জ্ঞানবিজ্ঞানঃ কাগজের সেতু - সুজিতকুমার নাহা



পার্কে বিকেলের আড্ডার মধ্যমণি দাসবাবু। তিনিই আড্ডার সবচেয়ে সিনিয়র সদস্য। পুরো নাম সন্তোষ দাস। নামে অবশ্য কেউই তাঁকে চিনবে না। কেননা, ‘সন্তোষ‘ তলিয়ে গেছে ‘দাসবাবু‘র জনপ্রিয়তার গভীরে। এনিয়ে কখনও সন্তোষবাবুকে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। এলাকায় দাসবংশের বহু সদস্য বিরাজমান থাকলেও ‘দাসবাবু‘ সম্বোধন যে তাঁকে দিয়েছে ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন! কেমিস্ট্রির টিচার সুনীল দের কথায়, সব ক্ষারক যেমন ক্ষার  নয়, সকল দাস পদবিধারীই তেমনি দাসবাবু নন।
দাসবাবু প্রকৌশলী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী প্রাক্তনী। ডিভিসি-র ডাকসাইটে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বছর কয়েক হল অবসর নিয়েছেন। কর্মজীবনে হরেকরকম মেশিনপত্তর ঘাঁটায় আর বিচিত্র লোকলস্করের সংস্পর্শে আসায় অভিজ্ঞতার ঝাঁপিটি কানায় কানায় পূর্ণ।
হালভাঙা নৌকোর মতো বিশুদ্ধ আড্ডার আলোচনাও কোনও নির্দিষ্ট দিকে এগোয় না। বরং এত চটপট চর্চার বিষয় পাল্টাতে থাকে যে তাকে তুলনা করা চলে দ্রুত সঞ্চরমান শাখামৃগের লম্ফঝম্ফের সাথে। অবশ্য আলোচনায় যদি উঠে আসে আকর্ষণীয় বা কৌতূহলপ্রদ কোনও বিষয়, তখন আড্ডা চলতে থাকে সেটিকে ঘিরেই।
ঠিক এটাই হয়েছিল গতকাল। গাছ বাঁচানোর জন্য চিঠিচাপাটির বিকল্প হিসেবে ই-মেইলের পক্ষে জোরালো সওয়াল করছিল সুদীপ্ত সোম। ব্যাঙ্ক-অফিসার সুদীপ্তর মতে, টেলিফোন বিল, বিদ্যুতের বিল, ট্যাক্স ইত্যাদি চেকে না দিয়ে অনলাইনে মিটিয়ে দিলে কাগজ বাঁচে, কাজটাও সমাধা হয় চটজলদি।
আমি বললাম, “মানছি যে কাগজের ব্যবহার কমানো উচিত। তবে ছাড় দিতে হবে লেখাপড়া আর খেলাধুলোর বেলায়।
ত্রিদিব অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কাগজ নিয়ে খেলাধুলো? সেটা আবার কেমন ব্যাপার?”
“কাগজের এরোপ্লেন বানানো, বর্ষার জমা জলে কাগজের নৌকা ভাসানো কিংবা স্কুলে টিফিনের সময় কাগজের বল নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ির মজাগুলো কি বেমালুম ভুলে গিয়েছ?” ছেলেবেলার মধুর স্মৃতি উস্কে দিয়ে জবাব দিই আমি।
ত্রিদিব কাঁচুমাচু হয়ে স্বীকার করল, কাগুজে খেলাধুলোর সেই দিনগুলোর কথা ওর মাথাতেই আসেনি।
দাসবাবু বললেন, “কাগজের বল-টলের কথা শুনে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। কাগজ দিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস বানাতে বলা হয়েছিল আমাকে। কী, সেটা শুনবে? কাগজের সেতু।”
“বাঁশের পুল, কাঠের সাঁকো, কংক্রিটের সেতু, ঝুলন্ত ব্রিজ - এসবের নাম জানি। কিন্তু কাগজের সেতুর কথা তো কস্মিনকালেও শুনিনি!” বিষ্ময় প্রকাশ করল শংকর বিশ্বাস।
“আমিই কি জানতাম! পৃথিবীর কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেই পেপার ব্রিজ নিয়ে পড়ানো হয় বলে শুনিনি। ভেবে পাচ্ছিলাম না কীভাবে কাজটা করব।” দাসবাবুর অকপট স্বীকারোক্তিতে আড্ডার পরিবেশ কেমন যেন রহস্যময় হয়ে ওঠে।
কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে সুনীল শুধালো, “আচ্ছা দাসবাবু, পেপার ব্রিজ তৈরির কথা কে বলেছিল আপনাকে?”
দাসবাবু বললেন, “অদ্ভুত নির্দেশটা এসেছিল একটা চাকরির ইন্টারভিউ চলাকালীন। দুটো দেশলাই বাক্স, একটা ফুলস্কেপ কাগজের শিট ও একটা পেনসিল দিয়ে বলা হয়েছিল বাক্সগুলোকে দু’ধারের থাম মনে করে কাগজটা দিয়ে এমনভাবে একটা ব্রিজ বানাতে যাতে সেটা পেনসিলটাকে বহন করতে পারে।”
আমি আর থাকতে না পেরে বললাম, “ন্যাতপেতে কাগজ দিয়ে পেনসিলের ভার বহন করার মতো পোক্ত পেপার ব্রিজ বানানো আদপেই সম্ভব নয়। ইন্টারভিউ নেবার সময় এধরনের রসিকতা করার অর্থ কী?”
দাসবাবু মুচকি হেসে বললেন, “এটা কিন্তু ঠাট্টা ছিল না। কাঠামোর সহন ক্ষমতা, মানে স্ট্রাকচারের স্ট্রেংথ বিষয়ে চাকরিপ্রার্থীর প্রাথমিক জ্ঞানের ভাঁড়ার যাচাই করার জন্যই প্রশ্নটা করা হয়েছিল। প্রথমটায় প্রচণ্ড ভড়কে গেলেও একটু চিন্তা করার পর তৈরি করতে পেরেছিলাম কাগজের সেতু!”
দাসবাবুর কথায় আমরা সবাই অবাক। কীভাবে এটা সম্ভব হল তা সহজ করে বুঝিয়ে বলার জন্য সমবেত অনুরোধ পেশ করা হল দাসবাবুকে।
দাসবাবু ব্যাখ্যান শুরু করলেন, “ভাবলে অবাক লাগে, স্রেফ আকারগত পরিবর্তন এনেই প্যাতপেতে জিনিসকে পোক্ত বানানো যায়। এর অনেক নজির ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে। আকারভেদে স্টিল শিটের মজবুতির পরিবর্তন খেয়াল করলেই এটা ধরা যায়। বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। ইস্পাতের পাতলা চাদর এত নমনীয় যে মাদুরের মতো গোল করে রাখা সম্ভব। অথচ সেই চাদর দিয়ে বানানো করোগেটেড শিট, চলতি কথায় টিনের শিট এত মজবুত যে টিনের চালের ওপর চড়লেও দুমড়োয় না। এটা মাথায় আসতেই সমস্যা সমাধানের সূত্র গেলাম। আকার পাল্টেই তো কাগজটাকে পোক্ত করা সম্ভব! এরপর আর কী? কাজটা করে ফেললাম চটপট।
সুনীলদা জানতে চাইলেন, “করোগেটেড টিনের মতো কাগজে তো আর ঢেউ তোলা যায় না। শিটটাকে পোক্ত বানিয়েছিলেন কীভাবে?”
“খুবই সহজে। ধুতি কোঁচানোর স্টাইলে পরপর ভাঁজ করে কাগজটাকে করাতের দাঁতের মতো চেহারা দেওয়াতেই সেটা পেনসিল বহন করার মতো মজবুত হয়েছিল। জানালেন দাসবাবু।
ত্রিদিব এতক্ষণ গভীর মনোযোগ সহকারে সেতুচর্চা শুনছিল। এবার সেই মোক্ষম প্রশ্নটাই করল যেটা পাক খাচ্ছিল সবার মনে, “বস্তুকে পোক্ত করা যায় স্রেফ আকার পাল্টে, সেটা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু শেপ চেঞ্জের সাথে স্ট্রেংথের বিশাল পরিবর্তনের কারণটা বোঝা যাচ্ছে না। বেসিক মেটিরিয়ালটা তো একই থাকছে।
দাসবাবু বললেন, “প্রশ্নটা মনে আসা খুবই স্বাভাবিক। টেকনিক্যাল কচকচির মধ্যে না গিয়ে ব্যাপারটা সহজ করে বোঝার চেষ্টা করা যাক। নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, আড়া বা বিম হিসেবে চ্যানেল, জয়েস্ট গোছের যেসব উপকরণ কাজে লাগানো হয় তাদের চেহারা বিশেষ ধরনের। সকলেরই মাঝের অংশের তুলনায় ওপর আর নিচের অংশ বেশি চওড়া। আসলে বক্রন বা বেন্ডিং মোকাবিলায় বিমের মধ্যাংশের চেয়ে ওপর আর নিচের অংশের অবদান অনেক বেশি। বস্তুর উপাদান ঠিকঠাক কাজে লাগানোর ব্যাপারে ইঞ্জিনিয়ারেরা ভীষণ খুঁতখুঁতে। তাই বক্রন কমানোর দাওয়াই হিসেবে বিমের মাঝখানে যতটা সম্ভব কম মেটিরিয়াল রেখে বাকিটাকে ওপর-নিচে পাচার করতে পারলেই তাঁরা খুশি হন। চ্যানেল-ট্যানেলের আজব চেহারার গোপন রহস্য এটাই।
সুনীলদা দাসবাবুকে বললেন, “কাগজের শিটটাকে করাতের দাঁতের মতো আকার দিয়ে আপনি এই পাচারকার্যই হাসিল করেছিলেন, তাই না?”
স্মিত হেসে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন দাসবাবু।
ত্রিদিব মন্তব্য করল, “টাটা সুমো বা মাহিন্দ্রা বোলেরো গাড়ির ছাদে লম্বালম্বি খাঁজ দেখে ভাবতাম, দেখতে ভালো লাগবে বলেই হয়তো ছাদের ডিজাইনটা করা হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। ভারী মালপত্র বইবার মতো পোক্ত করার জন্যই খাঁজযুক্ত ছাদের ব্যবস্থাপনা।”
“আকার পাল্টে পোক্ত বানানোর নজিরটা ভালোই দিয়েছ। শংকর ত্রিদিবের প্রশংসা করল।
দাসবাবু হাতঘড়ির পানে দৃষ্টি হানলেন। ঈঙ্গিতটা আমাদের চেনা। আড্ডার মধ্যমণি এবার ছোট্ট বিদায় সম্ভাষণ দিয়েই গাত্রোত্থান করবেন। দাসবাবুর বিদায়বাণীতে প্রায়শই থাকে চমকের ছোঁয়া। এবার সেটা শোনার জন্য আমরা উৎকর্ণ হলাম।
ত্রিদিবের হাতে ধরা এক লিটারের প্যাকেজড ড্রিঙ্কিং ওয়াটারের বোতলটা দেখিয়ে দাসবাবু প্রশ্ন করলেন, “জল ফুরোলেই তো ওটা ফেলে দেওয়া হবে। তা হলে বোতলটায় এত নকশার বাহার কেন?”
আমাদের চুপ দেখে উত্তরটা বলে দিলেন দাসবাবুই, "আসলে খাঁজটাজগুলো দেওয়া হয় পাতলা ন্যাতপেতে বোতলকে পোক্ত বানানোর জন্য। ওগুলো না রাখলে সামান্য চাপেই বোতল দুমড়ে গিয়ে অসুবিধে ঘটাত।”
দাসবাবু উঠলেন। আমাদের আড্ডার আসরও ভঙ্গ হল।
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment