গল্পঃ বিপদ ছিল ঘরেই - অদিতি ভট্টাচার্য


বিপদ ছিল ঘরেই


অদিতি ভট্টাচার্য্য


সন্ধেবেলায় ববি ক্যালকুলাসের ঢাউস একখানা বই নিয়ে বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছিল। মোড়ের মাথায় পিসিমণির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
“কেমন আছ, পিসিমণি?”
“ভালো আছি রে। তুই কোথায় যাচ্ছিস, বাবা?” পিসিমণি জিজ্ঞেস করলেন।
“এই বইটা ফেরত দিতে যাচ্ছি বন্ধুর বাড়ি।”
“সাবধানে যাস। আজকাল টাকাপয়সার সঙ্গে বইও ছিনতাই হচ্ছে,” পিসিমণি বললেন মুখটাকে কীরকম ব্যাজার করে।
“বই ছিনতাই!” ববি তো আকাশ থেকে পড়ল শুনে। কথাটা অন্য কেউ বললে হেসেই উড়িয়ে দিত। কিন্তু বলছেন পিসিমণি। উনি যে উলটোপালটা কথা বলার মানুষ নন তা সবাই জানে।
“হ্যাঁ বাছা, বই ছিনতাই। লাইব্রেরিতে গিয়ে সে কথাই শুনে এলাম। এক ভদ্রলোক এসে বললেন। ওঁরই বই ছিনতাই হয়েছে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ফল কিনছিলেন। টাকা দেবেন বলে মানিব্যাগ বার করেছেন, অমনি বাইকে করে দুটো ছেলে এসে ছোঁ মেরে ব্যাগটা নিয়ে নিল। বইটা নাকি বগলে চেপে রেখেছিলেন। সেটাও নিয়ে নিয়েছে! বোঝো কাণ্ড! জন্মে শুনিনি বাবা বই ছিনতাইয়ের কথা। তাই বলছি, সাবধানে যেও। বন্ধুর বই, তাকে ঠিকঠাক ফেরত দিতে হবে তো,” পিসিমণি বললেন।
তা সত্যি কথা। ববি, “আসছি পিসিমণি,” বলে চলে তো গেল, কিন্তু বেশ চিন্তিতভাবে। হেঁটে যাচ্ছিল। মনে হল সাইকেলে গেলেই ভালো হত। এইভাবে হাতে করে বইটা নিয়ে যাওয়াও বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। বইটাকে ব্যাগে পুরে চেন-টেন ভালো করে টেনে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ববি বইটাকে শক্ত করে ধরে জোরে জোরে পা চালাল।


বই ছিনতাই ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু শহরে বেশ চাঞ্চল্য পড়ে গেল। টাকা, গলার হার ছিনতাই – সে আর নতুন কথা কী? মাঝে মধ্যেই শোনা যায়। কিন্তু একখানা বই ছোঁ মেরে নিয়ে গিয়ে কার কী লাভ হবে বোঝা গেল না। তবে এ নিয়ে আলোচনা চলতেই লাগল। কেউ বলল, “ভদ্রলোক লাইব্রেরীর বই হারিয়ে ফেলে গপ্পো বানাচ্ছেন না তো?” কেউ বলল, “না না, ফলওয়ালা সাক্ষী আছে, সেও দেখেছে বই ছিনতাই হতে।” মুশকিল হচ্ছে, এক তো বাইক আরোহীদের মুখ বাঁধা ছিল, কেউ তাদের ভালো করে দেখেইনি। দুই, মোটরবাইকের নম্বরটাও খেয়াল করেনি।


নীলুদের এক প্রতিবেশীর বাড়িতেও সেদিন এই আলোচনা হচ্ছিল।
“বড়দি আপনি খোঁজখবর নিন। আপনি চেষ্টা করলেই ধরতে পেরে যাবেন,” বললেন একজন।
“হায় রে আমার পোড়া কপাল,” পিসিমণি বললেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে, “সারা শহরে কোথায় চুরি, কোথায় ছিনতাই হচ্ছে সে ধরা বুঝি আমার কাজ যে এসব খবর শুনলেই আমি খোঁজখবর নিতে শুরু করব? পুলিশ আছে কী করতে? তাছাড়া মানুষকেও সাবধান হতে হবে, চোখ কান খোলা রাখতে হবে। ছিনতাই করে পালাল অথচ কারুর মাথায় এল না মোটরবাইকের নম্বরটা দেখার কথা!”
এটা অবশ্য ন্যায্য কথাই বলেছেন পিসিমণি।
গল্প সেদিন আর বেশিক্ষণ জমল না। পিসিমণির প্রতিবেশী বললেন, “বড়দি, আমি তো প্রায় এক সপ্তাহ থাকছি না, বোনের বাড়ি যাচ্ছি। লাইব্রেরির বইটা পড়েই থাকবে। আপনি নেবেন? পড়ে নিতে পারবেন।”
“এ আবার একটা জিজ্ঞেস করার মতো কথা ভাই? অবশ্যই নেব। এবার লাইব্রেরিতে তেমন ভালো কোনও বই পেলাম না। পড়াই তো কত। তোমারটাই নিয়ে যাই বরং,” এক গাল হেসে বললেন পিসিমণি। ওঁর বই পড়ার নেশার কথা সর্বজনবিদিত।
বইটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখে পিসিমণি বললেন, “লাইব্রেরির বই যত্ন করে পড়তে খুব কম লোককেই দেখলাম। দেখো, বইয়ের কী হাল করে ছেড়েছে! কত কিছু লেখা, চায়ের কাপের দাগ, কী নেই! যত্ন করে পড়তে কী অসুবিধে বুঝি না বাপু!”
তবে বই ছিনতাইয়ের কথা শুনে নীলুও কিন্তু সেই একই কথা বলল।
“বই ছিনতাই ব্যাপারটাই তোমার ইন্টারেস্টিং লাগছে না, পিসিমণি? তোমার জায়গায় আমি হলে কিন্তু লেগে পড়তাম।”
“কিন্তু আমার জায়গায় তো আমিই আছি বাছা, তুমি তো নেই। তাই আমি লেগে পড়ব না, একেবারেই না। আর লেগে পড়ে হবেই বা কী? দেখব হয়তো তোদেরই মতো ছেলেপিলের কীর্তি। বাইক নিয়ে রাস্তাঘাটে উড়তে উড়তে যেতে তো এদেরই দেখি। বুড়ো মানুষ ছিনতাই করছে বলে তো শুনিনি কখনও। না না, এসবে আমি নেই।”
নীলু মুখটাকে গোমড়া করে চলে গেল।
পিসিমণি সদ্য নিয়ে আসা বইটা পড়তে শুরু করলেন। এক পাতা পড়েন আর গজগজ করেন, “ফুল আঁকার আর জায়গা পায়নি! কেন, বাড়িতে সাদা কাগজ নেই? লাইব্রেরির বইতেই আঁকতে হবে?” “চা খেতে খেতে বই পড়ছ পড়ো, তা বলে চা ফেলতেও হবে বইতে?” “সামনের ক’টা পাতা আবার জুড়ে গেল কী করে মলাটের সঙ্গে? বলিহারি!” ইত্যাদি ইত্যাদি।


দিন দুয়েক পর একদিন সন্ধেবেলা হাতে একখানা ছোটো চৌকোমতো জিনিস নিয়ে গম্ভীর মুখে বসেছিলেন পিসিমণি। নীলুর বাবা দেখতে পেয়ে বললেন, “কী হয়েছে, বড়দি? তোমার হাতেই বা ওটা কী?”
“এটা ছিল বইয়ের ভেতরে, এই নে দেখ,” পিসিমণি জিনিসটা দিলেন ভাইয়ের হাতে।
“এ তো দেখছি মেমরি কার্ড!” নীলুর বাবা অবাক, “কোন বইয়ের ভেতর থেকে তুমি পেলে এটা?”
“ওই যে সেদিন মীরার কাছ থেকে বইটা নিয়ে এলাম না? মীরা বলল, বড়দি আপনি বইটা নিয়ে যান, পড়ে নিন, আমি তো কয়েকদিন থাকছি না, সেই বইয়ে ছিল। লাইব্রেরির বই। বইটার সামনের দুটো পাতা মলাটের সঙ্গে আটকানো ছিল। আমিও প্রথমটায় অত গা করিনি। ভেবেছি হয়তো ছেঁড়া-টেঁড়া ছিল, ইচ্ছে করেই আটকে দিয়েছে। আজকে হঠাৎ কীরকম যেন মনে হল। ভালো করে দেখছিলাম, হাতে কী একটা ঠেকল। মনে হল ভেতরে কিছু আছে। সাবধানে খুলতেই এটা বেরোল।”
“আশ্চর্য! বইয়ের ভেতরে মেমরি কার্ড! কে রাখল? তাও আবার লাইব্রেরির বই! এ বই তো আর একজনের কাছে থাকবে না,” নীলুর বাবা বললেন।
“এরকম জিনিস আমার নীলুর কাছে দেখেছি। গরমে ঘুরে এলাম না সিমলা-কুলু-মানালি? বাড়ি ফিরে দেখি নীলু ক্যামেরার ভেতর থেকে এরকমই একটা জিনিস বের করে ল্যাপটপে ঢোকাল। আমি জিজ্ঞেস করাতে বলল, এই দেখো পিসিমণি, এবার সব ছবি ল্যাপটপে দেখতে পাবে। শুনে তো আমি বাক্যিহারা। এইটুকু জিনিসটাতে এত ছবি!”
“হ্যাঁ এতে অনেক জিনিস ধরে,” নীলুর বাবা হেসে বললেন, “এতে কী আছে তা ল্যাপটপে লাগিয়ে আমিও তোমাকে দেখিয়ে দিতে পারি। কিন্তু তোমার নীলু না দেখালে কি তোমার হবে?”
“নীলু ফিরুক, তারপরেই দেখব। নাহলে ভাববে, পিসিমণি এটুকুও অপেক্ষা করতে পারল না! বাছার আমার মনখারাপ হবে,” বললেন পিসিমণি।
বলতে বলতেই নীলু বাড়ি ঢুকল।
“নাও, তোমার নীলু এসে গেছে। এবার ওকেই দাও ওটা।”
নীলু তো সব শুনে তক্ষুণি বসে গেল ল্যাপটপ নিয়ে। মেমরি কার্ড লাগাতে দেখা গেল একটা ঘরের এক অংশের ছবি। একটা আলমারি, আলমারির পাল্লা ভেজানো, কি হোল থেকে চাবি ঝুলছে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠস্বরে কেউ একজন বললেন, ‘খুব বিপদ আমার, বাঁচান।’
‘বাঁচান’ কথাটাও পুরো শেষ হল না। মনে হল যেন তার আগেই রেকর্ডিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু এইটুকুই, আর কিচ্ছু নেই মেমরি কার্ডে।
“এই জন্যেই এটা লুকিয়ে রাখা হয়েছে,” নীলু বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল।
“কিন্তু বিপদ তো, এভাবে বলা কেন? বাড়ির লোকজন আছে, আশেপাশে পাড়া প্রতিবেশী আছে, আত্মীয়স্বজন আছে। পুলিশকেও জানাতে পারে। তা না করে মেমরি কার্ডে রেকর্ড করে লাইব্রেরির বইয়ে লুকিয়ে রাখা! এতে লাভ কী? কেউ তো নাও দেখতে পারে,” নীলুর বাবা বললেন।
“তার মানে ব্যাপার সুবিধের নয়। কেউ সত্যিই বিপদে পড়েছে, কিন্তু কাউকে জানাতে পারছে না। তাই এত কসরত। দেখলি না, মনে হল পুরো কথাটাও যেন শেষ করতে পারল না, আগেই ক্যামেরা বন্ধ করে দিয়েছে। গলা শুনে তো বয়স্ক কোনও লোক মনে হচ্ছে। অসুস্থও হতে পারে। দেখি আরেকবার চালা তো,” পিসিমণি বললেন।
“কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি না। ভিডিও ক্যামেরায় যখন রেকর্ডই করেছে তখন ক্যামেরাটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে রাখেনি কেন? একটা ফটো থাকলেই তো চটপট খুঁজে বার করা যেত,” নীলু বলল।
“দেখ কী অবস্থায় রেকর্ড করেছে। হয়তো এত কিছু মাথাতেই আসেনি,” নীলুর মা বললেন।
“এসব কথা ছেড়ে এখন যিনি এটা রেকর্ড করেছেন তাঁকে আগে খুঁজে বার করতে হবে। কী ভাবছ বড়দি?” নীলুর বাবা জানতে চাইলেন।
“এখন তো আর কিছু করা যাবে না। কাল লাইব্রেরি যাব। মীরার ফেরা অবধি অপেক্ষা করলে চলবে না। জানতে হবে এই বই কে কে নিয়েছিল। মীরার আগে যিনি নিয়েছিলেন তার মেম্বারশিপ নম্বর ১৫২৫। দু’জনের মধ্যে প্রায় দু’মাসের ফারাক। কত কাণ্ড যে হচ্ছে বই নিয়ে! বই ছিনতাই, বইয়ের ভেতরে মেমরি কার্ড! বলিহারি!” পিসিমণি বললেন।


পরের দিন লাইব্রেরি খুলতে না খুলতেই পিসিমণি হাজির বই নিয়ে। বইটা পিসিমণি নেননি লাইব্রেরি থেকে, তার ওপর ওঁর এক গাদা প্রশ্ন। লাইব্রেরিয়ান সমরবাবু স্বভাবতই কারণ জানতে চাইলেন।
পিসিমণি সংক্ষেপে বলে বললেন, “বেশি সময় নেই ভাই, তাড়াতাড়ি করুন। আর দয়া করে কথাটা পাঁচকান করবেন না।”
যতজন বইটা লাইব্রেরি থেকে নিয়েছেন তাঁদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরের একটা তালিকা পাওয়া গেল। মোট তেইশজন। অপেক্ষাকৃত নতুন কেনা বই, তাই রক্ষে। না হলে তালিকা যে আরও কত লম্বা হত কে জানে! এর মধ্যে দু’জন বর্তমানে আর গ্রন্থাগারের সদস্য নেই।
“এদের মধ্যে একজন এই ১৫২৫। এনাকে খুব ভালো চিনতাম আমি। সুবীর মজুমদার। এ শহরের পুরনো বাসিন্দা। এখানকার পাট তুলে ছেলের কাছে চলে গেছেন। আরেকজন হলেন ৩২২৭, ভদ্রমহিলা আসতেন। ওঁর হাজব্যান্ড বদলি হয়ে গেছেন; এই তো হালে মেম্বারশিপ ক্যান্সেল করলেন। বাকিদের মুখ দেখলে চিনতে পারব, কিন্তু ডিটেলস কিছুই বলতে পারব না,” বললেন সমরবাবু।
পিসিমণি লিস্ট নিয়ে বাড়িতে তো এলেন, কিন্তু একুশজনকে খুঁজে বার করা কি চাট্টিখানি কথা! পরের দিন শনিবার। নীলু আর নীলুর বেশিরভাগ বন্ধুদের ছুটি। পিসিমণি ওদেরই ডাকলেন। একডাকেই সবাই সক্কাল সক্কাল হাজির হয়ে গেল।
“এই কাজটা করে দে তো বাবা সবাই মিলে। একুশজনের নাম আছে এই লিস্টে। এদের সম্পর্কে জানতে হবে, এদের বাড়ির লোকদের সম্পর্কেও। বিশেষ করে বয়স্ক কোনও মানুষ আছেন কি না যাঁর কোনও বিপদ-আপদ হয়েছে। কী রে, পারবি না খবর এনে দিতে? আমি ততক্ষণে অন্য একটা কাজ সারি,” বললেন পিসিমণি।
পিসিমণি কিছু বললে তো নীলুরা একপায়ে খাড়া, “পারব না কী গো? এক্ষুণি বেরিয়ে পড়ছি। প্রত্যেকে ক’টা করে ভাগ করে নিই। আজ রাতের মধ্যেই তোমাকে সব খবর এনে দেব। আমাদের কম বন্ধুবান্ধব? কারুর না কারুর চেনা ঠিক বেরিয়ে যাবে। কিন্তু তুমি কী কাজে যাচ্ছ, পিসিমণি?”
“সে আছে বাছা, এখন বলা যাবে না,” পিসিমণি কিছুই ভাঙতে চাইলেন না।
নীলুরা বেরিয়ে পড়ল। কথামতো খবরাখবরও এনে দিল। কিন্তু তাতে সন্দেহজনক কিছুই নেই। অনেক বাড়িতে তেমন বয়স্ক মানুষ কেউ নেই। যে যে বাড়িতে আছেন তাঁদেরও কোনও বিপদ হয়নি। নীলুরা বেশ নিরাশ।
“যা বাবা, তোরা বাড়ি যা। সারাদিন অনেক ঘোরাঘুরি, খাটাখাটনি গেছে, বিশ্রাম কর,” বললেন পিসিমণি। অবশ্য তার আগে সব্বাইকে পেট পুরে লুচি-মাংস-মিষ্টি খাইয়েছেন।
সবাই চলে গেলে বেশ গম্ভীর মুখে পিসিমণি বললেন, “দেখ নীলু, আমরা শুধু তাদের খোঁজখবর নিয়েছি যারা বইটা লাইব্রেরি থেকে এনেছি। কিন্তু অন্য কেউ যদি তাদের কাছ থেকে পড়তে নেয়, এই যেমন ধর, আমি মীরার কাছ থেকে এনেছি, তাহলে?”
“তাহলে তো খুব মুশকিল, পিসিমণি!” নীলু বলল, “কে কাকে বই পড়তে দিয়েছে জানবে কী করে? কেউ যদি দিয়েও থাকে কাউকে পড়তে, তাদেরও যে এখন মনে আছে সে কথা বা ঠিক করে বলবে তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?”
পিসিমণি কিছু বললেন না, চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, “ওইটা আরেকবার চালা না বাবা, শুনি ভালো করে।”
নীলু আবার চালাল। বারদুই শুনে পিসিমণি বললেন, “শোন নীলু, ট্রেনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। রেললাইনের কাছে বাড়ি।”
নীলু শুনল। ঠিক তো, ট্রেনের আওয়াজ! এটা আগে খেয়াল করেনি তো!
“লিস্ট দেখ, রেললাইনের কাছে কার কার বাড়ি,” মুখে এলাচদানা ফেলে বললেন পিসিমণি।
“রেললাইন বা স্টেশনের কাছে একজনেরই বাড়ি পিসিমণি, কিন্তু...”
“কিন্তু? কিন্তু কী?”
“কিন্তু তারা তো আর এখানে থাকেই না। লাইব্রেরির মেম্বারও নয়। ওই ১৫২৫ নম্বর।”
“১৫২৫!” পিসিমণিও অবাক।


পরের দিন সকালে পিসিমণি একাই বেরোলেন। নীলু সঙ্গে যেতে চাইছিল, কিন্তু পিসিমণি রাজি হলেন না, “না বাছা, তোমার আর গিয়ে কাজ নেই। কাল সারাদিন এমনিতেই দৌড়োদৌড়ি গেছে। আজ আর দরকার নেই।”
ব্যাপারটা নীলুর মোটেই মনঃপূত হল না। কিন্তু পিসিমণির না মানে না। এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে যে কোনও লাভ নেই তা বেশ ভালোই জানে ও।
সকাল ন’টায় বেরিয়েছিলেন পিসিমণি, ফিরলেন সেই দুপুর দুটোয়। ততক্ষণে চিন্তায় ভাবনায় সবাই অস্থির। সঙ্গে আবার মোবাইল ফোনটাও নিয়ে যাননি। ফিরলেন ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে। খিদে তেষ্টায় মুখখানা শুকিয়ে এতটুকু। ঘরে ঢুকে সোফার ওপর বসে পড়ে বললেন, “নীলু, পাখাটা চালা না বাবা। খুব ঘোরাঘুরি গেছে। তবে শেষপর্যন্ত যে ভদ্রলোককে উদ্ধার করা গেছে সেটাই অনেক।”
ঘরে একটা সম্মিলিত গুঞ্জন উঠল, “ভদ্রলোককে উদ্ধার!”
“তার মানে তুমি সব জানতে, অথচ আমাকে নিয়ে গেলে না,” নীলুর মুখ হাঁড়ি।
“না বাছা, সব জানতাম না, জানতেই বেরিয়েছিলাম। তোদের মতো ছেলেপিলে সঙ্গে গেলে লোকে আর্দ্ধেক কথাই বলবে না। কিন্তু আমার মতো বুড়িকে বলবে, বুঝলি? তবে সব যে এত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে বুঝিনি।”
“এরকম হেঁয়ালি করলে চলবে না, সব খুলে বল,” নীলু বলল।
পিসিমণি বলতেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু নীলুর মা বাধা দিলেন, “না, এখন নয়। বড়দি হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসুক আগে, খেতে খেতে না হয় শুনিস।”
অগত্যা তাই।

খেতে খেতেই পিসিমণি বললেন সব।
“কাল যখন তোরা লিস্ট নিয়ে বেরোলি, আমি গেলাম সোজা সেই ফলওয়ালার কাছে। ক’টা আপেল, বেদানা কিনলাম আর জানতে চাইলাম সেদিনের ছিনতাইয়ের কথা। ফলওয়ালা বলল, মুখ দেখতে পাইনি দিদি, মুখ ঢাকা ছিল। সে তো জানিই। এদিক ওদিক কথা বলতে বলতে আরও একটা কথা বলল। বলল, সেদিন কীরকম চড়া একটা গন্ধ পেয়েছিলাম। কে জা্নে কোত্থেকে, কিন্তু সে গন্ধে আমার মাথা ধরে গেছিল, এত চড়া। তারপর গেলাম সাইকেল সারাইয়ের দোকানে। ফলওয়ালা যেখানে বসে তার থেকে একটু দূরেই এই দোকানটা। ছিনতাই হল আর সে কিছুই দেখেনি, এ হতে পারে নাকি? কিছু না কিছু তো দেখেছে বটেই।”
“তোমাকে ওরা সব বলল?” নীলু জিজ্ঞেস করল।
“একবার জিজ্ঞেস করলাম আর বলে দিল, তাই কখনও হয়? ভয়ে প্রথমে কিছু বলতেই চাইছিল না। শেষে আমি যখন বললাম, দেখো বাছা, আজ একজনের ব্যাগ, বই ছিনতাই হয়েছে, কাল যদি ছুরি দেখিয়ে তোমার সারাদিনের রোজগার লুটে নিয়ে যায় তখন কিন্তু কিছু বলতে পারবে না। ভয় করলে চলে না, এসব জিনিস প্রথমেই রুখতে হয়। তখন বলল যে বাইকে দু’জন ছেলে ছিল। একজনের মুখ, মাথা সব ঢাকা দেওয়া, অন্যজনের মুখ ঢাকা থাকলেও মাথাটা পুরো ঢাকা ছিল না। সামনেটা খোলাই ছিল। তার নাকি চুলের বেশ কায়দা। খাড়া করা চুল, মাঝে আবার লালচে রঙ। বোধহয় কায়দা নষ্ট হওয়ার ভয়েই ঢাকা দেয়নি। আজ গেলাম ওই ১৫২৫ নম্বরের বাড়ি যেদিকে ছিল সেদিকে। ও নীলু, সে কি কম দূর বাবা! মেইন স্টেশনের দিকে, তাও আবার লাইনের ওপারে!”
“তার মানে বই ছিনতাইয়ের সঙ্গে এই মেমরি কার্ডের যোগাযোগ আছে?” নীলুই বলল আবার।
“হায় রে আমার পোড়া কপাল! তুই এটাও বুঝিসনি, বাবা?” পিসিমণি বললেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে।
“বুঝব কী করে? কাল থেকে এ নিয়ে একটা কথাও বলেছ তুমি? আমাকে আজ সঙ্গে যেতেও দিলে না।”
“আচ্ছা আচ্ছা, আর রাগ করতে হবে না। ইচ্ছে করেই যেতে দিইনি। তারপর কী হল শোন। ওইদিকে গিয়ে ঘোরাঘুরি করতে করতে একটা চায়ের দোকান নজরে পড়ল। বেশ কয়েকজন লোকজন রয়েছে সেখানে। আমিও সেখানেই গেলাম, শরীর খুব খারাপ লাগছে, খুব জল তেষ্টা পেয়েছে – এরকম ভান করে। আমাকে দেখে লোকে উঠে বেঞ্চে বসতে দিল, চাওয়ালা জল দিল। জানি এবার কেউ না কেউ জিজ্ঞেস করবেই কোথায় যাব, কী বৃত্তান্ত। আমিও উত্তর ভেবে রেখেছি। রাস্তার ওদিকের লাল রঙের দোতলা বাড়িটা দেখিয়ে বলব, শুনেছি ওরা একতলা ভাড়া দেবে, তাই দেখতে এসেছি। যা ভেবেছি, ঠিক তাই হল। এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু আমাকে আর উত্তর দিতে হল না। তার আগেই এক মূর্তিমান দোকানে এলেন সিগারেট কিনতে। তেনাকে দেখে এই নিভারানি বামনীরও চক্ষু ছানাবড়া। যেমন জামাকাপড়ের ছিরি, তেমন চুলের। আসামাত্রই এমন উগ্র গন্ধে চতুর্দিক ভরে গেল যে আমার গা গুলিয়ে উঠল। ফলওয়ালার কথাটা মনে পড়ল আমার। মনে হল ইনি হলেও হতে পারেন।
“সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে চলে গেল দাম না দিয়েই। মাস কাবারে নাকি পয়সা দেয়। সবার চোখে মুখে দেখলাম বিরক্তি। ছোঁড়া চলে যেতেই সমালোচনা শুরু হল। লোকের কথাবার্তা থেকে বুঝলাম যে এদিকের একটা বাড়িতেই এ শর্মা আর তার তিন বন্ধু থাকেন পেয়িং গেস্ট হয়ে। পাড়ার লোকজন খুব বিরক্ত এদের ওপর। নানারকম উলটোপালটা কাজকর্ম করে নাকি। একজন বলল, মিস্টার বোস যে কী করে এদের সহ্য করেন জানি না। আরেকজন বলল, আরে উনিও কীরকম মানুষ সেটা দেখ। প্রতিবেশীদের তো পাত্তাই দেন না কোনও কালে। মিশতেন তো এক ওই সুবীর মজুমদারের সঙ্গে। এখন পড়েছেন এদের খপ্পরে।
“কথাবার্তা থেকে বুঝলাম, ওই বাড়িতে মিস্টার বোস বলে এক বয়স্ক ভদ্রলোক আছেন যাঁর অবস্থা মনে হয় খুব সুবিধের নয়। কিন্তু পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোনও কালে সদ্ভাব না থাকার জন্যে এখন আর কেউই গা করছে না। আর সুবীর মজুমদার তো ওই ১৫২৫ নম্বরের নাম।
“বাড়িটাও খুব দূরে নয়। শর্মাকে ঢুকতে দেখলাম তো। রেললাইনের একেবারে কাছে। এবার আমিও উঠে পড়লাম। চাওয়ালাকে ধন্যবাদ দিলাম। বাড়িটার পাশে একটা সরু গলি আছে, সেটাতে ঢুকলাম। গলির ধারের ঘরের জানালা খোলা। দেখলাম, ঘরে বিছানার ওপরে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসে রয়েছেন বালিশে ঠেসান দিয়ে। দেখেই বোঝা যায় অসুস্থ। একটি মেয়ে ঢুকল খাবার নিয়ে। কাজের মেয়েই মনে হয়। থালাটা বিছানায় বসিয়ে বলল, নে বুড়ো, খা। শুনেই আমি যা বোঝার বুঝে গেলাম।
“ওখান থেকে সোজা থানায় গেলাম। দারোগাবাবুকে সব খুলে বললাম। মেমরি কার্ডটা নিয়ে গেছিলাম। সেটাও দেখালাম। তা এবার আর অত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেননি। গেলেন দলবল নিয়ে। পুলিশ দেখেই তো বাছাধনরা পালাচ্ছিল। ওই যে বলে না, কানা মনে মনে জানা, সেই আর কী। নিজেরা তো ভালোই জানে কী কুকর্ম করছে। ভদ্রলোক ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে ছিলেন। কথাই বলতে পারছিলেন না। আমি বাড়ির বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। দারোগাবাবু আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। আমাকে দেখে, আমার কথা শুনে ভদ্রলোক একটু স্বাভাবিক হলেন,” পিসিমণি থামলেন দম নেওয়ার জন্যে।
“তারপর? তারপর কী হল?” এবার আর শুধু নীলু নয়, নীলুর বাবা-মাও এক সঙ্গে বলে উঠলেন।
“ভদ্রলোকের নাম কমলেশ বোস। ওঁর কথা থেকে আর প্রতিবেশীদের কথা থেকে যা বুঝলাম তা হল, এক সময় এই কমলেশবাবু আর তাঁর স্ত্রী কারুর সঙ্গে মিশতেনই না। মাটিতে পা পড়ত না। বেজায় পয়সাওয়ালা লোক নাকি। কারুর সঙ্গে সদ্ভাব ছিল না; মানুষকে মানুষই ভাবতেন না। এক ওই সুবীর মজুমদারদের সঙ্গে যা একটু মেলামেশা ছিল। কিন্তু দিন কারুরই সবসময় সমান যায় না। কমলেশবাবুর স্ত্রী মারা গেলেন; নিজেও নানান অসুখবিসুখে কাবু হয়ে পড়লেন। তার পর পরই মনে হয় এই তিন মূর্তিমান এখানে ঢোকেন পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকবেন বলে। কিন্তু পেয়িং গেস্ট আর রইলেন না। কমলেশবাবুর ঘাড় দিয়েই সব চলতে লাগল। উলটে ওঁকে ভয় দেখিয়ে পয়সাকড়ি আদায় করত। ইদানীং তো ভদ্রলোক পুরো ওদেরই কবজায় ছিলেন। এমনকি আলমারির চাবি-টাবিও সব ওদের কছে। কোথাও ফোন অবধি করতে দিত না। এমন কোনও আত্মীয়স্বজনও নেই যে এসে খোঁজখবর নেবে। একবার নাকি একটা কাগজে সব লিখে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু পড়বি তো পড় সে ওদেরই হাতে পড়েছিল। এরপর থেকে পাহারা আরও কড়া হয়েছে। হাতের কাছে একটা কাগজ-কলম অবধি রাখত না। ভয় দেখিয়ে একটা অসুস্থ মানুষকে বলতে গেলে বন্দি করে রেখেছিল। কাজের মেয়েটাও ওদের দলে। টাকার ভাগ পায় যে।
“ভদ্রলোক নাকি ছবি-টবি তুলতেন, দু’খানা ক্যামেরা আছে। সেসবও তারাও হাতিয়েছিল। একটা কী করে একবার হাতে পেয়েছিলেন। তখনই রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুরোটা পারেননি; কাজের মেয়েটি এসে পড়েছিল। সুবীর মজুমদার ওঁকে বইটা পড়তে দিয়েছিলেন। এরকম দিতেন মাঝে মাঝেই। উনি মেমরি কার্ডটা এক ফাঁকে বইয়ের মলাটে আটকে তার ওপর দুটো পাতা আটকে দিয়ে বইটা ফেরত পাঠালেন। যদি কেউ খুলে দেখে এই আশায়। এর থেকে বেশি কিছু আর উনি করতে পারেননি।
“এদিকে মেমরি কার্ড না পেয়ে ছেলেগুলোর সন্দেহ হল। যদি কিছু রেকর্ড করে বইয়ের মধ্যে করে পাচার করে থাকেন। বইটা তো পড়তে দেখেছে। এরা আবার ছিনতাইতেও হাত পাকাচ্ছিল। পাড়ার লোকের সন্দেহ ছিলই, কিন্তু হাতেনাতে কখনও ধরতে পারেনি। সেদিনও হয়তো ছিনতাই করতেই বেরিয়েছিল। ফলওয়ালার দোকানের সামনে বই হাতে ভদ্রলোককে দেখে বই আর টাকার ব্যাগ দুটোই নিয়ে নিল। বুদ্ধি তো বলিহারি! ওরকম সবুজ রঙের বাঁধানো বই লাইব্রেরিতে যে কত আছে তা যদি জানত!”
“যাক, ভদ্রলোক যে শেষ অবধি রক্ষা পেয়েছেন এটাই বড়ো কথা,” বললেন নীলুর মা।
“এই জন্যেই বলে, সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে হয়। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদ্ভাব না রাখলে চলে কখনও? বিপদে-আপদে ওদেরই প্রথম পাশে পাওয়া যায়। তবে...”
“তবে কী, পিসিমণি?” নীলু জিজ্ঞেস করল।
“ছেলেপিলেদের এই বিপথে যাওয়া দেখতে আর ভালো লাগছে না। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে, তাদের কিনা এই কাজ, এই ব্যবহার! সমাজের কী দুর্দিন বাছা!” পিসিমণির মুখটা যেন কীরকম হয়ে গেল।
“তালুকদার মানে থানার দারোগা যে তোমার কথা শুনল এটাই কিন্তু আশ্চর্যের পিসিমণি,” নীলু তাড়াতাড়ি কথা ঘোরাল। পিসিমণির মনখারাপ ও মোটে সহ্য করতে পারে না।
“হ্যাঁ, তা শুনেছে। শুধু একবার কটমট করে তাকিয়েছিল। যখন দলবল নিয়ে বেরোচ্ছিল, আমি বেশ জোরে জোরে দুগ্গা দুগ্গা বলেছিলাম কিনা। আগেরবার বলেছিলেন না, বয়স হয়ে গেছে এখন ভগবানের নাম করাই উচিত, তাই,” একগাল হেসে বললেন পিসিমণি।
-----

অলঙ্করণঃ অনুপম চক্রবর্তী

2 comments:

  1. জমজমাট পিসিমণি। খুব ভালো লাগল।

    ReplyDelete
  2. খুব মজার আর খুবই ইন্টারেস্টিং ।
    জব্বর লিখেছেন ।
    অভিনন্দন

    ReplyDelete