প্রবন্ধঃ রহস্যে ঘেরা শনির বলয় - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়



প্রাচীনকালে মানুষ ছ’টা গ্রহের কথা জানত। তবে মহাকাশে দেখতে পেত পাঁচটা গ্রহ। পৃথিবীতে থেকে পৃথিবীকে তো আর মহাকাশে দেখা সম্ভব নয়? যেমন কোনও বাড়ির কোনও একটা ঘরে বসে পুরো বাড়িটাকে দেখা যায় না। দেখতে হলে বাড়ির বাইরে আসতে হবে। তেমনই মহাকাশে পৃথিবীকে দেখতে হলে পৃথিবীর বাইরে অর্থাৎ মহাকাশে বা অন্য কোনও গ্রহে যেতে হবে। এখন সেটা সম্ভব হলেও সে সময় মানুষের হাতে উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি না থাকায় সেটা সম্ভব ছিল না। দূরবীন তখনও আবিষ্কার হয়নি। পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে খালি চোখে বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি এই পাঁচটা গ্রহই দেখা যেত। শনির পরেও যে আরও দুটো গ্রহ আছে সেকথা সে যুগের মানুষদের জানা ছিল না। শক্তিশালী দূরবীনের সাহায্য নিয়ে আমরা বর্তমানে আটটা গ্রহ দেখতে পাই। শনির পরের গ্রহ দু’টির নাম ইউরেনাস ও নেপচুন।
সৌরজগতে এই গ্রহগুলির মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর দেখতে শনিগ্রহ। অথচ এই গ্রহটিকে নিয়েই আমাদের কত না ভয়। যুগ যুগ ধরে একে ঘিরে মানুষের মনে রয়েছে নানা সংস্কার, কুসংস্কার ও ভীতি। অধিকাংশের ধারণা এটি একটি দুষ্টগ্রহ। এরই প্রভাবে মানুষের জীবনে নেমে আসে যত অঘটন, দুর্বিপাক ইত্যাদি। যদিও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এইধরনের চিন্তাভাবনার কোনও মূল্য নেই।
প্রজাপতি, মৌমাছি, বোলতা, মথ — এদের মধ্যে কোনটা দেখতে সুন্দর? উত্তর একটাই, প্রজাপতি। কেন? আমরা সবাই জানি, সুন্দর পাখনাদুটির জন্যই প্রজাপতি দেখতে এত সুন্দর। শনিগ্রহের সৌন্দর্য ওর বলয়ের জন্য। যদিও খালি চোখে গ্রহটিকে দেখা গেলেও একে ঘিরে থাকা এই বলয় দেখা যায় না বললেই চলে। দূরবীন আবিষ্কারের পরেই মানুষ দেখতে পেল গ্রহটির নিরক্ষবৃত্তের চারদিকে বেষ্টন করে আছে তিনটে বলয়। বলয়গুলো খুবই পাতলা, মাত্র ত্রিশ কিলোমিটারের মতো পুরু। প্রস্থ বা চওড়ার সঙ্গে তুলনা করলে এদের বেধ একটা পাতলা কাগজের মতো বলা যেতে পারে। পৃথিবী থেকে মাত্র তিনটে বলয় দেখতে পাওয়া যায়। ১৬৫৫ সালে ডাচ পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইজেনস (১৬২৯-১৬৯৫) প্রথমে বুঝতে পারেন যে একটি বিশাল বলয় শনিকে ঘিরে রয়েছে। হাইগেনস একটিমাত্র বলয় দেখতে পেয়েছিলেন। এরপর উইলিয়াম হার্শেল আবিষ্কার করেন যে একটি নয়, শনির দুটি বলয় আছে। ইতালির জ্যোতির্বিজ্ঞানী গিয়ান ডোমিনিকো ক্যাসিনি (১৬২৫-১৭১২) বললেন যে এই বলয়দুটির মাঝখানে একটা ফাঁক (gap) আছে। ক্যাসিনির নামানুসারে এই ফাঁককে বলা হয় ক্যাসিনি বিভাজন বা ক্যাসিনি ডিভিসন। শনির তৃতীয় বলয়টি আবিষ্কার করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী বন্ড।
১৬১০ সালে জুলাই মাসে গ্যালিলিও সর্বপ্রথম দূরবীনের সাহায্যে শনিগ্রহের সঙ্গে তার বলয়গুলি দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু দূরবীনটির শক্তি খুব কম থাকায় তিনি ঠিক বুঝতে পারেননি শনির গায়ে লেপ্টে থাকা বস্তুগুলি কী ছিল। তাঁর ধারণা হয়েছিল যে শনি একটি গ্রহ নয়। পৃথিবী থেকে আমরা যে শনিগ্রহকে দেখি সেটা প্রকৃতপক্ষে প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকা তিনটি গ্রহ। ডিউক অব তাসকানিকে তিনি এই মর্মে একটি চিঠিও লিখেছিলেন। এছাড়াও কয়েক বছর পরে বলয়গুলি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় তিনি ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা হয়েছিল, তিনি ভুল দেখেছিলেন। যদি তিনি সেদিন এই রহস্যের প্রকৃত উত্তর খুঁজে পেতেন তাহলে শনিগ্রহের বলয় আবিষ্কারকের জায়গায় তাঁরই নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকত। হাইজেনস প্রথম বলয়টি খুঁজে পেয়েছিলেন ১৬৫৫ সালে অর্থাৎ এর প্রায় ৪৫ বছর পরে।

গ্যালিলিও

শনিগ্রহকে ঘিরে থাকা বলয়ের নিকটবর্তী প্রান্ত শনিগ্রহ থেকে সাত হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং মহাকাশে সেটা চুয়াত্তর হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। বলয়গুলির ভিতরে যে বিভিন্ন পরিমাপের ফাঁকা জায়গা আছে তার বিচারে সেগুলিকে চারটি বড়ো গ্রুপে এবং অপেক্ষাকৃত ছোটো তিনটি গ্রুপে ভাগে করা হয়েছে। ভাগগুলি হল — ডি, সি, বি, এ, এফ, জি, (D, C, B, A, F, G, E)সবচেয়ে বড়ো গ্রুপটির ব্যাস শনির ব্যসের প্রায় দুশো গুণ। এ ও বি বলয়ের মধ্যেকার দূরত্ব সবচেয়ে কম। সবচেয়ে বড়ো ফাঁকা জায়গাটির নাম রাখা হয়েছে ক্যাসিনি বিভাজন।
পৃথিবী থেকে বলয়গুলি সবসময় একরকম দেখা যায় না। কখন কীরকম দেখা যাবে সেটা নির্ভর করে শনিগ্রহের অবস্থানের উপর। বলয়গুলি যখন আমাদের দৃষ্টিপথের সঙ্গে ২৮ ডিগ্রি কোণ করে থাকে তখন সেগুলিকে স্পষ্ট ও উজ্জ্বল দেখায়। এইসময় শনিগ্রহের ঔজ্জ্বল্যও বৃদ্ধি পায়। বলয়ের পুরো অংশটা আমরা একসঙ্গে দেখতে পাই না। কখনও উপরের দিকটা দেখি, কখনও নিচের দিকটা দেখি। এই দুই অবস্থার মধ্যে পার্থক্য প্রায় পনেরো বছরের মতো।
শনিগ্রহের এই বলয়গুলি বেশ রহস্যময়। পৃথিবী থেকে দেখলে যে বলয়গুলিকে একটি বলে মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে সেগুলি অনেকগুলি বলয়ের সমষ্টি। অধিকাংশ বলয়ই গোলাকার হলেও কয়েকটি উৎকেন্দ্রিক বলয়েরও খোঁজ পাওয়া গেছে। বলয়গুলো ধূলিকণা এবং ছোটো ছোটো পাথর ও বরফের টুকরোর সংমিশ্রণে তৈরি। এই বলয়গুলি কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। শনিগ্রহের চারদিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘুরছে।
শনির বলয় কীভাবে তৈরি হয়েছে তার উত্তর বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শেষে ১৮৫০ সালে ফরাসি জ্যোতর্বিজ্ঞানী রোঁশে (Roches) সর্বজনগ্রাহ্য একটি ব্যাখ্যা দেন। তিনি বললেন, কোনও উপগ্রহকে সুশৃঙ্খলভাবে মহাকাশে  বিচরণ করতে হলে তাকে গ্রহটি থেকে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের বাইরে থাকতে হবে। এই দূরত্বের পরিমাপ হল বড়ো বস্তুটির ব্যাসার্ধের আড়াই গুণ। এই দূরত্বের মাপকে ‘রোঁশে সীমা’ (Roches limit) বলা হয়। কোনও কারণে কোনও উপগ্রহ রোঁশের সীমা লঙ্ঘন করে যদি গ্রহটির দিকে এগিয়ে আসে তাহলে একসময় উপগ্রহটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এবং সেই টুকরোগুলি গ্রহটির অভিকর্ষ বলে আটকে গিয়ে তার চারপাশে উপবৃত্তাকার পথে অনন্তকাল ধরে ঘুরতে থাকবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, শনিগ্রহের ক্ষেত্রে অতীতে এরকমই কোনও ঘটনা ঘটেছিল।
বহুদিন ধরেই আমাদের ধারণা ছিল শনিগ্রহের তিনটে বলয়। পৃথিবী থেকে দূরবীনের সাহায্যে সেগুলি দেখাও যায়। এই ধারণা উল্টেপাল্টে দিল ভয়েজার-১ মহাকাশযান। শনির কাছে গিয়ে উঁকি মেরে ক্যামেরায় ধরে ফেলল বলয়ের ছবি। তারপর সেই ছবি পাঠিয়ে দিল পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের কাছে। ছবি দেখে বিজ্ঞানীরা অবাক। কোথায় শনির তিনটে বলয়? এ যে অসংখ্য বলয়? শুধু তাই নয়, বলয়গুলির মধ্যবর্তী যে অঞ্চলগুলি ফাঁকা বলে মনে হচ্ছিল, সেখানে রয়েছে একগুচ্ছ সরু সরু বলয়। সবকটি বলয়ই অমসৃণ এবড়োখেবড়ো কঠিন বরফের টুকরো দিয়ে তৈরি যার কেন্দ্রে রয়েছে কঠিন পদার্থ। কোনওটি অতি ক্ষুদ্র আবার কোনওটি একটু বড়ো। বিজ্ঞানীদের অনুমান, সৌরজগত তৈরি হওয়ার সময়েই এই বলয় তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
পাইওনিয়ার–১১ এবং ভয়েজার–১ ও ২-এর পর আরও অনুসন্ধানের জন্য শনির আকাশে পাঠানো হয়েছিল ক্যাসিনি-হাইগেনস নামে আরও একটি মহাকাশযান। এই মহাকাশযানটি দুটো ভাগে বিভক্ত ছিল — এক, ক্যাসিনি অরবিটার (মূল মহাকাশযান) এবং দুই, হাইগেনস প্রোব (অবতরণযান)। ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী গিওভান্নি ক্যাসিনির স্মৃতিতে নামকরণ করা হয় এই মহাকাশযান ‘ক্যাসিনি অরবিটর’-টির। ‘হাইগেনস’ তৈরি হয় ওলন্দাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনসের স্মৃতিতে এবং মিলিতভাবে এর সংক্ষিপ্ত নামকরণ হয় ‘ক্যাসিনি-হাইগেনস মিশন’।

পাইওনিয়ার-১১, ভয়েজার-১, ভয়েজার-২, ক্যাসিনি অরবিটার

ফিরে আসি শনির বলয়ের কথায়। ‘এ’ (A) বলয়ের বাইরের দিকে ৩০০০ কিলোমিটার দূরে শনিগ্রহকে ঘিরে আছে একটি বলয়। এই বলয়টিকে বলা হয় ‘এফ বলয়’ বা ‘এফ রিং’। এটা তেমন চওড়া নয়। এর প্রস্থ মাত্র কয়েকশো কিলোমিটার। এই বলয়ের ভিতরে ও বাইরে প্রমিথিউস ও প্যান্ডোরা নামে দুটো ছোট উপগ্রহ আছে। একসময় বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে এফ বলয়ের বন্ধন ধরে রাখার ক্ষেত্রে এই উপগ্রহদুটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এইধরনের উপগ্রহকে বলা হয় ‘শেফার্ড স্যাটেলাইট’। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে যে প্যান্ডোরা নয়, শুধুমাত্র প্রমিথিউসই হল শেফার্ড স্যাটেলাইট।
অপরূপ বলয়গুলির জন্যই শনির এত শোভা। এগুলো উবে যাক নিশ্চয়ই আমরা চাইব না। কিন্তু মহাকাশযান ক্যাসিনির পাঠানো ছবিগুলি থেকে বিজ্ঞানীরা যে তথ্য পেয়েছেন তা বেশ উদ্বেগের। শনিগ্রহের চারপাশে ঘুরতে থাকা বলয়ে অতীতে যে পরিমাণ মহাজাগতিক পদার্থ ছিল এখন নাকি তা অনেকটাই কমে গিয়েছে। কোথায় গেল পদার্থগুলি? বিজ্ঞানীরা বলছেন, হারিয়ে যাওয়া পদার্থগুলি দিয়ে তৈরি হয়েছে এফ বলয় এবং ছোটো ছোটো উপগ্রহ। পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপগ্রহগুলির অবিরত ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ফলে গঠিত হচ্ছে বড়ো বড়ো উপগ্রহ। এফ বলয়ের ভিতরে থাকা শেফার্ড স্যাটেলাইট সম্ভবত এইভাবেই তৈরি হয়েছে। বলয়ের বাইরে থাকা প্যান্ডোরা উপগ্রহের জন্ম একেবারে শেষ ধাপে। এই ঘটনা থেকে বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে শনিগ্রহের সবকটি বলয় বা রিং একইসময়ে গঠিত হয়নি। গ্রহটির সবচেয়ে দূরের বলয় এফ বলয়ের জন্ম সবার শেষে। নাসার দুই মহাকাশযান ভয়েজার ও ক্যাসিনির পাঠানো ছবি ও তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরির গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। চেহারার দিক থেকে এফ বলয় যথেষ্ট সরু (মাত্র ৩০০ কিলোমিটার চওড়া)। তবে মহাকাশে এর বিস্তার সবচেয়ে বেশি।
শনির বলয়ে সঞ্চিত মহাজাগিতিক পদার্থ বা কণা কমতে কমতে শেষে বলয়গুলি কি একদিন হারিয়ে যাবে?
_____

তথ্যসূত্রঃ
Space Encyclopedia – Heather Couper and Nigel Henbest; 1999 Dorling Kindersley.
The Universe – Iain Nicolson; 1996 Horus Editions.
The Rough Guide to the Universe – John Scalzi; 2003 Rough Guides Ltd.
মহাবিশ্বের বিস্ময় (দ্বিতীয় খণ্ড) – অরুণাভ চক্রবর্তী; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
আকাশ ও পৃথিবী – মৃত্যুঞ্জয়প্রসাদ গুহ; চতুর্থ সংস্করণ ১৯৯৮, শৈব্যা প্রকাশন বিভাগ।
Wikipedia
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment