চলো যাইঃ সনাতনের গল্প - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


সনাতনের গল্প

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


সনাতনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ভীমপুরে। সেই গল্পই বলব। এক গ্রীষ্মের দুপুরে চার বন্ধু মিলে ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পড়েছিলাম চূর্ণী নদীর ধারে কালীনারায়ণপুরে। সেখানে হাঁড়ি উলটনো চাপ দই পেট পুরে খেয়ে ভ্যান রিক্সায় চেপে নানা অ্যাডভেঞ্চার করে আড়ংঘাটা স্টেশনে যখন পৌঁছুলাম, বেলা তখন সাড়ে বারোটা হবে। ঠিক জানি না অবশ্য। কারও হাতেই ঘড়ি ছিল না কিনা। তা স্টেশনে হা-পিত্যেশ করে বসে আছি, এমন সময় উত্তরমুখো একটা ট্রেন গদাইলশকরি চালে স্টেশনে ঢুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, আকাশের সূর্যঠাকুরের মতো তারও রওনা দেবার কোনও তাড়া নেই। তার নাম গেদে লোকাল। নামটা দেখেই এক সেথোর মনে পড়ল, বছর দুই আগে মাঝদিয়ার কাছে ভীমপুরে তার একটা দোতারা সারাই করতে দিয়ে এসেছিল সনাতন মিস্তিরির দোকানে। এ ট্রেন তো মাঝদিয়ায় যাবে। তা এত কাছেই যখন এসে পড়েছি, একবার খোঁজ নিয়ে গেলে হয় না? বাহা রে আমার খদ্দের। দিলি তো দিলি তারপর এক্কেবারে দু-দুটো বচ্ছর পাত্তা নেই? ও জিনিস কি আর আছে? সেথো বলল, “চলো, দেখি গিয়ে নেই তো নেই, ঘোরাটা তো হবে। সেই সঙ্গে লালন আশ্রমটাও অমনি একটা পাক মেরে আসা যাবে। সেও তো ভীমপুরে।”
যেই ভাবা সেই কাজ। মাঝদিয়ার টিকিট কেটে ট্রেনে চেপে বসলাম। ট্রেনটা বোধহয় আমাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যাবার মতলবেই ছিল। পা পেতে বসতে না বসতে চলতে শুরু করে দিয়েছে।
মাঝদিয়া ইস্টিশন থেকে বাসে চেপে ভীমপুর। আশ্রম-টাশ্রম ঘুরে একটা দোকানে বিকেল চারটের সময় নতুন করে ডিমসেদ্ধ-ভাত রাঁধিয়ে চাট্টি খেয়ে সেথো বলল, “চলো এবারে সদানন্দের ঘাঁটি।”
রাস্তাখানা তার মনে আছে ঝাপসামতো। সে চলে আগে আগে, আর পেছু পেছু বাকি তিনজন। কটাক্ষে, মশকরায় পথ কাটে। সময়ও।
ইতিমধ্যে দু-দু’বার ‘পেয়েছি পেয়েছি’ হাঁক দিয়েও সেথো মুখটি ব্যাজার করে পিছিয়ে এসেছেন। এমনি করে যখন সূর্যঠাকুর পাটে বসব বসব করছেন, আর আমাদেরও সেই ‘কোথায় পাব তারে’ গান বেরোচ্ছে গলা ঠেলে, এমন সময় তিন নম্বর বার ‘পেয়েছি পেয়েছি’ হাঁক মেরে বন্ধু আমার একটা আধভাঙা, কচুগাছ ওঠা চালার সামনে খুঁটি গেঁড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে দেখি হাঁক পাড়তে লেগেছেন, “সনাতনদাদা, আছ নাকি?”
খানিক পরে যিনি বেরিয়ে এলেন তাঁর হাঁটুর ওপর ধুতি। হাত-পাগুলো যেন কতকালের পুরনো গাছের বাকল ওঠা শেকড়। গলায় বৈষ্ণবোচিত মালা, কণ্ঠে বৈষ্ণবোচিত বিনয়। বেশ লোকটি। বললেন, “কে গো?”
বন্ধু বললেন, “সনাতনদাদা, আমি এসেছিলাম, আমার...”
কথাটি শেষ করবার আগেই গালের ভাঁজ খাওয়ায় আরও ভাঁজ ফেলে পানরাঙা অবশিষ্ট দাঁত ক’টি বার করে দাদা বললেন, “অ, বুঝেছি। তা ছিলে কোথা অ্যাদ্দিন? এ-মেলা ও-মেলায় ঘুরি আর খুঁজি, দোতারাটি হাতে ধরিয়ে ভায়া আমার গেল কোথা। শেষে যন্ত্রটি ঠিকঠাক করে এনে তুলে রেখেছিলাম। নিয়ে আসি ভেতর থেকে।”
যেন কতই আসাযাওয়া রোজ। যেন এই গতকালের ঘটনা হবে। তোমার জিনিস আমায় বিশ্বাস করে গচ্ছিত রেখেছিলে। আজ যখন ফিরিয়ে নিতে এলে, প্রশ্ন করব না, কেন এলে না এতদিন, বলব না হারিয়ে গেছে তোমার গচ্ছিত ধন।
খানিক পরে যন্ত্রটি বার করে এনে বললেন, “গেলবারের বানে সব ভেসে গেল, তাতে তোমার যন্ত্রের কাপড়ের খাপটি ভেসে গেছে, দাদা। বাকিটা সারিয়ে রেখেছি। নতুন ছাউনি পড়েছে। দাঁড়াও দেখি, তার পরিয়ে আনি।”
তারের নিচে দেবার জন্য কাঠের নির্দিষ্ট আকারের টুকরোগুলো নিপুণ হাতে খুদে তুলে তার ওপরে তার বসতে আর কতক্ষণ। তারপর আদর করে যন্ত্রটির গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, “দেখি, সুরে বসাই।”
ছবিটা এখনও মনে আছে। সেই ধুলো-মাটি-ঘাসভরা একচিলতে উঠোনের ওপর একটা জলচৌকিতে উবু হয়ে বসে দুটো শির ওঠা হাতে যন্ত্রে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করছেন একজন বুড়ো মানুষ। পরীক্ষার ছলে বেজে উঠছে মন টানা সব সুর। লালন ফকিরের বাঁধা মানুষে মানুষে ভালোবাসার গানের সেইসব সুরের মধ্যে দিয়ে বন্ধুর দোতারাটি আবার প্রাণ ফিরে পেল। আর আমরা পেলাম স্মৃতির গ্যালারিতে বাঁধিয়ে রাখবার মতো একজন সনাতন ভারতীয়ের ছবি।
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment