গল্পঃ স্বর্ণকুমার ও লৌহকুমারের গল্প - বিশ্বজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়




স্বর্ণকুমার ও লৌহকুমারের গল্প


বিশ্বজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়



অনেককাল আগে ঐশ্বর্যপুর নামক এক গ্রহে এক রাজা বাস করতেন। রাজার ছিল সমস্ত গ্রহজোড়া বিশাল রাজত্ব। কিন্তু রাজার মনে ছিল খুব দুঃখ। কারণ, রাজার কোনও ছেলেপুলে ছিল না।
হঠাৎ একদিন এক ভিনগ্রহী সন্ন্যাসী ছোট্ট একটা মহাকাশযানে করে রাজার প্রাসাদে উপস্থিত হলেনসন্ন্যাসীর তিনটে মাথা, চারটে সরু লিকলিকে হাত আর দুটো মোটা পা। সন্ন্যাসী বললেন, “আমি শুনেছি রাজার কোনও সন্তান নেই। তাই আমি বিকটপুর গ্রহ থেকে সোনালি অক্টোপাসের পা নিয়ে এসেছি। এই পা প্রথমে নুন দিয়ে সেদ্ধ করে, তারপর বেটে যদি রানিকে খাওয়ানো যায়, তবে রানির সন্তান হবে।”
সোনালি অক্টোপাসের পা বিষাক্ত কি না পরীক্ষা করতে রানি তাঁর বিশেষ দাসীকে প্রথমে সেই পায়ের কিছু অংশ খাওয়ালেনসেই দাসীরও কোনও ছেলেমেয়ে ছিল না। কয়েকদিন পরে দাসীকে একদম সুস্থ থাকতে দেখে রানি শেষপর্যন্ত নিজেও সেই পায়ের অংশ খেলেন
কালক্রমে সত্যি সত্যিই রানির কোল আলো করে এক ছেলে এল। রাজা-রানি মিলে তার নাম রাখলেন স্বর্ণকুমার। অন্যদিকে দাসীও এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিল। কিন্তু সে পুত্র কোনও সাধারণ মানবপুত্র হল না। সেই পুত্র হল অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক রোবট। দাসীপুত্রের নাম হল লৌহকুমার সংক্ষেপে তাকে লৌহ বলে ডাকা হতে লাগল।
স্বর্ণকুমার ও লৌহ একসাথেই খেলাধুলা করে বড়ো হতে লাগল। লৌহ নিজের যান্ত্রিক মস্তিষ্কের জন্যে সব পড়াশোনা তাড়াতাড়ি শিখে ফেলে, যা রাজপুত্রের শিখতে অনেক সময় লাগে। ফলে লৌহর মাথায় অনেক বুদ্ধি খেলে যা রাজপুত্রের মাথায় আসে না। সুতরাং কোনও জটিল কাজ স্বর্ণকুমারের থেকে লৌহ তাড়াতাড়ি করে ফেলে এতে স্বর্ণকুমারের খারাপ লাগে সে চেষ্টা করে লৌহকে এড়িয়েই কাজগুলো করতে।

দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে গেল। স্বর্ণকুমার ও লৌহকুমার বড়ো হয়েছে। রাজা ঠিক করলেন, যে স্বর্ণকুমারের বিয়ে দেবেন। তিনি বহুদিকে লোক লাগিয়ে খবর পেলেন যে বহুদূরের সোনার-কাঠি ছায়াপথে এক ঘন সবুজ রঙের গ্রহ আছে। সেই গ্রহে বাস করে মেঘবরণ চুল, কুঁচবরণ রাজকন্যা। রাজপুত্র স্বর্ণকুমারের সাথে তাকে মানাবে ভালো। কিন্তু রাজকন্যাকে পাওয়ার পথ সোজা নয়। পথে যেতে ছড়িয়ে আছে নানান বিপদ। এছাড়া রাজকন্যাকে পাহারা দেয় এক ড্রাগন। রাজকন্যাকে পেতে গেলে তাকেও কৌশলে মারতে হবে। তবেই রাজকন্যাকে বিয়ে করা যাবে।
সব শুনলেন রাজা। কিন্তু তার পরেও তিনি দমলেন না। বিশাল সৈন্যসামন্ত আর অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তিনি স্বর্ণকুমারকে পাঠালেন রাজকন্যাকে বিয়ে করে নিয়ে আসতে। সৈন্যসামন্ত ও অস্ত্রশস্ত্রের বহর দেখে স্বর্ণকুমার ভাবল, এই অভিযানে সে একাই একশো। লৌহর সাহায্য তার দরকার পড়বে না। সুতরাং লৌহকে বাদ দিয়েই স্বর্ণকুমার ময়ূরপঙ্খী মহাকাশযানে চেপে বসল। রাজা-রানি চোখের জলে স্বর্ণকুমারকে বিদায় দিলেন।
স্বর্ণকুমার চলে যাওয়ার পরে ছ’মাস কেটে গেছে। কিন্তু রাজপুত্রের কোনও খবর নেই। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাকে রাক্ষসগ্রহের কাছ দিয়ে যেতে দেখা গেছে। রাজা-রানি চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেন তাঁরা লৌহকে ডেকে পাঠালেন।
লৌহ রাজসভায় আসতে রাজা বললেন, “তুমি আমার এবং রাজপুত্রের অন্যতম বিশ্বাসভাজন। আমি চাই তুমিও রাজপুত্রের গন্তব্যে যাও এবং দেখ যে রাজপুত্রের কী হল। আর তোমার মায়ের জন্য চিন্তা কোরো না। তোমার কিছু হলে তোমার মায়ের সব ভরণপোষণের দায়দায়িত্ব আমার।”
লৌহ বাড়ি ফিরে দাসী-মাকে সব জানাল। মা তো ছেলের যাত্রার কথা শুনে কেঁদেই আকুল। লৌহ বলল, “কেঁদো না, মা। আমি কথা দিলাম যে অভিযান শেষ করে আমি ঠিক ফিরে আসব।”
লৌহ দাসীপুত্র হওয়ার জন্য কোনও ময়ূরপঙ্খী মহাকাশযান পেল না। তাকে বাদুড়পঙ্খী মহাকাশযান দেওয়া হল। রাজা তাকে অনেক সৈন্যসামন্ত দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু লৌহ তা নিল না। লৌহ বলল, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সে একাই যাবে এবং যা কথা তাই কাজ। নির্দিষ্ট দিনে লৌহ মায়ের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে একাই বেরিয়ে পড়ল।
মহাকাশযানে চেপে লৌহ হাজার হাজার গ্রহ-নক্ষত্র-উল্কা-ধূমকেতু দেখতে দেখতে চলেছে। ক্রমে সে রাক্ষসগ্রহের কাছে এল। রাক্ষসগ্রহে সব কিম্ভুতকিমাকার রাক্ষসেরা বাস করে। তারা খুবই যুদ্ধবাজ। স্বর্ণকুমার ও তার সৈন্যদের রাক্ষসেরা যুদ্ধে হারিয়ে বন্দী করে রেখে দিয়েছে। রোজ একটা একটা করে সৈন্যকে রাক্ষসদের রাজা কাঁচা খেয়ে নেয়। লৌহ যখন গিয়ে পৌঁছল, তখন স্বর্ণকুমার আর তার কয়েকজন মাত্র সৈন্য বেঁচে আছে।
লৌহ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাদুড়পঙ্খী মহাকাশযানকে একদম মশা-মাছির আকারে নিয়ে এল। তারপর রাক্ষসদের জেলখানায় গিয়ে স্বর্ণকুমারকে খুঁজে বের করে ফেলল। রাত যখন গভীর হল, লৌহ নিজেকে ও নিজের মহাকাশযানকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনল। জেলখানার বাইরে মহাকাশযান রেখে সে সাবধানে জেলে ঢুকল। তারপর তার সৌর বন্দুক দিয়ে জেলের ঘুমন্ত পাহারাদার রাক্ষসদের একে একে ভবলীলা সাঙ্গ করল। এরপর রাজপুত্র ও সৈন্যদের মুক্ত করল।
স্বর্ণকুমার মুক্ত হয়ে আনন্দপ্রকাশ না করে বরং চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে লৌহকে বলল, “রাক্ষসরা যখন জানবে যে আমরা পালিয়েছি এবং পালাবার আগে ওদের জেলের পাহারাদারদের হত্যা করেছি, তখন ওরা আমাদের ঠিক খুঁজে বের করবে আর সবাইকেই কাঁচা গিলে ফেলবে
লৌহ বুদ্ধি দিল “এর জন্যে এক কাজ করা যাক। আমরা রাক্ষসদের রাজাকে অপহরণ করব, আর আমাদের সাথে নিয়ে যাব। রাক্ষসরা কাল সকালে যখন রাজাকে না পেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়বে, তখন রাজাকে খুঁজতে গিয়ে জেলের পাহারাদারদের দিকে অত নজর দেবে না। ওরা যতক্ষণে গোটা ব্যাপারটা আন্দাজ করবে, ততক্ষণে আমরা পালিয়ে অনেকদূর চলে যাব।”
স্বর্ণকুমার আশ্চর্য হয়ে বলল, “বুদ্ধিটা তো ভালোই। কিন্তু রাক্ষসদের রাজাকে অপহরণ করবে কী করে!”
লৌহ খুশি হয়ে বলল, “সে আপনি আমার ওপর ছেড়ে দিন
লৌহ পুনরায় বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজপুত্র, নিজেকে এবং সব সৈন্যদের একদম ছোট্ট করে ফেলল আর মহাকাশযান বাদুড়পঙ্খীকে মাছির আকারে পরিণত করল। এবার সেই মহাকাশযানকে উড়িয়ে রাক্ষসদের রাজবাড়ির দিকে চলল। ক্রমে রাজার দেহরক্ষীদের চোখ এড়িয়ে রাক্ষস রাজার অন্তঃপুরে প্রবেশ করল। রাজা তখন ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে। লৌহ ছোটো করার রশ্মি প্রয়োগ করে রাক্ষসরাজকেও ছোটো করে ফেলল। তারপর তাকে লোহার চেন দিয়ে বেঁধে বন্দী বানিয়ে মহাকাশযানে তুলল। এরপর রাজবাড়ির বাইরে এসে বাদুড়পঙ্খীকে স্বাভাবিক আকারে ফিরিয়ে আনল এবং আর এক মুহূর্তও দেরি না করে আলোর গতিবেগে পালাতে লাগল।
সকাল হতেই ভয়ানক রাক্ষসের দল রাগে নিজেদের চুল ছিঁড়তে লাগল, দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল। মহাকাশযানে এদিক ওদিক রাক্ষসসেনা পাঠাল। কিন্তু কিছুতেই বাদুড়পঙ্খীর খোঁজ পেল না।

এদিকে পাঁচ দিন পাঁচ রাত্রি যাওয়ার পরে বাদুড়পঙ্খী মহাকাশযান সেই সবুজ গ্রহে পৌঁছল যেখানে মেঘবরণ চুল, কুঁচবরণ রাজকন্যা থাকে। কিন্তু স্বর্ণকুমার সেই কন্যার কাছে যাবে কী, তাকে যে পাহারা দিয়ে আছে মস্ত বড়ো আগুনরঙা ড্রাগন! সেই ড্রাগনের একেকটা পায়ের থাবায় দশজনের মুণ্ডু আটকে যাবে।
স্বর্ণকুমার দূর থেকে দেখল যে রাজকন্যার কেল্লার সামনে ড্রাগন ঘুমিয়ে আছে। নিজের শক্তির প্রতি অগাধ আস্থা ছিল তার। সে লৌহকে বলল, “শোনো, তুমি মহাকাশযানের সামনে পাহারায় থাকো। আমি চললাম সৈন্যদের নিয়ে ড্রাগনকে হারাতে।”
এই বলে বীর স্বর্ণকুমার লৌহর উত্তরের তোয়াক্কাই না করে ছুটে গেল সামনের দিকে। স্বর্ণকুমার ও তার সৈন্যদের সমবেত কোলাহলে ঘুমন্ত ড্রাগন গেল জেগে। শুরু হল ড্রাগনের সাথে স্বর্ণকুমারের ভয়ংকর যুদ্ধ।
ড্রাগন তার মুখের হাঁ দিয়ে নরকের আগুন বের করে আনল। সেই আগুনে অনেক সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, মারা গেল, পালিয়ে গেল। সৈন্যদের লেজার রশ্মির তরোয়ালে ড্রাগনেরও রক্ত ঝরল বটে। কিন্তু তাহলে হবে কী। ড্রাগনের আকার যে বিশাল। শেষপর্যন্ত অনেক লড়াইয়ের শেষে স্বর্ণকুমার দেখল যে তার সৈন্যরা কেউ আর অবশিষ্ট নেই। সেই একা লড়ে যাচ্ছে। এরপর স্বর্ণকুমারের অস্ত্রশস্ত্র সবই ড্রাগন ধ্বংস করে দিল এবং তাকে বন্দী করল।
বন্দী স্বর্ণকুমারকে ড্রাগন হাত-পা বেঁধে একটা বিশাল কড়াইয়ে ফেলে দিল। তারপর সেই কড়াইয়ে পিপে পিপে জল ঢেলে, মশলা ঢেলে, আগুন জ্বালিয়ে রান্না করতে দিল। রান্না হতে সময় লাগবে, তাই সেই ফাঁকে ড্রাগন দূরের পাহাড়ে একটু বেড়াতে গেল।
ড্রাগন যেই উড়তে উড়তে পাহাড়ের দিকে অদৃশ্য হল, অমনি আড়াল থেকে লৌহ বেরিয়ে এল। সে এতক্ষণ পুরো যুদ্ধটা দেখছিল এবং বেশ বুঝতে পেরেছিল যে ড্রাগনের সাথে সামনাসামনি যুদ্ধে পেরে ওঠা যাবে না। বুদ্ধির আশ্রয় নিতে হবে।
লৌহ প্রথমেই কড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বর্ণকুমারকে মুক্ত করল। তারপর যে রাক্ষসদের রাজাকে সে অপহরণ করেছিল, তাকে মহাকাশযান থেকে নিয়ে এল। লৌহ রাক্ষসরাজকে ঠেলে কড়াইয়ে ফেলে দিল।
এবার স্বর্ণকুমার ও লৌহ দু’জনে পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। একটু বাদেই ড্রাগন ফিরে এল এবং মাংস রান্না হয়ে গেছে দেখে মহানন্দে ভোজ খেতে শুরু করল। কিন্তু রাক্ষসদের মাংস ভারি বিষাক্ত হয়। এর প্রভাবে ড্রাগন খেয়েই অজ্ঞান হয়ে গেল। ড্রাগনকে অজ্ঞান হতে দেখে স্বর্ণকুমার আর লৌহ আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। স্বর্ণকুমার তার লেজার রশ্মির তরোয়াল এবং লৌহ তার সৌর-বন্দুক দিয়ে ড্রাগনের মাথা কেটে ফেলল।
ড্রাগনের বিরুদ্ধে কৌশলে জয় পেয়ে স্বর্ণকুমারের আনন্দ আর ধরে না। স্বর্ণকুমার লৌহর বুদ্ধির প্রশংসা করল এবং তাকে নিজের সব অভিযানে সঙ্গী না করার জন্যে দুঃখও প্রকাশ করল।
স্বর্ণকুমার ও লৌহ দু’জনে মিলে প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করল। প্রাসাদের ভেতরে মেঘবরণ চুল, কুঁচবরণ রাজকন্যা স্বর্ণকুমার ও লৌহকে স্বাগত জানাল। রাজকন্যার মা-বাবা মানে সবুজ গ্রহের রাজা-রানিকে ড্রাগন খেয়ে নিয়েছিল। রাজ্যের সৈন্যসামন্তও সব ড্রাগনের পেটে গেছিল। সুতরাং স্বর্ণকুমার ড্রাগনকে হারিয়েছে দেখে রাজকন্যা খুব খুশি হল এবং বিয়েতে সম্মতি দিল। রাজকন্যার এক রোবট সহচরী ছিল যাকে দেখে লৌহর বেশ পছন্দ হল। তার বউ হিসেবে মানাবে ভালো
এইভাবে স্বর্ণকুমার, লৌহ, রাজকন্যা এবং তা সহচরী ঐশ্বর্যপুর গ্রহে ফিরে এল। রাজা-রানি খুব ধুমধাম করে স্বর্ণকুমার এবং লৌহকুমারের বিয়ে দিলেন। তারপর একসময় স্বর্ণকুমার হল রাজা এবং লৌহকুমার তার মন্ত্রী। সবাই মিলে খুব আনন্দে জীবন কাটাতে লাগল।
_____

2 comments:

  1. Kolpobiggan at rupkothar Moseley khub velo hoyeche. 1ta theme annotar a bad Nicholson Porsche golpota. So genre e sir compo likhun

    ReplyDelete
  2. kolpo bijnan ar rupkothar asadharan melbandhan............khub valo laglo.....

    ReplyDelete