গল্পঃ বুড়োবুড়ি আর বেড়াল - তাপস মৌলিক




একটা গল্প বলি শোনো। জানি তোমাদের সময় নেই, আমারও রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, তাই সংক্ষেপে বলছি।
এক গ্রামে এক ছোট্ট মাটির কুঁড়েঘরে থাকত এক বুড়ো, এক বুড়ি আর তাদের পোষা একটা বড়ো সাদাকালো হুলো বেড়াল।
সংক্ষেপে বললে দাঁড়ায় – মেটেবাড়ি বুড়োবুড়ি বড়ো সাদাকালো হুলো।
একদিন দুপুরবেলা, বুড়ি উঠোনের রোদে বসে ডালের বড়ি দিচ্ছে, বুড়ো দাওয়ায় বসে বিড়ি ফুঁকছে, এমন সময় হুলোটা একটা মাছের কাঁটা মুখে নিয়ে আয়েশ করে কোনও নিরিবিলি জায়গায় বসে খাবে বলে বাড়ির পাশের বাঁশের বেড়ার ওপর দিয়ে গুটিগুটি হেঁটে যাচ্ছিল।
সংক্ষেপে বললে – বুড়ি বড়ি বুড়ো বিড়ি বাড়ি বেড়া কাঁটামুখে গুটিগুটি চলেছিল হুলো।
সেই দেখে পাশের এক আমগাছে বসে থাকা একটা দাঁড়কাক বিশ্রী হেঁড়ে গলায় আচমকা ডেকে উঠল, ‘কাঃ।’
মানে হল, “বাঃ, বেড়ালটার দেখি বরাত ভালো! মাছের কাঁটা তো আমার জন্য বরাদ্দ, এ ব্যাটা পেল কী করে?”
অর্থাৎ কিনা – এ কাঁটা আমার কাঁটা, তোর নয়, কাঃ
ভালো যদি চাস তবে ফেলে দিয়ে যাঃ!
ওদিকে পাড়ার নেড়িকুকুর ভুলো তখন আমগাছতলার ছায়ায় শুয়ে আয়েশে দিবানিদ্রা যাচ্ছিল। কাকের ওই বিশ্রী ডাক শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে হুলো আর তার মুখে ধরা মাছের কাঁটাখানা দেখেই ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে গেল।
বলতে চাইল – তোর দেখি বাড় বড়ো বেড়ে গেছে, হুলো?
শুনে রাখ, এ কাঁটার হকদার ভুলো।
শুনে হুলো থাবা উঁচিয়ে ফ্যাঁচ করে ভুলোকে এক রামভেংচি কেটে দিল। আর যায় কোথা? ভুলো রেগে টং হয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে একশো কুড়ি ডেসিবেলে ঘেউ ঘেউ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল বেড়ার গায়ে। পাতলা বাঁশের বেড়ার ওপর টাল সামলাতে না পেরে হুলোও পড়ল মাটিতে। শুরু হয়ে গেল গরগর ম্যাও ম্যাও ঘাউ ঘাউ ফ্যাঁচ ফোঁচ শুম্ভ-নিশুম্ভের লড়াই।
হৈচৈ গোলমাল শুনে বুড়োবুড়ি দু’জনেই তড়িঘড়ি ছুটে এল সেখানে। কাঁটার দখল নিয়ে হুলো আর ভুলোর মধ্যে তখন তুলকালাম ঝগড়া চলছে।
ফলে যা হবার তাই হল! হঠাৎ কালো মেঘ ঘনিয়ে এসে চরাচর অন্ধকার করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে গেল। কুকুর-বেড়াল মারদাঙ্গা করলে যে এরকম ধুন্ধুমার বৃষ্টি নামে সে কথা তো ইংরিজি বইতে লেখাই আছে, পড়েছ নিশ্চয়ই।
সে বৃষ্টিতে বুড়োর বিড়ি নিভে গেল, বুড়ির বড়ি ভিজে গেল, ভুলোর কানে জল ঢুকে গেল, হুলো ভিজে গিয়ে ভিজেবেড়াল হয়ে গেল, আর সেই ফাঁকে মাটিতে পড়ে থাকা মাছের কাঁটাটা ছোঁ মেরে মুখে তুলে নিয়ে দাঁড়কাক মহাশয় উড়িয়া পলাইয়া গেলেন।
আমার গল্পও ফুরোল।
_____


অলঙ্করণঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

2 comments: