গল্পঃ বাড়ি ফেরবার পথে - প্রদীপ কুমার বিশ্বাস


বাড়ি ফেরবার পথে

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস


স্কুল-বাসটা লজঝড়ে। ঠিক বাড়ি ফেরবার পথে প্রায় সময়ই তার কিছু না কিছু বিগড়ায় ড্রাইভার, মেকানিক তার মেরামতিতে তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে সেই সুযোগে শ্যাম, নিত্য, দেবা আর কার্ত্তিক এই চারবন্ধু চুপিসাড়ে বাস থেকে নেমে পড়ে। স্কুল বাস ধুঁকতে ধুঁকতে দু-তিনটে সিগন্যাল খেয়ে তাদের টাউনশিপের গেটে ঢোকবার আগেই শর্টকাটের রাস্তায় তারা চারবন্ধু বাড়ির কাছে পৌঁছে চলে আসে
গরমের ছুটির পর টানা বেশ কয়েকদিন ভালো চলার পর আজ বাসটা বেশ বাজেভাবে বিগড়ে গেল। শুধু যে পেছনের চাকা ফাটল তাইই নয়, ব্রেক না কী কী সব যেন খারাপ হয়েছে বলছিল ড্রাইভার আর কন্ডাক্টরকাকুরা কাকুরা যেই বাসের তলায় গেছে কী হয়েছে দেখবার জন্য, সেই সুযোগটা ওরা চারজন আর হাতছাড়া করেনিআজ যেন ওদের পালাবার সুযোগ করে দিতেই বাসটা বিগড়েছে ঠিক শঙ্খনালার সাঁকোর কাছে। সাঁকোর একটু আগে থেকেই দু’পাশে ঝোপঝাড়কোনওমতে চুপিসাড়ে পা টিপে টিপে সাঁকোর পাশের ঢালু রাস্তা বেয়ে নিচে নেমে পড়তে পারলেই হল।
শঙ্খনালার পাড় ধরে একটু এগিয়ে গেলেই পড়বে তাদের টাউনশিপের ঠিক বাইরে দু-তিনটে বাগানবাড়ি ওদের পছন্দের বাগানবাড়িটা সবার শেষে। আম, জাম, জামরুল, সবেদা, ফলসা আর পেয়ারাগাছের ছড়াছড়ি পাখি, বাঁদর আর স্কুল-ফেরতা এই চার ওস্তাদের মতো আগন্তুকদের আপ্যায়নের জন্য গাছে গাছে ফলের যোগান বেশ প্রচুর পরিমাণেই থাকেসবচেয়ে বড়ো কথা, অন্য বাগানবাড়িগুলোর মতো এর পাঁচিল তালগাছের মতো লম্বা নয়, বেশ ভদ্র আর বিনয়ী। একটু চেষ্টা করলেই পাঁচিল টপকে যাওয়া আসা করা যায়গেটটাও তার সাথে মানাসই হয়ে বেশ বেঁটেখাটো
বাড়ির মালিক বাইরে থাকেক্বচিৎ-কখনও আসে যায় যখন আসে বাগানের মালী এবং পাহারাদার লখনকে দিনদুপুরে সিদ্ধি খেয়ে চোখ লাল করে থাকার জন্য খুব গালমন্দ করে। তবে লখনের এই গুণের জন্যই এই বাগানবাড়িটা ওদের আরও পছন্দ। ওর দুপুরের ভাতঘুম, নিত্যা-দেবাদের স্কুল ফেরবার সময়ে আরও চেপে বসে। তখন গেট বা পাঁচিল টপকে বাগানের ভেতরের সব ফলে ভরা গাছ খালি করে দিলেও লখন বোধহয় টেরও পাবে নাকিন্তু তা করার দরকার হয় নাদু-তিনটে গাছের পেয়ারা, আম, নয়তো ফলসা, জামরুল আর সবেদায় সবার জামাপ্যান্টের পকেট ভর্তি হয়ে যায়
বাগানের পেছনদিকের প্রায় সবক’টা গাছেরই ডাল পাঁচিল পেরিয়ে ফলের ডালি নিয়ে বাইরে চলে এসেছে। এদিকটায় ঝোপঝাড় বেশি থাকায় কেউ আসেও না, এমনকি মালী লখনও না। তবে দেবা আর কার্তিকের চোখ রাডারের মতো ঘোরে। এসব তাদের নজরে এসেছে। বাড়ি ফেরার তেমন তাড়া থাকলে মাঝেমধ্যে এখান থেকে জোগাড় মন্দ হয় না।
গরমের ছুটির পর এই পথে বেশ কিছুদিন পর আজ এই প্রথম আসা। বাগানবাড়ির গেটের সামনে এসে ওরা সবাই থমকে দাঁড়ালএই ক’টা দিনে এই বাগানবাড়ির অনেক পরিবর্তন হয়েছেদেওয়ালে নতুন রঙ হয়েছে। শুধু তাই নয়, নতুন ইটের সারি চাপিয়ে বেশ অনেকটাই উঁচু করা হয়েছে বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো নতুন দেওয়ালে হাত খানেকের বেশি উঁচু কাঁটাতারের বেড়া। সেই আগেকার হালকা-পলকা বেঁটেখাটো গেট বিদায় নিয়েছেসে জায়গায় নতুন দেয়ালের সঙ্গে মানানসই প্রায় সাত ফুট উঁচু শক্তপোক্ত লোহার গেট ভেতর থেকে বড়ো তালা দিয়ে বন্ধ করা। গেটের রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে যতটুকু দেখা যায় তাতে ওরা হতাশ হয়ে দেখল যে প্রায় সব গাছই ফাঁকা।
সত্যা ফিসফিসিয়ে বলে, “ভাং-খেকো ফোকলা মালী পেয়ারা, আম, সবেদা সব বাজারে বেচে দিয়েছে
নেত্য ভেংচে ওঠে, “একটা পাকা সবেদাও তো কামড়াবার উপায় নেই ওর
দেবা বলে, বাগান-মালিককে লুকিয়ে মঙ্গলবারের হাটে লখন সব বিক্রি করে। তা না হলে ওর ভাঙের পয়সা আসবে কোথা থেকে?
সত্যা আর দেবার নজরে এল, দূরে এক গাছের তলায় ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রাখা একটা মই। চুনকামের রঙ তাতে তখনও লেগে আছে। মনে হচ্ছে রংমিস্ত্রিরা কোনও কারণে মইটা না নিয়ে যেতে পেরে ওখানে লুকিয়ে রেখেছেনিত্য দেখে, শ্যাম গেটের পাশের দেওয়ালে একটা বিজ্ঞাপনমতো কিছু একটা পড়ছে আর মিচকি মিচকি হাসছেএগিয়ে এসে নিত্যর নজরে এল যে গেটের সামনের দেওয়ালে একটা কাগজ আঠা দিয়ে সাঁটানো আছে। তাতে কেউ কাঁচা হাতে দেয়ালের রঙের সাথে বেমানান কালো কালিতে লিখে রেখেছে ‘TO LET HERE’তবে সেটা ফেল্ট পেনেকাঁচা হাতের হলেও বেশ মোটা করে লেখা আর শব্দগুলোর মধ্যে অনেক ফাঁকবলে নেতাই, তোর কালো ফেল্ট পেনটা দে তো
নিত্য বলে, সেটা দিয়ে এখন কী করবি?
শ্যাম চাপা হাসি মুখে এনে বলে, দে এখন, দেখতেই পাবি একটু পরে
কালো কালির ‘TO’ আর ‘LET’-এর মাঝে খালি জায়গাতে কালো ফেল্ট পেন দিয়ে মানানসই এমন একটা ইংরেজি অক্ষর শ্যাম লিখল যে বিজ্ঞাপনটার মানে পালটে গেল। ও ‘TO’ আর ‘LET’ এই দুটো ইংরেজি শব্দের মাঝে লিখেছে I খুব কাছে এসে মন দিয়ে না দেখলে এটা যে কারও কারিকুরি, তা ধরা যাবে না TO LET HERE এখন হয়েছে TOILET HERE
শ্যামের কান্ড দেখে বাকি তিনবন্ধু কোনওরকমে হাসি চেপে বাগানের পেছনদিকের দেওয়ালে মইটা নিয়ে গেল সামনের দেওয়ালের প্রায় শেষদিকে ভাড়াটে চেয়ে হুবহু আর একটা বিজ্ঞাপনও ছিলশ্যামু সেখানেও ফেল্ট পেন দিয়ে একই কান্ড করল
পেছনের দিকের গাছগুলো নিরাশ করেনিবাদুড়, ময়না, টিয়াদের জন্য গাছে গাছে বেশ কিছু ফল ওরা ছেড়ে দিলেও ওদের চারজনেরই শার্টপ্যান্টের পকেটগুলো ফলে উপচে পড়ছে।
মই বেয়ে নামতে নামতে দেবা একটা আধখাওয়া পেয়ারা ছুঁড়ে মারল বাগানের ভেতরে। সেই দেখে বাকিরাওপর পর দুটো পেয়ারা গিয়ে পড়ল মালীর টিনের ছাদের আস্তানায়কিন্তু দুপুরের ভাঙ এখন মালীকে ঘুমের দেশে ডুবিয়ে রেখেছে। তার ঘুম না ভাঙলেও একটা ঘেউ ঘেউ আওয়াজ শুনে ওরা চারজন মইটা কোনওমতে সামনের ঝোপে ছুঁড়ে দিয়েই বাড়ির রাস্তায় দৌড়ে গেল
মালী তাহলে এখন একটা দেশী কুকুর পুষেছেলম্বা গরমের ছুটির পর আজই ওরা প্রথম আসছে, এ-খবর তো না জানবারই কথা
ওদের মধ্যে সবচাইতে ঠাণ্ডা মাথা শ্যামুরও সবাইকে দৌড়াতে বারণ করতে করতে বললে, ওরে তোরা থাম, আমার কথা শোনঅত উঁচু গেটটা অ্যালসেসিয়ান কুকুরেও কোনওমতেই পার হতে পারবে না
ততক্ষণে ওরা নালার পাশে ঢিপির কাছে এসে গেছেঢিপিটার চারপাশ ঝোপে ঢাকা থাকার একটা সুবিধে হল যে বাগানবাড়ির গেটের আশপাশ ওরা দেখতে পেলেও ওখান থেকে ওদেরকে দেখা কুকুরটার পক্ষেই বেশ মুশকিল আর মালী বেচারার তো কথাই নেই। কুকুরটার চিৎকারে সে বেচারা কোনওরকমে কাঁচা ঘুম ভেঙে টলতে টলতে দৌড়োবার চেষ্টা করতে গিয়ে গেটের সামনে এসে চিৎপাত হয়ে উলটে গেলতার ভুঁড়ির হাপরের মতো ওঠানামা দেখে কুকুরটাও বিরক্ত হয়ে গরর গরর করতে করতে সরে গেলঢিবির ঢালে বসে পেড়ে আনা ফলসা আর পেয়ারায় কামড় দিতে দিতে ওরা তাই দেখছিল আর খুব কষ্টের সঙ্গে চাপা হাসি হাসছিল
পকেটভর্তি পেয়ারা আর গাছপাকা আমগুলো ভাইবোনদের দেবার জন্য স্কুল-ব্যাগে চালান করছিল দেবা আর নেতাই। শ্যামু আর কার্তিকের ভাইবোন নেই, তবে ওদের বিল্ডিং সোসাইটির দারোয়ানদের বাচ্চাগুলোকে কিছু দেবেওদের মধ্যে এসব কথাই হচ্ছিল। কিন্তু কার্তিকের রাডারের মতো চোখে ধরা পড়ে এক দারুণ দৃশ্যও বলে, সবাই সামনের দেয়ালের শেষটায় দেখশ্যামুর কারসাজিটা ধরতে না পেরে ওরা কিন্তু সামনের দেওয়ালের দুটো জায়গাতে সাঁটানো নোটিসগুলোকে সিরিয়াসলি নিয়েছে
স্কুল-বাসের ঠিক হয়ে যাবার আশা ছেড়ে দিয়ে দলে দলে ওদের স্কুলের ছেলেরা বাড়ি ফেরার রাস্তায় এখন বাগানবাড়ির সামনের দেওয়ালের শেষ থেকে শুরু করে গেটের প্রায় কাছে পর্যন্ত জায়গায় সমবেত টয়লেট করা শুরু করে দিয়েছেএসব দেখে মালীর কুকুর সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছেভাঙের নেশায় ডুবে থাকা মালী মাথা তোলবার চেষ্টা করেও পারছে না
দেবা, কার্ত্তিক, শ্যামু আর নেতাই এতক্ষণ ধরে হাসি চেপে ছিল এবার এসব দেখে আর পেরে উঠল না হাসি চাপতে। ওরা নিশ্চিত হয়ে গেল, শ্যামুর সংশোধিত অ্যাড দারুণ হিট করেছে। এখন বেশ অনেকক্ষণ ধরে এই সমবেত টয়লেট চলতেই থাকবে
ওরা এবার নিজেদের টাউনশিপে ঢুকছে। শ্যামু আর নেতাই এই আবাসনের একবারে শেষদিকে থাকে ওরা পা চালিয়ে চলে গেল
কার্ত্তিক আর দেবা বাস-স্ট্যান্ডের কংক্রিটের বেঞ্চিতে বসেছেকেউ দেখলে ভাববে, এইমাত্র স্কুল-বাস থেকে নেমে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। আসলে ওদের এখনই ঘরে ফেরার তেমন তাড়া নেই। ওদের মায়েরা এখন কোনও এক আন্টির বাড়িতে তাস খেলাতে ব্যস্ত
কার্ত্তিক বলে, দেবা, আজ দিনটা বেশ গেল কিন্তুযদিও আমাকে প্রায় পুরো সেকেন্ড পিরিয়ডটা কান ধরে ক্লাসের বাইরেই কাটাতে হল
দেবা বলে, তুই করেছিলিটা কী?
কাল সন্ধেয় বড়ো তাড়াতাড়ি চোখ লেগে গেছিল। ঢুলতে ঢুলতে হোম টাস্কের খাতায় আমরা দুধ কোথা থেকে পাই প্রশ্নের জবাবে লিখেছিলাম প্যাকেট থেকে’ম্যাম ক্লাসসুদ্ধ সবাইকে পড়ে তো শোনালেনই, তার ওপর আবার ক্লাসের বাইরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তিও দিলেন।
দেবা হেসে গড়িয়ে পড়ে আর কী। বলে, ঠিক উত্তরটা তুই নিশ্চয়ই জানিস?
কার্ত্তিক বলে, হ্যাঁ, দুধ গরু দেয় সেটা তো জানি এই ভুলটা একটা কপালের ফের বলতে পারিস খানিক থেমে ও বলে, দেবা, তুই কখনও দেখেছিস গরু কেমন করে বা কীভাবে দুধ দেয়? আমাদের টাউনশিপে যে গরুগুলো ঘুরে বেড়ায়, তাদেরকে খেতে আর গোবর ফেলে নোংরা করতেই দেখেছি।
দেবা মাথা চুলকে বলে, কথাটা তুই জব্বর বলেছিসসত্যি তো, ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতোআচ্ছা গাছের গায়ে যেরকম ফলগুলো ডালে ডালে লেগে থাকে এটা সেইরকম কিছু নয় তো?
কার্ত্তিক বলে, মানে? তুই যে কী বলছিস আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না
দেবা বলে, রাত্রে যখন গরু ঘুমায় তখন গাছের মতো তার সারা গায়ে ছোটো ছোটো থলির মতো কিছু হয় ভোর পর্যন্তও সেগুলো দুধে ভরে বড়ো হয়ে যায়গোয়ালা ফল পাড়ার মতো সেগুলো পাড়ে আর প্যাকেট বানিয়ে দেয়
কার্ত্তিক মাথা নাড়ে, দেবা, মানছি তোর কোথা। কিন্তু কীরকম যেন লাগছে তোর কথাটা
দেবা বলে, আমাদের সোসাইটির দারোয়ান বলছিল, ওর গ্রামের বাড়িতে নাকি অনেক গরু-মোষও মনে হয় ঠিক জানবে আর মিছে কথা বলবে না

বাস-স্ট্যান্ডের কাছেই সারি সারি বাংলোডাঁসা পেয়ারাদুটো শেষ করতে দুজনের চোখই একটা বাংলোতে আটকে যায়কার্ত্তিক বলে, দেবা, শ্রীবাস্তব আঙ্কেল আর আন্টি বেড়াতে বেরোল
তাতে আমাদের কী?
তুই ভুলে গেলি? এই তো সেদিন, সেই হরতালের দিন আমরা ক্রিকেট খেলছিলাম এখানেএকটা বল গেট পেরিয়ে ওদের বাগানে চলে গেছিল
হ্যাঁ রে, কার্ত্তিক বল তো, আঙ্কেল দিলই না, তার ওপর আন্টি কত গালমন্দ করল
কার্ত্তিক বলে, আঙ্কেলদের ফিরতে আধাঘণ্টারও বেশি হবে। সেবারে আন্টি যখন ধমকাচ্ছিল তখন ভুট্টাগাছে সবেমাত্র থোড় আসছে
দেবা কার্তিকের মতলবটা বুঝে বলে, কার্ত্তিক, একবার ভেবে দেখ। আঙ্কেল-আন্টি যদি আজ তাড়াতাড়ি ফেরে, কিম্বা কেউ যদি আমাদের দেখে ফেলে?
কার্ত্তিক নিজের স্কুল-ব্যাগ থেকে একটা লাল বল বের করে আশ্বাস দেয়, আমরা মিনিট খানেক ওদের বাংলোর পেছনে এই বল নিয়ে লোফালুফি খেলবকয়েকবার খেলার পর বলটা গেট পেরিয়ে ঢুকতেই পারে। আমি গেট টপকে ঢুকে যাব; তুই চলে যাবি সামনের গেট থেকে একটু তফাতেকেউ যদি দেখে থাকে তবে সে এইটুকুই দেখবেবুঝলি, হাঁদারাম?
কার্ত্তিক এবার দেবার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে, আমি একটা একটা করে ভুট্টা ছুঁড়ব আর তুই আমাদের দুজনের ব্যাগে ঢোকাতে থাকবিআর যদি দেখিস আঙ্কেল-আন্টি আসছে তবে আমাকে ইশারা করেই তুই স্মার্টলি সটকে পড়বি আর আমি বাংলোর পেছনের গেট টপকে পালাব
দেবা নিজের বুড়ো আঙুল তুলে ইশারা করতেই কার্ত্তিক পি.টি. স্যারের গলা নকল করে বলে, এনি ডাউট, বয়েজ? তব আগে বঢ়, ডর কে আগে জিৎ হ্যায়

শ্রীবাস্তবদের বাংলো পেরিয়ে সামান্য এগিয়ে গেলেই পার্ককেটে সাফ করা শুকনো ঘাস-জঙ্গল আর ঝোপে আগুন লাগিয়ে পার্কের মালী গেছে কোথাও হাতমুখ ধুতেসেই ধিকিধিকি আগুনে সেঁকে নেওয়া কচি ভুট্টাগুলো খেতে খেতে ওরা দুজনেই বলাবলি করছিল, একটু নুন আর লেবু হলে মন্দ হত না
দেবা বলে, বাড়ি ফিরলে হয় ম্যাগি, নয়তো স্যান্ডউইচ। সে জায়গায় এগুলো দারুণ কিন্তু
কার্তিক কিছু বলতে যাচ্ছিল। একটা হায় হায় ধ্বনি ভেসে আসতেই দুজনে পার্কের বেড়া-ঝোপ থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখে শ্রীবাস্তব আঙ্কেলদের বাড়ির সামনে বেশ ভিড়
দেবা আর কার্ত্তিক শ্রীবাস্তবদের বাংলো থেকে ফেরবার সময় বেশ কিছু ভুট্টার সবুজ খোসা ওখানেই ছাড়িয়ে গেটের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছিল। অবশ্য এর সাথে বাদুড়ে আধখাওয়া কিছু আস্ত ভুট্টাও যে ছিল না তা নয়আন্টি একবার গেটের দিকে দুহাত দেখিয়ে আর একবার কপালে চাপড়ে সমানে হায় হায় করে যাচ্ছে। আঙ্কেল রাগে দেবা-কার্ত্তিকদের ফেলে যাওয়া ভুট্টার আবর্জনা, খোসা এসব ছুঁড়ছিল রাস্তাতে। দুধের ক্যান সাইকেলে চাপিয়ে দু-তিনজন গোয়ালা যাচ্ছিল লোকের  ভিড় দেখে সেইদিকে সাইকেল ঘোরাতেই তাদের কারও কারও মাথায় গিয়ে লাগল আধখাওয়া ভুট্টা
কার্ত্তিক, ভিড় মন্দ হয়নি
দেবা, ওই দেখ, দুধওয়ালারা সাইকেল থামিয়ে তেড়ে আসছে শ্রীবাস্তব আঙ্কেলদের দিকেআন্টি এতক্ষণে ‘হায় হায়’ ছেড়ে অন্য কিছু সুর ধরেছে
পড়শি আর সিকিউরিটিকে ডাকছেআন্টির যা কুঁদুলে ব্যবহার, কেউ আসছে নামামলা হেবি জমেছে রে, কেতোসেদিনে আমাদের বল রেখে দিয়ে খুব চোটপাট দেখাচ্ছিল
হঠাৎ দেবার কিছু একটা কথা মনে আসেহায় রে, কেতো রে, বিশাল একটা ভুল হয়ে গেছে রেশেষবারে বলটা তোকে ছোঁড়বার জায়গায় আর একটা কচি ভুট্টা ছুঁড়েছি।
ভালো নতুন বলটা হারাবার শোক কেতোকে ছুঁয়ে গেলেও দেবার কথা ভেবে সেটা চট করে এড়িয়ে গিয়ে ওর পিঠ চাপড়ে দিতে গিয়ে দেখে ওদের পিছু পিছু ভোলু আসছেভোলু এই পাড়ার দেশী কুকুরকেতোরা রোজ ওকে নিজেদের টিফিন থেকে কিছু দেয় কেতো ঘাড় ঘুরিয়ে ভোলুকে দেখতে পেয়ে পকেটে রাখা একটা বিস্কুট ওর দিকে এগিয়ে দিতেই লেজ নাড়ার সাথে সাথে ও কেতোর পায়ে মুখ ঘষতে থাকেব্যাপারটা আন্দাজ করে কেতো বলে, আজ আমি অনেক কিছুই ভুলছি রে, দেবা। তুই জানিস না, আমি যখন ভুট্টা তুলছিলাম তখন ভোলু আগে থেকে সেখানেই ছিলআমাকে পাহারা দিয়েছে। আর একেই আজ আমি বিস্কুট দিতে ভুললাম
ভোলু কিন্তু বিস্কুটের কথা মনে করানোর জন্য ওদের পিছু পিছু আসেনিকেতোর পায়ে আর একবার মুখ ঘষে ওদের দু’জনের দিকে বেশ কয়েকবার তাকানোর পর গর গর আওয়াজ করতে করতে শ্রীবাস্তবদের বাড়ির বাগানের পেছনের গেট লাফ দিয়ে পেরিয়ে ভুট্টাগাছগুলোর দিকে দৌড়ে চলে যায় বিস্কুট দুটো যেমন, তেমনি পড়ে থাকে
ভোলুর এই আচরণকে সময়ে বিস্কুট না দেবার অভিমান ভেবেছিল ওরাকিন্তু মিনিট খানেকের কম সময়ে বাগান থেকে সে ফিরে আসে তার মুখে কেতোর সেই ফেলে আসা বল বলটা কেতোর পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে একবার ‘ভৌ’ করেই এবারে বিস্কুট কামড়ানোতে মন দেয় ভোলুবিস্মিত ওরা দু’জনে, সাবাস, ভোলু বলা ছাড়া আর কিছু বলতে পারেনি
ভোলুকে ওরা আসলে একটা অবোধ পশু ভেবেছে সত্যি সত্যি বন্ধু ভাবেনিএই সত্যটা তাদের সামনে আসতেই  কিছুটা লজ্জা আর আর অনেকটা অনুশোচনা দুটোই তাদেরকে দু’জনের বাড়ির রাস্তা অবধি সাময়িক বোবা করে রেখেছিল
_____

অলঙ্করণঃ সুজাতা চ্যাটার্জী

No comments:

Post a Comment