গল্পঃ টোটন সিংয়ের উপস্থিত বুদ্ধি - অরুণ চট্টোপাধ্যায়


টোটন সিংয়ের উপস্থিত বুদ্ধি

অরুণ চট্টোপাধ্যায়


নতুন ট্যাক্সিটা কিনেছে টোটন সিং ব্যাঙ্ক থেকে কিনেছে ধার করে ইচ্ছে এবার ব্যবসা করে টাকা পাঠাবে দেশের বাড়িতে মানে সেই পাঞ্জাবে বাবা দেশে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে বিছানায় মা অনেক কষ্টে সংসার চালায়
পড়া ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের অন্বেষণে বেরিয়ে পড়া সুদূর পাঞ্জাব থেকে বাংলার মাটিতে এসে পড়া পরিচয় হল এক সহৃদয় বন্ধুর সঙ্গে একটা সুযোগ পেল লোনে ট্যাক্সিটা কেনার কিন্তু ভাগ্য এমনই তার মন্দ যে কিছুতেই যাত্রী হয় না তার ট্যাক্সিতে ভাগ্যের ওপর তার রাগ হলেও করার কিছু নেই সেই বন্ধু বলে দিয়েছে ভাগ্যের চাকা এমনি এমনি ঘোরে না পরিশ্রম, সততা আর বুদ্ধির জোরে ঘোরাতে হয়
একবার এক যাত্রীকে পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময় একটু ধীরগতিতে আসছিল সে ভেবেছিল ট্যাক্সির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনও মানুষ যদি তার ট্যাক্সি দেখে হাত দেখিয়ে থামায় এমনভাবে আর কতদিন লোকসানের বোঝা বইবে সে বুঝতে পারছে না
কখন যে ট্যাক্সিটা একটা ব্যাঙ্কের শাখার কাছে এসে পড়েছে বুঝতে পারেনি অন্যমনস্কভাবেই তাকিয়েছিল বাঁদিকে দেখল কোনও এক ব্যাঙ্কের বিরাট বড়ো হোর্ডিং সেটা দেখে ঝট করে সে ট্যাক্সিটা থামিয়ে দিল অনেক সময় ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে লোকেরা ট্যাক্সি খোঁজে তাই একটু অপেক্ষা করে দেখতে লাগল যদি কেউ আসে
এমন সময় হঠাৎ তার মনে হল, তাই তো, এটা তো ট্যাক্সি দাঁড়াবার জায়গা নয় যদি পুলিশ এসে পড়ে এই ভয়ে সে তো তাড়াতাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিল কিন্তু কী বিপত্তি! চোখের নিমেষে ভোজবাজির মতো একটা মুখ ঢাকা লোক তার মাথায় একটা পিস্তল ঠেকিয়ে দিল চাপা গলায় বলল, “চুপ করে দাঁড়া, কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ করবি না যতক্ষণ না পর্যন্ত ব্যাঙ্কের ভেতর থেকে আমার বন্ধুরা এসে পৌঁছচ্ছে ওরা এসে গাড়িতে উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে স্টার্ট করবি যেখানে যেতে বলব সেখানেই যাবি একটু বেচাল দেখলেই গুলি মেরে খুলি উড়িয়ে দোব
একটা তোয়ালে জাতীয় কিছুতে সারা মুখ ঢাকা চোখও ঢাকা কালোর কাচের সানগ্লাসে ভয়ে তো টোটনের হাত-পা কাঁপতে লাগল কী সর্বনাশ! এরা তবে ডাকাত? ব্যাঙ্কে দলবেঁধে ডাকাতি করতে ঢুকেছে? এদের কথা না শুনলে তো এরা মেরে ফেলবে আবার কথা শুনলেও তো পুলিশ তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে জেলে ভরে দেবে কিন্তু কী আর করা যাবে শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া?
নিজের ভাগ্যকেই বার বার দোষারোপ করা ছাড়া তো আর কিছুই খুঁজে পেল না টোটন আর ওদিকে মুখঢাকা লোকটা তো বার বার ব্যাঙ্কের দিকে তাকাচ্ছে সানগ্লাসে ঢাকার জন্য চোখ দেখতে না পেলেও টোটনের ধারণা ওর চোখেও বেশ ভয়ের ছায়া
টোটন গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বসে আছে ইঞ্জিনটা একটা হালকা চাপা আওয়াজ করেই যাচ্ছে একেবারে বন্ধ করা যাবে না সেটা তেমন করলেই লোকটা তার জীবনের স্টার্ট একেবারে বন্ধ করে দেবে
কয়েকটা মিনিট এইভাবে কাটল এমন সময় দু-তিনজন লোক ব্যাঙ্ক থেকে দৌড়ে দৌড়ে বেরোল সঙ্গে একটা বিরাট বড়ো ব্যাগ বোধহয় ব্যাঙ্ক থেকে লুঠ করা টাকা আছে এতে এদের প্রত্যেকের মুখে মুখোশ আর চোখ সানগ্লাসে ঢাকা এরা ব্যাগটা নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে প্রায় হোঁচট খেতে খেতে আসছে এদের সকলের হাতে বন্দুক সেটা কয়েকজন তাক করে রেখেছে ব্যাঙ্কের দিকে, আবার কয়েকজন তাক করে রেখেছে বাইরে রাস্তার দিকে
ওরা এসে দাঁড়াল ট্যাক্সিটার পেছনদিকে একজন ব্যাঙ্কের দিকে বন্দুকটা তাক করে পাহারা দিতে থাকল বাকি দু’জন খুলল ডিকি আর পেছনে গুঁজে দিল সেই ভারী বস্তাটা তারপর বন্ধ করল ডিকিটা
সামনের লোকটা তখনও টোটনের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আছে সে নড়েনি জায়গা ছেড়ে লোকটার চোখে ক্রুর একটা দৃষ্টি এরা এবার ট্যাক্সির দরজা খোলার চেষ্টা করছে সামনের লোকটাও ওদের সঙ্গে সামিল হল চারটে দরজায় চারজন কিন্তু পিস্তল তার দিকেই তাক করা
আয়নায় সব দেখছে টোটন সব ঘটনা ঘটনা ঘটে গেল ম্যাজিকের মতো সময় লাগল মাত্র মিনিট দুই কি তিন
একটা বিশ্রী অপরাধের সঙ্গ দিতে হবে সে এই ব্যাপারের সঙ্গে কিছুমাত্র জড়িত না হয়েও বাবার কথাটা মনে হল বাবা বার বার বলেছে, নুনভাত খাবে সেও ভালো, কিন্তু অসৎ হবে না তার কান্না পেয়ে এল আজ তো নিজের অনিচ্ছাতেও অসৎ হতে হচ্ছে
ওরা সব ওঠার চেষ্টা করছে সবে এখনও ওঠেনি দরজা একটুখানি খুলে ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছে ওদের হাতে সময় নেই বিদ্যুতের ঝিলিকের থেকেও দ্রুতগতিতে ওরা কাজ করছে টোটনের হাতেও সময় নেই তারও মাথায় যেন বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল চকিতে যা হয় হোক একটা রিস্ক নিতেই হবে এদের কথা না শুনলে এরা মারবে আর শুনলে পুলিশ জেলে পুরবে তাতে তো তবুও প্রাণে সে বেঁচে থাকবে তৃতীয় একটা পন্থা চকিতে মাথায় এসে গেছে তার
মুহূর্তে গিয়ার পালটে ফেলল সে আর অ্যাক্সিলারেটর চেপে ধরল প্রবলভাবে গাড়িতে উঠতে পারল না ওরা কেউ ছিটকে গিয়ে পড়ল রাস্তায় ভিড়ের রাস্তায় প্রচন্ড গতিতে ট্যাক্সি চালিয়ে দিয়েছে সে পথচারী বা অন্য গাড়িগুলো হুড়মুড় করে সামলাচ্ছে নিজেদের
বেশ খানিক প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে এসে ভাবতে লাগল টোটন কেউ তো কোনও গুলি ছুড়ল না! তার মানে বন্দুকগুলো সব নকল! কিন্তু এবার সে কী করবে? বিপজ্জনক লোকগুলো তার সঙ্গে নেই বটে, কিন্তু ডিকিতে আছে সেই বিপজ্জনক টাকার বস্তাটা এখন যদি রাস্তায় ট্র্যাফিক পুলিশ গাড়ি থামিয়ে সার্চ করে?
তার মনে হল সে বেশ একটু নিরাপদ দূরত্বে এসে গেছে হঠাৎ দেখল একটা থানা প্রথমে তো তার বুকের ভেতরে হাতুড়ি পিটতে লাগল তারপর হঠাৎ চোঁ করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল মাথায় রিস্ক তো সে অনেক নিয়েছে এবার বাকিটুকুও নিতে হবে কথায় বলে, নো রিস্ক নো গেইন এতটা রিস্ক নিয়েছে যখন তখন বাকিটাও নিতে হবে এই টাকার বাক্সটা একটা বোমার মতো লাগল তার কাছে যতক্ষণ কাছে আছে ততক্ষণই যেন ফাটার ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াতে লাগল এটার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে
গাড়িটা রাস্তায় দাঁড় করিয়েই ছুটল থানার ভেতর গিয়ে হাউমাউ করে সব খুলে বলল থানা অবশ্য প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি তাদের মনে হয়েছিল, লোকটা নিজে ব্যাঙ্ক লুঠ করে তারপর সাধু সাজার চেষ্টা করছে কিন্তু পরে তাদের সে সন্দেহ ফিকে হতে শুরু করল
বড়োবাবু বললেন, “ঠিক আছে, আমরা দেখছি কী করা যায় তুমি এখানেই বস বাইরে বেরোলে তোমার বিপদ হতে পারে
ট্যাক্সিটা তেমনভাবেই দাঁড় করানো রইল একটু পরেই আরেকটা গাড়ি করে ডাকাতগুলো এসে পড়ল হুড়হুড় করে প্রথমে তাদের মনে হয়েছিল ট্যাক্সিটা বোধহয় ব্রেক ডাউন হয়েছে তারপর যখন দেখল কিছু হয়নি শুধু চালক বেপাত্তা তখন তারা একজন ঢুকে বসল চালকের আসনে আর বাকি একজন বসল সামনের সীটে দু’জন খুলতে গেল পেছনের দরজা কিন্তু গাড়ির সিটের নিচে থেকে তখন বেরিয়েছে আর কয়েকটা লুকিয়ে থাকা হাত সেই হাতে চকচকে কালো বন্দুক পুলিশের আসল বন্দুক
অনেক টাকা লুঠ করেছিল লোকগুলো তাদের জেলে ভরে দেওয়া হল পুলিশের পক্ষ থেকে টোটনকে দেওয়া হল সাহসিকতার পুরস্কার ইতিমধ্যে ব্যাঙ্কের ম্যানেজার আর সব লোকেরা এসে পড়েছে থানায় সব টাকা উদ্ধার হওয়ায় ম্যানেজার খুব খুশি তিনি নিজে এগিয়ে এসে তাকে দিলেন একটা চাকরি অবশ্য চাকরি ঠিক নয় ব্যাঙ্কের কাজে তার গাড়িটা সর্বদা ভাড়া নেবার প্রতিশ্রুতি এমন সৎ সাহস কজনের হয়?
_____

অলঙ্করণঃ বিশ্বদীপ পাল

1 comment:

  1. বিশ্বদীপ পালকে অসংখ্যা ধন্যবাদ এমন সুন্দর অলংকরণের জন্যে। একপর্ণিকাকে ধন্যবাদ গল্পটি প্রকাশ করার জন্যে।

    ReplyDelete