গল্পঃ বিথোভেনের ফিফথ সিম্ফনি - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


বিথোভেনের ফিফথ সিম্ফনি

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


এক

জানালার পাশে একটা কাঠবেড়ালি বাসা বেঁধেছে। ক’দিন ধরেই জিকো কাঠবেড়ালিটাকে বারবার যাতায়াত করতে দেখেছে। জিকোদের বাড়িটা দোতলা। সামনে একটা বিরাট আমগাছ। আমগাছের মোটা কান্ডের দু’পাশ দিয়ে দুটো ডাল উঠে জিকোদের দোতলা বাড়ির ছাদ ছাড়িয়ে যেন আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। গাছের ডালদুটো যেখান থেকে ছড়িয়ে গেছে, ঠিক সেখানে বড়সড় এক গর্ত। গর্তের মধ্যে কাঠবেড়ালিদের বাসা। কখনও তারা গাছের ডাল বেয়ে উপরে ওঠে, আবার কখনও ক্ষিপ্রগতিতে নিচে বাগানে নেমে আসে। বাগান থেকে খুঁটে খুঁটে খায় মুখ নিচু করে।
জানালার পাশে কাঠবেড়ালিদের কাণ্ডকারখানা দেখে জিকোর কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টাওদের লোমশ নরম শরীর সাদা-কালোর ডোরা আঁকা। সরু মুখ, অনেকটা ঠিক যেন ইঁদুরের ভাই! জিকোর ওদের দেখে খুব হাসি পায়। একমুহূর্ত ওরা স্থির হয়ে কোথাও বসে না। সবসময় ছুটছে।
ইদানিং নিজের ভেতর একটা বড়ো পার্থক্য টের পায় জিকোসারাদিন জানালার পাশে বসে বসে কাঠবেড়ালিদের পর্যবেক্ষণ করতে করতে আজকাল সে ওদের ভাষা বুঝতে পারেঅথচ মানুষের ভাষা বুঝতে তার বেজায় অসুবিধা। ক্লাসে টিচার পড়ানোর সময় জিকোর মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়। একবর্ণ মাথায় ঢোকে না। আবার মা যখন বলে হাত দিয়ে ভালো করে ভাত-ডাল মেখে খেতে, তখনও জিকো কিছুতেই মায়ের কথামতো কাজ করতে পারে না। জিকোর মার খুব ধৈর্য। তিনি একটুও না রেগে ওকে সাহায্য করেন।
অঙ্কের ক্লাস ছাড়া কোনও ক্লাসেই জিকো মনঃসংযোগ করতে পারে না। তার ঘুম পায়। যে বিষয়ে আগ্রহ নেই, তাতে একাগ্রতা আনা ওর পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, অঙ্কের ক্লাস হলেই ওর ঘুম পালিয়ে যায়। সংযুক্তা-ম্যামের সবচাইতে প্রিয় ছাত্র জিকো। ক্লাসে যেকোনও জটিল অঙ্ক কষতে দিলে এক লহমায় তার সমাধান এক জিকো ছাড়া আর কেউ করতে পারে না। একমনে পাতার পর পাতা অঙ্ক কষে যায় জিকো। বন্ধুরা খানিকটা হলেও এইজন্যই বোধহয় ভয় পায় ওকে। এড়িয়েও যায়। কারণ, আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো গতানুগতিক পথে হাঁটতে পারে না জিকো। ক্লাসের প্রথম সারিতে ও বসে থাকে একা। বন্ধুদের সাথে কথা বলতেও চায় না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে রাজ্যের অনীহা।
শুধু কাঠবেড়ালিদের ভাষা কেন, ছাদের উপর বসে থাকা কাকেদের ‘কা কা’ শব্দের মানে জিকো খুব সহজেই খুঁজে পায়। পায়রাগুলো উড়ে এসে জানালার খড়খড়িতে বসে কাকেরা ওদের তাড়া করে। পায়রাগুলো ভয় পেয়ে উড়ে যায়। জিকো একাগ্র মনে ওদের দিনযাপনের পালার সাক্ষী হয়। কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আলো ফুটে ওঠে, জানতেই পারা যায় না।
বাগানের পাঁচিলের উপর দিয়ে মোটা বেড়ালটা গদাইলস্করি চালে হেঁটে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে মিয়াঁও বলে গাছের ডালে বসা পায়রাদুটোকে ধমকে দিয়ে গেল জিকোর মনের সূক্ষ্ম তন্ত্রীতে সহজেই সে কথা ধরা পড়ে। কিন্তু মা যখন নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে না রাখতে পারার জন্য বকুনি দেন, জিকোর কানে শুধু তীব্র ঝনঝন শব্দ ছাড়া আর কোনও অর্থ ধরা পড়ে না। কথা না শুনে একমনে সে বাগানের গাছপালার দিকে মনঃসংযোগ করেছে দেখে মায়ের কানমলা খেতে হয়।
গান শুনতে খুব ভালো লাগে জিকোর। কিন্তু কানে ইয়ার প্লাগ লাগানোটা বিচ্ছিরি লাগে। তাই বাড়ির ড্রয়িং রুমে রাখা বড়ো মিউজিক সিস্টেমে গান শুনতেই বেশি ভালোবাসে। স্কুলে মিউজিক ক্লাস নেন সুব্রতস্যার। সুব্রতস্যারের ক্লাস জিকোর খুব ভালো লাগে মাউথ অরগ্যান বাজাতে সে ভালোবাসে সবচাইতে বেশিসুব্রতস্যার লক্ষ করেছেন, জিকো অন্য বাচ্চাদের চাইতে অনেক দ্রুত কোনও টিউন চট করে মাউথ অরগ্যানে তুলে নিতে পারে।
ওর বয়সের বাচ্চারা যখন খেলার মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়ায়, তখন ক্লাসের এককোণে বসে ব্যাগ থেকে ‘মেকানিক্স’ বার করে বিভিন্ন সাইজের স্টিলের পাত জুড়ে জুড়ে নানারকম জিনিস বানায়। এই খেলনাটা জিকোর বাবা ওকে গতবছর জন্মদিনে কিনে দিয়েছিলেন। কখনও সে এরোপ্লেন বানিয়ে ফেলে, কখনও বা স্পেস শাটল।

দুই

সেদিন ছুটি ছিল স্কুলেস্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস। জিকোর বাবা-মা দু’জনেই চাকরি করেন। বাড়িতে জিকো আর দাদু। দাদু অনেক গল্প শোনানোর চেষ্টা করে জিকোকে। কিন্তু গল্প শোনার চাইতে আপনমনে থাকতেই ভালো লাগে ওরসকালবেলা হঠাৎ চারদিক অন্ধকার করে ঘনিয়ে এল কালো মেঘ। বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। জিকো জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। রাস্তায় বৃষ্টির ফোঁটা ধুলো উড়িয়ে আছড়ে পড়ছে। বাতাসের ঝাপটায় গাছ দুলছে। গাছের মাথায় কাক ডাকল। সামনের আমগাছটার কোটর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল কাঠবেড়ালিটা। একছুটে বাগান পেরিয়ে জিকোদের জলের পাইপ বেয়ে জানালার নিচে সান শেডের উপর। জিকোর স্থির দৃষ্টি কাঠবেড়ালিটার দিকেএক লাফে কাঠবেড়ালিটা ডিশ অ্যান্টেনার তার বেয়ে সোজা উঠে এল জানালার পাশে। বড়ো জানালার পাশে একটা কাচের পাল্লা লাগানো ছোটো জানালা আছে, সেটা সবসময় বন্ধই থাকে। সেই জানালার পেছনে কাঠ-কুটো জোগাড় করে বাসা বানিয়েছে কাঠবেড়ালি।
পর্দার ফাঁক থেকে কাঠবেড়ালিটাকে দেখতে থাকে জিকো। কাঠবেড়ালির চকচকে চোখদুটো ঝিকমিক করে উঠল। বাসার মধ্যে থেকে দুটো ছোটো কাঠবেড়ালি উঁকি দিচ্ছে। এখনও ওদের চোখ ফোটেনি। মা এসেছে জানতে পেরে মুখ বাড়াচ্ছে। মা কাঠবেড়ালি মুখে করে এনে ছোটো ছোটো খাবারের টুকরো বাচ্চাদুটোকে খাওয়ায়।
জিকো টেবিল থেকে মাউথ অরগ্যান তুলে আস্তে আস্তে সদ্য শেখা সুর তোলে। বাজাতে বাজাতে জানালার পর্দা সরায়। কাঠবেড়ালিটা ঘাড় সোজা করে, কান খাড়া করে মাউথ অরগ্যানের সুর শুনছে বলে মনে হয়সে আর একটু এগিয়ে এসে জানালায় চোখ রাখে। কাঠবেড়ালির নরম রোঁয়া ওঠা শরীর তিরতির করে কাঁপছে। জিকো বাজানো থামিয়ে সরু চোখে কাঠবেড়ালির বাচ্চাগুলোকে দেখে। কী করে যেন ওরা জিকোর উপস্থিতি টের পেয়ে যায়। জিকো বড়ো জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। কাঠবেড়ালি ছুটে নিচে নেমে যায় তার বেয়ে। বাইরে বৃষ্টি ধরে গেছে তখন। জিকো খিলখিল করে হেসে ওঠে সবার অজান্তে। জিকোকে কেউ কোনওদিন হাসতে দেখেনি।
সেদিন থেকে কাঠবেড়ালি আর তার বাচ্চাদের জানালার পাশে দেখলেই জিকো মাউথ অরগ্যানে সুর তোলেমার্বেলের মতো কালো কালো চোখ মেলে কাঠবেড়ালিগুলো কান খাড়া করে সুর শুনে দৌড়তে ভুলে যায়ওদের ছোট্ট শরীর সুরের তালে থরথর করে কাঁপে।

তিন

কাঠবেড়ালির বাচ্চাগুলো দু-তিন সপ্তাহে বেশ বড়ো হয়ে গেলএখন ওরা লম্বায় মায়ের থেকে কিছুটা ছোটো হলেও নিজেরাই জানালার পাশের বাসা ছেড়ে আমগাছের কোটরে আশ্রয় নিয়েছে। জিকো ওদের বাসা পরীক্ষা করে দেখেছে। গোল করে ঘেরা বাসাটা বানানোর জন্য কী না ব্যবহার করেছে কাঠবেড়ালি। প্লাস্টিকের টুকরো, দড়ি, থার্মোকলের কাটা অংশ, গাছের পাতা, চেরাই কাঠের চাকলা সব আছে। এখন যেন ওদের দুটো বাড়ি। জিকো ভাবে, ইস, ওদেরও যদি দুটো বাড়ি থাকত, তবে এ-বাড়ি ও-বাড়ি করে দিব্যি সময় কেটে যেত।
ছুটির দিনে কাঠবেড়ালিগুলোকে দেখতে না পেলে জিকো মাউথ অরগ্যানে সুর তুললেই কোথা থেকে যেন কাঠবেড়ালির দল ছুটে এসে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। এখন ওদের সাহস বেড়ে গেছে। জিকোর ঘরে নির্ভয়ে ঢুকে পড়ে। অরগ্যানের সুর শুনে সুরের নেশায় বুদ হয়ে থাকে। অরগ্যান থেমে গেলে চারদিকে দৌড়ে খেলা করে বেড়ায়। কেউ জিকোর মাথায় উঠে পড়ে ওর ঘাড়ে সুড়সুড়ি দেয়। জিকো খিলখিল করে হেসে ওঠে। ওর গলার আওয়াজে পাশের ঘর থেকে জিকোর মা ছুটে আসেন। ম্যারাথন দৌড় লাগিয়ে কাঠবেড়ালিগুলো আমগাছের কোটরে পালায়।
সেদিন সুব্রতস্যার মিউজিক ক্লাস নিতে গিয়ে বিথোভেনের গল্প শোনালেন। জিকো কোনও গল্প শুনলেও তার খেই ধরে রেখে গল্পে মনঃসংযোগ করতে পারে না। কিন্তু বিথোভেনের গল্প মন দিয়ে শুনে জানতে পারল, তাঁরও জিকোর মতো পড়াশুনো করতে অসুবিধা হত। মাত্র দশবছর বয়সে পড়াশুনো ছেড়ে পুরোপুরি সঙ্গীতের জগতকে বেছে নেন। কানের অসুখের জন্য শুনতে অসুবিধা হত সারাজীবন। অথচ শোনার প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও অসাধারণ সব সুর তৈরি করে গেছেন।
জিকো বিথোভেনের মতো হবে, এই মনে হতে লাগল বারবার। কোথাও যেন মানুষটার সাথে জিকোর ভারি মিল। আসলে জিকো জানত না, ওরা দু’জনেই অটিসিম নিয়ে জন্মেছে পৃথিবীতে। অটিস্টিক বাচ্চারা সাধারণের চাইতে অন্যরকম। অনেক গুণসম্পন্ন এই মানুষেরা সাধারণের ভিড়ে মিশে যেতে পারে না। নিজের সৃষ্টির মাঝে ডুবে থাকতেই তার যত আনন্দ।
বিথোভেনের ফিফথ সিম্ফনি বড়ো মনে ধরে গেল জিকোর। সুব্রতস্যার বললেন কী-বোর্ডে বাজাতে। কিন্তু জিকোর এক গোঁ, সে মাউথ অরগ্যানে বাজাবেইযন্ত্রটা পকেটে ভরে রাখা যায়। যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যাওয়া যায়, যেখানে খুশি বসে বাজানো যায়। আশ্চর্যরকম দ্রুততায় জিকো ফিফথ সিম্ফনি অরগ্যানে তুলে ফেলে। অন্য ছেলেরা তখনও কী-বোর্ডে টুং টাং করে চলেছে।
মিউজিক ক্লাসের পর সোশ্যাল স্টাডিসের ক্লাস। জিকো পেছনের দরজা দিয়ে চুপ করে স্কুলের পেছনের বাগানে চলে আসে সবার চোখের আড়ালে। স্কুলের পাঁচিলের ধার দিয়ে হাঁটতে থাকে। স্কুলের বাচ্চাদের হৈ-হট্টগোলের আওয়াজ আস্তে আস্তে কমে আসছে। বাগানে কৃষ্ণচূড়াগাছের মাথা ফুলের ভারে নুয়ে আছে, লালে লাল। বাঁধানো রাস্তা কৃষ্ণচূড়াগাছ থেকে খসে পড়া ফুলে ভরে আছে। এই ফুলে পা পড়লে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা। জিকো সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যায়। এখানে একটা ল্যাম্প পোস্টের আড়ালে বসে পড়ে জিকো। কেউ দেখে ফেললে প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ যাবে। আর ইচ্ছার বিরুদ্ধে একঘেয়ে ক্লাসটায় বসতে হবে জিকোকে।
জিকো পকেট থেকে মাউথ অরগ্যান বার করে। অরগ্যানের উপর সযত্নে হাত বুলায়। তারপর ধীরে ধীরে ফুঁ দিয়ে বিথোভেনের ফিফথ হারমনি বাজায়। জিকোর দু’চোখ বন্ধ হয়ে আসে। শেষ হতে চোখ মেলতেই দেখে তার পায়ের সামনে অনেকগুলো কাঠবেড়ালি মুখ উচু করে তাকে দেখছে কালো কালো মার্বেল চোখ দিয়ে। গান শেষ হতে ওরা জিকোর পা ঘিরে যেন নাচতে থাকে। জিকোর মনে হয় ওরা আরও গান শুনতে চায়এবার জিকো নিজের কম্পোস করা গানের সুর তোলে। কাঠবেড়ালিরা উঠে এসে জিকোর পা বেয়ে কোলে উঠে পড়ে। গায়ে, মাথায় ঘোরাফেরা করে। জিকো হাসতে থাকে।

চার

শনিবার বিকেল। বাবা আর মা গেছে ছোটো পিসিমার বাড়ি। জিকো যায়নি। তার কারও বাড়ি যেতে মোটেই ভালো লাগে না। সবাই বকবক করে ওরা মাথা খারাপ করে দেয়। অদ্ভুত সব প্রশ্ন করে। উত্তর দিতে বিরক্ত লাগে। তাই বিছানায় শুয়ে শুয়ে মাউথ অরগ্যানে নিজের মতো করে সুর করছিল জিকো। সুব্রতস্যার বলেছেন, সুরের যাদুকর বিথোভেন নাকি ছোটোবেলা থেকেই নিজে নিজে সুর তৈরি করতেন। সেসব সুর পরবর্তীকালে সারা পৃথিবীর মানুষকে বিস্মিত করেছে।
আপন মনে বাজাতে বাজাতে হঠাৎ করে ইতিহাস-টিচার রিনি-ম্যামের কথা মনে পড়ে যায় জিকোররিনি-ম্যাম জিকোর উপর ভীষণ রেগে যানকারণ, জিকো কিছুতেই ইতিহাসের ঘটনা মনে রাখতে পারে না। পলাশীর যুদ্ধ, না সিপাহি বিদ্রোহ, কোনটা আগে, কোনটাই বা পরে, একটুও মনে থাকে না। রিনি-ম্যামের রাগী মুখে ভাঁটার মতো ঘুরন্ত চোখদুটো দেখে আরও সব গুলিয়ে যায়।
রাগটা মাথায় ঘুরতে ঘুরতে কখন যে সুরে বদলে গেছে, জিকো নিজেও জানতে পারেনি। ঘরময় সুরের মূর্ছনা, জিকোর যন্ত্রণা হয়ে ফুটে বেরোচ্ছে যেন। জিকোর কষ্ট হয়। হাত থেকে ছুঁড়ে বিছানায় ফেলে দেয় মাউথ অরগ্যান।
জানালায় আওয়াজ কীসের? জিকোর চমক ভাঙে। চারটে কাঠবেড়ালি জানালায় লাগানো বন্ধ লোহার জালের উপর পাগলের মতো দৌড়ে বেড়াচ্ছে। একবার উপরে ওঠে, আবার নিচে নামে।
জিকো উঠে জানালার কাছে এগিয়ে যায়। কাঠবেড়ালিগুলো অশান্ত হয়ে উঠেছিল। আবার আস্তে আস্তে তারা শান্ত হয়ে জিকোর দিকে কালো কালো চোখ মেলে যেন বলতে চায়, জানালা খুলে দাও। আমাদের ভেতরে আসতে দাও। জিকো জানালা খুলে দেয়। লাফ দিয়ে ভেতরে কাঠবেড়ালিরা ঢুকে পড়ে। আলমারির মাথা, জিকোর পড়ার টেবিল, বিছানাময় দৌড়ে বেড়ায়।
মাথায় যন্ত্রণা বোধ হওয়ায় জিকো ওদের বাড়ির ছাতে চলে যায়। সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তে, সেদিনের মতো বিদায় জানাচ্ছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। সামনের মস্ত বড়ো বটগাছে পাখির দল হইচই বাধিয়ে দিয়েছে। ছাদের রেলিংয়ে দশ-বারোটা কাক কা কা করে ডেকে চলেছে। জিকোকে দেখে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাচ্ছে। এতক্ষণ পাইপ দিয়ে চুইয়ে পড়া জলের বিন্দুগুলো লম্বা ঠোঁট বাড়িয়ে দিয়ে পান করছিল। জিকোর উপস্থিতিতে ভয় পেয়ে চিলেকোঠার উপর গিয়ে বসল।
একটা পায়রা কোথা থেকে যেন উড়ে এসে ছাদে এসে বসল। তার পেছনে আরেকটাদুটিতে মিলে ছাদ থেকে কী যেন খুঁটে খুঁটে খেতে লাগল। জিকো একটা মোড়া টেনে নিয়ে বসে বসে পাখিদের খেলা দেখতে লাগল।
হঠাৎ ওর একটা বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। কিছুক্ষণ আগে তৈরি করা সুর বাজিয়ে দেখতে হবে পায়রা বা কাকেদের উপরও কি সুর প্রভাব ফেলে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই জিকো পকেট থেকে মাউথ অরগ্যান বের করে নিজের তৈরি সুর বাজাতে থাকে। আড়চোখে দেখে নিতে থাকে পাখিদের গতিবিধি।
প্রথমে কাকগুলো চিলেকোঠার মাথা থেকে ঘাড় নিচু করে শুনছিল। সুর ধীরে ধীরে মধ্যমে পৌঁছতেই কাকগুলো ‘কা কা’ চিৎকার করে নিচে নেমে এল। মাউথ অরগ্যানের সুর দ্রুত লয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ঠিক সে সময় কাকগুলো ভীষণ হিংস্র হয়ে উঠল যেন! পায়রাদুটোর দিকে কালো ধারালো ঠোঁট নিয়ে তাড়া করে গেল। জিকোর বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ওর নতুন তৈরি করা সুরে এমন কিছু আছে, যা কাকগুলোকে হিংস্র করে তুলছে। তবে কি কাঠবেড়ালিরাও ঠিক একই কারণে অস্থির হয়ে উঠেছিল?

পাঁচ

নতুন তৈরি করা সুর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে ঘুমোতে দেয়নি সারারাত। অঙ্কের ক্লাসে যেমন তেমন করে কেটে গেলেও পরের ক্লাসটা ছিল জীবনবিজ্ঞানের। ঘুমে চোখ ঢুলে এল জিকোরকখন যে বেঞ্চের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, টের পায়নি। কানের গোড়ায় প্রবল যন্ত্রণায় চোখ খুলে দেখে নীহারিকা-ম্যাম জিকোর কান টেনে ধরে রাগী চোখে তাকিয়ে। কান ধরে টেনে তোলেন ম্যাম। ক্লাসের বাইরে বার করে দেনসহপাঠীরা খিল খিল করে হেসে ওঠে।
বাইরে স্কুল করিডোর ফাঁকামিষ্টি রোদে ভরে আছে স্কুলের লন। যেন জিকোকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে শীতের বাতাস। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় লনের ঘাসের উপর। রোদের তাপ শরীরে আরাম এনে দেয়। ফাঁকা স্কুল করিডোর এখান থেকে পরিষ্কার দৃশ্যমান। স্কুলের প্রিন্সিপালকে করিডোরের শেষপ্রান্তে দেখা যায়। জিকোর ভয় হয়। প্রিন্সিপাল দেখতে পেলেই শাস্তি পেতে হবে। সে ঘাসের উপর শুয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। কেন কে জানে, প্রিন্সিপালের নজরে আসে না। প্রিন্সিপাল চলে যেতেই স্কুল গেটের দিকে দৌড়তে থাকে জিকো।
বন্ধ গেটের সামনে স্কুলের দারোয়ান ঝিমাচ্ছে। জিকোকে দেখতেও পেল না। গেটের ডানদিক থেকে বাঁধানো রাস্তায় ও হাঁটতে থাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে। হঠাৎ গেটে শব্দ হতে তাকিয়ে দেখে, লোহার ভারী গেট টপকে একটা লোক স্কুলে ঢুকছে। কী আশ্চর্য, তার কাঁধ থেকে ঝুলছে বন্দুক! লোকটা মাথায় পড়ে আছে একটা মাঙ্কি ক্যাপ, তাই তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। জিকো একটা ডাস্টবিনের পেছনে লুকিয়ে পড়ে। দূর থেকে নজরে আসে, লোকটা দারোয়ানকে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে তার বুকে বন্দুকের নল ঠেকালদারোয়ানের মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোয় না। তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে দারোয়ানের ঘুপচি ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় লোকটা। ঘরের ভেতরের দৃশ্য নজরে আসে না জিকোরততক্ষণে আরেকটা লোক গেট টপকে স্কুলে ঢুকে পড়েছেতার হাতেও বন্দুক। মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ। জিকো বুঝতে পারে, এরা খারাপ লোক। স্কুলের ক্ষতি করার জন্য ঢুকে পড়েছে।

লোক দুটো নিজেদের মধ্যে কীসব কথা বলে চলেছে এতদূর থেকে শোনা যায় না। গেটের দিক থেকে স্কুলবাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে লোকদুটো। মুহূর্তে জিকো পকেট থেকে মাউথ অরগ্যান বার করে নিজের করা সুর বাজাতে থাকে। লোকদুটো এদিক ওদিক তাকিয়ে সুরের উৎস খোঁজে, কিন্তু ডাস্টবিনের পেছনে জিকোকে দেখতে পায় না।
সুরের মূর্ছনায় দলে দলে কাঠবেড়ালি আর কাকেরা ছুটে আসে। জিকো সর্বশক্তি প্রয়োগ করে মাউথ অরগানে সুর ধরে রাখে। কাঠবেড়ালিরা হিংস্র হয়ে ওঠে। ডাস্টবিন ঘিরে দৌড়ে বেড়ায়। জিকো ইশারা করে লোকদুটোর দিকে। কালো কালো মার্বেলের মতো কাঠবেড়ালিদের চোখ পড়ে লোকদুটোর উপর। তারা দৌড়োয় সেদিকে। লোকদুটো কী করবে বুঝতে না পেরে হাতের বন্দুক নাড়িয়ে কাঠবেড়ালিদের তাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে। কাকগুলো মাথার উপর চক্কর দিতে দিতে ‘কা কা’ করে ডেকে চলে। কোথা থেকে এত কাক চলে আসে জিকোও বুঝে উঠতে পারে নাসুরে আচ্ছন্ন কাকগুলো এবার লোকদুটোকে ঠোকরাতে থাকে। হাতের বন্দুক ছিটকে পড়ে একজনের হাত থেকে। এর মধ্যে লোকদুটোর চিৎকারে স্কুলের দুয়েকজন টিচার বাইরে বেরিয়ে আসে। জিকো সাহস পেয়ে গেটের দিকে এগোতে থাকে। রিনি-ম্যাম চিৎকার করে জিকোকে কাছে যেতে বারণ করেনজিকোর মাথায় তখনও আগুন জ্বলছে। তার মাউথ অরগ্যান থেকেও যেন আগুন ঝলসায়। জিকো দৌড়ায়। সুর থামে না। কাকেদের ঠোকর খেতে খেতে লোকদুটো মাটিতে পড়ে যায়। ওদের হাতের বন্দুক ছিটকে পড়ে। কাঠবেড়ালিরা লোকদুটোর জামাকাপড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে দাঁত দিয়ে কামড়াতে থাকে। লোকদুটো যন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠে। গেম টিচার অরুণস্যার ছুটে এসে দারোয়ানের ঘর খুলে ওকে উদ্ধার করেনঅরুণস্যার আর দারোয়ান লোকদুটোকে বেঁধে ফেলেন
জিকো মাউথ অরগ্যান থামিয়ে মাটিতে বসে পড়ে হাঁপায়। রিনি-ম্যাম বোতল খুলে জল খাওয়ান ওকেরিনি-ম্যাম জিকোকে জড়িয়ে ধরেনজিকোর দু’চোখ দিয়ে জলের ধারা নামে। তাকে কেউ কোনওদিন কাঁদতে দেখেনি। সুব্রতস্যার জিকোকে কাঁধে তুলে নেন। বাইরে তখন পুলিশের গাড়ির আওয়াজ।
প্রিন্সিপাল-ম্যাম আর সব টিচারদের সাথে বিজয়ী জিকো স্কুলের লনে এসে দাঁড়ায়। একতলা, দোতলা আর তিনতলার করিডোর থেকে হাততালি দিয়ে জিকোকে সাধুবাদ জানায় সব সমস্ত পড়ুয়ারা। এই প্রথম স্কুলের জন্য ভালোবাসা জন্মায় জিকোর বুকে।
_____

অলঙ্করণঃ সুজাতা চ্যাটার্জী

No comments:

Post a Comment