গল্পঃ ছন্দদাদু ও বান্টির মানভঞ্জন - সুস্মিতা নাথ


ছন্দদাদু ও বান্টির মানভঞ্জন

সুস্মিতা নাথ


ছোটকার বকুনি খেয়ে দুপুর থেকেই বেশ দমে ছিল বান্টি। কারও সাথে কথাবার্তা নেই। মনে মনে ছোটকার ওপর রেগে ফেটে পড়ছে ও। একটু সামান্য গ্রামার ভুলের জন্যে এত অপমান? তাছাড়া বান্টি তো উত্তরটা একেবারে ভুল বলেনি। একটু বেশি শুদ্ধ করে বলতে গিয়েই তো গণ্ডগোলটা হয়ে গেল। আর সেটা নিয়েই কত বড়ো হট্টগোল বাধাল ছোটকা। বান্টির ডানকানটা ধরে চেঁচিয়ে বাড়ির সকলকে জড়ো করে বলল, “শোনো শোনো, সবাই শোনো। আমাদের এই গুণধর বান্টি মহাশয় এতদিন তিলে তিলে গ্রামার পড়ানোর পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, টেনস চারপ্রকার। যথাক্রমে পাস্ট টেনস, প্রেজেন্ট টেনস, ফিউচার টেনস এবং সেনটেনস।”
একথা শুনে বান্টির দিদিভাই, বড়দা আর অনুর কী হাসি! আর ওর বাবা তো গুরুগম্ভীর স্বরে হুকুম জারি করে দিলেন, “আজ থেকে তুমি রোজ অন্তত একঘণ্টা করে গ্রামার পড়বে বরুণের কাছে।”
এই বরুণই হচ্ছে বান্টির ছোটকা। বান্টি জানে, বাবার হুকুম যখন একবার জারি হয়ে গেছে তখন সেটা তামিল করতে কোনও কসুর রাখবে না ছোটকা। রাগটা এবার সবার ওপরেই পড়ল। বান্টির মনে হচ্ছে, এ-বাড়ির সবাই কেবল ছোটকার পক্ষে। একমাত্র ঠাম্মা, যিনি সবসময় বান্টির পক্ষে থাকতেন তিনি তো এখন কাশী বেনারসে তীর্থ করছেন। কাজেই সবার ওপরেই অভিমান করে মুখ ঢেকে বিছানায় শুয়ে পড়ল বান্টি।
আজ দেওয়ালি। এমন একটা উৎসবের দিনে বান্টির এমন অভিমান করে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকাটা কারোরই ভালো লাগছিল না। দিদিভাই আর অনু অনেক চেষ্টা করল ওর অভিমান ভাঙাতে। এমনকি ছোটকা স্বয়ংও। কিন্তু বান্টি আজ কিছুতেই কারও সাথে কথা বলবে না, খেলবে না, বাজিও ফাটাবে না। এমন অবস্থায় একমাত্র ওর বাবাই পারেন ওর অভিমান ভাঙাতে। শুধুমাত্র তিনি যদি তার পূর্বঘোষিত হুকুমটা তুলে নেন, তবেই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু তা তো হবার নয়। উপরন্তু তিনি একবারও বান্টির কাছে এলেন না।
দেওয়ালির ঝকমকে রাতে বান্টিকে খুব মিস করছিল সবাই। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট আলোয় আলোয় ঝলমল করছে। টুনি লাইট, প্রদীপের আলো আর আতসবাজির রোশনাইতে উৎসবের মত্ততা। কিন্তু বান্টিদের বাড়িটা অপেক্ষাকৃত শান্ত। কেননা, বাড়ির সবচেয়ে উৎসাহী ব্যক্তিটি অভিমানে চুপচাপ শুয়ে আছে। ফলে বাজি ফাটানোতে কারোরই তেমন আগ্রহ নেই। ঘরে বসেই গল্পগুজবে সময় কাটাচ্ছিল সবাই। ঠিক তখনই কলিং বেলের আওয়াজ।
দরজা খুলে ওরা অবাক। আরে! ছন্দদাদু যে! ছন্দদাদু অর্থাৎ, বান্টির বাবা-কাকুদের জ্যাঠামশাই অনেকদিন পর এসেছেন। সবার প্রিয় এই ছন্দদাদুটি যেমন প্রাণবন্ত তেমনই মজাদার। যতক্ষণ যেখানে থাকেন, ততক্ষণ সেখানে সম্পূর্ণ পরিবেশ দারুণ জমিয়ে রাখেন। তার এই অদ্ভুত নামটার পেছনেও একটা মজার কারণ আছে। ওনার একটা বিশেষত্ব হল, উনি সবসময় ছন্দ মিলিয়ে কথা বলেন। প্রায় সবার সাথেই, বিশেষ করে সমস্ত নাতিনাতনিদের সাথে উনি ছন্দ মিলিয়ে ছড়া কেটে কেটে বাৎ-বিবাদ চালান। নাতিনাতনিদের কাছে তাই তিনি বড়োদাদু নন, ছন্দদাদু। যাই হোক, এমন দিনে ছন্দদাদুকে কাছে পেয়ে সবাই খুশি। দাদু ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হে, কে আছ কেমন?”
“অতি সাধারণ।” ছোটকাও ছন্দ মিলিয়ে উত্তর দিল।
দাদু আবার বললেন, “অতি সাধারণ, দেওয়ালির রাতে?”
“বান্টি যে খেলছে না সাথে!” এবারে অরুণা ওদের অতি সাধারণ থাকার কারণটা ছন্দ মিলিয়ে জানিয়ে দিল। তারপর ইশারাতে বান্টির রাগ করে থাকবার ব্যাপারটা জানিয়ে দিল ছন্দদাদুকে।
দাদু বললেন,
“হুম, ব্যাপার গুরুতর বটে।
তবে উপায় আছে হাতে।”

ছন্দদাদু এবার একটু ভাবলেন। তারপরই একটা উপায় বের করে ফেললেন। আসলে উনি বান্টিকে ভালোভাবে জানেন। কী করলে বান্টির মানভঞ্জন হতে পারে সেটা উনি কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারেন। সেইমতো উনি একটা প্ল্যান করলেন। তারপর সকলকে জানিয়ে দিলেন তার পরিকল্পনার কথা। সবারই বেশ মনঃপূত হল সেটা। ছোটকাসহ সবাই প্রস্তুত হয়ে গেল ছন্দদাদুর প্ল্যান অনুযায়ী আচরণ করতে। বান্টি কিন্তু তখনও একইরকমভাবে মুখ ঢেকে শুয়ে আছে। ছন্দদাদুর উপস্থিতিও ওকে নড়াতে পারেনি। আজ ও কিছুতেই কথা বলবে না, কারোর সাথেই না। চরম প্রতিজ্ঞা। কিন্তু ছন্দাদাদুও কি ছাড়বার পাত্র? উনি এবার বান্টিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কী হে, দাদুভাই,
তোমার সাড়া নেই?
দেওয়ালির রাতে
বাজি ফাটাতে
তোমার কি ইচ্ছে নেই?”

বান্টি নিরুত্তর। যেন কোনও কথাই ওর কানে যায়নি। দাদু বুঝলেন, সোজা পথে কাজ হবে না। কৌশল তাকে নিতেই হবে। এবার তিনি তার প্ল্যান অনুযায়ী কাজ শুরু করলেন। বান্টির অভিমানটা তো ভাঙাতেই হবে। উৎসবের দিনে মান-অভিমান কার ভালো লাগে?
ছন্দদাদু এবার এমন অভিনয় করলেন যেন তিনি জানেনই না যে বান্টি অভিমান করে আছে। উনি আবার বান্টিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কী আর করা যাবে বান্টি যখন
সন্ধেবেলাতেই ঘুমে অচেতন।
আমরাই তবে একসাথে মিলে
একটা নতুন খেলা খেলি সকলে।
যে দেবে যতটা ধাঁধার সঠিক উত্তর,
পুরস্কার তত তার মিলবে সত্বর।”

দাদুর প্রস্তাবটা দারুণ! অরুণারা একসাথে সবাই লাফিয়ে উঠল।
ছোটকা বলল,
“আমার পূর্ণ সমর্থন এমন প্রস্তাবে,
যে যোগ দেবে না সে পস্তাবে।”

বান্টির মধ্যে এখনও কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। দাদু এবার ধাঁধা বলা শুরু করলেন। দেওয়ালির রাত। কাজেই ধাঁধাগুলোও সব দীপাবলি উৎসবকে ঘিরেই। দাদু প্রথম ধাঁধা বললেন,
“মুখ পুড়ে আলো দেই,
হনুমান তবুও নই।
পেট পুরে ঘি খাই,
তবুও দেহে মেদ নেই।”

দাদুর ধাঁধা শেষ হতে না হতেই কাউকে একটুকুনও ভাববার সুযোগ না দিয়ে অরুণ অর্থাৎ, বান্টির দাদা বলে উঠল, “প্রদীপ, প্রদীপ। উত্তর হবে প্রদীপ।”
এক্কেবারে সঠিক উত্তর পেয়ে ছন্দদাদু বললেন,
“এবারে তবে দ্বিতীয় ধাঁধায় আসা যাক,
বান্টি যখন ঘুমোচ্ছে, আর একটু ঘুমাক।”

বান্টির তরফ থেকে তখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। ছন্দদাদু তার দ্বিতীয় ধাঁধাতে এলেন,
“চন্দ্রমা আড়ি দেয় পৃথিবীর সাথে,
অমাবস্যা পাড়ি দেয় অন্ধকার ছড়াতে।
তখন ছোটো ছোটো আলোকবিন্দু একসাথে মিলে,
সূর্যকেও লজ্জা দেয়, বল তো কোন রাতে?”

এবার একটু ভাবতে হল। তবে নিতান্তই খানিকক্ষণের জন্যে। অরুণা এবং অনু প্রায় একসাথেই চেঁচিয়ে উঠল, “দীপাবলির রাতে।”
এত তাড়াতাড়ি যে সব উত্তর পাবেন, তাও আবার সঠিক উত্তর, সেকথা ছন্দদাদুও ভাবেননি। তাই বাঁকাভাবে তারিফ করে বললেন,
“সব উত্তর এত তাড়াতাড়ি?
তবে এবার একটু কঠিন প্রশ্ন করি।”

আজকাল অনুও ছন্দ মেলাতে পটু হয়ে গেছে। ছন্দদাদুর কথা শুনে ও বলল,
“প্রশ্ন যতই কঠিন কর না কেন,
আমরা ভয় পাই নে, এটা জেনো।”

“তাই বুঝি? ঠিক আছে, এই শোনো তৃতীয় ধাঁধা,
প্রশ্ন কঠিন, তবুও ভাবতে সময় দিতে নেই বাধা।”

ছন্দদাদু এবার তৃতীয় ধাঁধা বললেন,
“আগুনের শলাকাটি যেই কাছে ধরি,
অমনি বিস্ফোরণ, যেন আগ্নেয়গিরি।
ঊর্ধ্বমুখে উঠে যায় আগুনের কণা,
নানা রঙে আলোকিত আলোর ফোয়ারাখানা।
সকলের মুখে হাসি ফোটাতে,
জুড়ি নেই তার দেওয়ালির রাতে।
বল তো সে কে?”

হুম, প্রশ্ন কঠিন বটে এবার। সবাই চুপ। কেউ চোখ বুজে, কেউ গালে হাত দিয়ে, কেউ নিজের চুল টেনে ধরে ভাবতে শুরু করে দিল। কী হতে পারে? আগ্নেয়গিরি… আলোর ফোয়ারা… দেওয়ালির রাত… সব গুলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ছোটকার ভাবতে সময় একটু কম লাগে। ছোটকা উত্তরটা বলতে চাইল, “আমার মনে হচ্ছে…”
কিন্তু তৎক্ষণাৎ ছন্দদাদু তাকে ইশারা করে থামিয়ে দিলেন। ছোটকাও আমতা আমতা করে চুপ হয়ে গেল। আমাদেরও দাদু চুপ থাকতে ইশারা করলেন। আসলে ছন্দদাদুর পরিকল্পনাটা এরকমই ছিল। দাদু এবার বান্টিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কী হে দাদুভাই, দেখলে তো?
এমন ধাঁধা, কেউ পারল না তো।
আমি জানি, একমাত্র তুমিই এই বাড়িতে,
এই ধাঁধার উত্তর পার দিতে।”

বান্টি এখনও একইরকমভাবে শুয়ে আছে। যেন এতক্ষণের ধাঁধাবাজি খেলার কিছুই ও টের পায়নি। এদিকে এতক্ষণে ধাঁধার উত্তরটা কী হতে পারে সেটা সবাই বুঝে গেছে। কিন্তু ছন্দদাদুর নির্দেশে সবাই চুপ করে আছে। দাদু আবার বললেন,
“এমন ধাঁধা তো আর গ্রামারের মতো সহজ নয়,
এর উত্তর দিতে চাই বুদ্ধির পরিচয়।
জানি, এটা তোমাদের সাধ্যি নয়,
এই ধাঁধা যদি কেউ বোঝে, তবে সে বান্টি মহাশয়।”

একগাদা অপ্রত্যাশিত প্রশংসায় বান্টি এবার পাশ ফিরে শুলো। বোঝা গেল, ছন্দদাদুর কৌশল কাজ করছে। দাদু এবার একটু ঝুঁকে বান্টির কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“দাদুভাই, বলে ফেল দেখি।
এই ধাঁধার উত্তরটা কী?
সবাইকে করে একদম হয়রান,
জানিয়ে দাও তুমি কেমন বুদ্ধিমান।”

এবার সবার কানগুলোকে অবাক করে একটা সংক্ষিপ্ত উত্তর এল, “তুবড়ি।”
ব্যস, আর যায় কোথা! মুখ খোলার সাথে সাথে বান্টির সব রাগ-অভিমান গেল বেরিয়ে। অনেকক্ষণ মৌনব্রতের পর সেই যে মুখ খুলল বান্টি, যেন কথার তুবড়ি!

_____

অলঙ্করণঃ অনুপম চক্রবর্তী ও পুণ্ডরীক গুপ্ত

No comments:

Post a Comment