প্রবন্ধঃ উষ্ণায়নে ক্ষতিগ্রস্ত মেরুপ্রদেশ ও মেরুভাল্লুক সম্পর্কে কিছু কথা - সবর্না চ্যাটার্জী

উষ্ণায়নে ক্ষতিগ্রস্ত মেরুপ্রদেশ ও মেরুভাল্লুক সম্পর্কে কিছু কথা

সবর্না চ্যাটার্জী


ছোট্ট বন্ধুরা, আজ বরং চলো একটু ঠান্ডার দেশ থেকে ঘুরে আসি যেখানে শুধু বরফ,আর বরফ
তোমরা আর্কটিক সার্কেলের নাম শুনেছ তো? চলো, আজ আমরা আর্কটিক সার্কেল আর ওখানকার অন্যতম প্রাণী পোলার বিয়ারদের নিয়ে কিছু কথা জেনে নিই

জানো তো, এই উত্তরমেরু প্রদেশের পুরোটাই প্রায় বরফে ঢাকা তোমরা এটাও জানো, সারা বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন এক বিরাট সমস্যা এই উষ্ণায়নের জন্য কিন্তু খুব দ্রুত গলছে সুমেরুর বরফের পরিমাণ গত ৪০ বছরে এই বরফের পরিমাণ এখনই সবচেয়ে কম

যে সমস্ত অঞ্চলে তাপমাত্রা অত্যন্ত কম ও সমুদ্রের জলে বরফ আছে সেখানে মিথেন গ্যাস কঠিন আকারে (বরফের মতো) জমা হয় হিমশীতল সমুদ্রের তলদেশে একে মিথেন ক্ল্যাথরেট বলে। আবার বার্নিং আইস বা ফায়ার আইসও বলে ফলে ক্রমশ কমতে থাকে সমুদ্রের গভীরতা সমুদ্রের বরফ গলনের ফলে ক্ল্যাথরেট থেকে ক্রমাগত যে মিথেন গ্যাস (গ্রীন হাউজ গ্যাস) নির্গমন হয়, তার ফলেও ক্রমশ বাড়ছে উষ্ণতা বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, উষ্ণায়নের ফলে এভাবে বরফ গলতে থাকলে একদিন গ্রীনল্যান্ডের সমস্ত বরফও গলে যাবে যার ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাবে ৭ মিটার পর্যন্ত সমুদ্রের বরফ সূর্যরশ্মির প্রতিফলন ঘটিয়ে উষ্ণতা কম রাখতে সাহায্য করে কিন্তু গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে এই বরফ গলে যাচ্ছে ও জলস্তর অনেক বেশী পরিমাণ রশ্মি শোষণ করছে ফলে উষ্ণতা বেড়েই চলেছে
আরেকটা কথা, ‘ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ এই সংস্থার মতে, উষ্ণতা বৃদ্ধি ও হ্রাসের প্রভাব পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে মেরুপ্রদেশে অনেক বেশি ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সালে উষ্ণতা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল গ্রীন হাউজ গ্যাস ও সুটের (অশোধিত কার্বন) প্রভাব ছিল এই অত্যাধিক উষ্ণায়নের কারণ আর একটা কথা জানলে তোমরা খুব অবাক হবে, বর্তমানে আবার বিজ্ঞানীরা সাদা বরফের ওপর গোলাপি রংয়ের বরফের সন্ধান পেয়েছেন কিছু কিছু জায়গায় এর নাম দেওয়া হয়েছে ওয়াটারমেলন স্নো আর তা নিয়ে বেশ চিন্তিতই বিজ্ঞানীরা
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আসলে বরফ রঙ পাল্টায়নি৷ বরফের উপর জন্ম নেওয়া লালাভ রঙের এক অ্যালগির কারণেই এই রঙ বদল বিশেষধরনের এই শৈবাল হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রাতেও জন্ম নিতে পারে৷ সূর্যরশ্মি শোষণের পরই স্বাভাবিক সবুজ এই শৈবাল থেকেই একধরনের প্রাকৃতিকসানস্ক্রিন’-এর তৈরি হয় যা গোলাপি আভায় আছন্ন করে রেখেছে৷ সাদা বরফের তুলনায় গোলাপি শৈবালের তাপশোষণ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় বরফ গলার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে অনেক গুণ বিশ্ব জুড়ে বরফ গলা এমনিতেই বিজ্ঞানীদের মাথাব্যথার কারণ, তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এই শৈবাল৷ যত বরফ গলবে তত বংশবিস্তার করবে এই শৈবাল৷ ফলে গুণিতক হারে বরফ গলতেই থাকবে৷ মেরুপ্রদেশ থেকে অন্যান্য পোল ঢাকা অঞ্চলে এখন অল্প পরিমাণেই দেখা গিয়েছে এইওয়াটারমেলন স্নো৷ তবে ছোট্ট কারণ যে বড়ো বিপর্যয় হয়ে দেখা দিতে পারে তা আঁচ করে চিন্তিত বিজ্ঞানীরা৷ ইতিমধ্যেই এ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন জার্মান রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানী স্টিফেন লুতজ৷ শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যোসেফ কুকও নমুনা সংগ্রহ করে পুরো বিষয় খতিয়ে দেখছেন৷ গোলাপি বরফ আখেরে যে হিমবাহগুলোকেও দ্রুত গলিয়ে দিতে পারে পারে সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা৷ আর তাই এর আগ্রাসন রুখতে কী করা যায় তারই সন্ধানে আছেন তাঁরা৷
সবথেকে চিন্তার বিষয় কী জানো তো, এই উষ্ণায়নের প্রভাব সবচেয়ে ক্ষতি করছে এখানে বসবাসকারী প্রাণীদের
আগেই বলেছি, সুমেরুতে দ্রুত হারে গলছে বরফ যার ফলে আগামী বছর ৩৫ থেকে ৪০-এর মধ্যে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এক তৃতীয়াংশ পোলার বিয়ার বা মেরুভাল্লুক ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অফ নেচার (IUCN)-এর রিসার্চ রিপোর্ট বলছে, খুব বেশি হলে আর ৪০ বছর গরমের জেরে পোলার বিয়াররা হারাতে চলেছে তাদের এক তৃতীয়াংশ সদস্যকে
বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে অদূর ভবিষ্যতে যেসব প্রজাতির প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, সেই লাল তালিকায় প্রথমেই রয়েছে পোলার বিয়ার বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, গরমের জেরে সামুদ্রিক বরফ গলে যাচ্ছে দ্রুত হারে ফলে পোলার বিয়ারদের বাঁচার আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে বিজ্ঞানীরা বলছেন, পোলার বিয়ারের সংখ্যা ২৬ হাজার থেকে কমে ১৭ হাজার হয়ে যাবে আগামী ৩৫ বছরেই
এই পোলার বিয়ার সম্পর্কে চলো কিছু চমকপ্রদ তথ্য আমরা জেনে নিই তোমরা কি জানো, পোলার বিয়ার বা মেরুভল্লুক উত্তরমেরু এলাকায় বাস করে?
·  এরা প্রধানত সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী কার্নিভোর পরিবারের বৃহত্তম শিকারী প্রাণী খাবারের সন্ধানে এরা যাযাবরের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ায়
·  একটি পূর্ণবয়স্ক পোলার বিয়ারের ওজন ৬৫০ থেকে ১১০০ পাউন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে পুরুষ পোলার বিয়ারের ওজন অপেক্ষাকৃত বেশি হয়
·  এদের গায়ের রং সাদা, কখনও কখনও হলুদাভ হয়ে থাকে
·  পোলার বিয়ার কোনওরকম বিশ্রাম ছাড়াই একনাগাড়ে ৬০ মাইল সাঁতার কাটতে পারে
·  তাদের শরীরের ওজনের দশ ভাগের এক ভাগ ওজনের খাবার একঘণ্টার মধ্যে সাবাড় করতে পারে
·  এদের লিভার বা কলিজায় এত বেশি ভিটামিনআছে যে স্বাভাবিক মানুষের জন্য তা প্রাণনাশক হতে পারে
·  জানো তো, সাধারণত গর্ভবতী পোলার বিয়ার পুরো শীতকালটা হাইবারনেট বা ঘুমন্ত অবস্থায় কাটায়
·  ধারণা করা হয়, পোলার বিয়াররা খুব হিংস্র কিন্তু আসল ঘটনা হচ্ছে গত ৩০ বছরে মাত্র সাতজন লোক পোলার বিয়ারের হাতে মারা গেছে
·  সিল পোলার বিয়ারের প্রিয় খাদ্য এরা সিলের চামড়া, চর্বি এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খেয়ে থাকে কিন্তু মাংস খায় না পোলার বিয়ার প্রায় ২০ মাইল দূর থেকে গন্ধ শুঁকে সিলের উপস্থিতি টের পায়
·  জন্মের সময় পোলার বিয়ার অত্যন্ত ছোটো থাকে ওই সময় এদের আকার প্রায় একটি ধেড়ে ইঁদুরের মতো এবং ওজন এক পাউন্ডেরও কম থাকে
·  পূর্ণবয়স্ক পোলার বিয়ার ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয় এবং এটি প্রায় ২৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে

তাহলে বন্ধুরা, তোমরা কিন্তু আজ অনেক কিছু জানলে মেরুভাল্লুক ও মেরুপ্রদেশের সঙ্কটজনক পরিবেশ সম্পর্কে তোমরা তোমাদের বন্ধু ও ভাইবোনদের এগুলো গল্প করতে পার আর তার সাথে পরিবেশ উষ্ণায়ন সম্পর্কে আরও নানান তথ্য দিতে পার।


https://en.m.wikipedia.org/wiki/Polar_bear




http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2011-08-20/news/179517
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment