প্রবন্ধঃ অবাক ঘটনা - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


অবাক ঘটনা

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
    



ফুটন্ত কাদা

প্রকৃতিতে রহস্যের শেষ নেই। এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার কথা শুনে আমরা বিস্ময়ে হতবাক হই। এই যেমন ফুটন্ত কাদা। গরম জলের মতো টগবগ করে ফুটছে কাদা অবাক হচ্ছ? ভাবছ, এ আবার হয় নাকি? পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই হয় যা আমরা ভাবতেই পারি না। নিউজিল্যান্ডের রোটোরুয়ার টউপো হ্রদে জলের সঙ্গে কাদামাটিকেও ফুটতে দেখা যায়। এখানকার মাটির নিচের তাপমাত্রা খুব বেশি হওয়ায় হ্রদের উপরের কাদা জায়গাগুলো টগবগ করে ফুটছে। শুধু কাদাই নয়, কিছু কিছু জায়গায় জলও ফুটছে। হ্রদের এই জায়গাগুলো জলীয় বাষ্পের ঘন ধোঁয়ায় সবসময় ঢাকা থাকে। গবেষকদের অনুমান, এখানকার নদী ও লেকের জল মাটির নিচের কোনও উত্তপ্ত পাথরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর তারই ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতির এই বিস্ময়কর ঘটনা দেখতে প্রতি বছর এখানে লক্ষ লক্ষ পর্যটক আসে।




মাকড়সার জালে সেতুবন্ধন

মাদাগাস্কারের ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন বিজ্ঞানীদের একটি দল। দুর্ভেদ্য জঙ্গল। বড়ো বড়ো পাতার বিশাল বিশাল গাছগুলো গা ঘেঁষাঘেষি করে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে সূর্যের আলোকে পাতার ফাঁক দিয়ে পথ খুঁজতে হয় মাটিতে পৌঁছোতে। আলো-আঁধারির এই জঙ্গলে কোনও নির্দিষ্ট পথ নেই। যেকোনও সময়ে তাঁরা পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন। তাই গাইডের পরামর্শ মতো তাঁরা নদীর পার ধরে হেঁটে চলেছেন। এই গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটা খুব সহজ কাজ ছিল না। কখনও কাঁটা ঝোপ মাড়িয়ে, কখনও ভেঙে পড়া কোনও বড়ো গাছের প্রকাণ্ড ডাল পেরিয়ে আবার কখনও কোনও গাছের হেলে পড়া কোনও ডালের নিচ দিয়ে তাঁদের এগোতে হচ্ছিল। গাইডের নির্দেশে এবারে তাঁরা নদীর ধার ঘেঁষে দাঁড়ানো একটা বড়ো গাছের দিকে এগোতে লাগলেন। গাছের কাছে গিয়ে তাঁরা দেখা পেলেন সেই বস্তুটির যার খোঁজে তাঁরা এখানে এসেছেন। নদীর এপার থেকে ওপার পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল জাল। কে বানিয়েছে এত চওড়া, এত লম্বা এই জাল? না, কোনও মানুষ নয়। এর কারিগর এক নতুন প্রজাতির মাকড়সা, যার নাম ডারউইন’স বার্ক স্পাইডার। এদের বানানো জাল অন্যান্য মাকড়সাদের বানানো জালের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত হয়। এই প্রকাণ্ড জাল দেখে মনে হবে, এটা বুঝি অনেকগুলো মাকড়সার মিলিত প্রয়াস। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মোটেই তা নয়। এই জাল বানিয়েছে একটি মাত্র মাকড়সা। এখনও অবধি জানা কোনও একক মাকড়সার তৈরি জাল হিসেবে এদের জালই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো।
২০০১ সালে ইঙ্গি অ্যাগনারসন প্রথম এই মাকড়সাটির খোঁজ পান। তিনি তখন পুয়ের্ত রিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মাদাগাস্কারের রানামোফানা জাতীয় উদ্যানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই একদিন নদীর এপার-ওপার জুড়ে থাকা এই মাকড়সার বিশাল জাল দেখতে পান। পরে ডারউইনের নামে এই মাকড়সার নামকরণ করা হয়। ডারউইন’স বার্ক স্পাইডারদের আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে মাদাগাস্কার দ্বীপ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। দেখা গেছে, জাল বোনার কাজটা শুধুমাত্র স্ত্রী মাকড়সারাই করে। পুরুষ মাকড়সারা একাজে তেমন থাকে না। অল্পবয়সী ছেলে মাকড়সারা মাকে প্রথম প্রথম কিছু সাহায্য করলেও প্রাপ্তবয়স্ক হলেই তারা কেটে পড়ে। তখন তারা অন্য পুরুষ মাকড়সাদের মতো শুধু সঙ্গিনী খোঁজার কাজে তৎপর হয়ে ওঠে।
এই বার্ক স্পাইডাররা তাদের দেহ-নিঃসৃত লালার সাহায্যে কীভাবে এত সূক্ষ্ম, এত শক্ত সুতো তৈরি করে তা জানতেই এখন চলছে গবেষণা। বিজ্ঞানীদের আশা, এই রহস্য হয়তো শিগগিরই উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।



রহস্যময় অ্যাজোর দ্বীপ

ভারি আশ্চর্যের দ্বীপ। এখানে একই দিনে কতবার যে ঋতু পালটায় তার ঠিক নেই। সকালে ঝম ঝম বৃষ্টি – মনে হবে যেন বর্ষাকাল, দুপুরে ঠান্ডা হাওয়ায় শীতের আমেজ আবার বিকালে রোদ উঠে গরমে হাঁসফাঁসএখানে তাপমাত্রা ওঠানামা করে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এই দ্বীপে চড়ুইভাতি করতে গেলে আর যাই নিয়ে যাওয়া হোক না কেন আগুন নিয়ে যাবার দরকার হয় না। পাত্রে রান্নার উপকরণ দিয়ে মাটি খুঁড়ে গর্তে পাত্রটিকে বসিয়ে দিলেই ব্যসকিছু পরেই জল ফুটতে শুরু করবে। রান্না হবে ভাত, ডাল, মাংস আরও কত কী। অবাক হওয়ার মতোই কথা, তাই না? আসলে এই দ্বীপটার নীচে রয়েছে একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। তাই দ্বীপের মাটি সবসময় তেতে আছে। সেই উত্তাপেই রান্না হয়ে যায়। এই দ্বীপে যেতে হলে আমাদের যেতে হবে পর্তুগালের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরে।



গোলাপি হ্রদ

সবুজে ঘেরা দ্বীপটার মাঝখানে আছে এক রহস্যময় হ্রদ। কালো দীঘি বা টলটলে নীল জলের জলাশয়ের কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু গোলাপি জলের জলাশয়ের কথা আমরা শুনেছি কি? না শুনলেও এমনই একটা হ্রদ রয়েছে ওই দ্বীপটার মাঝখানে। রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো সংবাদ, তাই না?
দক্ষিণ মহাসাগরে জল কেটে এগিয়ে চলেছে একটা জাহাজ। ব্রিটিশ নেভিগেটর ম্যাথিউ ফ্লাইন্ডার্স-এর নির্দেশে জাহাজের সারেং নোঙর ফেলল পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মিডল আইল্যান্ডের তটভূমির অনতিদূরে। জাহাজ থেকে নেমে ম্যাথিউ দ্বীপে উঠলেন। কিন্তু ঘন জঙ্গলের দেয়াল ভেদ করে বেশি দূর দেখা যায় না। তাই তিনি সেখানকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টায় চড়ে বসলেন দ্বীপের ভিতরে কী আছে দেখার জন্য। হাতের দূরবীনে চোখ রেখে চারপাশ দেখতে লাগলেন। দ্বীপের মাঝামাঝি জায়গায় তাঁর দৃষ্টি আটকে গেল। অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মনে মনে বললেন, ‘যা দেখছি তা ঠিক তো?’ চোখটা মুছে নিয়ে আবার যন্ত্রটাতে চোখ রাখলেন। ‘না, একই জিনিস দেখছি। একটা হ্রদ। আনুমানিক ছ’শো মিটারের মতো লম্বা হবে। কিন্তু জলের রঙ এমন অদ্ভুত কেন? একটু দূরেই রয়েছে দক্ষিণ মহাসাগর। অথচ হ্রদের জলের রঙ নীল না হয়ে গোলাপি!’ যে পাহাড়ে উঠে ম্যাথিউ এই গোলাপি হ্রদের খোঁজ পেয়েছিলেন সেটার বর্তমান নাম ‘ফ্লাইন্ডার্স পিক’।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মিডল আইল্যান্ডের এই গোলাপি হ্রদটির নাম ‘হিলিয়ার হ্রদ’। ম্যাথিউর লেখা দিনপঞ্জী থেকে বিশ্ববাসী এই হ্রদের কথা জানতে পারে ১৮০২ সালে। খবর পেয়েই বিজ্ঞানীরা ছুটে গেলেন মিডল আইল্যান্ডে। হ্রদের জল নিয়ে চলল নানা পরীক্ষানিরীক্ষা। তবে হ্রদের জলের রঙ কেন হলদে সে সম্পর্কে তাঁরা কোনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারলেন না
এরকম হলদে জলের হ্রদ পৃথিবীতে আরও কয়েকটা আছে। যেমন, সেনেগালেরলেক রেটবা’, বলিভিয়ার ‘লেগুনা কলোরাডা’ ইত্যাদি। তবে এদের জলের রঙ সারাবছর গোলাপি থাকে না। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পালটে যায়। একমাত্র ব্যতিক্রম হিলিয়ার হ্রদ। এর জলের রঙ সারাবছর একইরকম থাকে
গোলাপি হ্রদের জল প্রচণ্ড লবণাক্ত হয়। ডুনালিয়েলা (Dunaliella salina ) নামক এক ধরনের শৈবাল ছাড়া এই ধরনের হ্রদের জলে আর কোনও উদ্ভিদ বা প্রাণী বাঁচতে পারে না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, হ্রদের জলের রঙ গোলাপি হওয়ার পেছনে এই শৈবালটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। অনুমান করা হয়, শৈবালটি সূর্যরশ্মি থেকে লাল রঙ ব্যতীত বাকি সব রঙ শোষণ করে নেয়। প্রচুর শৈবালের উপস্থিতি এবং প্রতিফলিত লালাভ আলোর কারণেই হ্রদের জল গোলাপি দেখায়। শৈবালটির সঙ্গে ব্যাক্টেরিয়ার অনেক মিল থাকায় একে হ্যালো-ব্যাক্টেরিয়াও বলা হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, হ্রদের জলে থাকা সোডিয়াম বাই-কার্বনেটের সঙ্গে লবণের বিক্রিয়ার ফলেও রঙের এই পরিবর্তন হতে পারে। তবে তাঁরা নিশ্চিত নন।
গোলাপি হ্রদগুলোতে সারাবছর পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি অনেকে স্নান করতে জলে নেমে পড়েন। যারা সাঁতার জানেন তাঁরা এক চক্কর সাঁতার কেটেও নেন। অতিরিক্ত লবণ থাকায় হ্রদের জলের ঘনত্ব খুব বেশি থাকে। ফলে সাঁতার কাটার সময় মনে হয় শরীরটা যেন জলের উপর ভাসছে। এ এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এইধরনের হ্রদের জলে বেশি সময় ধরে সাঁতার না কাটাই ভালো। স্থানীয় লোকেরা স্নান করার সময় একধরনের তেল গায়ে মেখে নেয়।
_____

No comments:

Post a Comment