গল্পঃ শাপমুক্তি - কস্তুরী মুখার্জী


শাপমুক্তি

কস্তুরী মুখার্জী


‘শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই, সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’
“আচ্ছা দাদু, ভুঁই মানে তো জমি?”
“হ্যাঁ, দাদুভাই।”
“তবে... এই জমিটাও বাবু কিনে নেবে? তবে উপেন চাষ করবে কীভাবে?
“হ্যাঁ গো দাদুভাই, এটাই হল ট্র্যাজেডি। তখনকার দিনে অত্যাচারী জমিদার ছোটো ছোটো চাষিদের জমি আত্মসাৎ করত আর সেই চাষিদের যে কী করুণ অবস্থা হত, কী বলব তোমায়? কত চাষি-পরিবার এইভাবে না খেতে পেয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে গেছে তার হিসেব কে রাখে বল!” শ্রীহরিশঙ্কর রায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
রাজহাটের বিখ্যাত জমিদারবংশ হল শ্রীহরিশঙ্কর রায়ের পরিবার। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত, কিন্তু এখনও এঁরা প্রচুর জমির মালিক। জমি ভাগে দেওয়া আছে। সেখান থেকে বছরের ধান, এছাড়া আলু, মুলো ইত্যাদি সবরকমের সবজি ঘরে আসে। এঁরা রাজহাটের বিশেষ সম্মানীয় পরিবার। সবাই সম্মান করে। শ্রীহরি রায় রাস্তা দিয়ে গেলে সবাই হাতজোড় করে নমস্কার জানায়। ওঁর কর্মকান্ড সারা রাজহাটে পরিব্যাপ্ত। স্কুল থেকে আরম্ভ করে দুটো দাতব্য চিকিৎসালয় সব রায়দের তৈরি। গরিব মানুষের জন্য ওঁর হৃদয় উৎসারিত।
“আচ্ছা দাদু, জমিদাররা যে চাষিদের জমি জোর করে কেড়ে নিত, ওরা পুলিশে কেন যেত না?
হেসে বললেন শ্রীহরি রায়, “দাদুভাই, পুলিশরাও জমিদারদের হাতের পুতুল ছিল। আরও শোনো, অনেক ক্ষেত্রে গরিব চাষিরা ঋণ নিত। সেই ঋণ সময়মতো শোধ দিতে পারত না তখন জমিদাররা লেঠেল দিয়ে তাদের জমি নিয়ে নিত।”
“আমরাও তো শুনেছি জমিদার ছিলাম। তাহলে আমরাও এরকম অত্যাচার করতাম?
“হ্যাঁ, আমাদের পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন। তবে সবাই অত্যাচারী ছিলেন না। তাঁদের অনেকে খুব প্রজাবৎসল মানে, প্রজাদের দুঃখে তাদের পাশে থাকতেন। দানধ্যান করতেন। জানো দাদুভাই, বহু আগে আমাদের বাড়িতে দোল-উৎসব হত তখন সমস্ত গ্রামের ধনী-গরিব নির্বিশেষে মানুষ তিনদিন ধরে ভোজ খেত।”
“ও, সবাই অত্যাচারী ছিল না?
“না না, সবাই ছিল না।”
শ্রীহরিশঙ্কর রায় তাঁর একমাত্র নাতি নীলকিশোরের সঙ্গে আজ গল্পে মেতেছেন।
“দাদু, বলাইদাদু কি আমাদের আশ্রিত?” চোদ্দ বছরের নীলকিশোর তার দাদুকে জিজ্ঞেস করল।
“তোমায় কে বলল এসব, দাদুভাই?
“ওই যে, রামশরণদাদু একদিন বাগানে বসে গল্প করছিলেন, তখন বলছিলেন।”
“আর কী বলছিল?” দাদুর গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে নীলকিশোর চমকে উঠল।
“বলছিল যে বলাইদাদুর দাদু ছিলেন এ-বাড়ির বাজার সরকার। খুব গরিব ছিলেন ওঁরা
“হুম।” দাদুকে গম্ভীর হয়ে যেতে দেখে নীলকিশোর চুপ হয়ে দাদুর দিকে তাকিয়ে রইল

শ্রীহরিশঙ্কর রায়ের দাদু পল্লবসুন্দর রায় দোর্দন্ডপ্রতাপশালী ছিলেন। যদিও তখন জমিদারি প্রথার অবসান ঘটেছে, কিন্তু মেজাজ, ঠাটবাট তখনও জমিদারসুলভ ছিল। রাস এবং দোলের উৎসব স্তিমিত হয়ে এলেও নিষ্প্রভ হয়ে যায়নি। শ্রীহরি রায় তখন ছোটো সেদিনটা আজও ওঁরও চোখের সামনে ভাসে।
রাসের সময় ঘটা করে পুজো হয়েছে। গ্রামের গরিব-দুঃখীকে বস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। সবশেষে বাড়ির সবাই প্রসাদ খাবে। এমন সময় সদর দালানে উচ্চ স্বরে কথাবার্তার আওয়াজ আসছে। দাদু-বাবাদের সাথে শ্রীহরি পায়ে পায়ে সদরের দিকে এগিয়ে গেলেন
“দেখুন নায়েবমশাই, আমাকে যে বাজারের ফর্দ দেওয়া হয়েছিল সেইমতো বাজার করেছি। খরচ বেশি তো করিনি।” বাজার সরকার কাশীনাথ দত্ত ভয়ে ভয়ে কথাগুলো বলছিলেন
“তা বললে কী করে চলবে? জমিদারির আয় কম, তার ওপরে যদি আপনি এইভাবে খরচ করেন তবে চলে কী করে বলুন তো?” নায়েব অগ্নিবরণ মজুমদার বেশ রেগে কথাগুলো বলছিলেন।
“কিন্তু বড়মা যা বলবেন আমাকে তো আনতে হবে। আমি ওঁর কথার অবাধ্য হই কেমন করে বলুন।”
“আমি ওসব জানতে চাই না। যেটা বললাম সেটা মাথায় রেখে চলবেন।”
“কী ব্যাপার অগ্নি, কী হয়েছে?” পল্লবসুন্দর রায় কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন নায়েবমশাই টের পাননি। ওঁর গলার স্বরে চমকে উঠলেন।
“আজ্ঞে, সের’ম কিছু না।”
“সের’ম কিছু না তবে দত্তমশায়ের সাথে চ্যাঁচামেচি করছিলে কেন?” রাশভারী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।
“আজ্ঞে কর্তাবাবু, অনর্থক যদি বাজার খরচ করা হয় তবে তবিলে টান পড়ে। তাই বলছিলাম আর কী!”
“শোনো অগ্নিবরণ, দোল-উৎসব আমাদের সাতপুরুষের উৎসব। এখানে খরচে কোনও কাটছাঁট করা হয়নি কোনওদিন, এখনও হবে না। শুধু শুধু দত্তমশাইকে দোষারোপ করবে না।”
“যে আজ্ঞে, কর্তাবাবু।” কোনওরকমে উত্তর দিয়ে গুম হয়ে গেলেন নায়েবমশাই।

“আচ্ছা দাদু, বলাইদাদুর বাবা গরিব ছিল বলে বলাইদাদুকে তোমরা আশ্রয় দিয়েছিলে?” নীলকিশোরের ছোট্ট মনে বলাইর ব্যাপারটা গেঁথে রয়েছে।
“হুঁ দাদুভাই, তা একরকম বলতে পার
“খুব ছোটোবেলায় বলাইদাদু এ-বাড়িতে এসেছিল?
“হ্যাঁ... না, বলাইরা তো আমাদের বাড়ির পেছনে বাগানের উত্তরদিকে টালির চাল দেওয়া বাড়ি ছিল, সেখানে থাকত
“টালির চাল মানে আমাদের মতো বাড়ি নয়! তাহলে তো বলাইদাদুদের খুব কষ্ট হত, বলো?” ছোট্ট মনের এক সরল জিজ্ঞাসা।
“না দাদুভাই, আমাদের মতো বাড়ি নয় সেখানে বলাই তার বাবা আর দাদু কাশীনাথ দত্তের সাথে থাকত। কষ্ট যদি বলো তবে সেটা খুবই হত তো বটেই। ভাবো তো দাদুভাই, আমরা পাকা ঢালাই দেয়া ছাদের বাড়িতে আরামে থাকতাম আর ওরা টালির চাল দেওয়া বাঁশ আর দরমার বাড়িতে থাকত বর্ষায় কত কষ্ট হত!
“যাই হোক, বলাই ছোটো থেকেই পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল। আমার কাছে ও এসে এসে পড়া দেখত
“বলাইদাদু স্কুলে পড়তেন?
“পড়ত...” শ্রীহরি রায় অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।

শ্রীহরি রায়ের বেশ মনে আছে নায়েবকাকার সেদিনের দেহের ভাষায় বোঝা গেছিল যে দত্তমশাইকে উনি সহজে ছাড়বেন না। রাত তখন দুটো কি তিনটে হবে হঠাৎ বাড়ির পেছনে অর্থাৎ বাগানের দিক থেকে একটা ঘসঘসে আওয়াজ আর খুব নিচু গলায় কথার আওয়াজ ভেসে আসছিল শ্রীহরির কানে। শ্রীহরি রায় যে ঘরে শুতেন তার দক্ষিণমুখো জানালাটা দিয়ে বাগান স্পষ্ট দেখা যেত। আওয়াজে শ্রীহরি তাকিয়ে দেখেন, বাগানের মেহগনিগাছের তলায় নায়েবকাকা দত্তমশাইয়ের ওপর তম্বি করছেন আর দত্তমশাই হাতজোড় করে অনুনয়ের ভঙ্গিতে কিছু বলছেন। একটু দূরে বলাই কেঁদে যাচ্ছে। তারপরে নায়েবকাকা হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে খিড়কির দরজা দিয়ে বার করে দিলেন। পেছনে সনাতনকাকা। শ্রীহরি রায়ের হাত-পা হিম হয়ে আসছে। গলা কাঁপছে। ভয়ে কাউকে কিছু না বলে বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে বসে রইলেন। পরদিন সকালে বাড়িতে গুঞ্জন শোনা গেল, কর্তাবাবু অর্থাৎ পল্লবসুন্দর রায় ফরমান জারি করলেন যে বলাই এবার থেকে ওঁদের সাথে থাকবে আর শঙ্করের সাথে পড়াশুনা করবে। কিন্তু শ্রীহরি রায়ের আগের রাতের দেখা ঘটনা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে। একটা অজানা আশঙ্কা মনে উঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে, দত্তমশাইকে কি তাড়িয়ে দেওয়া হল? কিন্তু কেন? শুধুমাত্র অতিরিক্ত খরচের জন্য, নাকি অন্য কারণ আছে! ছোটো বলে এসব জিজ্ঞেস করার অধিকার বা সাহস কোনওটাই ছিল না। তবে মনের মধ্যে সেই রাতের ছবিটা শুধু ঘুরে ঘুরে আসত

দাদুর কথায় নীলকিশোর স্পষ্ট বুঝতে পারছিল যে রায় পরিবারে অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার আছে। বলাইদাদুর প্রসঙ্গ উঠতেই দাদুর চোখমুখে কষ্টের একটা আভাস দেখতে পেল।
“বলাইদাদু তোমার সাথে স্কুলে যেতেন?
“হুঁ, যেত। আমার থেকে তিন ক্লাস নিচে পড়ত
“তোমরা খুব বন্ধু ছিলে, না দাদু?
“তা ছিলাম, দাদুভাই। জানো, আমাদের একটা মজার খেলা ছিল অঙ্ক খেলা। খেলার মধ্য দিয়ে অঙ্ক কষতাম। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, বলাই বেশিরভাগ জিতে যেত।”

শ্রীহরি রায় কথা বলতে বলতে নিজের মধ্যে ডুবে গেলেন। অনেক সাধাসাধি করেও বলাইর থেকে সেই রাতের আসল ঘটনা জানতে পারেননি। দাদু বলেছিলেন যে দত্তমশাই আর তার ছেলে সনাতন অর্থাৎ বলাইর বাবাকে দাদু ওঁদের রামপুরহাটের জমিজমা দেখাশুনা করতে পাঠিয়েছেন। শ্রীহরি এটা বুঝেছিলেন যে একথা সত্য নয়।
প্রায় কুড়ি বছর পর সত্য উদঘাটন হয়েছিল, কিন্তু সেটাও শ্রীহরির কাছে আজও ধোঁয়াশা হয়ে আছে।
নায়েব অগ্নিবরণ মজুমদার সেই রাতের অপমানটা হজম করে নেবেন এটা বোঝার মতো ছেলেমানুষ দত্তমশাই ছিলেন না। তাই ছেলে সনাতনের সঙ্গে পরামর্শ করছিলেন। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ।
“কে?
“আমি, নায়েববাবু। দরজাটা খুলুন।”
নায়েবমশাইয়ের গলার আওয়াজে দত্তমশাইয়ের শরীর কেঁপে উঠল সনাতন উঠে দরজা খুলে দিল।
“আসুন, নায়েববাবু।”
নায়েব অগ্নিবরণ মজুমদার তার রক্তবর্ণ চোখ দিয়ে ঘরের চারপাশ দেখছিলেন।
“শুনুন দত্তমশাই, আশা করি এটা বুঝতে পারছেন যে এত রাতে খোশগল্প করতে আসিনি! কর্তাবাবু তখন আপনার পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন বলে ভাববেন না সেটাই সত্যি। আপনি কী করে ভাবলেন যে অভিনয় করে পার পেয়ে যাবেন?
“কী বলছেন নায়েবমশাই এসব? অভিনয়? আমি? কেন করব?” দত্তমশাই অবাক হয়ে কথাগুলো বললেন।
“কেন করবেন সেটা আপনি ভালোই জানেন। তবে খুব সুবিধা হবে না বা হচ্ছে না। কত সরিয়েছেন এ যাবত?” চিবিয়ে চিবিয়ে নায়েবমশাই জিজ্ঞেস করলেন।
“সরিয়েছি মানে! কী সরিয়েছি?
“ন্যাকামো রাখুন। বাজার সরকার হয়েছেন আর কিছু সরাননি এটা বিশ্বাস করতে হবে?” চাপা হিসহিসে গলায় গর্জে উঠলেন নায়েবমশাই।
এক কামরার ঘর। একপাশে বলাই শুয়ে আছে। সব শুনে ভয়ে কাঁপছে। সনাতন রাগে কটমট করে নায়েবের দিকে তাকিয়ে আছে
“নায়েববাবু, আপনি এসব কী বলছেন আমার দেবতুল্য বাবাকে!”
“হুঁহ্‌, দেবতুল্য! ওরকম হাজার হাজার দেবতা আমি দেখেছি, সনাতনবাবু।”
“আপনি কী চান, নায়েববাবু? আমার বাবা সম্পর্কে কোনও বাজে কথা বরদাস্ত করব না। কার সম্পর্কে কী বলছেন, ভেবে কথা বলুন।”
“আহ্‌! চুপ কর, সনাতন।” দত্তমশাই ভয়ে পেয়ে গেছেন।
“কী বললেন, সনাতনবাবু? আপনাদের মতো নরকের কীট সম্পর্কে কথা বলতে আমায় ভাবতে হবে?” ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি নিয়ে নায়েব অগ্নিবরণ কেটে কেটে কথাগুলো বললেন।
এই বাদানুবাদ যখন চলছে, হঠাৎ নায়েবের চোখ পড়ল তক্তপোষের ধারে একটা তামার কলস চকচক করছে।
“ওটায় কী আছে, দত্তমশাই?
“ওটা আমার পারিবারিক সম্পত্তি। ওতে...”
“আপনার পারিবারিক সম্পত্তি! বাজে কথা বলবেন না।” বলে নায়েববাবু তামার কলসটা টান মেরে ফেলে দিলেন। ঝনঝন করে মোহর মেঝেতে পড়ে ছত্রখান হয়ে গেল।
“কী করছেন নায়েববাবু আপনি? আমাদের জিনিসে আপনি হাত দেন কোন অধিকারে?” সনাতন চেঁচিয়ে উঠল।
“চুপ! আপনাদের সম্পত্তি! রায়বংশের মোহর আপনি চুরি করেছেন। আমি কর্তাবাবুকে জানাচ্ছি।”
“না! মিথ্যে কথা। আমি চুরি করিনি। এ আমার দাদুর দাদুর জিনিস। ওঁর কষ্টার্জিত সম্পত্তি। হে ভগবান, এ কী করলে!” দত্তমশাই ছিটকে মেঝেয়ে ছড়ানো মোহরগুলো জাপটে ধরে কেঁদে ফেলেছেন।
“কষ্টার্জিত সম্পত্তি! চুরির মাল! ছদ্মবেশে এখানকার বাজার সরকার হয়ে সবকিছু হাতানোর ধান্দা।” নায়েবমশাই সুযোগের হাতছাড়া করবেন, এ তো হয় না।

“এর পরের ঘটনা দাদুভাই, আগেই বললাম।” শ্রীহরি রায় ইজি চেয়ারে ক্লান্তিতে মাথা এলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“এরপর বলাইদাদুর আর তাঁদের সাথে দেখা হয়নি?” দম বন্ধ করে শুনছিল নীলকিশোর।
“বোধহয় না। আমি সেটা সঠিক জানি না।”
“দাদু, সেই মোহরভর্তি ঘড়া নায়েবমশাই কর্তাবাবুকে দিয়েছিলেন?
“তারপরের ঘটনা দাদুভাই, আমি বলতে পারব না। বলাই সে সম্পর্কে কিছু বলেনি। আজ সে বিরাট মানুষ। আইএফএস অফিসার ছিল। এখন অবসরপ্রাপ্ত। কোচবিহারে বিশাল বাড়ি করেছে। ও যে কত মানুষের উপকার করে তার ইয়ত্তা নেই। বলাই হল গরিবের বন্ধু। ছোটোবেলার স্মৃতি বোধহয় ওকে মাটিতে পা রেখে চলতে শিখিয়েছে।” শ্রীহরি রায় নাতির কাছে আজ অকপট।
“দাদু, তুমি দত্তমশাই আর বলাইদাদুর বাবার কী হল জানতে চেষ্টা করনি?
“চেষ্টা একটু আধটু করিনি তা নয় তবে দাদুভাই, তুমি আমার কলজে। তোমার কাছে অস্বীকার করব না যে সেভাবে করিনি। মনে হয়েছিল, কী দরকার! বেশি মাটি খুঁড়তে গেলে অনেক আগাছা হাতে আসবে যা উপড়াতে গেলে এ-পরিবারের সম্মান হয়তো নষ্ট হবে। থাক না!”

নীলকিশোর সামনের বাগানসংলগ্ন বারান্দায় চায়ের কাপ নিয়ে অন্যমনে বসে আছে। দশ বছর হল শ্রীহরিশঙ্কর রায় প্রয়াত। আজ বড়ো বেশি করে দাদুকে মনে পড়ছে নীলকিশোরের। মনে পড়ছে দাদুর থেকে শোনা তাদের পরিবারের সেই অভিশপ্ত ঘটনা।
রায় পরিবার বলতে আজও লোকে শ্রদ্ধায়, সম্ভ্রমে নুয়ে পড়ে। রাজহাট, রামপুরহাট, মুকুন্দপুর সর্বত্র ‘রায়দের ছেলে’ বলে সবাই শ্রদ্ধায় নতমস্তক হয়। নীলকিশোরের বোধেরও অগম্য সেই পরিবারের সাথে এরকম একটা কলঙ্ক জড়িয়ে আছে!

পল্লবসুন্দর রায়ের কানে সেই রাতেই নায়েবমশাই তামার কলসভর্তি মোহরের কথা তুলেছিলেন। প্রথমে রায়মশাই বিশ্বাস করেননি।
“না না, অগ্নিবরণ, দত্তমশাই চুরি করতেই পারেন না। উনি বিশিষ্ট মানুষ। অসম্ভব।”
“সবই সম্ভব, কর্তাবাবু। আপনার দয়ার প্রাণ। বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিন্তু এটাই ঘটেছে। আপনি বলুন, সত্যি যদি ওটা দত্তমশায়ের হয় তবে ওঁর তো এখানে বাজার সরকারের কাজ করবার দরকার পড়ে না। ন্যায্যটা বিচার করুন।”
“শোনো অগ্নি, অনেকের পরিবারে এরকম একেকটা জিনিস থাকে যা মঙ্গলের প্রতীক। এটা সেরকমই ব্যাপার।”
“বাবা, নায়েবমশাই যা বললেন সেটাই ঠিক। আপনি ভেবে দেখুন। দত্তমশাইর অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। সেখানে মোহরভর্তি ঘড়া তুলে রাখবে শুধু পরিবারের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য এ বিশ্বাসযোগ্য নয়।” মেজোছেলে দিব্যসুন্দরের গলায় চমকে উঠলেন কর্তাবাবু।
এদিকে নায়েব অগ্নিবরণ ভেতর ভেতর আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছেন মেজদা তাকে সমর্থন করায়।
“দেখলেন কর্তাবাবু, মেজদা ঠিক বুঝেছেন
পল্লবসুন্দরকে গম্ভীর হয়ে যেতে দেখে নায়েববাবুও চুপ হয়ে গেলেন।
“অগ্নি, দত্তমশাইকে কোথায় পাঠিয়েছ?
“খিড়কি দিয়ে বের করে দিয়েছি। কোথায় গেছে জানি না।”
নায়েবের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন পল্লবসুন্দর।
“বাবা, আপনাকে ভাবতে হবে না। আমি দেখছি। পল্লবসুন্দর রায়ের এস্টেটে কোনও চোরের স্থান নেই” বলে নায়েবকে ইঙ্গিত করলেন বাইরে আসার জন্য।
পরে জনান্তিকে শোনা গেছে যে সনাতন দত্তকে গুম করে মেরে ফেলা হয় আর কাশীনাথ দত্তকে হাত ভেঙে অন্ধকার ঘরে জল পর্যন্ত না দিয়ে তিলে তিলে মেরে ফেলা হয়েছিল। আর এসবের কান্ডারি ছিলেন নায়েব অগ্নিবরণ মজুমদার ও পল্লবসুন্দরের মেজোপুত্র দিব্যসুন্দর রায়। তবে কাশীনাথ দত্ত ওই মর্মান্তিক অবস্থায় কোনও একদিন নাতি বলাইকে সব ঘটনা বলে যান।

প্রায় চার পুরুষ আগের কলঙ্কের প্রায়শ্চিত্ত করতে বর্তমান রায় পরিবারের জীবিত উত্তরাধিকারী নীলকিশোর বলাই দত্তের নাতি উদ্দালককে ওদের রাজহাটের এক তৃতীয়াংশ জমি ও মন্দির দান করেছে।
“উদ্দালক, কোন ছোটো থেকে অজান্তে এই পাপ বয়ে বেড়াচ্ছিলাম।”
“না নীলকিশোর, তোমার পূর্বপুরুষ আর একজন বেতনভোগী কর্মচারীর কৃত পাপের দায় তোমার হবে কেন?
“তাই হয়, উদ্দালক। অজান্তে হলেও আমারই হয়। আজ আমি পাপমুক্ত। শাপমুক্তও বটে
_____

অলঙ্করণঃ বিশ্বদীপ পাল

No comments:

Post a Comment