গল্পঃ ডাইনিবুড়ি - প্রকল্প ভট্টাচার্য


ডাইনিবুড়ি

প্রকল্প ভট্টাচার্য


“তারপর, প্রতি অমাবস্যায় সেই বাড়ির নতুন বৌটা ডাইনি হয়ে যেত, আর রাত্তিরে খোলা চুলে রাস্তায় বেরোত। যদি কোনও বাড়ি থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসত, ব্যস! খোনা গলায় বলে উঠত, কেঁ রেঁ কাঁদে! দেঁখি তোঁ মুঁখটাঁ! সেই ভয়েই তো গ্রামের সব বাচ্চারা সন্ধে হলেই ঘুমিয়ে পড়ত, আর রাত্তিরে কক্ষনও সাড়াশব্দ করত না। ঘুম ভেঙে গেলেও না!”
প্রতি বিকেলের মতো আজও চিকুদি গল্প বলছিল। গঙ্গার ধারে সারি সারি শিবমন্দির। তার চাতালে গোল হয়ে বসেছিল দশ-বারোজন। শুভদার সঙ্গে টুকাইও একমনে শুনছিল ডাইনিবুড়ির গল্প। গ্রীষ্মের ছুটিতে মামাবাড়ি আসবার এটা একটা প্রধান আকর্ষণ। এই অনেকের সঙ্গে খেলাধুলো, গল্প শোনা। কলকাতায় তার তেমন কোনও বন্ধু নেই। পাড়ার দাদা-দিদিরাও অনেক বড়ো, ঠিক গল্প শোনার মতো নয়। তাছাড়া এমন গঙ্গার ধার, এমন খোলা মাঠ আর সবুজ গাছপালা সে শহরে কোথায় পাবে! মামাতো দাদা-দিদিরা তাকে খুব ভালোবাসে। মামিমা আর দিদিমা তো নিত্যনতুন রান্না করে খাওয়াতেই ব্যস্ত থাকে। মাও এই সময় একদম বকাবকি করে না, শাসন করে না। সব মিলিয়ে এই দশ-বারো দিন ভীষণ আনন্দে কাটে টুকাইয়ের।
এই তো, আজ দুপুরেই পুকুরে চান করতে গেছিল দাদাদের সঙ্গে। জলে নেমেই বুঝেছিল যে তার সুইমিং ক্লাবের ক্লোরিনেটেড জলে হাত-পা ছোঁড়ার অভ্যাস এখানে কোনও কাজেই লাগবে না। তাই দাদারা যখন মাঝপুকুরে দাপিয়ে সাঁতরাচ্ছিল, সে পাড়ের কাছাকাছিই কোমর জলে ডুব দিয়ে স্নান সেরেছে। শুভদা তখন একটু খেপিয়েছে শহরের ছেলে বলে, কিন্তু সেটা টুকাই গায়ে মাখেনি। তবে মজা হয়েছে খুব! তারপর খেয়েদেয়ে ঘুম। বিকেলে গঙ্গার ধারে আবার ছোটাছুটি করে লুকোচুরি খেলা।
অন্যদিন আলো থাকতে থাকতেই বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু আজ গল্প শোনবার লোভে দেরি হয়ে গেল। ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল। তাও তো শেষটুকু শোনা হলো না। চিকুদিই বলল, “শুভ, তুই টুকাইকে নিয়ে বাড়ি যা। তোদের রাস্তাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার।”
ঘুটঘুটে অন্ধকারই বটে। এত কালো এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে ছিল, ওই গাছগুলোর ডালে? সুর্য ডুবতেই যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একটা রোড-লাইট কেবল টিমটিম করছে, যাতে আলোর থেকে অন্ধকার হচ্ছে বেশি। এখানে ভোল্টেজ খুব কম আসে। তাই এমন দশা। বাড়িতেও সারারাত একটা হারিকেন নিভু নিভু করে জ্বালিয়ে রাখতে হয়; যদি কেউ বাথরুমে যায় তার জন্যে। শুভ আর টুকাই পা চালাল।
উলটোদিক থেকে একটা হারিকেন হেঁটে আসছিল। কাছে আসতে বোঝা গেল, সেটা ছিল হারিকেন হাতে নন্দজেঠু। আলোতে ওদের দেখে জেঠু বলল, “কে রে, শুভ নাকি?”
“হ্যাঁ, জেঠু।”
“সঙ্গে কে? আমাদের শৈলির ছেলে বুঝি?”
“হ্যাঁ, জেঠু।”
“এখন বাড়ি ফিরিস! যাবি কী করে, আমি আগান দেব?”
“না জেঠু, ঠিক চলে যাব।”
“পারবি? দেখিস, সাবধানে যাস। গুয়েহাড়গিলে না কামড়ায় আবার!”
জেঠু চলে যেতে টুকাই জিগ্যেস করল, “গুয়েহাড়গিলে কী গো, শুভদা?”
শুভদা হাসল। “গোসাপ। আমরা এদিকে বলি গুয়েহাড়গিলে।”
“তারা আবার কামড়ায় নাকি!”
“ও ব্বাবা, একবার কামড়ালে মেঘ না ডাকা অবধি ছাড়বে না জান!”
টুকাই চুপ করে গেল দেখে শুভদা ব্যঙ্গের সুরে বলল, “কী হল, শহরের ছেলে? ভয় করছে?”
“না না, ভয় কেন করবে! আমি ভয়-টয় পাই না।” টুকাই জোর দিয়েই বলল।
“তাই! ডাকাতদের ভয় পাও না?”
“ধুর!”
“অন্ধকারে? ভূতে?”
“নাহ্‌!” গলা না কাঁপিয়েই টুকাই বলল।
“শুনলে তো চিকুদি কী বলছিল? ডাইনিবুড়ি!”
“যাহ্‌, ওসব তো গল্প। সত্যি হয় নাকি!”
এবার বোধহয় শুভদার আঁতে লাগল। “সত্যি ভূতের বাড়ি দেখতে চাও?”
“এখন?”
“হ্যাঁ এখন? পারবে? আছে সাহস?”
টুকাই একটু চিন্তা করে নিল। দেরি তো হয়েই গেছে। মা আর অন্যদের বকা খেতেই হবে। এদিকে ভয় করছে বললে শহরের ছেলে বলে খ্যাপাতে ছাড়বে না শুভদা আর বাকিরা। দেখাই যাক না কেমন ভূতের বাড়ি!
“ঠিক আছে, চল।”
শুভ একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ও ভেবেছিল টুকাই ভয় পেয়ে যাবে। কিন্তু এখন তো আর উপায় নেই।
“চল। কিন্তু ভয় পেলে আমার দোষ দেবে না বলে দিচ্ছি।”
“আরে, ভয় পাবই বা কেন! তুমি ভয় পাচ্ছ মনে হচ্ছে তো।”
শুভ রাস্তা ছেড়ে পুকুরধার দিয়ে একটা সরু রাস্তা দিয়ে এগোল। টুকাইও চলল তার সঙ্গে। এইদিকটায় বিশেষ কেউ আসে না, বোঝাই যাচ্ছে। অন্ধকার হলেও এতক্ষণ তবুও রাস্তাটা চেনা ছিল। এখন শুভদার পিছু পিছু এগোনো ছাড়া গতি নেই। চাঁদের কিছুটা আলো আছে, সেটাই ভরসা। ওটা কী উড়ে গেল, চামচিকে? নাকি বাদুড়? ঝিঁঝিঁ ডেকেই যাচ্ছে একভাবে। তার সঙ্গে ভেসে আসছে অদ্ভুত কিছু সোঁদা গন্ধ।
ছায়াভরা ঝোপঝাড়ের মধ্যে কী একটা যেন সরসর করে নড়ে উঠল। শুভদা দাঁড়িয়ে পড়ল। নিচু গলায় বলল, “ভাম! গায়ে পায়েসের গন্ধ, দেখেছ?”
খুব ঠাহর করেও টুকাই কিছু দেখতে পেল না বটে, তবে এবার স্পষ্ট গোবিন্দভোগ চালের গন্ধ পেল। এই তাহলে ভাম! বুড়ো ভাম বলে এদেরই! দিদা গল্প বলে, এরা নাকি ‘মাপ-মাপ’ করে ডাকে। তখন জিগ্যেস করতে হয় ‘তুষ না ভুশ?’ ভাম উত্তরে যদি বলে ‘তুষ’ তাহলে নাকি সেইবছর জমিতে ভালো ফসল হবে। আর যদি ভুশ বলে…
“এইদিকে, সাবধানে এস!” শুভদার ডাকে চটক ভাঙল টুকাইয়ের।
একটা পোড়োবাড়ি, একেবারে ধ্বসেই গেছে ছাদগুলো। অন্ধকারেই দেখা যাচ্ছে দেওয়ালে বটের আর অশ্বত্থের চারা ঠেলে বেরিয়েছে।
“এটা বাড়ি! এ তো ধ্বংসস্তুপ!”
“এদিকে দরজা আছে। ঢুকবে? ভয় করছে না তো?”
জবাব না দিয়ে টুকাই ঢুকে পড়ল। শুভদাও পেছনে পেছনে ঢুকল। কিন্তু অন্ধকারে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না; তাই এগোতে পারছিল না কেউই।
“শুভদা, একটা টর্চ থাকলে...”
“ভয় করছে তো? জানতাম!”
“আরে না না, সাপখোপও তো থাকতে পারে!”
শুভদা আঁতকে উঠল, “এই রে, রাত্তিরে ওদের নাম নিতে নেই! লতা বল!”
টুকাইয়ের মজা লাগল। “সে লতাই বল আর যাই বল, যদি কামড়ায়...”
টুকাইয়ের কথা শেষ হল না। একটা গোঙানির আওয়াজ শোনা গেল। “ওঁ-ওঁ-ওঁ...”
শুভদা টুকাইয়ের হাতটা চেপে ধরল, “শুনতে পাচ্ছ!”
গলা শুকিয়ে গেলেও টুকাই বলল, “হ্যাঁ।”
এবার আরও স্পষ্ট কেউ খোনা গলায় বলল, “ওঁরে বাঁবা রেঁ...”
ভয়ে শুভ আর টুকাই দু’জনেই কাঠ হয়ে গেছিল। হুঁশ হতে আস্তে আস্তে দরজার দিকে সরতেই একটা আলোর রশ্মি দেখা গেল। হাতে একটা কেরোসিন তেলের কুপি নিয়ে সাদা শাড়ি পরে এক বুড়ি খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরোচ্ছে।
সবটুকু শক্তি এক করে টুকাই, “ডাইনিবুড়ি!” বলে চেঁচিয়ে, শুভকে এক ঝটকায় টেনে বাইরে নিয়ে এল। শুভর তখন প্রায় জ্ঞানহীন অবস্থা! সেও কোনওমতে “আঁ-আঁ” করে চিৎকার করে উঠল। তাদের আওয়াজে চারপাশের বাড়ি থেকে কয়েকজন বেরিয়ে আসতেই টুকাই তাদের ওই পোড়োবাড়িটা দেখিয়ে শুধু বলতে পারল, “ডাইনিবুড়ি!”
তারপর আর তার কিছু মনে নেই।

পরদিন ঘুম ভাঙল বেশ বেলায়। দেখল মামাবাড়িতে চেনা পরিবেশেই শুয়ে আছে সে। উঠে বসতে যেতেই মামা হাঁ হাঁ করে উঠল, “আরে থাক থাক, আর একটু ঘুমিয়ে নাও। কাল যা ধকল গেছে!”
টুকাইয়ের মনে পড়ল। “শুভদা কোথায়?”
“সেও তোমারই মতো ঘুমোচ্ছে ঘরে। ভালো আছে, চিন্তা নেই।”
“আর সেই ডাইনিবুড়ি?”
মামা হাসল। “ওই চিকুই হয়েছে যত নষ্টের গোড়া। ভুলভাল গল্প শোনায় আর তোরাও বিশ্বাস করিস।”
“কিন্তু মামা, আমি সত্যিই দেখেছি কাল...”
দিদা এসে বলল, “ওরে, ও তো তোদের মুড়িদিদা! চিনতে পারিসনি! ওখানেই তো থাকে। বাতের ব্যথায় অমন কোঁকায়।”
“মুড়িদিদা! যে মুড়ি ভেজে বাড়ি বাড়ি বিক্রী করে? সে ওই পোড়োবাড়িটায় থাকে?” টুকাইয়ের যেন তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না।
“হ্যাঁ রে, হ্যাঁ। আজ বিকেলে চল একবার দেখিয়ে আনি তোকে ওর বাড়ি। দেখবি কেমন ডাইনিবুড়ি তোর!”
টুকাই লজ্জায় মুখ নামাল। মামা হেসে উঠল হা হা করে।
-----

অলঙ্করণঃ চিত্রনিভা দাশ

No comments:

Post a Comment