গল্পঃ নেই মানুষের রাজ্য - শাশ্বতী চন্দ



নেই মানুষের রাজ্য

শাশ্বতী চন্দ



সুয্যিঠাকুর সবে আড়মোড়া ভেঙেছে পুব আকাশে, সোনার রেখা সবে আলপনা সাজাতে শুরু করেছে, তখনই শুরু হয়ে গেল ক্যালর-ব্যালর। ফড়িং, কটকটি পোকা তারস্বরে গল্প জুড়েছে। বোঁ বোঁ করে ওড়াওড়ি শুরু করে দিয়েছে বোলতা। এর মধ্যে ঘুমায় কার সাধ্যি! উফ্‌! ব্যাঙ তার ডান হাতের পাঞ্জাটা কানের ওপর চেপে বালিশে মুখ চেপে ধরল। কে না জানে, ভোরের ঘুমটাই সবচেয়ে আরামের।
কিন্তু কোথায় কী? আদুরে ঘুমের মাসিপিসি চোখের পাতাতে বসে সবে স্বপ্নবুড়িকে ডেকে আনতে যাচ্ছিল, তখনই পায়ে টান পড়ল। “বাবা, ও বাব, ধানক্ষেতে যাবে না? সব পোকা সবাই খেয়ে নিল যে! আমরা পরে কিন্তু কিচ্ছুটি পাব না।”
ছানা ব্যাঙ দুটো। সদ্যই ব্যাঙাচি থেকে ব্যাঙ হয়েছে। মানুষের নাকি লেজ গজালে দুষ্টুমি বাড়ে। আর ব্যাঙেদের লেজ খসলে। তিড়িংবিড়িং লাফাতে লাগল ব্যাঙের ছানা। “বাবা, ও বাবা।”
ধানের খোসা জড়ো করে করে বানানো চমৎকার বালিশটা সরিয়ে রেখে ব্যাজার মুখে উঠে বসল ব্যাঙ। “সাতসকালে কী শুরু করলি, বল তো? যা যা, ইস্কুলে যা।”
“ইস্কুল? ইস্কুল নেই তো।”
“নেই মানে?”
“নেই মানে, নেই। আমাদের ইস্কুল যে ডোবাটায় বসত সেখানে ইট, মাটি, নোংরা পড়ে আছে। কালকে মানুষগুলো ট্রাক বোঝাই করে করে মাটি, ইট ফেলেছে ওখানে। ডোবাটা আর ডোবা থাকবে না গো। ওখানে বাড়ি হবে। বড়ো বাড়ি। কী মজা! আমাদের আর পড়াশোনা করতে হবে না।”
শুনেই তো ব্যাঙ রেগে কাঁই। তাই তো! পড়াশোনা করতে হবে না শুনে দুটো মিলে লাফাচ্ছে উচ্চিংড়ের মতো। দিতে হয় গাঁট্টা মাথায়। আরে, পড়াশোনা না শিখলে চারপাশের বিপদ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে চলবি কেমন করে?
হয়েছে কী, উচ্চিংড়ে-দাদা তখন ধানক্ষেতের দিকেই যাচ্ছিল। ব্যাঙের কথাটা কানে যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। “কী ব্যাপার হে? আমার নাম নিয়ে গাল পাড়ছ যে! আমরা কি খুব খারাপ জীব নাকি হে? এমন করে ছোটোদের কানে বিষ ঢালা কেন, বাপু?”
ব্যাঙ তো পড়ল লজ্জায়। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে কান-টান মুলে অস্থির। “না দাদা, তুমি হলে আমাদের গর্ব। তোমার নাম নিয়ে কি গাল পাড়তে পারি? তোমার মতো লাফাতে পারে কেউ? প্রতিবছর স্পোর্টসের সময় হাই জাম্পে তোমার ফার্স্ট প্রাইজ হবে বাঁধা। আমি তো ভাবছিলাম, আমার ছেলেপুলেগুলোকে তোমার কাছে টিউশন নিতে পাঠাব। তোমার মতো লাফাতে-ঝাঁপাতে পারলে তো বর্তে যাবে। আর কোনও চিন্তাই থাকবে না সারাজীবনের জন্য।”
উচ্চিংড়ে ব্যাঙের কথা শুনে খুশি হল। বলল, “আর টিউশন! পড়াশোনা আর করতে হচ্ছে না ব্যাঙদের কাউকে। স্কুল-ফুল তো সব চৌপাট হয়ে গেল। শোনোনি বুঝি?”
ব্যাঙ বলল, “হ্যাঁ, শুনলাম। ওরা তো বলছিল। কিন্তু কথাটা কি সত্যি?”
“নিয্যস সত্যি। বিশ্বাস না হয়, দেখবে চলো।”
আড়মোড়া ভেঙে ব্যাঙ রওনা দেয় উচ্চিংড়ের পেছন পেছন। ডোবার কাছে গিয়ে দেখল, সত্যিই ভয়ংকর ব্যাপার। ইটের গুঁড়ো, মাটিতে হারিয়ে গেছে ডোবা। বুড়বুড়ি কাটা কালো জলের জায়গায় লাল লাল ইট। পাড়ে দুটো ভ্যান গাড়ি দাঁড়ানো। এতে করেই এসব জঞ্জাল আনা হয়েছিল নিশ্চিত। এত সকালেও লোক জুটে গেছে কাজে। ধাই-ধপ্পড় আওয়াজ তুলে ইটের গুঁড়ো, মাটি ঠেসে ঠেসে দিচ্ছে ক’জন লোক ডোবায়। ভ্যানের চাকার পাশে নিজেকে লুকিয়ে শুকনো মুখে দেখছিল ব্যাঙ
পাশ থেকে বলল কেউ, “দেখছ কী? এখুনি পাততাড়ি গোটাও। অন্য কোনও জায়গা খুঁজে নাও গে।”
“কে বলল? ওহ্‌, শামুকভাই? তা ও শামুকভাই, এত সকালে গুটি গুটি পায়ে চললে কোথায়?”
“যাব না তো কী? এখানে পড়ে মরব নাকি? এই মানুষগুলো কাউকেই কি স্বস্তিতে থাকতে দেবে? ছিল আমাদের সুন্দর ডোবা। আমাদের গ্রাম। সেটাকেও দখল করতে লেগেছে মানুষ।”
“আচ্ছা, মানুষ এই ডোবা বুজিয়ে কী বানাবে?”
“কী জানি। বাড়ি বানাতে পারে। দোকান-বাজার বানাতে পারে। ওদের গায়ে জোর আছে। ওদের কে আটকাবে? স্কুলও বানাতে পারে ওদের ছেলেমেয়েদের জন্য। আমাদের ছানাপোনাদের স্কুল নষ্ট করে নিজেদের ছানাপোনাদের জন্য স্কুল। হতেই পারে।”
“তাই বলে নিজের জায়গা ছেড়ে চলে যাবে?”
“যাব না তো কী? পড়ে পড়ে মরব নাকি? এই তো কাল বিকেলেই। আমার খুড়তুতো ভাইকে পায়ে পিষে মারল একটা বাজে লোক। ভাই ডোবার ধারে গিয়ে ওদের কাণ্ডকারখানা দেখছিল। কাউকে তো কোনও ক্ষতি করেনি। ব্যস, একটা লোক বুটসুদ্ধু পা তুলে দিল গায়ে। আহা রে, ভাইটা আমার। ঘরে দুটো ছোট্ট ছোট্ট ছানা। কী হবে ওদের বলো দেখি। কে এদের কচিপাতা মুখে করে এনে এনে খাওয়াবে?” চোখের জল ফেলে শামুক।
ব্যাঙের চোখেও জল চলে আসে। আহা রে, এমন বেঘোরে প্রাণ গেল।
পেছনদিকে তাকিয়ে হাঁক দেয় শামুক, “কই, হল তোমাদের? পা চালিয়ে এস একটু। না হলে পৌঁছাতে তো বেলা কাবার হয়ে যাবে।”
তারপর ব্যাঙের দিকে তাকিয়ে বলে, “চলি ভাই। জানোই, আমরা খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারি না। তোমাদের মতো লাফাতে পারলে তো হয়েই যেত। একটু তাড়াতাড়ি রওনা দিতে না পারলে রাত হয়ে যাবে পৌঁছাতে। আর রাত হলেই তো বিপদআপদ ঘনায় হাজারটা।”
চোখ মুছে ব্যাঙ বলল, “তা যাচ্ছটা কোথায়?”
“বৌবাগান গো। এখন সেখানেই আপাতত আস্তানা গাড়ব। আপাতত মানে, যদ্দিন না লোভী মানুষগুলোর চোখ ওদিকে পড়ে। এবার তুমিও একটা আস্তানা খুঁজে নাও গে। মানুষগুলোকে বিশ্বাস নাই। কোনদিন তোমাদের ডোবাটাকে দখল করে নেবে। ছেলেপুলে নিয়ে বিপদে পড়বে তখন।”
সে কি আর ব্যাঙ বুঝছে না? বুঝছে। তবুও মায়া বলে তো একটা বস্তু আছে। মিনমিনে গলায় বলে, “কোথায় যে যাই। বাপ-পিতামোর ভিটে। ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলেও কষ্ট হয়।”
ততক্ষণে খুদে খুদে পায়ে হেঁটে একটু দূর চলে গিয়েছে শামুক। সেখান থেকেই গলা তুলে বলল, “সে কষ্ট কি আর আমাদের হচ্ছে না গো? কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। আহা, ছোট্টবেলা থেকে দেখে আসছি যে শিউলিগাছ, নোনাধরা দেওয়াল, পিঁপড়ের ঢিবি – সেসব ছেড়ে যাওয়া কি অতই সহজ? কিন্তু কী করব বলো, প্রাণটাকে তো রাখতে হবে।”
গুটি গুটি পায়ে ফিরতে লাগল ব্যাঙ। উৎসাহ নেই আর যেন কোনও। সত্যি কী হবে তাহলে? হঠাৎ দেখে, গুবরে পোকা খুব ব্যস্ত হয়ে চলেছে। ব্যাঙকে দেখে বলল, “একটা বদ্যির খোঁজ দিতে পার, দাদা?”
“বদ্যি কেন? বোলতা কী হল? আমাদের অসুখে বিসুখে বোলতাই তো বরাবর দেখে এসেছে। কতরকমের ফুলের মধু হুল দিয়ে শরীরে ঢুকিয়ে ভালোই তো চিকিৎসা করে।”
“হ্যাঁ, গো। তাকেই তো খুঁজছিলাম। তা শুনলাম, তার নিজের বাড়িতেই অসুখবিসুখ শুরু হয়েছে। তার আসার সময় নেই। এদিকে যে কাছিমদাদুর এখন তখন অবস্থা।”
“সে কী! কাছিমদাদুর আবার কী হল?”
“কত করে বলেছিলাম, দাদু, বয়স হয়েছে, হটর হটর করে এদিক ওদিক চলে যেও না। তোমাদের জাতটাই তো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে। কয়েক বছর আগেই তো তোমাদের পরিবারের সবাইকে ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে দিল মানুষগুলো। নেহাত তুমি গর্তের একদম ভেতরের দিকে ছিলে, তাই নাগাল পায়নি পাজিগুলো। তোমার কিছু হয়ে গেলে পৃথিবীতে আর কাছিম বলেই কিছু থাকবে না। তা শুনলে তো? সেই বড়ো নদীর দিকে সাঁতরে গেল।”
“কেন? বড়ো নদীতে গিয়েছে তো কী হয়েছে?”
“বড়ো নদীর পাশে যে একটা কারখানা হয়েছে। তার যত বিষজল নর্দমা বেয়ে নদীতেই তো এসে পড়ে। নদীর জলও তাই বিষজল হয়ে গিয়েছে। সেই বিষজল গায়ে লেগে কাছিমদাদুর সে কী কষ্ট! গায়ে চাকা চাকা দাগ, শ্বাসকষ্ট। দেখ দেখি, এখন একটা বদ্যি পাই কোথায়?”
“বিষ, বিষ। সব বিষ হয়ে গেছে। বদ্যি-ফদ্যি দিয়ে কিচ্ছু হবে না গো।”
“কে বলল? আরে, কেঁচোভাই যে!”
গুবরে একটু গম্ভীর গলায় বলল, “এভাবে বলতে নেই। চেষ্টা তো করতেই হবে। আমার মা বলত, যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ।”
“সে করো গে চেষ্টা। আমি বলছি, কোনও লাভ নেই। মাটির ভেতর চুপ করে বসে থাকি, আর সব শুনি আমি। আমি জানি, মানুষ বিষ ছড়াচ্ছে। কীটনাশক বোঝো, কীটনাশক? সব মরে হেজে যাব আমরা এখন। জানো, বোলতার পরিবারে কী হয়েছে?”
“কী? কী?” সমস্বরে বলে ব্যাঙ আর গুবরে।
“বিষ লেগেছে। জমিতে কীটনাশক ছড়াচ্ছিল মানুষ। সেই বিষ লেগে পরিবারসুদ্ধু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। প্রজাপতি তিনদিন ধরে কিচ্ছু খাচ্ছে না। বিষ মেশানো মধু খেতে হবে এই ভয়ে।”
“মানুষ জমিতে বিষ ছড়ায়ই বা কেন? পোকামাকড় তো আমিই খেয়ে শেষ করে দিই। বেশ ভালোই তো খাই। তারপর যদি দুয়েকটা থাকেও, তাতেও বা ক্ষতি কী? ওদের ফসলের কতটুকুই বা ক্ষতি হয় তাতে?”
“লোভ গো, লোভ। মানুষের আরও চাই স্বভাব।” বলতে বলতে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে সাপ। তার কুলোপানা ফণায় সকালবেলার রোদ্দুর ঝলসায়।
সাপকে দেখেই তো ব্যাঙের বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস শব্দ হতে শুরু করেছে। এল লাফে সরে গেল সে একপাশে। বিশ্বাস কী? গপ করে মুখে পুরলেই হল। সাপ আর ব্যাঙের যে জন্মজন্মান্তরের শত্রুতার সম্পর্ক।
কিন্তু ব্যাঙ খাওয়ায় মন নেই এখন সাপের। সে বলতে লাগল, “কীটপতঙ্গ কি আমিও খাই না? আমরা তো মানুষের উপকারই করি। হ্যাঁ, ছোবলে দু-চারজন লোক মরে। তবে আমরা তো কারও ঘরে ঢুকে যেচে কামড়াতে যাই না। আমাদের গায়ে এসে পড়লে, নিজেদের বাঁচাতে ওটুকু তো করতেই হয়। আর বিষ? ভগবান ওটা আমাদের আত্মরক্ষার উপায় হিসেবেই দিয়েছেন। সে বিষও তো মানুষের কত কাজে লাগে। আমাদের বিষ দিয়েই তো ওষুধ বানায় কত। তবুও কি কৃতজ্ঞতা আছে এতটুকু? আমাদের ঝাড়ে বংশে শেষ না করে ওদের আর শান্তি নেই যেন।”
কেঁচো গলা তুলল। “আর আমি? জমির ভেতর দিয়ে চলাচল করে জমিকে উর্বরা বানাই। কীটনাশক ছড়িয়ে আমাদের মেরে ফেললে জমি উর্বরা হবে কী করে? মানুষ কি আর সেই কথা ভাববে?”
“কিন্তু এভাবে কি চলে? একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে। পড়ে পড়ে মার খাব নাকি?” সাপের কথায় এ ওর মুখের দিকে তাকায়। মানুষের বলে গায়ে কত জোর, মাথায় কত বুদ্ধি। মানুষের সঙ্গে এঁটে উঠবে সাধ্যি কী তাদের?
সাপ বলে, “শোনো। আমাদের জোট বাঁধতে হবে বিপদের দিনে একসঙ্গে থাকতে। এই যে ব্যাঙভাই, এত ভয়ে ভয়ে থেকো না। আমি তোমাকে মারতে যাচ্ছি না গো। আমরা তো আর মানুষ না যে হিংসেহিংসি করে বাঁচব! এস, সবাই মিলে একটা বুদ্ধি বের করি যাতে একটা নেই মানুষের রাজ্য বানানো যায়।”
বোঁ, বোঁ, বোঁ। উড়ে এল বোলতা। “এনেছি, এনেছি। অনেক দূরের বন থেকে ভালো পরিষ্কার মধু নিয়ে এসেছি। আর কোনও চিন্তা নেই। সবাইকে ভালো করে দেব। আরে, এখানে কীসের মিটিং হচ্ছে? শুনি, শুনি।”
তারপর? দিকে দিকে খবর পৌঁছল। উড়ে এল বোলতা। গর্ত থেকে বেরিয়ে এল বিষধর সাপ সব। বিছে এল হুল উঁচিয়ে। কেন্নো, কেঁচো, মৌমাছি সবাই তৈরি হল নিজের নিজের অস্ত্র নিয়ে। ব্যাঙ তো আছেই। আর কিছু না পারুক, লাথি তো মারতে পারবে সেই লোকটাকে যে কীটনাশক ছড়াতে আসবে।
এই জায়গাকে নেই মানুষের রাজ্য বানাতেই হবে। না হলে যে প্রকৃতির ভারসাম্যই নষ্ট হয়ে যাবে।
_____
অলঙ্করণঃ অনির্বাণ সরকার

No comments:

Post a Comment