প্রথমাঃ সুরেখা যাদব




২ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫। মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় বসবাস ছিল সম্ভ্রান্ত কৃষক সোনাবাই ও রামচন্দ্র যাদবের। সোনাবাইয়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করলেন ফুটফুটে এক মেয়ে, নামকরণ করা হয় সুরেখা। কে জানত তখন যে সমান্তরাল দুটো রেখাই হয়ে উঠবে তাঁর ধ্যানজ্ঞান, ভবিষ্যৎ?
সুরেখা ছিলেন পাঁচ ভাইবোনদের মধ্যে বড়ো। যথাসময়ে সেন্ট পল কনভেন্ট স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ক্রমে তাঁর মেধা শিক্ষা এবং স্কুল-ক্রীড়ায় দারুণ প্রসিদ্ধি লাভ করে।
স্কুলজীবনের শেষে এক ভোকাশনাল ট্রেনিং কোর্সে ভর্তি হয়ে যান। তারপর একসময় সাতারা জেলার পলিটেকনিক গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করেন সুরেখা।
প্রাথমিকভাবে জীবনে একজন শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই সুবাদে গণিতশাস্ত্রে পরবর্তী শিক্ষাগ্রহণ ও বি.এড ডিগ্রি লাভের দিকে মনোনিবেশ করলেও সুরেখা অচিরেই সেই স্বপ্ন ত্যাগ করে আচমকা ভারতীয় রেলে চাকরি করার নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
সুরেখার কথায়, “আমার কাহিনি খুবই সহজসরল। আর পাঁচজন ছাত্রছাত্রীর মতো ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করার পর একটা স্থায়ী চাকুরি খুঁজছিলাম। কানে এল, ভারতীয় রেলে সহযোগী চালকের একটা শূন্যপদ রয়েছে এবং যোগ্যতা হিসেবে যেকোনও বিষয়ে ডিপ্লোমা থাকলেই আবেদন করা যাবে।”
প্রকৌশলী সুরেখা দেরি না করে ওই পদের জন্যে আবেদন করেন এবং লিখিত পরীক্ষায় বসার জন্য প্রস্তুত হন। সালটা ছিল ১৯৮৭।
সবশেষে ভারতীয় রেলে শিক্ষানবিশ সহযোগী চালক হিসেবে যোগদান করেন। রেল দপ্তর তাঁকে কল্যাণ ট্রেনিং স্কুলে ট্রেনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ করলে পরবর্তী ছয়মাসে তিনি সেই কোর্স সম্পন্ন করেন।
১৯৮৮ সালে সুরেখা যাদব ভারতবর্ষ তথা সমগ্র এশিয়ার প্রথম নারী রেল চালক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এল-৫০ নম্বরের মালবাহী ট্রেনটি সুরেখা প্রথমবারের মতো চালান ওয়াডি বন্দর থেকে কল্যাণ পর্যন্ত।
সুরেখা বলেন, “লিখিত পরীক্ষায় দেখলাম, আমিই একমাত্র নারী পরীক্ষার্থী। আমার ধারণাই ছিল না তখনও যে ভারতীয় রেলে ড্রাইভার হিসেবে কোনও নারী কাজ করেনি তদাবধি। কাউকে তো শুরুটা করতেই হত...”
শূন্য থেকে ২০১১ সালে সেই সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় ৫০ জন নারীতে যারা পুরুষদের সঙ্গে সমানভাবে ভারতীয় রেলে চালক হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন।
ক্রমে সুরেখা প্রথমে মালগাড়ির ড্রাইভার হিসেবে কাজ করতে করতে ২০০০ সালে মোটর-উইমেন পদে উন্নীত হন।

২০১০ সালের এপ্রিল মাসে রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ‘লেডিস স্পেশাল’ লোকাল ট্রেন চালু করেন তখন সুরেখা যাদবই ছিলেন প্রথম মোটর-উইমেন যিনি গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছান।
২০১০ সালেই তিনি পশ্চিমঘাট রেলওয়ে লাইনে ড্রাইভার হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ২০১১ সালে ‘এক্সপ্রেস মেল ড্রাইভার’ পদে উন্নীত হন। পাশাপাশি তাঁকে কল্যাণের ‘ড্রাইভারস ট্রেনিং সেন্টার’-এ সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

সুরেখার জীবনে উজ্জ্বলতম দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ৮ মার্চ, ২০১১ সালের নারী দিবস। পুনে থেকে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাল – মহারাষ্ট্রের অন্যতম মহা বিপদসংকুল রেল-রুটে নির্বিঘ্নে ‘ডেকান কুইন’ নামের ট্রেন চালিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম তুলে নেন।
সুরেখা দৈনিক প্রায় দশ ঘণ্টা কাজ করেন।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সুরেখা এশিয়ার প্রথম নারী রেল চালক হিসেবে প্রভূত পুরস্কারে সম্মানিত হন।
১৯৯০ সালে মহারাষ্ট্র পুলিশের ইনস্পেকটর শঙ্কর যাদবের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন সুরেখা। তাঁদের দুই পুত্রসন্তান – আজিঙ্ক্য ও অজিতেশ। বর্তমানে দুইভাই মুম্বই ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র।
যে মেয়ে একসময় ড্রাইভিং কী জিনিস জানতেন না, দু’চাকা বা চার চাকার বাহন সম্পর্কেও ন্যূনতম জ্ঞান ছিল না, তিনিই আজ পৃথিবীর অসংখ্য তরুণ-তরুণীর আইকন, অনুপ্রেরণা।


সুরেখা যাদব প্রাপ্ত পুরস্কারসমূহঃ
১। জিজাউ পুরস্কার (১৯৯৮)
২। উইমেন অ্যাচিভারস অ্যাওয়ার্ড (২০০১)
৩। রাষ্ট্রীয় মহিলা আয়োগ, দিল্লি (২০০১)
৪। লোকমত সখী মঞ্চ (২০০২)
৫। এস.বি.আই প্লাটিনাম জুবিলি ইয়ার সেলিব্রেশনস (২০০৩-২০০৪)
৬। শহিয়াদ্রি হিরকানি অ্যাওয়ার্ড (২০০৪)
৭। প্রেরণা পুরস্কার (২০০৫)
৮। জি.এম অ্যাওয়ার্ড (২০১১)
৯। উইমেন অ্যাচিভারস অ্যাওয়ার্ড (২০১১) (সেন্ট্রাল রেলওয়ে)
১০। আর.ডব্লিও.সি.সি বেস্ট উইমেন অ্যাওয়ার্ড অফ ইয়ার ২০১৩
_____

No comments:

Post a Comment