গল্পঃ পঞ্চভূত - ঋদেম ভট্টাচার্য


পঞ্চভূত
ঋদেম ভট্টাচার্য
(ঋত্বিক-দেবজ্যোতি-মহাশ্বেতা)



প্রথম ভূত


নতুন কলেজে জয়েন করলাম। কলেজে আজ ছুটি ছিল। লোকজন বিশেষ নেই। প্রিন্সিপ্যাল শ্রীমতী বিশাখা দত্ত বয়স্ক মানুষ। খুবই স্নেহশীলা। যত্ন করে সব ঘুরে দেখালেন। কাজকর্ম বুঝে নিতে নিতে সন্ধে হয়ে গেল। অফিসের গেস্ট হাউসেই প্রথমে থাকবার বন্দোবস্ত। রাতে খাবারমতো কোনও হোটেলের খোঁজ করতে মিষ্টি হেসে বললেন, “আজ তোমার আমার বাড়িতে ডিনার।”
বাড়িটা শহর ছেড়ে একটা পাহাড়ের মাথায়। বললেন, “শ্বশুরকুলের তিন পুরুষের বাড়ি।”
গল্পে গল্পে রাত হয়ে গেল বেশ। অনেকরকম পদ রান্না হয়েছিল। সামনে বসে যত্ন করে খাওয়ালেন। রাত তখন অনেক হয়েছে। দুটি মৌরি মুখে দিয়ে বললাম, “এবারে আসি। আপনাদের এখনও খাওয়া হল না।”
শ্রীমতী দত্ত কান পেতে কিছু শোনবার চেষ্টা করছিলেন। আমার কথার জবাব দিলেন না। দূরে কোথাও ঘড়িতে রাত বারোটা বাজছিল। শেষ ঘন্টাটা পড়তে উনি ক্ষুধার্ত চোখে আমায় একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, “এই যে, এবার খাব।” তারপর ভেতরবাড়ির দিকে মুখ ঘুরিয়ে ডাকলেন, “আয় রে সব, খাবার তৈরি।”
তাঁর পেছনদিকে বাইরে যাবার দরজাটা একটা কান্নার মতো শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে গেল। ছায়াগুলো এগিয়ে আসছে—



দ্বিতীয় ভূত


রাতে অফিস থেকে ফিরে স্নান করতে বাথরুমে ঢুকে দেখি কলে জল নেই। অন্যমনস্কভাবে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দোতলায় বাড়িওয়ালি মাসিমাকে উদ্দেশ্য করে হাঁক দিলাম, “পাম্পটা চালিয়ে দেবেন, মাসিমা।”
একটু পরেই যান্ত্রিক শব্দটা ভেসে এল দোতলা থেকে। এক মিনিটের মধ্যেই জল ফিরে এল কলে।
স্নান সেরে বেরিয়ে ঝপ ঝপ শব্দটা কানে গেল। ওভার-হেড ট্যাঙ্কের ওভার-ফ্লো পাইপের জলটা আমার শোবার ঘরের জানালার পাশ দিয়ে নিচে পড়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আবার ডেকে বললাম, “পাম্পটা বন্ধ করে দেবেন, মাসিমা।”
গলায় জোর আমার বেশ ভালো। পরমুহূর্তেই পাম্পের শব্দ বন্ধ।
খাবার নিয়ে খেতে বসেছি, তখন ফোনটা এল। ওটাওয়া থেকে মাসিমার ছেলে কৃশানুর ফোন। “দাদা, সব ঠিক আছে তো? মা খানিক আগে এসে পৌঁছোলেন। দোতলার ঘরের চাবিটা আপনাকে দিয়ে আসতে ভুলে গেছেন। আপনাকে খবরটা দিয়ে দিতে বললেন একটু।”



তৃতীয় ভূত
সমিতের পাঠানো বইটা পড়তে পড়তে ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছেছি, ঠিক তখন কারেন্ট চলে গেল। বিরক্তির একশেষ। উঠে মোমবাতিটা  জ্বালিয়ে এনে ফের বসব, তখন সমিতের ফোনটা এল, “দেবজ্যোতিদা, ভালো আছেন?”
“হ্যাঁ। তোমার বইটা অসাধারণ। এত ভালো সুপারন্যাচরাল বই আমি কমই পড়েছি, বুঝলে?”
“সেইজন্যেই তো আপনাকে পাঠালাম। ফোনটা করেছি অন্য একটা মজার জিনিস দেখাব বলে।”
“অদ্দূর থেকে, কী দেখাবে?”
“বলছি। সামনে বড়ো আয়না আছে?”
“উঁহু। বাথরুমে।”
“একবার বাথরুমে গিয়ে আয়নায় দেখুন তো, কিছু দেখতে পান নাকি! আমি দু’মিনিট বাদে আবার ফোন করছি।”
কৌতূহল হচ্ছিল। মোমবাতিটা হাতে প্যাসেজ পেরিয়ে বাথরুমের দরজা খুললাম। সামনে লাইফ সাইজ আয়নাটায় কিছু একটা ছবি দুলছে—একটা শরীর—সমিত-গলায় দড়ি পেঁচানো—চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে আছে—গালে সেই পরিচিত আঁচিলটা—একটা তীব্র মাংসপচা গন্ধ চারদিকে-
হাতে ধরা ফোনটা আবার বাজছে—সমিতের নাম্বার—



চতুর্থ ভূত
সুধীর পটলের দোলমা বানিয়েছিল আজ। মাছের পুর দিয়ে। মহুয়ার রস দিয়ে ম্যারিনেট করা মাংস, সরু চালের ভাত। ঠিক যেমনটা আমি ভালোবাসি।
বাইরে থেকে যেন চিৎকার করে উঠল না? ওহো, এইজন্যেই খাবার দিতে দিতে খানিক আগে সুধীর বেরিয়ে গেছিল তাহলে। ভালো। লাইব্রেরি রুমে একজন অ্যাটেন্ডেন্টের দরকার হয়ে পড়েছিল। বাকি যারা আছে তাদের বিদ্যেয় ও-কাজ হবে না।
খেয়ে উঠে লাইব্রেরি ঘরে গেলাম। মোটাসোটা চশমা পড়া লোকটা হতভম্বের মতো এদিক ওদিক চাইছে। চেহারা দেখে মনে হল কোনও মাস্টার-টাস্টার হবে বোধহয়। হঠাৎ পেছনে সুধীরকে দেখে আর্তনাদ করে উঠে আমায় দু’হাতে আঁকড়ে ধরতে গেল। আমার শরীরের মধ্যে দিয়ে তার হাতদুটো চলে গেল। মৃদু হাসলাম। এমন প্রায়ই দেখতে হয় আমাকে।
পিছু ফিরে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। বাগানে ঝোপের মধ্যে পড়ে থাকা দেহটার সাদা পাঞ্জাবিটা চাঁদের আলোয় উড়ছে। লাইব্রেরি রুমে সুধীর নিচু গলায় লোকটাকে কিছু বলছিল। কাজকর্ম বুঝিয়ে দিচ্ছে বোধহয়। সুধীর আমাকে বড়ো ভালোবাসে। কত কষ্ট করে  লোক ধরে আনে আমার কাজকর্ম করবার জন্য!


ঘুম ভেঙে দেখি আটটা বাজে। বিছানায় রোদ এসে পড়েছে। দিনের বেলাটা ভারি বিরক্তিকর। কথা বলবার লোকও জোটে না একটা। হাতের কাছে সবকিছু গুছিয়ে রাখা আছে অবশ্য। পক্ষাঘাত বড়ো কষ্টকর রোগ। শুয়ে শুয়েই ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে খেয়ে একটা বই টেনে নিলাম। আজ সারাদিনে এটা পড়ে শেষ করব ঠিক করেছি।



পঞ্চম ভূত

আমরা লুকোচুরি খেলতে ভীষণ ভালোবাসি, জানো! আমি, শুনু, গদাই, পঞ্চানন—এমন আরও কত আছে এখানে! এ-বাড়িটা বিরাট বড়ো। পাঁচটা মহল। কত ঘর, বারান্দা, চোরকুঠুরি! আমরা সেখানে লুকোচুরি খেলি। মাঝে মাঝে নতুন কেউ চলে আসে। তখন সে হয় চোর। সে লুকোয়। আমরা সবাই মিলে তাকে খুঁজি। তারপর খুঁজে বের করি। তারপর সেও আমাদের দলে মিশে যায়।
বাড়িটার মহলে মহলে ঝাপসা অন্ধকার পুরনো ঘরগুলোতে অনেক কংকাল--


*********


“কী মশাই ,আরও ক’খানা শুনবেন নাকি? গল্পগুলো ভালো না?”
মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল আমার। বর্ধমান ছেড়ে ইস্তক ভদ্রলোক আমায় পাকড়াও করে নিজের লেখা বইয়ের থেকে একের পর এক গাঁজাখুরি গল্প শুনিয়ে যাচ্ছন। কড়া গলায় বললাম, “দেখুন মশায়, রাত অনেক হয়েছে। এবারে আমি শুতে যাব। এ-কামরায় যদি আর কোনও লোক ওঠে তাকে বরং বাকি রাতটা জেগে আপনার ওসব গাঁজাখুরি গল্প শোনাবেন। আমায় এবার ছাড় দিন।”
গাড়ি গুমগুম শব্দ করে ফরাক্কা ব্যারেজ পেরোচ্ছিল। ভদ্রলোক ব্যথিত মুখে আমার দিকে একঝলক তাকিয়ে নিয়ে নিজের মনেই বললেন, “সব গাঁজাখুঁরি, তাই না? আ-আমি তাহলে আসি। সরি, না বুঝে আপনাকে বিরক্ত করলাম। ভেবেছিলাম আপনি—”
বলতে বলতে হঠাৎ জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে গলে বাইরের অন্ধকারে মিশে গেলেন তিনি।
_____

অলঙ্করণঃ ইন্দ্রশেখর

4 comments:

  1. দারুণ। ভদ্রলোক কি বইটা ফেলে গিয়েছিলেন? তাহলে আরো কয়েকটা গল্প আশা করতে পারি।

    ReplyDelete
  2. আহা! খাসা লাগল। ঋদেম জিন্দাবাদ।

    ReplyDelete
  3. জিওঃ ধুন্ধুমার কান্ড তো - তৃতীয় ভুতের গল্পটা বেস্ট - আর শেষ টা ঠিক জমলোনা - উপসংহার টা একটু গতানুগতিক হয়ে গেল এত ভাল গল্পের তুলনায়

    ReplyDelete
  4. উনি ক্ষুধার্ত চোখে আমায় একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, “এই যে, এবার খাব।

    baap re gaye kata die uthlo..darun hoeche

    ReplyDelete