জ্ঞানবিজ্ঞানঃ বাবার কীর্তি - সৌম্যকান্তি জানা


বাবার কীর্তি

সৌম্যকান্তি জানা



“পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্মঃ, পিতা হি পরমং তপঃ
পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীত্যন্তে সর্বদেবতা”

সমস্ত মানব সন্তানের কাছে মা যেমন ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’, তেমনি বাবাও ‘স্বর্গ’, ‘ধর্ম’ এবং ‘পরমং তপঃ’। বাবা খুশি হলেই সমস্ত দেবতা খুশি হন। মানব সন্তানের কাছে মা এবং বাবা দুই ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করলেও তাঁরা হন একে অপরের পরিপূরক। মা গর্ভধারণ করেন, সন্তানের জন্ম দেন, সন্তানের পরিচর্যা করেন। বাবা গর্ভধারণ করেন না ঠিকই, কিন্তু সন্তানের প্রতিপালনে হন মায়ের পরিপূরক। শুধু মানুষ নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই মা ও বাবাকে এই ভূমিকায় দেখা যায়। কিন্তু উলটো ভূমিকায় কি বাবাকে দেখা যায়? অর্থাৎ বাবা গর্ভধারণ করবে আর বাচ্চার জন্ম দেবে – এমনটা কি সম্ভব? এমন আপাত অবিশ্বাস্য ও বিরলতম ঘটনা কিন্তু আমাদের জীবজগতেই রয়েছে। গর্ভধারণকারী এই বাবারা হল সি-হর্স বা সিন্ধুঘোটক।
নামটাও অবাক করার মতো। সমুদ্রে আবার ঘোড়া থাকে নাকি? আসলে সি-হর্স হল এক জাতের মাছ। তবে চেহারাটা মোটেই মাছসুলভ নয়। বরং মাথা আর ঘাড় দেখে ঘোড়ার ক্ষুদ্র সংস্করণ ভাবাই স্বাভাবিক। তাই এদের বিজ্ঞানসম্মত নামের গণ (Genus) হল Hippocampus (Hippo মানে ঘোড়া)। প্রায় পুরো পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন সমুদ্রে এদের বাস। অগভীর ও সামুদ্রিক আগাছাপূর্ণ এলাকা এদের পছন্দসই বাসস্থান। প্রজাতিভেদে এরা লম্বায় ১.৫ সেমি থেকে ৩৫.৫ সেমি হয়। সি-হর্স অস্থিবিশিষ্ট মাছ হলেও এদের কোনও আঁশ নেই, বরং সারা দেহ অনেকগুলো শক্ত পাতের মতো ফলক দিয়ে নির্মিত বহিঃকঙ্কাল দিয়ে ঢাকা, আর তার ওপর ত্বকের আবরণ থাকে। এদের পৃষ্ঠ-পাখনা ও বক্ষ-পাখনা থাকলেও পুচ্ছ-পাখনা থাকে না। তার পরিবর্তে থাকে একটা লম্বা বাঁকানো লেজ। জলের স্রোত বেড়ে গেলে তখন কোনও অবলম্বনকে লেজের সাহায্যে জড়িয়ে ধরে। এরা মাছের মতো জলতলের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সাঁতার না কেটে উল্লম্বভাবে সাঁতার কাটে। সি-হর্স ছাড়া একমাত্র রেজর ফিসই উল্লম্বভাবে সাঁতার কাটে। এই কাজে সাহায্য করে পৃষ্ঠ-পাখনা। আর বক্ষ-পাখনার সাহায্যে এরা এক জায়গায় স্থির হয়ে ভাসতে পারে। এদের মুখটাও ভারি অদ্ভুত। দুটো চোয়াল জুড়ে লম্বা হয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে তুন্ড (Snout)। চোয়াল জুড়ে যাওয়ায় হাঁ করে খাবার ধরার উপায় নেই। তাই তুন্ডের মাথায় রয়েছে ছিদ্র। ওই ছিদ্রের সাহায্যে এরা খুব ছোটো ছোটো চিংড়ি বা কাঁকড়া জাতীয় প্রাণী মুখের মধ্যে টেনে নেয়।
সি-হর্স আজব চেহারার সাথে যে আজব বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে, তা হল পুরুষের মাতৃত্ব! গর্ভধারণের জন্য পুরুষ সি-হর্সের পেটে রয়েছে একটা থলির মতো অঙ্গ। স্ত্রী ও পুরুষ সি-হর্সের যৌন মিলনের সময় স্ত্রী সি-হর্স প্রায় ১৫০০ ডিম পুরুষ সি-হর্সের পেটে থাকা ওই থলির মধ্যে ঢেলে দেয়। ৯ - ৪৫ দিনের মধ্যে পুরুষের থলির মধ্যে ডিম ফুটে বেরনো বাচ্চারা একটু বড়ো হয়ে ওঠে। তখন পুরুষটি জলে বাচ্চাদের ছেড়ে দেয়। তারপর বাচ্চাদের দেখভালের আর কোনও দায় সে পালন করে না। আবার স্ত্রী সি-হর্সের সাথে মিলিত হতে সে উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

প্রজননের সময় একটা পুরুষ সি-হর্স কিন্তু একটাই স্ত্রী সি-হর্সের সাথে মিলিত হয়। স্ত্রী ডিম ছাড়ার আগে উভয়ে মিলে কয়েকদিন এক সাথে বসত করে। স্ত্রী ও পুরুষ সি-হর্সের শরীরে তখন রঙের পরিবর্তন হয়। স্ত্রী ও পুরুষ সি-হর্স পরষ্পরের লেজ জড়িয়ে জলের মাঝে বা সামুদ্রিক শ্যাওলার জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। কখনও কখনও ওরা একটা শক্ত মতন শ্যাওলাকে নিজের নিজের লেজ দিয়ে জড়িয়ে ধরে ঘুরপাক খায়। একসময় একজনের তুন্ডের অগ্রভাগ অন্যজনের তুন্ডের অগ্রভাগে ঠেকায়। ইতিমধ্যে স্ত্রী সি-হর্সের পেট ডিম ভরে ফুলে ওঠে। তখন পুরুষ সি-হর্স পেট ফুলিয়ে তার পেটে থাকা জলভরা থলিটি থেকে জল বার করে দিয়ে স্ত্রী সি-হর্সকে দেখিয়ে দেয় যে তার থলিতে জল ছাড়া আর কিছু নেই। সুতরাং সে নিশ্চিন্তে ডিম ছাড়তে পারে। এবার স্ত্রী সি-হর্স তার ডিম ছাড়ার যন্ত্র ওভিপোজিটরকে পুরুষের থলির মধ্যে রেখে ডিম ছেড়ে দেয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরুষ তার থলিটিকে খুলে দেয়। এই সময়ের মধ্যে স্ত্রীর ডিম ও পুরুষটির শুক্রাণু থলির মধ্যে ঢুকে যায়। সাথে কিছুটা সামুদ্রিক জলও ঢুকে যায়। লবণাক্ত জলীয় পরিবেশে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মধ্যে সফল নিষেক ঘটে। ডিম ছাড়ার পর স্ত্রী সি-হর্স তার নিজের এলাকায় চলে যায়। তারপর প্রতিদিন সকাল হতে না হতে স্ত্রী সি-হর্সটি এসে তার পুরুষ সঙ্গীর সাথে দেখা করে যায়। তার ছানাপোনাদের ঠিকঠাক প্রতিপালন হচ্ছে কি না স্বচক্ষে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে যায়।
এদিকে নিষিক্ত ডিমগুলি পুরুষের থলির মধ্যে দেয়ালে আটকে যায়। তারপর সেগুলোর চারদিকে স্পঞ্জের মতো কিছু কলার (টিস্যু) সৃষ্টি হয়। পুরুষটি তার দেহ থেকে প্রোল্যাকটিন নামে একরকম হরমোন ক্ষরণ করে বর্ধনশীল ভ্রূণকে জোগান দেয়। এই হরমোন প্রধানত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দুধ উৎপাদনের জন্য দায়ী। তাছাড়া পুরুষটি থলির মধ্যে থাকা বাচ্চাদের জন্য ক্যালসিয়াম ও লিপিড সরবরাহ করে। সি-হর্সের বহিঃকঙ্কাল গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম খুবই দরকারি। থলির মধ্যে বাচ্চারা বাইরে বেরোবার উপযুক্ত হয়ে উঠলে কোনও এক রাতে পুরুষটি তার পেটের পেশির ক্রমসংকোচন ঘটিয়ে থলি থেকে বাচ্চাদের বের করে দেয়। তারপর সকালবেলা স্ত্রী সি-হর্স যখন তার সাথে অভ্যাসমত দেখা করতে আসে তখন পুরুষের পেট খালি! ছানাপোনা পালনের দায় ওদের নেই, শুধু জন্ম দেওয়ার দায়টুকু আছে। সুতরাং সকালবেলা আবার স্ত্রী ও পুরুষটি নিজেদের লেজ ধরাধরি করে সাঁতার লাগায় সমুদ্রের তলায় শ্যাওলার পার্কে।
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment