প্রবন্ধঃ কুকুর, ঘোড়া ও গ্যালিলিও - সুজিতকুমার নাহা


কুকুর, ঘোড়া ও গ্যালিলিও

সুজিতকুমার নাহা



গ্যালিলিও একবার অদ্ভুত কিছু কথা বলেছিলেন কুকুর আর ঘোড়ার তুলনামূলক ভার বহন ক্ষমতা সম্পর্কে। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, একটি ছোটো কুকুর নিজের আকারের দু-তিনটি কুকুরকে পিঠে বইতে পারে স্বচ্ছন্দেকিন্তু একটি ঘোড়া নিজের সাইজের একটিমাত্র ঘোড়াকেও বইতে পারে কি না সেই ব্যাপারে সন্দেহ আছে
ঘোড়া কে হেয় করার পেছনে বরেণ্য বিজ্ঞানীর সঙ্গত কারণ ছিল। আসলে প্রাণীদের আকার বৃদ্ধির সাথে হাড় তুলনামূলকভাবে কমজোরি হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করার পেছনে ‘স্কেলন’ (scaling)-এর হাত আছেএবার ছোট্ট করে জেনে নেয়া যাক স্কেলনের হাতযশের ব্যাপারটা।
আমার পাশের বাড়ি সজলবাবুর। ওঁর নেশা বাগান করার। ছয় বাই দশ ফুট মাপের প্রায় রুমাল সাইজের কিচেন গার্ডেনে গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকেন সকাল-বিকেল। দুঃখ করে বলছিলেন, যদি লম্বা ও চওড়া দু’দিকেই জমিটা ডবল করে হত তাহলে কিছুটা অন্তত ভদ্র চেহারা হত বাগানটার
হিসেব করে দেখলাম, ভদ্রলোকের ইচ্ছাপূরণ হলে জমির ক্ষেত্র বাড়ত চারগুণ জমির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ উভয়ই তিনগুণ করে হলে ক্ষেত্র দাঁড়াত নয়গুণ দেখা যাচ্ছে, ক্ষেত্র স্কেলিত হয় মাপের (dimension) বর্গ অনুসারেঅনুরূপ যুক্তি জাল বিছিয়ে দেখাতে পারি, একটি বস্তুর লম্বা, চওড়া ও উচ্চতার প্রত্যেককে ডবল করলে আয়তন বাড়বে আটগুণ। ডবলের বদলে তিনগুণ করে বৃদ্ধি করলে আয়তন বাড়ত সাতাশগুণ। কাজেই আয়তন স্কেলিত হয় মাপের ঘন অনুসারে বললে মোটেই ভুল হবে না
জন্তুদের আকার বৃদ্ধির সাথে হাড়ের মজবুতি কমার আশঙ্কা দেখা দেয় স্কেলন-এর কারণে, সেটা আগেই বলেছি। বুঝিয়ে বললে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
আকারের সাথে যেহেতু প্রাণীদেহের ঘনত্ব তেমন কিছু পাল্টায় না, তাই আয়তন কথাটির বদলে ওজন বসিয়ে ওজন স্কেলিত দৈর্ঘ্যের ঘন অনুসারে লিখলেও ভুল হবে না। আরেকটা কথা। হাড়ের সহন ক্ষমতা (বোন স্ট্রেংথ) নির্ভর করে হাড়ের আড়াআড়ি ক্ষেত্রের ওপর। স্পষ্টতই, হাড়ের ক্ষেত্র স্কেলিত মাপের বর্গ অনুসারে।
মাপ বাড়ার সাথে সাথে প্রাণীর ওজন এবং হাড়ের ক্ষেত্র দুই-ই বাড়ে। কিন্তু ওজন বৃদ্ধির সাথে হাড়ের ক্ষেত্র সমান তালে তো বাড়েই না, বরং পিছিয়ে পড়তে থাকে অতি দ্রুত। মাপ দ্বিগুণ হলে ওজন আটগুণ বৃদ্ধি পায় কিন্তু হাড়ের ক্ষেত্র বাড়ে মাত্র চারগুণ। আবার মাপ তিনগুণ হলে ওজন যেখানে সাতাশগুণ বাড়ে সেখানে হাড়ের ক্ষেত্র বাড়ে মোটে নয়গুণ। বাইক আর সাইকেল আরোহীর রেস হলে সাইকেলওয়ালা যেমন দ্রুত পিছিয়ে পড়তে থাকে, এটাও ঠিক সেরকম ব্যাপারদেহের বিপুল ওজন সামাল দেওয়ার জন্য বৃহদাকার প্রাণীদের হাড় তাই ছোটো জন্তুদের হাড়ের তুলনায় শুধু আনুপাতিক হারে মোটা হলেই চলবে না, হতে হবে বেঢপ রকমের মোটা। অবশ্য বেঢপ মোটা হওয়ারও একটা মাত্রা থাকে। এই মাত্রাই ঠিক করে দেয় প্রাণীর আকারের ঊর্ধ্বসীমা
বেঢপ সাইজের হাড়গোড়ের দৌলতে বড়ো প্রাণীরা হাড়ভাঙা দ’ না হয়ে বেঁচেবর্তে থাকে ঠিকই, কিন্তু ছোটো জন্তুদের তুলনায় তাদের হাড়ের পোক্ততার খামতি পুরোপুরি মেটে না। বড়ো জন্তুদের ভার বহন ক্ষমতা তাই তুলনামূলকভাবে কম। বিশাল চেহারা পাওয়ার মাশুল চোকাতে হয় হাড়ের মজবুতি হ্রাসের মূল্যে!
আশ্চর্যের কথা, অত্যন্ত কৌতূহলপ্রদ এই বিষয়টি সম্বন্ধে সম্যক অবহিত ছিলেন গ্যালিলিও কুকুর ও ঘোড়ার প্রসঙ্গ টেনে বড়ো প্রাণীর ভার বহন ক্ষমতার আনুপাতিক ন্যূনতার বিষয়টি তাই তিনি অসাধারণ মুন্সিয়ানায় সকলের বোঝার মতো করে পরিজ্ঞাপন করতে পেরেছিলেন এখন থেকে প্রায় চারশো বছর আগে স্কেলন-এর মূল ধারণা বা কনসেপ্টকে হৃদয়ঙ্গম করে বাস্তবে সেটির সার্থক প্রয়োগ করার অনন্য কৃতিত্ব তাঁরই!
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment