার। আর তাকে কোনোদিন হাত তুলে ন্যাকা সুরে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে আলাদা করে অর্ডার দিতে হয় না। এটা ভেবে আত্মশ্লাঘার জেরে সোডার মতো ফিনকি দিয়ে উঠে আসা আনন্দ সংবরণ করেন। বসে বসে ভাবেন, বন্ধুরা কত বলে রোল, পিৎজা, মোমো, বার্গার, আর কেন্টাকির বুড়োর মুরগিভাজার কথা। কিন্তু ওসব দোকানে গিয়ে অজ্ঞাতকুলশীলদের মতো লাইন দিয়ে খাবার কিনতে পারবেন না তিনি। ওতে মজা নেই। বরং ছাব্বিশ বছর ধরে তৈরী করা তার এই ইমেজ অনেক গুণে রাজসিক, ওজনদার আর সম্মানের। হয়তো আধুনিক খাবারগুলি অনেক বেশি সুস্বাদু, কিন্তু তিনি ‘ইচ ম্যান হ্যাজ হিজ ওন ব্র্যান্ড’-এ বিশ্বাসী।
কিন্তু সেদিন যা ঘটে গেল এখানে রমাপতির সাথে, সে কথা ভাবলে আজও রক্তচাপ বেড়ে কান গরম হয়ে ঘাড়-মাথা দপদপানি শুরু হয়ে যায়। ওই ঘটনার পরে ওখানে গিয়ে রীতিমতো অপদস্থ হয়েছেন তিনি। যদিও কেউ কিচ্ছু বলেনি তাকে। তাও যেন তার মনে হয়েছে যে রেস্তোরাঁর কর্মচারীরা যেন পিটপিট করে তার দিকে তাকাচ্ছে; আবার কেউ যেন মুচকি হেসেও পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। যদিও তিনি ওসবে মন না দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে তার প্লেটের দিকে মন দিয়েছেন, কিন্তু কোথায় যেন একটা তাল কেটে যাওয়ার সুর। কী হয়েছিল সেদিন? জানতে চাও? শোন তবে...
সেদিন তিনি ট্যাক্সি থেকে নেমে লোভাতুর চোখে রেস্তোরাঁর দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে ভাড়া মেটাচ্ছেন, এমন সময়ে উড়তে উড়তে এক ব্যাটা কাকের হঠাৎ করে পেটে মোচড় দিয়ে উঠল। ফলে টাটকা গরম বস্তুটি সরকারবাবুর গাল ছুঁয়ে পাঞ্জাবীর বুকপকেটে আছড়ে পড়ল। রমাপতি একদিকে ধার্মিক আবার একদিকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভীরু পুরুষ। তাই এটা হবার সাথে সাথেই তার মনে হল, শনিবারের বারবেলায় আমার এ কী শনির দশা? ভাড়া মিটিয়ে রেস্তোরাঁর দরজা দিয়ে ঢোকা থেকে ওয়াশরুম অবধি অন্তত ছ’জনকে তার এই অবস্থা হবার শো-কজ করতে হল। এমন ব্যাপার যেন তারই দোষ। তিনি কেন ওই সময় কাকের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন! হাড়ে হাড়ে টের পেলেন পরিচিতির বিড়ম্বনা। ভালো করে পরিষ্কার হয়ে এলেন তিনি। আর কিছুক্ষণের ভেতরেই এসে হাজির হবে তার স্পেশাল অর্ডার। আনন্দে গান ভাজতে লাগলেন রমাপতি।
অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি ভিড় ছিল সেদিন ফুডিজ গ্যালোরে। আর তাই তার টেবিলের জন্য মিনিট কুড়ি অপেক্ষা করতে হল রমাপতিবাবুকে। মেজাজটা একটু যেন খিঁচড়েই গেল ওনার। বারবার মনে হতে লাগল, দিনটা বোধহয় খারাপ যাবে। টেবিল খালি হতে একজন তাকে প্রায় হাত ধরে নিয়ে বসিয়ে দিল। তিনি বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব করতে লাগলেন, ‘হু হু বাবা, আমি হলাম গিয়ে, যাকে বলে রেগুলার কাস্টমার!’ কিন্তু দিনটা সত্যি ছিল অন্যরকম। গুছিয়ে বসার পরেই ব্রহ্মতালুর উপর থেকে বজ্রগর্ভ মেঘের ডাকের মতো, “এক্সকিউজ মি, ক্যান আই জয়েন ইউ?” শুনে উপরে তাকিয়ে অন্ততপক্ষে সাড়ে ছ’ফুটের পেশীবহুল চেহারাটা দেখে মুখে কথা সরল না সরকারবাবুর। কলের পুতুলের মতো ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলেন। মানে, বাধ্য হলেন তিনি। হাতের ট্রেতে করে নিজের খাবারটি বয়ে নিয়ে এসেছে এই খোকা দৈত্যটি। সেটি টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে বসে পড়ল সে। মাথার চুল জাপানি সুমো কুস্তীগিরদের মতো করে বাঁধা, বুক অবধি বিশাল দাড়ি, সারা গায়ে উল্কির ভেলকি, কানে ‘সঙ্গীত-ঠুলি’, আর চেহারার কথা কী বা বলার? হিউম্যান এনাটমিতে যত রকমের পেশী আছে, সব যেন তিনগুণ ফুলে উঠে তার দিকে ড্যাবডেবিয়ে তাকিয়ে আছে। বিন্দুমাত্র নড়াচড়ায় যেন কিলবিলিয়ে উঠছে।
এমন সময়ে রেস্তোরাঁর সামনে রাস্তার উপর গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ। আর তার সাথে ঝনঝন করে কাচ ভাঙার বিকট শব্দে ক্যাপ্টেনরা তাদের দলবলসহ বাইরে ছুটল সরেজমিনে তদন্ত করতে। কাস্টমাররা তো বসেই আছেন, খাচ্ছেন। ততক্ষণ যদি বাসি ইডলির মতো স্বাদহীন জীবনে একটু সুস্বাদু টাকনা জোটে, মন্দ কী? রেস্তোরাঁর ভেতরে সবাই একটু নড়ে বসে আবার গল্পগুজব আর খাওয়াদাওয়ায় মন দিল। এই পুরো সময়টা ধরে রমাপতি খোকা দৈত্যকে হাঁ করে দেখছিলেন। কিন্তু তাকে দেখা শেষ করে যেই তার চোখ আস্তে আস্তে টেবিলের উপর নেমে এল, তার পিলেটা যেন তড়াক করে তুড়িলাফ খেয়ে গলা অবধি উঠে এসে আবার নিজস্থানে ফিরে গেল। ছেলেটি যে তার প্লেটটাই নিয়ে এসেছে! আর শুধু তাই নয়, গানের তালে তালে মাথা নাড়াতে নাড়াতে আয়েশ করে সসে ডুবিয়ে একটা একটা করে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে শুরু করেছে!
এখন উপায়? পা ছড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে হল তার। কাউন্টারে কেউ ফিরে আসেনি। ‘এক্সকিউজ মি’দের একটাকেও দেখা যাচ্ছে না। এদিকে স্লোলি বাট শিওরলি তার মুখের গ্রাস, তার একান্ত প্রাণপ্রিয় খাবার একটি একটি করে দাড়ির ঘন জঙ্গল পেরিয়ে সেঁধিয়ে যাচ্ছে রাক্ষুসে হাঁয়ের ভেতর। গরম সুস্বাদু আলুভাজার সাথে টমেটো সসের অতুলনীয় যুগলবন্দী ছেলেটির মুখে এক তূরীয় অনুভূতি এনে দিল। পরম আবেশে চোখ বুজিয়ে ফেলে খাবারটার আনন্দ নিতে লাগল সে। আর নিতে পারলেন না রমাপতি। তার খাবার, তার টেবিলে বসে, তার সামনে একটু একটু করে সাবাড় করবে কেউ এটা হতে পারে না। এ হতে দেওয়া যায় না। হোক সে রাক্ষস। তিনিও আজ তার অধিকারের জন্য লড়ে যাবেন। যা থাকে কপালে।
ছেলেটির একটি ফোন আসতে খাওয়ায় বাধা পড়ল একটু। রমাপতি যেন একটু শান্তি পেলেন। কিন্তু তারপর যা হল তাতে তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন তার রক্তচাপ এক ধাক্কায় ঠিকরে উঠেছে। ঘাড়টা দপদপ করতে লাগল আর বিনবিনিয়ে ঘেমে উঠলেন তিনি। ছেলেটি তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে এক নম্বর কবিরাজি উদ্দেশ্য করে ছুরি কাঁটাচামচ বাগিয়ে ধরেছে! কবিরাজি কেটে (নাকি রমাপতিবাবুর কলজের এক টুকরো?) মুখে পুরে আবার আরাম করে চোখ বুজে চিবোতে লাগল সে।
কী যেন একটা হয়ে গেল। হঠাৎ করে সব ভুলে সরকারবাবুর ভেতরের জানোয়ারটা ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙে প্রচণ্ড রাগে গরগর করে উঠল। যা করার নিজেকেই করতে হবে, কারও কোনও সাহায্য চাই না। যা কোনোদিন স্বপ্নেও করার কথা ভাবতে পারেন না, সেই কাজটি করে বসলেন। ‘যা থাকে কপালে’ বলে স্রেফ হাত বাড়িয়ে প্লেট থেকে একটি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তুলে নিয়ে মুখে দিলেন। ভেতরে ভেতরে কাঁপছিলেন তিনি ভয়ে, উত্তেজনায় আর রাগে। আর নিজেকেই প্রবোধ দিয়ে চলেছিলেন তিনি। ‘হু হু বাবা, আমার সাথে মামদোবাজি? আমিও রমাপতি সরকার, ‘মনোরমাজ’-এর মালিক। এখানে এই রেস্তোরাঁয়, এই টেবিল আর এই খাবারের উপর আমার ছাব্বিশ বছরের অধিকার। হতে পারে আমার বয়স ছাপান্ন, কিন্তু তোমার কাছে আমি হারছি না।’ মনে মনে এসব বলে দ্বিতীয়বার হাত বাড়ালেন তিনি।
যেই আরেক পিস আলুভাজা তুলে মুখের কাছে এনেছেন, তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। ছেলেটির চোখ খুলে গেছে ও সে অদ্ভুতভাবে চেয়ে আছে তার দিকে। বিন্দুমাত্র আমল না দিয়ে খাবারটি মুখে পুরলেন রমাপতি। ব্যাপারটা যে আসলে ঘটছে সেটা যেন বুঝে উঠতে পারছিল না ছেলেটি। তার খাবারের প্লেট থেকে একজন ভদ্রলোক খাবার তুলে নিয়ে খাচ্ছেন, তাও আবার এই অভিজাত রেস্তোরাঁর ভেতর? পাগল-টাগল নাকি? এই সুযোগ পেয়ে রমাপতিবাবু অম্লানবদনে বেশ কয়েক টুকরো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেয়ে ফেললেন। তারপর শুরু হল এক অবাক করা ‘অ-বাক যুদ্ধ’!
কান থেকে পটাং পটাং করে হেডফোন খুলে ফেলল ছেলেটি। তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। কোমরে হাত রেখে এদিক ওদিক তাকাল। কিন্তু ম্যানেজার বা কোনও বেয়ারা এখনও দোকানে ফেরেনি। সে যখন আবার বসল, ততক্ষণে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইগুলো মুড়িয়ে খেয়ে ফেলেছেন রমাপতিবাবু। এতক্ষণে রমাপতিবাবু বেশ সাহস পেয়ে গেছেন। তিনি এবার অন্য কবিরাজিটার কোণা থেকে একটা বড়ো টুকরো ভেঙে মুখে দিতেই ছেলেটি আর পারল না সইতে। সে প্লেটটা তার দিকে টেনে নিয়ে তার শুরু করা কবিরাজিটা খেতে লাগল। সে যে এই ঘটনায় কতটা অবাক হয়েছে, তা তার কপালের ভাঁজ বা উঁচিয়ে থাকা ভ্রূ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
কিন্তু বাঘ যে রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে একবার, তাকে কি আর থামান যায়? নিজের হাত যতদূর ছড়ানো যায় ততদূর ছড়িয়ে দিয়ে প্লেট থেকে পুরো কবিরাজিটাই তুলে আনলেন রমাপতি। ছেলেটি এবার ছিটকে উঠে দাঁড়াল। এবার তার মুখ ফুলে উঠেছে, ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে সে। চোয়াল শক্ত, কিন্তু কিছু করতে পারছে না সে। এই প্রথমবার রমাপতিবাবু ভীষণ মজা পেলেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে মুচকি হাসি মুখে ঝুলিয়ে তারিয়ে তারিয়ে কবিরাজির সদ্গতি করতে লাগলেন। আর তারপরই টের পেলেন আশেপাশের টেবিল থেকে সকলেই খাওয়া থামিয়ে তাদের দু’জনের কাণ্ডকারখানা দেখে চলেছে।
‘কুছ পরোয়া নেই’ বডি ল্যাংগুয়েজ এনে এবার আরও একটা সাংঘাতিক কাজ করে ফেললেন সরকারবাবু। কবিরাজি শেষ হতে প্রচুর কনফিডেন্স এনে কফির কাপ টেনে নিয়ে গরম ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিলেন তিনি। খোকা দৈত্য ধপাস করে বসে পড়ল এবার। আশেপাশের টেবিল থেকে এবার টুকরো মন্তব্য উড়ে আসতে লেগেছে তাদের উদ্দেশ্যে। মোটেই পাত্তা দিলেন না এইসবে। ছেলেটির মুখ দেখে এবার মায়াই লাগছিল রমাপতিবাবুর। কিন্তু এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন... ইত্যাদি ইত্যাদি মেনে আবার হাত বাড়ালেন প্লেটের দিকে। কী করবেন, পোচ যে তার ভয়ানক প্রিয় খাবার! ছেলেটি প্রায় বুকে করে চেপে নিয়ে বসে আছে তার প্লেট। ঠিক যেন লেভ ইয়াশিন আগুয়ান ফরোয়ার্ডের পা থেকে নিশ্চিত গোল বাঁচাচ্ছে। আবার মায়া হল রমাপতির। ভাবলেন কী লাভ হল অত বড়ো শরীরে পেশীকলা দেখিয়ে? নিজেকে ‘বিভীষণ’ সাজিয়ে জোরজুলুম করে তার খাবারটা পেটে পোরার বদ মতলবের কী হল? নেহাত তার সাহস ছিল, তাই নিজের অধিকারে এই রাক্ষসের মুখ থেকে তার খাবার ছিনিয়ে আনতে পারছেন তিনি।
‘ও বাবা, ছোঁড়ার যে দেখি এতেও শিক্ষা নেই!’ এরপরেও রমাপতিবাবু দেখেন ছেলে একহাতে প্লেট আটকে আরেক হাতে চামচ নিয়ে পোচ আক্রমণ করতে উদ্যত। পোচ তো আর ওভাবে খেতে পারবেন না, তাই এবার একটু বাড়াবাড়ি করে ফেললেন বোধহয় রমাপতিবাবু। উঠে গিয়ে টেবিলের ওদিকে গিয়ে বোকা দৈত্যর (এই সময়ে তার কনফিডেন্স লেভেল এতটাই বেশি যে ছেলেটির এই নামকরণ অবধি করে ফেলেছেন তিনি।) ঘাড় টপকে পোচের দিকে হাত বাড়ালেন তিনি। ফলে একটা চাপা হুটোপাটি, আর পোচ বেচারা পেট-টেট ফাটিয়ে রমাপতিবাবুর পাঞ্জাবী আর ছেলেটির দাড়িময় ছড়িয়ে পড়ল। আর ঠিক সেই সময় ক্যাপ্টেন ও তাদের টিমের প্রত্যাবর্তন ঘটল।
সে এক সীন বটে! রেস্তোরাঁর মধ্যিখানে পোচমাখা অসমবয়সী দুই যুযুধান পুরুষ জড়ভরতের মতো দাঁড়িয়ে, আশেপাশের টেবিল থেকে খাওয়াদাওয়া থামিয়ে সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে, আর দরজার কাছে ক্যাপ্টেন আর বয়রা পাথরের মতো স্থাণু। পুরো ফ্রীজ শট। না, পুরোটা নয়, কারণ তখনও একজনের দাড়ি থেকে টপ টপ করে হলদে ফোঁটা ঝরে পড়ছে।
পুরো একমিনিট পর, একজন বয় সাহস করে এগিয়ে কাউন্টারের কাছে গিয়ে, খাবারভরা একটা প্লেট ট্রেতে তুলে সেই ‘টাইম টেবিল’-এর দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। খাবারটা খুব সাবধানে টেবিলে রেখে আমতা আমতা করে বলল, “টাইমবাবু, গত সোমবার থেকে আমাদের এখানে সেলফ সার্ভিস চালু হয়েছে। কাউন্টারে টাকা পেমেন্ট করে স্লিপ দেখিয়ে নিজের খাবার নিজেকেই আনতে হবে। আপনি জানতেন না, তাই আপনার খাবারটা রেডি করে রেখেছিলাম। কিন্তু বাইরে অ্যাক্সিডেন্ট দেখতে...” বাকি কথাগুলো আর কানে ঢুকল না রমাপতির। একবার ছেলেটির দিকে, একবার নতুন আনা প্লেটের দিকে, একবার বয়ের দিকে, আর একবার অসহায়ভাবে আশেপাশে সবার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মাথা নামালেন তিনি। এক্ষুনি যদি ভ্যানিশ হবার উপায় জানা থাকত তার! নতুন আনা প্লেটে সযত্নে সাজানো তার ভীষণ পরিচিত খাবার। তার মনে হল, ডবল ডিমের রয়াল পোচটা যেন তার দিকে চোখ নাচিয়ে বিদ্রূপ করছে।
এরপর যা হল বলে লাভ নেই। খোকা দৈত্য আবার তার পশ্চিমা সপ্রতিভতা ফিরে পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অট্টহাসি হেসে ওঠার সাথে সাথেই হাসির রোল উঠল রেস্তোরাঁ জুড়ে। আর লজ্জায় অধোবদন, ঘাড় ঝুলে যাওয়া রমাপতিবাবুকে জাপটে বুকে জড়িয়ে ধরল ছেলেটি। হাসতে হাসতে বলল, “নেভার মাইন্ড ডুড, ইট হ্যাপেনস। কাম, লেটস হ্যাভ আওয়ার ফুড নাও।”
মরমে মরে থাকা রমাপতিবাবুর প্রায় চোখে জল এসে গেছে। তাও জোর করেই তাকে নতুন আসা প্লেট থেকে আধখানা পোচ খেতে বাধ্য করল স্যামুয়েল (এর মধ্যেই আলাপ করে নাম জানিয়ে দিয়েছে সে।), আর রেস্তোরাঁ জুড়ে তাদের দু’জনের এই ‘ম্যাজিক মোমেন্ট’ মোবাইল ক্যামেরায় ধরে রাখতে লাগল সবাই।
রমাপতিবাবু অবশ্য জোর করে দু’জনের বিলটাই দিয়ে এসেছিলেন আর স্যামুয়েলও তাকে ঘটা করে বিদায় জানিয়েছিল সেদিন। খুব একচোট হাসির খোরাক হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। তারপরও দু’তিনবার গিয়েও দেখেছিলেন যে তিনি এখনও হাসির পাত্র হয়েই রয়েছেন। সেদিন আবার ভুজঙ্গবাবুর ছেলে তাকে দেখে মুচকি হেসে, “কী কাকা, শরীর-টরীর ভালো তো? জাঙ্ক ফুড সামলাতে পারছেন তো?” বলে আওয়াজ দিয়ে গেল। ভেবেও দেখেছেন অনেকবার, ও দোকানে আর যাবেন না। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? তার জীবনকালে ওই খাবার ছাড়তে পারবেন না তিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে একটা কিছু করার দরকার।
এখন ‘মনোরমাজ’ শনিবারে পুরো দিন খোলা। তার বদলে সোমবার আধা বেলা বন্ধ। রমাপতির ‘ফুডিজ গ্যালোর’ অভিযান এখন বার বদলেছে। শুধু প্রতিবার সেখানে ঢোকার সময় তিনি একবার মনে মনে আওড়ে নেন, ‘সেলফ হেল্প ইজ...’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কী দরকার বাবা? সাবধানের কি মার আছে?
আর একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাড়িতে পিসি আর গজগজ করে না। হঠাৎ করে যেন রমাপতির অনেক বদল ঘটেছে। তার বাড়িতে রোজই এখন মাছ, মাংস আর ডিমের যাতায়াত লেগে থাকে। ওই যে বললাম না, ‘সেলফ হেল্প... যা দেবে অঙ্গে, তা যাবে সঙ্গে।’
-----

অলঙ্করণঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

3 comments:

  1. গল্পে খাওয়াদাওয়ার এমন দাপুটে উপস্থিতি থাকলে, আর তার সঙ্গে যদি থাকে ভাষা নিয়ে মজারু কারবার, তাহলে সে গল্প ভালো না লেগে উপায় আছে!
    হেব্বি লাগল।

    ReplyDelete
  2. ওঃ একদম কবিরাজি !!

    ReplyDelete
  3. bonfool er kotha mone porie dilen to...darun hoeche

    ন্যাকা সুরে ‘এক্সকিউজ মি’..ei line ta fatafati..darun

    dhanyobaad

    ReplyDelete