প্রবন্ধঃ আমাজনে ফুটন্ত নদী - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


    

গা ছম ছম করা জঙ্গল। বড়ো বড়ো পাতার গাছগুলো ঘেঁষাঘেঁষি করে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছোতে পারে না। এই আলো-আঁধারি জঙ্গলে কোথায় যে বিপদ লুকিয়ে আছে তা কারও জানা নেই। একটু অসতর্ক হলেই প্রাণটা খোয়াতে হতে পারে কোনও বন্যজন্তুর আক্রমণে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো রেইন ফরেস্ট এই আমাজন জঙ্গল। দক্ষিণ আমেরিকার ন’টি দেশে ছড়িয়ে আছে এই জঙ্গল। এই ন’টি দেশ হলঃ ব্রাজিল, পেরু, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়াডর, বলিভিয়া, গুয়ানা, সুরিনেম এবং ফ্রেঞ্চ গায়েনা।

অনেকদিন আগের কথা। ১৫৪২ সালে ইউরোপ থেকে ফ্রান্সিসকো ডি ওরেলানা প্রথম  আমাজনে গিয়েছিলেন। যদিও তখন এই অঞ্চলের নাম আমাজন ছিল না। কোনো এক কারণে স্থানীয় দুই উপজাতিগোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই বাঁধে। দুটি দলের একটিতে ছিল তাপুয়াসের উপজাতিরা এবং অপরটিতে ছিল দক্ষিণ আমেরিকার উপজাতিরা। ওরেলানা সবিস্ময়ে দেখেন লড়াইয়ে উপজাতিদের স্ত্রী, পুরুষ সকলেই অংশগ্রহণ করেছে। এটাই তাদের রীতি। এই ঘটনা তাঁকে এতটাই বিস্মিত করেছিল যে তিনি গ্রিক পুরাণ থেকে জায়গাটার নাম রাখেন ‘আমাজোনাস’। পরবর্তীকালে এই নাম থেকেই ‘আমাজন’ নামের উৎপত্তি।

পায়ের নিচে ঘন গুল্মের চাদর। আকাশছোঁয়া প্রাচীন গাছগুলো একে অপরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে আছে যে দিনের বেলাতেও ছায়া ছায়া আঁধার। পথ বলে কিছু নেই। গাইডের দেখানো পথ ধরে দু’হাতে গাছের ডালপালা সরাতে সরাতে এগিয়ে চলেছি গভীর জঙ্গলের দিকে। সেখানেই নাকি আছে গল্পে শোনা সেই আশ্চর্য নদী ‘মায়ানতুইয়াসু’, যার জল টগবগ করে ফূটছে। ছোটোবেলা দাদুর কাছে অনেক গল্প শুনতাম। তখনই শুনেছিলাম এই গল্পটা।
মেক্সিকো ও পেরুর স্পেনীয় শাসক অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছিল ইনকা রাজত্ব দখল করতে। তাঁদের কাছে খবর ছিল যে ইনকাদের কাছে প্রচুর সোনা আছে। শেষ ইনকা শাসককে যুদ্ধে পরাজিত এবং হত্যা করে স্পেনীয়রা যখন ইনকা রাজত্বে ঢুকে পড়ল তখন তারা বিস্ময়ে হতবাক। তাদের ধারণার থেকে অনেক বেশি সোনা রয়েছে ইনকাদের কাছে। এত সোনা এরা পেল কোথা থেকে? নিশ্চয়ই আশেপাশে সোনার খনি আছে। কিন্তু ইনকাদের রাজত্ব তো জঙ্গলে ঘেরা! তাহলে কি এই জঙ্গলের ভেতরেই সোনার খনির সন্ধান পাওয়া যাবে? সোনার খোঁজে সেনাপতি সৈন্যদের নিয়ে আমাজনের জঙ্গলে ঢোকেন। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাঁরা কোনও সোনার খোঁজ পাননি। বরং বিষধর সাপের কামড়ে ও বিষাক্ত জল পান করে অর্ধেকেরও বেশি সৈন্য মা্রা পড়ে। কোনওক্রমে প্রাণ হাতে নিয়ে কয়েকজন সৈন্যেকে সঙ্গে নিয়ে ফেরার পর সেনাপতি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলার সময় মৃত্যুর ফাঁদ পাতা এই ফুটন্ত নদীর কথা বলেছিলেন। তারপর থেকেই এই নদী সম্পর্কে নানা গল্পকথা লোকের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে।
অফিসের কাজে পেরু আসার সময়েই ঠিক করেছিলাম, যতই কষ্ট হোক ফুটন্ত নদী মায়ানতুইয়াসুকে স্বচক্ষে দেখব। সেই ইচ্ছে পূরণ করতেই গাইডের সঙ্গে হেঁটে চলেছি আমাজনের জঙ্গলে শুকনো ঝরা পাতার উপর দিয়ে মস মস শব্দ করতে করতে।
কয়েক বছর আগে চিলাপাতার জঙ্গলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেখানকার ঘোরার সঙ্গে আমাজনের জঙ্গলে ঘোরার কোনও মিল নেই। চিলাপাতার জঙ্গলে যতটা ঘুরেছি পুরোটাই গাড়িতে চেপে। আমাজনের গহিন জঙ্গলে সে উপায় নেই। গাড়ি চলা তো দূরের কথা, হেঁটে যাওয়ারই কোনও রাস্তা নেই এখানে। বড়ো বড়ো গাছ পড়ে আছে এখানে সেখানে। সেগুলো ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে যেতে হচ্ছে। কখনও জলে পচে যাওয়া ঝরা পাতায় পা অনেকটাই ঢুকে যাচ্ছে। আবার কোথাও গাছ এমনভাবে হেলে আছে যে মাথা নিচু করে চলতে হচ্ছে। অসমান পথে টাল সামলাতে গিয়ে অনেক সময় কাঁটাগাছে ধরে ফেলায় হাত দিয়ে রক্ত ঝরছে। গাইড বারবার সাবধান করে দিচ্ছে ঠিকই, তবুও অনেক সময় নিজেকে সামলাতে পারছি না।
বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পর গাইড হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। আমিও ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু দূরে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সে বলল, “ওটা দেখছেন?”
“একটা ঢিবি।”
“একটা নয়, ভালো করে দেখুন, দুটো আছে। একটা বড়ো, আরেকটা ছোটো।
“উইঢিপি?”
“না, পিঁপড়ের বাসা।”
“পাশাপাশি দুটো বাসা কেন?”
“বড়োটা বড়ো পিঁপড়েদের বাসা। আর ছোটোটা ছোটো পিঁপড়েদের বাসা। এই পুঁচকে পিঁপড়েগুলো ভীষণ বদমাশ।
“বদমাশ? কীরকম?”
“ডেঁয়ো পিঁপড়েদের মতো বড়ো আকারের এই পিঁপড়েগুলো যেখানে বাসা বানায়, খুদে পিঁপড়েগুলো ঠিক তার পাশে গিয়ে বাসা বানায়। বড়ো পিঁপড়েগুলো এই পুঁচকেগুলোকে প্রথমদিকে কোনও পাত্তাই দেয় না। বাসা বানাচ্ছিস বানা, কিন্তু কোনওদিন  পেছনে লাগতে আসিস না। তাহলে মেরে লোপাট করে দেব - এমনই এদের ভাবখানা। পুঁচকেগুলোও কোনও ঝামেলা করে না। ভালো মানুষের মতো বাসা বানাতে থাকে। এই সময় এদের দেখলে মনে হবে যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। অথচ এরা এক একটা বিচ্ছু। বাসা বানানো শেষ হলেই শুরু হয় এদের খেল। নিজেদের বাসার ভেতর থেকে বড়ো পিঁপড়েগুলোর বাসার ভাঁড়ার পর্যন্ত শুরু হয় এদের সিঁদ কাটা। এই কাজ এরা এতটাই চুপি চুপি করে যে বড়ো পিঁপড়েগুলো কোনওভাবেই টের পায় না। সিঁদ কাটা শেষ হলে শুরু হয় এদের আসল কাজ। বড়ো পিঁপড়েগুলোর ভাঁড়ার থেকে খাবার চুরি করে নিয়ে এসে তোলে নিজেদের ভাঁড়ারঘরে। প্রথম প্রথম বড়ো পিঁপড়েগুলো বুঝতে পারে না যে তাদের ভাঁড়ারে চোর ঢুকেছে। কিছুদিন পর যখন দেখে যতই খাবার ভাঁড়ারে রাখা হোক না কেন ভাঁড়ার কিছুতেই ভর্তি হচ্ছে না, তখন তাদের সন্দেহ হয়। চোর কোথায়, খোঁজ খোঁজ় বলে বেরিয়ে পড়ে সৈন্যসামন্ত নিয়ে। আতিপাতি খুঁজেও চোরের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না। পাশের বাড়ির পুঁচকেগুলো বাসার ভেতরে নিজেদের কাজ নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকে। তাহলে চুরি করল কে? আর চোর গেলই বা কোথায়? এবার শুরু হল নিজেদের বাসার ভেতরে খোঁজা। কে একজন চেঁচিয়ে উঠল, পাওয়া গেছে। ছুটল সবাই সেদিকে। তাজ্জব ব্যাপার! পাশের বাড়ির পুঁচকেগুলোরই এই কাজ! বদমাশ কাঁহা কা! মারো ব্যাটাদের। কিন্তু মারবে কে? সিঁদের মুখ আর বাসায় ঢোকার প্রধান ফটক দুটোই এত ছোটো যে এত বড়ো শরীর নিয়ে ওর ভেতর দিয়ে ঢোকাই দুষ্কর। অতএব খুদেগুলোর বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে হম্বিতম্বি করা ছাড়া আর কিছুই ওদের করার থাকে না।
“বাহ্‌, দারুণ মজার তো!”
গাইড মুচকি হেসে হাঁটা শুরু করল। আমিও ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে হাঁটতে লাগলাম। যেতে যেতে ও আমাকে গাছ চেনাচ্ছিল। কোন গাছের কী নাম বলে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা গাছের কাছে গিয়ে ও একটা ডাল ভেঙে নিয়ে এল। ডালটায় কোনও পাতা নেই। আমার কাছে এসে ডালটাকে খুব জোরে ঝাঁকাতেই ডালটার দু’পাশ থেকে লম্বা লম্বা খেজুরপাতার মতো পাতা বেরিয়ে এল। আমি তো অবাক। গাছটার নাম জিজ্ঞেস করতে ও বলল, “ম্যাজিক ট্রি।”
আমি বললাম, “সত্যিই এটা ম্যাজিক।”
ও আরও বলল, “এই পাতা জঙ্গলের অধিবাসীরা ঘরের চাল হিসেবে ব্যবহার করে।”
নানাধরনের পাখির ডাক শুনতে শুনতে গাইডের সঙ্গে হেঁটে চলেছি। হঠাৎ ও আমার হাত টেনে ধরে বলল, “এদিক দিয়ে যাওয়া যাবে না, ওপাশ দিয়ে ঘুরে যেতে হবে।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
ও বলল, “সামনে শয়তানের বাগান আছে। ওখানে চুয়াচাকি নামে এক দুষ্ট আত্মা থাকে। এদের একটা পা মানুষের মতো হলেও আরেকটা পায়ে আঙুলের বদলে ঘোড়া বা গরুর খুর থাকে। ধূমকেতুর মতো হঠাৎ করে একে দেখা যায় আবার পরমুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করছে এমন মানুষ দেখতে পেলেই বন্ধু সেজে তার সঙ্গ নেয়। তারপর নানাভাবে ভুলিয়ে তাকে জঙ্গলের গভীরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে চুয়াচাকি উধাও হয়ে যায়। গভীর জঙ্গল থেকে পথ চিনে মানুষটি আর বের হতে পারে না। চিরকালের মতো হারিয়ে যায়।”
স্থানীয় অধিবাসীদের গল্প যাই হোক না কেন চুয়াচাকি বা শয়তানের বাগান আসলে আমাজনের জঙ্গলের বিশেষ এক জাতের পিঁপড়ের বাগান। তবে এদের বাগান করার ধরনটা অদ্ভুত। মানুষ যেখানে নতুন নতুন গাছ লাগিয়ে বাগান করে এরা সেখানে গাছ কেটে বাগান করে। এদের বাগানে অবশ্য নানাধরনের গাছ পাওয়া যায় না। কেবল ‘লেমন অ্যান্ট’ নামে একধরনের গাছই সেখানে থাকে। পিঁপড়েগুলো ওদের ওই নির্দিষ্ট এলাকায় এই গাছ ছাড়া অন্য কোনও গাছ জন্মাতেই দেয় না। অন্য কোনও গাছের চারা মাথা তুললেই সঙ্গে সঙ্গে এরা ফরমিক অ্যাসিড ছিটিয়ে সেটাকে মেরে ফেলে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এই প্রজাতির পিঁপড়েরা একমাত্র লেমন অ্যান্ট গাছেই বাসা বাঁধে। আমাজনের জঙ্গলে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে পুরনো যে বাগানটির খোঁজ পাওয়া গেছে তার বয়স আটশো বছরেরও বেশি। এক হাজার তিনশো বর্গ মিটার আয়তনের এই বাগানে প্রায় পনেরো হাজার রানি নিয়ে ত্রিশ লক্ষেরও বেশি পিঁপড়ে বাস করে।
গাইডের বিশ্বাসের কোনও বিরোধিতা না করে ওর সঙ্গে ঘুরপথে জায়গাটা পেরিয়ে গেলাম। যেতে যেতে একটা বড়ো গাছের উঁচু ডালে নালসো পিঁপড়ের বাসা দেখলাম। গাইডই দেখাল। পিঁপড়েদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর বাসা বানায় এই নালসো পিঁপড়েরা। গাছের পাতার মধ্যে এই বাসাগুলো এমনভাবে লুকোনো থাকে যে গাছের ডালে পিঁপড়ের সারি দেখা গেলেও এদের বাসাগুলো চট্‌ করে দেখা যায় না। বাসা বানানোর জন্য নালসো পিঁপড়ে সাধারণত সোজা ও লম্বা পাতার ফলক পছন্দ করে। বাসা বানানোর সময় হাজার হাজার শ্রমিক পিঁপড়ে এক সঙ্গে কাজ করে। রানি পিঁপড়ে বা পুরুষ পিঁপড়েদের এখানে কোনও ভূমিকা থাকে না।
প্রথমে এরা পাশাপাশি দুটি পাতার একটির প্রান্তভাগ মুখ দিয়ে কামড়ে এবং অন্যটির প্রান্তভাগ পা দিয়ে আঁকড়ে টেনে ধরে। তখন আরেকটি দল পাতার উল্টোদিক দিয়ে পাতাদুটি জুড়তে থাকে। এই জোড়ার কাজটা বেশ অভিনব। পাতার পেছনদিকে যারা থাকে তাদের প্রত্যেকের মুখে থাকে একটি করে নিজেদের শূককীট বা লার্ভা। শক্ত চোয়াল দিয়ে শ্রমিক পিঁপড়েরা যখন এই শূককীটগুলোর দেহে চাপ দেয় তখন এদের মুখ দিয়ে রেশমসুতোর মতো একধরনের আঠালো সুতো বেরিয়ে আসে। টেনে ধরা পাশাপাশি দুটো পাতার প্রান্তভাগে তখন এরা শূককীটগুলোর মুখ একবার এ-পাতায় আরেকবার ও-পাতায় ঠেকিয়ে ওই আঠালো সুতোর বুনোট দিতে থাকে। এইভাবে এরা একটার পর একটা পাতা জুড়ে গোলাকার বাসা তৈরি করে। এইভাবে নিজেদের শূককীটকে কাজে লাগিয়ে বাসা বানাতে গিয়ে অনেক শূককীটই মারা যায়। গাছের ডালের আগার দিকে যেখানে পাতা বেশ ঘন থাকে সেখানে এরা এই বাসাগুলো বানায়। তাই সাধারণত ডালের আগার দিকে এদের বাসাগুলো ঝুলতে দেখা যায়। প্রতিটি বাসার নিচের দিকে একটি গোলাকার দরজা থাকে। বাসা বানানোর পর এরা বাসাটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে। কোথাও কোনও খুঁত বা ফুটো থাকলে শূককীটদের মুখ থেকে বের হওয়া আঠালো সুতো সেখানে বার বার লাগিয়ে খুঁত সারিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। বাসাগুলো এত মজবুত হয় যে ঝড়জলেও সহজে নষ্ট হয় না। এমনকি বাসার ভেতরে একফোটাও জল ঢোকে না। অনেক সময় এরা কাছাকাছি ডালের পাতা আগের বাসার সঙ্গে জুড়ে বাসাটাকে বড়ো করে। নালসো পিঁপড়েরা সাধারণত গাছের ডালে ডালেই ঘুরে বেড়ায়। তাই এদের গেছো পিঁপড়েও বলা হয়। লাল রঙের এই পিঁপড়ের চোয়াল খুব শক্ত হয়। এদের কামড়ে প্রচন্ড জ্বালা করে এবং কামড়ানো জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে ওঠে। এই ক্ষুদ্র  প্রাণীটির স্থাপত্যশিল্প দেখার মতো।

জঙ্গলের পথে আমরা প্রায় তিন ঘন্টা হাঁটছি। নদীর তখনও দেখা নেই। গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম, “আর কত দূর?”
আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে আমাকে চুপ করে দাঁড়াতে বলে ও পাশের গাছ থেকে একটা ডাল ভেঙে নিয়ে এল। তারপর সামনে পড়ে থাকা ঝরা পাতাগুলোকে নাড়িয়ে নাড়িয়ে কী যেন দেখতে লাগল। একটু পড়েই পাতাগুলোর ভেতর থেকে কালো কুঁচকুঁচে একটা মাকড়সা বেরিয়ে এল। ফটো তোলার জন্য ওর দিকে এগোতে গেলে গাইড আমাকে হাত দিয়ে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল। অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতেই ও বলল, “ওটা কী জানেন?”

আমি বললাম, “মাকড়সা।”
“মাকড়সা তো বটেই। এর নাম টেরান্টুলা। এক কামড়েই অক্কা। ছবি নিলে দূর থেকে নিন।”
ছবি তোলা হলে গাইড ওকে গাছের ভাঙা ডালটা দিয়ে ভয় দেখিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দিল। আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর পরিবেশটা হঠাৎ পালটে গেল। পাখির ডাক থেমে গেছে। জঙ্গল হালকা হয়ে এসেছে। এতক্ষণ যে ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আসছিলাম তার তুলনায় এই জায়গাটা যেন ন্যাড়া ন্যাড়া। দূরে ঘন কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। সেদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গাইড বলল, “ওইখানে নদীটা আছে।”
অবশেষে মায়ানতুইয়াসু নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। নদীটা খুব বেশি বড়ো নয়। বড়োজোর ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ। চওড়ায় পঁচিশ মিটারের মতো। পেরুতে আমাজনের জঙ্গলের একেবারে গভীরে এই নদীটি বয়ে চলেছে। জল টগবগ করে ফুটছে। অনবরত। জল থেকে ওঠা ধোঁয়ায় চারদিক ঢেকে আছে। নদীর জল গায়ে লাগলে ফোস্কা পড়তে এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। জলের কাছাকাছি গেলেই হাড়মাস ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। চারদিক নিস্তব্ধ। সারা দুনিয়ায় আলোড়ন ফেলে দেওয়া আমাজনের জঙ্গলের এই রহস্যজনক  নদীটি যেন মৃত্যুফাঁদ। ভয়ে কোনও জীবজন্তু এর ধারে কাছে ঘেঁষে না। গাইড জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা মরা ব্যাঙ নিয়ে এল। সুতোয় বেঁধে সেটাকে নদীর জলে কয়েক সেকেন্ড চুবিয়ে রেখে তুলে নিতেই দেখলাম সেটা সেদ্ধ হয়ে প্রায় গলে যাওয়ার উপক্রম। নদীর ধারে রাখা একটা বোর্ডে লিখে রাখা তথ্য থেকে জানলাম, কুড়ি ফুট গভীর এই নদীর জলের উষ্ণতা ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। ফুটন্ত বলতে আমরা যা বুঝি ততটা না হলেও এর কাছাকাছি ওই উষ্ণতা। তাই এ নিয়ে যে কিংবদন্তি আছে তা অবাস্তব নয়।
নদীর জল এত গরম কেন? এর উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনও খুঁজে পাননি। সাধারণত নদীর আশেপাশে কোনও সুপ্ত বা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থাকলে নদীর জল গরম হতে পারে। এই নদীটির কাছাকাছি বা বহুদূরে তেমন কোনও আগ্নেয়গিরি নেই। বিজ্ঞানীরা এখনও খুঁজে চলেছেন এই আশ্চর্য নদীর গরম জলের উৎস।

ভূবিজ্ঞানী আন্দ্রে রুজো তখন খুব ছোটো। দাদুর কাছে নানা রূপকথার গল্প শোনার সময় মায়ানতুইয়াসু নদীর গল্পও শুনেছিলেন। তখন তাঁর মনে হত এটাও একটা রূপকথার গল্প। বড়ো হয়ে ভূবিজ্ঞানী হওয়ার পর তাঁর কেন যেন মনে হল এই নদী শুধু গল্পে নয়, বাস্তবেও  আছে। অনেকের নিষেধ সত্ত্বেও তিনি একদিন নদীর খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। জানা নেই জঙ্গলের কোথায় নদীটা থাকতে পারে। শোনা গল্পের উপর ভিত্তি করে তিনি আমাজনে গভীর জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। অবশেষে ২০১১ সালে তাঁর স্বপ্ন পূরণ হল। খুঁজে পেলেন সেই রূপকথার নদী।
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment