গল্পঃ স্মৃতিটুকু থাক - প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়



স্মৃতিটুকু থাক

প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


সকলেই চায় অভিন্নহৃদয় এক বন্ধু। সবেতেই মনের মিল থাকবে, আচরণের মিল থাকবে এমন জীবনসঙ্গী তো সবাই চায়। স্মরণজয়বাবুও ঠিক তেমনটাই চেয়েছিলেন।
তাঁর বয়স যখন পনেরো, বাবার সঙ্গে হৃষিকেশ বেড়াতে গিয়ে পড়েছিলেন এক নাগা সাধুর খপ্পরে। তাঁর হাত ধরে টেনে বসিয়ে টকাটক করে কপালে চারটে গাঁট্টা ঝেড়ে দিয়ে সেই সাধু বলেছিলেন, “ওয়াহ! ক্যায়া নসিব বনায়া হ্যায় বচ্চে! তু যো মাঙ্গেগা ঈশওয়র তুঝে জরুর দেগা, দেখ লেনা।”
ঈশ্বর মনের বাসনা পূর্ণ করবেন একথা তো সব সাধুই বলেন। কিন্তু তবুও সেই সাধুবাবাকে বিশ্বাস করে একটাই মনোবাঞ্ছা পুষেছিলেন স্মরণজয়বাবু। আর আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগে বিয়ের জন্য পাত্রী পছন্দ করতে যাবার সময়ে কালীঘাটে গিয়ে চোখ বুজে প্রার্থনা করে বলেছিলেন, “মা গো, এমন একটা বউ দাও মা, যার সঙ্গে আমার মতের মিল, স্বভাবের মিল, চলনে-বলনে সবকিছুরই মিল হয়।”
ভক্ত যখন অন্তঃকরণ থেকে প্রার্থনা করে তখন ভগবানের বাপের সাধ্যি কী তা না শুনে পারেন? ভগবান দিয়েই দিলেন স্মরণজয়বাবুর মনের মতো বউ।
আর সেইদিন থেকেই ফেঁসেছেন স্মরণজয়বাবু।
এই পঁচিশ বছরে তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি সবেতেই মিল থাকে তাহলে কোনও মনে আর যেই থাকুক, শান্তিদিদিমণি ভাগলবা হবেনই
স্মরণজয়বাবু অফিস থেকে এসেই টিভিতে জীবজন্তুর চ্যানেল দেখতে বসে পড়তেন। তাঁর স্ত্রীয়েরও ওই চ্যানেল খুবই প্রিয়। দু’জনেই সোফায় আয়েস করে বসে একসাথে দেখতেন। কিন্তু তাহলে রান্নাটা করবে কে? রান্না করতে যে তাঁরা কেউই ভালোবাসেন না। অগত্যা বাধ্য হয়ে রান্নার লোক রাখা হল। বাজে খরচ।
স্মরণজয়বাবুর খুব গান গাওয়ার শখ। প্রতি রবিবার ভোরবেলায় হারমোনিয়াম পেড়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত না গাইতে পারলে সারা সপ্তাহ গলাটা কেমন যেন বাকুম বাকুম করে। কিন্তু তাঁর স্ত্রীয়েরও সেই বাতিক। তবে কিনা সেটা নজরুলগীতি, এইটুকু যা ফারাক। দু’জনের জন্য দুটো হারমোনিয়াম কেনা না হয় হল। কিন্তু একসঙ্গে দু’জনেই গান ধরলে সুরতালটা বোঝা যায় কী করে? দু’জনের জন্য আলাদা তবলচি একই সঙ্গে বাজাবেটাই বা কী করে?
রোজ খবরের কাগজ একসাথে পড়েন আর নতুন পত্রিকা এলে দু’জনেই কাড়াকাড়ি করেন। তাই একই বই দুটো করে কিনতে হয়।
দু’জনে মুখোমুখি হেঁটে এলে তো আর কথাই নেই। কেউ কাউকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন না। যেন একে অপরের আয়না। ইনি যদি ভাবেন টেবিলের গা দিয়ে যাবেন তো উনিও ভাবেন তাই। উনি ভাবলেন দেওয়াল ধরে যাবেন তো ইনিও সেই মুহূর্তে সেটাই ভেবে বসে আছেন। বেশ খানিক্ষণ এরকম চলার পরে দু’জনেই একইসঙ্গে অ্যাবাউট টার্ন নেন।
একই কারণে দু’জনের জন্য দুটো একইরকম দেখতে বাথরুমও বানাতে হয়েছে।
তাঁদের একমাত্র ছেলে শাক্যব্রত হবার পরে তাঁদের তো আরও অসুবিধে। দু’জনেরই তাঁদের আদরের খোকাকে একসাথে কোলে নিতে ইচ্ছে করে, আবার দু’জনেরই একই সাথে হাত টনটন করে ওঠে। তবে একটু বড়ো হতেই শাক্য দেখল, তারই পোয়াবারো। বাবা-মা দু’জনেই তার জন্য একই আইসক্রিম কিনে আনছেন। অবশ্য অনেক সময়ে তাতে বিপত্তিই হত বেশি। ইনি বলছেন আমারটা আগে খা, উনি বলছেন আমারটা আগে। অনেকসময় দেখা যেত, দু’জনেই রেগেমেগে আইসক্রিম মাটিতে আছাড় মেরে পা দিয়ে পিষছেন।
তবে আসল সমস্যা এল আজ থেকে পাঁচ বছর আগে। স্মরণজয়বাবুর মাথায় কী একটা অসুখ করে ভুলে যাবার রোগে ধরল। তাতে তাঁর চাকরিটারও যায় যায় অবস্থা হল। বাধ্য হয়ে তিনি স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে একটা স্টেশনরি দোকান দিলেন। নিজে কিছুই মনে রাখতে পারেন না দেখে একজন বিশ্বাসী কর্মচারীও রাখলেন। স্ত্রী তাঁকে ডেকে বললেন, “হ্যাঁ গো, খুব তো শখ ছিল তোমার সঙ্গে তোমার গিন্নির সবকিছু পাই টু পাই মিলে যাবে। দু’জনের ঠিকুজি-কুষ্টি, এমনকি নামটাও পর্যন্ত। তোমার নাম স্মরণজয় আর আমার নাম স্মৃতিকণা। দু’জনের ভাগ্যে কী নাচছে এবার বুঝছ তো? এবার শান্তি হল? আর কোনওদিন নিজের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে বউ আনবে!”
না, আর কোনওদিন বউ আনবেন না স্মরণজয়বাবু। ম্যাচিং বউ তো কক্ষনও না। এমন দুর্ভোগ চরম শত্রুরও যেন না হয়। যত বেশি অমিল হবে তত বেশি মজা, ততই যে বৈচিত্র একথা তাঁর মতো আর কে বুঝল! ভগবানকে কত বিশ্বাস করেছিলেন তিনি, আর এখন মাঝে মাঝেই বিরক্ত হয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে বলেন, “ভগবান তুমি ওপরেই বসে থাকো, নিচে নেমো না।”
এই গত বছরেরই ঘটনা। রোজকার অভ্যেসমতো সূর্যোদয়ের আধঘন্টা আগে ঘুম থেকে উঠতে অ্যালার্ম দেওয়া সত্ত্বেও দেরি করে ফেলেছিলেন। তাঁর আর কী দোষ, এই ব্যাপারটা বেশ কিছুদিন ধরেই হচ্ছিলমোবাইলে অ্যালার্ম সেট করাই থাকে। অ্যালার্ম যখন বাজে তখন সেটা তিনি তা কানে দিব্যি শুনতেও পান। কিন্তু ঘুমের ঘোরে কিছুতেই মনে করতে পারেন না সেটা কীসের আওয়াজ। কোনওদিন ভাবেন ঝিঁঝিঁপোকা ডাকছে, কোনওদিন ভাবেন কুকুরে কামড়াকামড়ি করছে, তো কোনওদিন ভাবেন পাশের বাড়িতে চোর এসে বাসনপত্র ফেলছে। বিড়বিড় করে তিনি “ভাঙ ভাঙ, আরও ভাঙ” বলে মৃদু হেসে পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন।
তা, সেদিনও স্মরণজয়বাবু ভোরবেলায় সামান্য দেরি করে উঠে সূর্য নমস্কার করছিলেন। পাশে যথারীতি স্মৃতিকণাদেবীও ছিলেন। একটু আগেই সেরে ফেলেছিলেন স্মৃতিদেবী। স্মরণজয়বাবুর তাকিয়ে আদুরে গলায় বললেন, “আজকে চায়ে একটু আদা দিতে বলি, কী বলো? ঠাণ্ডাটা যা পড়েছে!”
স্মরণজয়বাবু ধীরেসুস্থে প্রণামটা সেরে নিয়ে ভুরু কুঁচকে বললেন, “তোমাকে কতদিন বলেছি না, মোরগ নমস্কারের সময়ে কথা বলবে না?”
“মরণ! আজকে আবার মোরগ কোথায় দেখতে পেলে?”
স্মরণজয়বাবু বললেন, “তার মানে? মোরগ কাকে বলে তাও ভুলে গেলে? আরে, যেটা সারাদিন আলো দেয়, সর্দির সময়ে যার দিকে তাকালে হাঁচি পায় সেটা হল মোরগ। যার জন্য এ জীবজগৎ বেঁচে আছে, যাকে ঘিরে এই পৃথিবী আর গোটা মোরগজগতের গ্রহগুলো ঘুরছে তাকে বলে মোরগ। শীতকালে ছাদে উঠে তুমি যার দিকে পিঠ করে বসে উল বোনো, গরমকালে যার তাপ থেকে বাঁচতে লোশন লাগিয়ে ছাতা খুলে রাস্তায় বের হও তাকে বলে মোরগওই যার দিকে তাকাতে গিয়ে তুমি এখন ভুরু কুঁচকে কপালে হাত দিয়ে ছায়া বানাচ্ছ, আগুনের যেই থালাটাকে সকালবেলায় ওই সজনেগাছের ফাঁক দিয়ে উঠতে দেখলেই টিনের চালে উঠে ধোপাদের ওই হতচ্ছাড়া সূর্যটা লাল ঝুঁটি ফুলিয়ে কুক্কুরকুউ বলে ডেকে ওঠে সেই নক্ষত্রকেই বলে মোরগ। মনে পড়ছে এবার? হুঁহ্‌, যত্তসব ভুলোমনা নিয়ে হয়েছে আমার সংসার!”
“ইঃহিঃহিঃহিঃহিঃহি!” জোরে হেসে উঠলেন স্মৃতিদেবী, “তোমার তো মাথাটা শুকিয়ে একেবারে লেড়োবিস্কুট হয়ে গেছে গো। চায়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে রোজ কে খাচ্ছে বলো তো দিকিনি! আরে, কোঁকরকোঁ করে যেটা ডাকে তাকে বলে মোরগ, আর আকাশে যেটা দেখছ, যাকে নমস্কার করলে সেটাকে বলে খোকা। মনে পড়েছে এবার? রোজ সকলে উঠে খোকা-নমস্কার করছ, আর আজকে তাকে বলছ মোরগ!”
এবার স্মরণজয়বাবু বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, “কী যা তা বলছ? আকাশের ওটা খোকা? তাহলে ঘরে —”
স্মৃতিদেবী এবার বেশ রেগে গেলেন। স্মরণজয়বাবুকে থামিয়ে দিয়ে চাপা গলায় দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “চেঁচিও না তো! সূর্যটা ঘরে ঘুমোচ্ছে। উঠে পড়বে যে বেচারা কাল অনেক রাত করে শুয়েছে।”
তিতিবিরক্ত হয়ে স্মরণজয়বাবু আকাশের দিকে মুখ তুলে বললেন, “ভগবান তুমি ওপরেই বসে থাকো, নিচে নেমো না।”

এই তো অবস্থা।
তবে হ্যাঁ। ঈশ্বর যাকে দুর্দশা দেন, তারই জন্য তিনি বেশি কাতরও হন। তারই কাছে নিজের দূত পাঠান অন্ধকারে আলোর সন্ধান দিতে।
তাই তো সেইদিনই দুপুরবেলায় এক দেবদূত এসে স্মরণজয়বাবুর বাড়ির দরজায় টোকা দিয়ে বলল, “বাড়িতে কেউ আছেন?”
“কে?” স্মরণজয়বাবু সাড়া দিলেন।
“স্যার, আমার নাম দেবদত্ত প্রসাদএকটা দুর্দান্ত ভিশুয়াল ডিকশনারি আছে, স্যার। ছবি দিয়ে বাংলায় আর ইংরেজিতে লেখা। একবার হাতে নিয়ে —”
“না না, ওসব লাগবে না। বাড়িতে আমি সেলাইমেশিন অ্যালাউ করি না।”
“সেলাইমেশিন কোথায়, স্যার?”
“এই তো তুমি। বাড়ি বাড়ি জিনিস বেচে বেড়াও, সেলাইমেশিন না তো কী!”
“সেলসম্যান, স্যার।”
“ও আচ্ছা, আমার একটু গুলিয়ে — যাই হোক, ওই একই তোতোমাদের সেল করার একটা বাজে ম্যানিয়া আছে। একদম অ্যালাউ করি না।”
“স্যার, একটা অফার ছিল।”
“ছিল তো আজ এসেছ কেন? যেদিন ছিল সেদিন এলেই পারতে।”
“না মানে স্যার, আজকেই আছে।”
“আজকে আছে তো ছিল বললে কেন?”
বেগতিক বুঝে দেবদূত যখন হাঁটা লাগিয়েছে, তখনই পেছন থেকে স্মরণজয়বাবুর তেইশ বছরের ছেলে শাক্য ডাকল। সে বুঝেছে যে ঠিক এই জিনিসটাই সেই মুহূর্তে তার বাবা-মায়ের সবচেয়ে বেশি দরকার।
দেবদূত কোন দেবের মুখ দেখে সকালে উঠেছিল কে জানে, একই ফ্যামিলি তার থেকে দু’কপি মোটা মোটা ভিশুয়াল ডিকশনারি কিনে নিল।
বাবা আর মাকে একটা করে ভিশুয়াল ডিকশনারি গিফট করে শাক্য বলল, “আর ঠিক একবছর বাদে তোমাদের টোয়েন্টিফিফথ ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। তোমরা বেড়াতে যেতে এত ভালোবাসতে আর ভুলোমনা হবার পরে একদম ঘরে বসে থাকো। তাই আমি চাই নেক্সট ইয়ার তোমরা তোমাদের ফেভারিট জায়গা কন্যাকুমারী বেড়াতে যাও। খরচা আমি দেব। প্লিজ না কোরো না। এই বইটা সবসময়ে সঙ্গে রাখবে, যখনই দরকার হবে দেখে নেবে। তাহলে একবছরে তোমাদের ভুলে যাওয়া অনেক কমে যাবে মনে রাখবে, এটা তোমাদের গীতা।”
স্মরণজয়বাবু হেসে বললেন, “দেখেছ ছেলের কাণ্ড! এই কচি বয়েসে তুইও ভুলে যেতে শুরু করলি! আরে, এটা তো ডিকশনারি। ঠাকুরঘরে যা, গীতা দেখতে পাবি।”

তা, সেই কন্যাকুমারী যাবার দিন এসে পড়ল। আজ থেকে আর ঠিক চারদিন বাদে স্মরণজয়বাবু আর স্মৃতিকণাদেবীর পঁচিশতম বিবাহবার্ষিকী। গোটা একবছর ধরে নিজেদের তৈরি করেছেন তাঁরা। আগের মতো অতোটা ভুল এখন হয় না। ভুল হলে হাতের কাছে ভিশুয়াল ডিকশনারি তো আছেই
বিকেলে হাওড়া থেকে ট্রেন ছাড়বে। গোছগাছ শেষ করছেন স্মরণজয়বাবু আর তাঁর স্ত্রী স্মৃতিকণাদেবী। বাড়িতে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ডাকা হয়েছে। তাঁরা মাসখানেক বাড়িতে থাকবেন না, এই সময়ে ফ্যানগুলো খুলে নিয়ে গিয়ে ইলেক্ট্রিশিয়ান সেগুলোকে সার্ভিস করিয়ে রাখবে।
শাক্য বাড়িতে নেই। সে গুরগাঁওতে নামকরা কোম্পানিতে চাকরি করছে। এই বয়সেই সে বেশ দায়িত্ববান। কী কী নিতে হবে, বেরোবার সময়ে বাড়ির কোন কোন জানালা বন্ধ করতে হবে সব বিস্তারিতভাবে লিখে রেখে এসেছে সে।
কিন্তু তাতেও কি ভুল ঠেকানো যায়! সবকিছু রেডি করে সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরোনোর মুখে স্মরণজয়বাবুর মনে পড়ল কী বিশাল ভুল তিনি করেছেন। দু’জনে মিলে যুক্তি করেছিলেন হাজীর দোকান থেকে মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাঁপ আনিয়ে নেবেন, সঙ্গে থাকবে চিকেন তন্দুরি। সেইমতো ফোন করে অর্ডার দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এইমাত্র মনে পড়ল অর্ডারের টাইমটা ভুল দেওয়া হয়ে গিয়েছে। বিকেল চারটে দশে ট্রেন, আর তিনি চারটেতেই খাবার ডেলিভারি দিতে বলে দিয়েছেন। এখন আড়াইটে বাজে। স্টেশনে অন্তত একঘণ্টা আগে পৌঁছনো দরকার। তাই এক্ষুনি বেরোতেই হবে। তার মানে, সে-খাবার তাঁদের ভাগ্যে জুটল না।
দরজা বন্ধ করতে করতে চরম বিরক্তিতে স্মরণজয়বাবু আকাশের দিকে মুখ তুলে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “ভগবান তুমি ওপরেই বসে থাকো, নিচে নেমো না।”

দু’জনে মিলে একটা ট্যাক্সি নিয়েছেন। মালপত্তর লিস্ট মিলিয়ে তুলে ট্যাক্সির কাচ বন্ধ করে শালটাকে ভালো করে জড়িয়ে বসে আছেন স্মরণজয়বাবু। শুধু কানের কাছে স্মৃতিদেবী মাঝে মাঝেই বলে চলেছেন, “হ্যাঁ গো, আমরা কিন্তু কিছু একটা যেন ভুলে যাচ্ছি।”
স্মরণজয়বাবু জানেন যে এই পাঁচ বছরে তাঁর স্ত্রীয়ের মধ্যে এই স্বভাবটা তৈরি হয়েছেতাই তাতে পাত্তা না দিয়ে চোখ বুজে গনগনে ধোঁয়া ওঠা হাজীর মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাঁপ দেখতে পেলেন। গন্ধও যেন পেলেন। জিভটা রসিয়ে উঠল। মুখটা হাঁ করে কামড় বসাতে যাবেন—
“রোককে ড্রাইভার, রোককে!”
হঠাৎ কন্যাকুমারীর ঢেউ এসে চিকেনের ঠ্যাং-ম্যাং ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। জলের ঝাপটায় চোখ পরিষ্কার হয়ে দূরে দেখা গেল, বিরিয়ানির মাংসের চাঁইটা সমুদ্রের একটা বড়ো পাথর সেজে জেগে আছে শুধু স্ত্রীয়ের চেঁচানিতে চমকে উঠে চোখ খুললেন স্মরণজয়বাবু। স্মৃতিদেবী ডান হাতের তর্জনীটা নাক বরাবর বাড়িয়ে ধরেছেন। হিন্দুস্থানি ড্রাইভার হতভম্ব। স্মরণজয়বাবু বললেন, “কী গো, কী হল আবার?”
“এটা কী?”
ঝট করে ভিশুয়াল ডিকশনারির পাতা উলটে দেখে স্মরণজয়বাবু হেসে বললেন, “তাই বলো, ওটাই ভুলে যাচ্ছিলে? ওটা হল আঙুল। ওকে বলে তর্জনী।”
“আরে দূর বাবা! ঠিক করে বলো।”
ডিকশনারির পাতাটা স্মৃতিদেবীর নাকের ডগায় ধরে স্মরণজয়বাবু বললেন, “ঠিকই বলেছি। এই দ্যাখো।”
“ধ্যাত্তেরি! তোমার দ্বারা হবে না। ড্রাইভার ভাইয়া, বলিয়ে তো ইয়ে ক্যায়া হ্যায়?”
ড্রাইভার স্মৃতিদেবীর আঙুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “সাব তো সহি বোলা, মেমসাব। ইয়ে তো আপহিকা উঙ্গলি হ্যায়
“ধুত্তোর উঙ্গলির নিকুচি করেছে!” স্মৃতিদেবী রেগেছেন, “আরে বাবা, হামারা উঙ্গলি জিসকো তাগ কর রাহা হ্যায় উও ক্যায়া হ্যায়?”
ট্যাক্সির উইন্ডস্ক্রিনের সামনে একটা মালা পরানো মা লক্ষ্ণীর ছোট্ট ছবি রয়েছে। স্মৃতিদেবী সেইটাতেই আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন। কিন্তু সেটা যে কী জিনিস স্মরণজয়বাবুরও সেই মুহূর্তে পেটে আসছিল অথচ মুখে আসছিল না। ডিকশনারি খুলে সেরকম কোনও ছবিও পেলেন না। আর ড্রাইভার বলল, “হাঁ মাজি। হাম রকখা হ্যায়। হাম হিন্দু হ্যায় তো, ইস লিয়ে রকখা হ্যায়।”
“আরে ভাই রকখা হ্যায় তো সমঝা। লেকিন ক্যায়া রকখা হ্যায়? ধ্যার বাবা, হামারা বাতহি নেহি বুঝ রাহা হ্যায়!” স্মৃতিদেবী অসহিষ্ণু।
“অজীব বাত করতে হ্যাঁয় মাজী, আপনে বাত্তি জ্বলায়ে কাহাঁ কে বুঝ নহি রহা হ্যায়?”
এবারে হাল ধরলেন স্মরণজয়বাবু, “সুনো ড্রাইভারজী, ইয়ে যো তুমহারা মাজী হ্যায় না, ইয়ে জরা ভুলক্কর হ্যায়। তুম ব্যস ইতনা বতা দো কে উস ফোটোমে জো হ্যায় উও ক্যায়া হ্যায়।”
“আপ তো ভুলক্কর নহি হ্যায় না, আপ হি বতা দিজিয়ে।”
“লেকিন ড্রাইভারজী, ইনকে সাথ রহতে রহতে ম্যায় ভি ভুলক্কর হো গয়া হুঁ। অব বতাও।”
“অজীব আদমি হ্যায় আপলোগ। ইয়ে লকশমিজীকা ফোটু হ্যায়, অওর ক্যায়া!”
“লকখিজীকো ক্যায়া কহেতা হ্যায়?” স্মৃতিদেবী জিজ্ঞাসা করলেন।
“লকশমিজীকো মাতা কহতে হ্যাঁয়, অওর ক্যায়া!”
“আরে, মতলব ইয়ে লক্ষ্মী, সরস্বতী, দূর্গা, কালী, শিব, নারায়ণ, গণেশ এদের সব এক শব্দমে ক্যায়া কহেতা হ্যায়?”
“ঈশওয়র কহতে হ্যাঁয়, অওর ক্যায়া!”
“অওর ক্যায়া কহেতা হ্যায় ওহি তো হাম পুছতা হ্যায়।” স্মৃতিদেবী রীতিমতো হাত পা ছুড়তে লেগেছেন। ধৈর্য ক্রমশ হারাচ্ছেন।
“ভগওয়ান কহেতে হ্যাঁয়, অওর ক্যায়া!”
“এইত্তো মনে পড়েছে! তোমাকে পঞ্চাশ টাকা বেশি ভাড়া দেব। হ্যাঁ গো, তাড়াতাড়ি ভগবানকে ফোন করো।” স্মৃতিকণাদেবী স্মরণজয়বাবুর দিকে ফিরে বললেন।
শুনে ড্রাইভার খৈনিতে তালি দিয়ে হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে বলল, “অজীব পাগল হ্যায় তো আপলোগ। ভগওয়ানকো ফুন করেঙ্গে! অচ্ছা ইয়ে বতাইয়ে, আপলোক রানচি যা রহে হ্যায় ক্যায়া?”
কিন্তু ড্রাইভারের কথায় কর্ণপাত না করে স্মরণজয়বাবু সত্যি সত্যি মোবাইল থেকে ফোন করলেন। ফোনটা তাঁর হাত থেকে নিয়ে স্মৃতিদেবী বললেন, “হ্যালো! ভগবান, তুমি এখন কোথায়?”
“ওপরে আছি, আর কোথায়!” স্মরণজয়বাবুদের ইলেক্ট্রিশিয়ান ভগবান রায় কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিল, “আমনাদের বাড়িতেই তো আটক হয়ে বসে আচিভাল আক্কেল তো আমনাদের! ভগবানকে ঘরের মধ্যে আটকে নিজেরা ফূত্তি কচ্চেন! কী ক্ষতি করেচি আমনাদের যে এরম শাস্তি দিচ্চেন! সব কাজ সেরে দোতলা দিয়ে নিচে নামতে যাব, বাবু চিল্লিয়ে বললেন, ‘ভগবান তুমি ওপরেই বসে থাকো, নিচে নেব না’। আমি ভাবলাম আরও কাজ আচে বোধহয়। তা না, আমনারা তালাচাবি মেরে পাইলে গেলেন! আমার মুবাইলে ব্যালেস নেই বলে ফুনও করতে পারচি না।”
স্মৃতিদেবী বললেন, “ভগবান, তুমি কিছু মনে কোরো না ভাই। তুমি যে ওপরে সেটা আমাদের খেয়াল ছিল না। তুমি একটু অপেক্ষা করো, আমরা গিয়ে খুলে দিচ্ছি। ড্রাইভারভাইয়া, ওয়াপাস ঘর চলো।”

তাড়াহুড়ো করে বাড়ি পৌঁছে ভগবান রায়কে খুলে দিয়ে স্মরণজয়বাবু তার হাতে পাঁচশোটা টাকা গুঁজে বললেন, “ভগবান, তুমি এত কষ্ট করলে তো, তাই তোমার জন্য একটা সাপ্রাইজ আছে। তুমি দরজার বাইরেটায় চারটে অবধি দাঁড়াও, হাজী থেকে ভালো ভালো খাবার দিয়ে যাবে, তুমি আর তোমার বউ পেট পুরে খেও, কেমন! আমরা যাই গো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
ভগবান রায় বলল, “হ্যাঁ, এখন নিজেরা দোষ করেচেন তো, তাই আমনাদের পেসাদ ভগবান খাবে।”
_____
অলঙ্করণঃ অনির্বাণ সরকার

No comments:

Post a Comment