গল্পঃ চাঁপাপুকুর গ্রামের কবরেজমশাই - অদিতি ভট্টাচার্য্য



চাঁপাপুকুর গ্রামের কবরেজমশাই

অদিতি ভট্টাচার্য্য



চাঁপাপুকুর গ্রামের বিশ্বনাথ কবিরাজের খুব নামডাক। আশেপাশের পাঁচটা গ্রাম থেকে লোকজন অসুস্থ মানুষকে নিয়ে আসে দেখাতে। চাঁপাপুকুর গ্রামের লোকজন বলে সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি বাস করেন তাদের গ্রামে। কবরেজমশায়ের ওষুধের এমনই গুণ। কবরেজমশাই শুনে হাসছ? তা গ্রামের মানুষ সবাই ওই নামেই ডাকে, কবিরাজ থেকে মুখে মুখে কবরেজ হয়ে গেছে। বিশ্বনাথ গুপ্ত গ্রামের ছেলেবুড়ো সক্কলের কবরেজমশাই। ওঁর আসল নামটা লোকে ভুলেই গেছে। এক ওই বটুজেঠু ছাড়া। উনিই একমাত্র বিশু বলে ডাকেন, ছেলেবেলার বন্ধু কিনা।
এমনকি চয়ন অবধি সেদিন বলল, “খুব কাশি হয়েছে আমার, মা বলেছে সন্ধেবেলায় কবরেজমশায়ের কাছে নিয়ে যাবে।”
আমরা তো শুনে অবাক, বলে কী এ! বললাম, “সে কী রে, তুই কবরেজমশাই বলছিস কেন? তোর না বড়ো জেঠু হন উনি?”
“তা তো হন। কিন্তু সর্বক্ষণ কবরেজমশাই কবরেজমশাই শুনতে শুনতে ওটাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তাছাড়া উনি তো সব সময় রোগী আর ওষুধপত্তর নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, আমাদের এদিকে প্রায় আসেন না বললেই হয়কবরেজমশাই ছাড়া অন্য কিছু ওঁকে মনেই হয় না,” বলল চয়ন।
তা অবশ্য সত্যি।
কবরেজমশাই একা মানুষ। সঙ্গে থাকে শুধু লক্ষ্মণদাদা, কবরেজমশায়ের চাকর। এছাড়া সাগর বলে একটা ছেলে থাকে সারাদিন কাজকর্মে ওঁকে সাহায় করার জন্যে। তবে সন্ধে হতে না হতেই সে চলে যায়। তারপর রোগী এলে কবরেজমশাইকে একাই সব সামলাতে হয়। ওর থেকে সন্ধে পর্যন্ত শুধু রোগীর ভিড়, কত লোক যে আসে তার ঠিক নেই। বটুজেঠু বলেন, “ঘোর কলি! অসুখে অসুখেই পৃথিবী নাশ হবে।”
এই এত রোগী সামলাতেই কবরেজমশায়ের দিন হুড়হুড় করে কেটে যায়। তার মধ্যে সময় পেলে হয় ওষুধপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, নয় এই মোটা মোটা বই পড়েন। আগে তাও চয়নদের দিকে যেতেন খাওয়াদাওয়া করতে, কিন্তু রোগীর ভিড়ে ওঁর নাওয়া-খাওয়ার কোনও ঠিক থাকে না বলে ইদানীং লক্ষ্মণদাদাই এদিকে সব ব্যবস্থা করে রাখে।
চাঁপাপুকুরের বাসিন্দাদের বাড়িতে দূর থেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এলে দুটি জিনিসের কথা বলতে কেউ ভোলে না। এক কবরেজমশায়ের সুখ্যাতি, আর দুই গ্রামের মধ্যিখানের বিরাট বড়ো চাঁপাপুকুর। এই পুকুরের নাম থেকেই গ্রামের নাম, আবার পুকুরপাড়ের লম্বা লম্বা মোটা মোটা চাঁপাগাছগুলোর জন্যেই পুকুরের নাম। চাঁপাগাছগুলোতে যখন ভর্তি ফুল ফোটে, সারা গ্রাম গন্ধে ম ম করে।
গ্রাম শুনেও হাসছ? কী ভাবছ, রাস্তায় গরুর গাড়ি চলে আর রাত্তিরে বাঘ বেরোয়? মোটেও তা নয়। ইস্কুল আছে, দোকানবাজার আছে, লাইব্রেরি আছে – সব আছে। তোমাদের শহরের মতো মল-টল নেই বটে, কিন্তু আমাদের মতো এত সুন্দর খেলার মাঠও কি তোমাদের আছে? পুকুরের জলে ঝুপ ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ে সাঁতার কাটার মজাও তো তোমরা জানো না। একটা ছোটোখাটো হাসপাতালও আছে, ডাক্তারও আছে সেখানে। কিন্তু সবাই প্রথমে কবরেজমশাইকেই দেখায়। তবে রোগীর অবস্থা সেরকম বুঝলে কবরেজমশাই নিজেই বলেন, “না বাপু, আমি ভালো বুঝছি না, হাসপাতালে নিয়ে যাও
কিন্তু এসব কথা সবাই বোঝে না, খালি আমাদের গ্রামের নিন্দেই করে।
রিনিদের বাড়িতে ক’দিন আগে রিনির মাসি, মেসোমশাই আর মাসতুতো দুই ভাইবোন এল। তারা নাকি হিল্লি-দিল্লি অনেক ঘুরেছে, অনেক বেড়িয়েছে, কিন্তু কোনওদিন নাকি ভিলেজ দেখেনি, তাই ভিলেজ দেখতে এসেছে। যা দেখে তাতেই চোখ কপালে তুলে বলে, “ওহ্‌, মাই গড!”
কবরেজমশায়ের কথা শুনেও বলল, “কবরেজ? হোয়াট ইজ দ্যাট? এখানে ডক্টর নেই?”
ভাগ্যিস বটুজেঠু ছিলেন সেখানে তখন বললেন, “হে ভগবান, তোরা আয়ুর্বেদের নামও জানিস না? কত জায়গায় এখন নতুন করে এসবের চর্চা হচ্ছে! শহরে তো শুনি ভেষজ মানে হার্বাল জিনিসপত্রের খুব চল। এই সেদিন অবধি আমাদের এখানে জগার আখড়া ছিল। যোগব্যায়ামের। জগা এমনিই শেখাত। তোরা তো শহরে কত কত টাকা খরচ করে যোগব্যায়ামের ক্লাস করিস আর কায়দা করে বলিস, ইয়োগা!”
শুনে ওরা আর কিছু বলল না বটে, কিন্তু মুখ এক্কেবারে হাঁড়ি করে বসে রইল।
এসব তো হল। তবে কবরেজমশায়ের কিন্তু একটা দোষ আছে। আমরা সেজন্যে পারতপক্ষে ওঁর ধারে কাছে ঘেঁষতে চাই নাবড়োরাও অনেক সময়ে বিরক্ত হন। কিন্তু ওই যেমন অসুখ করলে তেতো ওষুধ না খেয়ে উপায় নেই, সেরকম বাধ্য হয়েই সবাই মেনে নেন আর কী। ব্যাপার হচ্ছে, কবরেজমশাই বড্ড বকবক করেন আর বড্ড প্রশ্ন করেন। একের পর এক প্রশ্ন করেই যান, করেই যান, থামার নামই করেন না।
তারককাকু গেছিলেন কবরেজমশায়ের কাছে। জ্বর হয়েছে, ক’দিন আগে বৃষ্টিতে খুব ভিজেছিলেন।
কবরেজমশাই সব শুনে-টুনে নাড়ি, চোখ সব দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কোনদিকে মেঘ করেছিল?”
“আজ্ঞে?” তারককাকু তো কিছুই বুঝলেন না প্রশ্নের মাথামুণ্ডু।
“বলছি, আকাশের কোনদিকে মেঘ করেছিল? বৃষ্টিতে ভিজেছ বলছ, মেঘ না করলে তো বৃষ্টি হয় না। তাই বলছি মেঘ কোনদিকে করেছিল? ঈশানকোণে, না মাথার ওপরে না দক্ষিণদিকে?” কবরেজমশাই আবার জিজ্ঞেস করলেন, এবার একেবারে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে।
তারককাকু তো মহা ফাঁপরে পড়লেন। বৃষ্টিতে ভিজেছেন জানেন, মেঘ কোনদিকে করেছিল সে কি আর দেখেছেন, না খেয়াল আছে!
সে কথা কবরেজমশাইকে বলতেই উনি বেশ বিরক্ত হলেন বললেন, “আচ্ছা মানুষ তো বাপু তুমি! কিচ্ছু মনে নেই! মনে করার চেষ্টা করো। যখন বৃষ্টি এল তার আগে মেঘ দেখে কিছু তো ভেবেছিলে তুমি - এইদিকে মেঘ করেছে, বৃষ্টি না হয়ে যায় না বা জোর বৃষ্টি এল বলে – এরকম কিছু। ভাবো, মনে করো, দেখো ঠিক মনে পড়বে।”
তারককাকু কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কিছুই মনে করতে পারলেন না। শেষে খুব বিনীতস্বরে বললেন, “খুব অন্যায় হয়ে গেছে কবরেজমশাই, খুব ভুল হয়ে গেছে। পরেরবার ঠিক খেয়াল রাখব কোনদিকের মেঘে বৃষ্টি হচ্ছে। এবার ওষুধটা দিয়ে দিন - খুব কষ্ট হচ্ছে, গা, হাত, পা ব্যথা করছে, মাথা তুলতে পারছি না।”
না, ওষুধ দিতে কিন্তু কবরেজমশাই একদম দেরি করেননি; ওষুধ দিয়ে দিয়েছিলেন। আর সে ওষুধ একবার খেয়েই তারককাকু অনেক উপকার পেয়েছিলেন।
তারককাকু নাকি প্রায় বলেই ফেলছিলেন, “বৃষ্টি তো বৃষ্টিই, যেদিকের মেঘেই হোক না কেন, তাতে কী তফাত?”
কিন্তু বলেননি, জোর সামলে নিয়েছিলেন। কে জানে বাবা, কবরেজমশাই যদি ওষুধ না দেন! তাছাড়া বলাও যায় না, হলুদ হয়ে যাওয়া পাতার ওই মোটা মোটা বইগুলো ঘেঁটে কোনদিকের মেঘের কী বৈশিষ্ট্য সেসব যদি বলতে থাকেন? তার থেকে ওষুধ নিয়ে চুপচাপ চলে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সৌরভ খেলতে খেলতে মাঠে পড়ে গিয়ে পা মচকে ফেলল। সে কী ব্যথা! হাঁটতেই পারে না। কবরেজমশাই শুনে জানতে চাইলেন ঠিক কীভাবে পড়েছে। সৌরভ তো আর দেখাতে পারছে না, শেষ চয়নরা দু’ভাই মিলে দেখাল। ওরাও খেলছিল তো। কবরেজমশাই বলেছিলেন, “হাড়গোড় কিছু ভাঙেনি, তবে একটা এক্স-রে করে নেওয়া ভালো।”
এক্স-রে করা হয়েছিল হাড় সত্যিই ভাঙেনি, আর কবরেজমশায়ের ওষুধে সৌরভ দিব্যি ভালো হয়ে গেল। আবার খেলছেও।
মিতুঠাকুমা তো আরও মুশকিলে পড়েছিলেন কবরেজমশাইকে যেই বলেছিলেন, “আমার খুব হাঁচি-কাশি হচ্ছে,” অমনি কবরেজমশাই বললেন, “আগে কোনটা হয়েছে? মানে আগে হেঁচেছেন, না আগে কেশেছেন?”
হাঁচছেনও, কাশছেনও কিন্তু আগে হেঁচেছেন না আগে কেশেছেন তা কি আর মিতুঠাকুমার মনে আছে! এদিকে কিছু একটা উত্তর দিতে হবে ভুলে গেছি বলার পাত্রী উনি নন তাই বললেন, “আগে কাশিই শুরু হয়েছে, হাঁচিটা তো এই সবে দু’দিন হচ্ছে।”
কবরেজমশাইও ওষুধ দিয়ে দিলেন।
“ওষুধ তো নিয়ে এলাম কিন্তু বুক দুরদুর করছিল। আগে হাঁচি শুরু হয়েছে না আগে কাশি শুরু হয়েছে তা কি ছাই মনে আছে? এ-ওষুধে যদি কাজ না হয়? তবে মিথ্যে কথা বলব না, মিথ্যে বললে নারায়ণ রুষ্ট হবেন, ওষুধ একেবারে অবর্থ্য। এই তো দেখো না, না হাঁচি আছে, না কাশি।”
এই হল কবরেজমশায়ের স্বভাব, উদ্ভট সব প্রশ্ন করবেন। যেসব প্রশ্ন না করলেও মনে হয় চলে। আমরা বিকেলে খেলতে গিয়ে চয়নের কাছে সেসব গল্প শুনি। শুনি আর হাসি। তবে আজ চয়ন এক্কেবারে অন্য কথা বলল। শুনে আমরা বেশ অবাকই হলাম। গতকালের ঘটনা এটা। তখন সবে সন্ধে হয়েছে। চয়ন কাল খেলতে আসেনি, বাড়িতেই ছিল। ঘর থেকেই শুনল, কবরেজমশায়ের ওখানে কে যেন খুব জোরে জোরে কথা বলছে। চয়ন একটু অবাকই হল। জোরে জোরে কথা একমাত্র কবরেজমশাইই বলেন, গলার আওয়াজটা ওঁর বেশ বাজখাঁই। গলার আওয়াজ ওঁরই পাওয়া যায়। তাছাড়া পাওয়া যায় বটুজেঠুর, যখন উনি কবরেজমশায়ের সঙ্গে গল্প করতে আসেন। সেও অবশ্য তেমন ঘন ঘন নয়। কবরেজমশায়ের অত সময় কোথায়? এ-গলাটা বটুজেঠুর নয়, কবরেজমশায়ের তো নয়ই, সাগরও তো চলে গেছে। তাহলে? এত জোরে জোরে কে কথা বলছে? চয়ন জানালা দিয়ে উঁকি মারল, কিন্তু তেমন কিছু দেখতে পেল না শুধু কবরেজমশায়ের পিঠটা একটুখানি দেখা যাচ্ছে। কবরেজমশায়ের গলা কিন্তু তেমন শোনা যাচ্ছে না। চয়ন কান পেতে ভালো করে শুনেছে লোকটা কী বলছে। লোকটার শরীর খারাপই মনে হচ্ছে, ওষুধ নিতেই এসেছে কিন্তু এসে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে। কবরেজমশাইকেই!
“এই ওষুধটা এতটা দিচ্ছেন কেন?”
“এটা দিনে দু’বার আর এটা একবার খাব কেন? দুটোর মধ্যে ফারাক কী? না না, আপনাকে বোঝাতেই হবে, খাওয়ার দরকার আছে বললেই হবে না আমাকে ওষুধ খেতে হবে, আমার জানার অধিকার আছে কোনটা কী ওষুধ, কোনটার কী গুণ।”
“এটা কি কিছু গুঁড়ো করছেন? গুঁড়োটা তো ঠিক মিহি হল না। কেন, মিহি করে গুঁড়ো করছেন না কেন? আমার যদি খেতে অসুবিধে হয়?”
“এটা ভোর পাঁচটায় খালি পেটে খেতে হবে? আমি এরকম নিয়ম করে রোজ ভোর পাঁচটাতেই উঠতে পারি না। সাড়ে চারটেতেও কোনওদিন উঠে পড়ি, আবার কোনও কোনওদিন উঠতে উঠতে সাড়ে পাঁচটাও বেজে যায়। তাহলে? আপনি পাঁচটা এরকম ধরাবাঁধা সময় দিচ্ছেন কেন? আপনার বলা উচিত, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে ওষুধটা খাবেন। পাঁচটা বলা উচিত হয়নি আপনার।”
“আমি কিন্তু বারবার বলেছি আমার পেটের ডানদিকে একটা চিনচিনে ব্যথা হয়। কনকনে নয়। আপনি চিনচিনে ব্যথার ওষুধই দিচ্ছেন তো? কনকনের দেননি তো? চিনচিনে আর কনকনে ব্যথার পার্থক্য বোঝেন তো?”
এই অবধি শুনেই চয়নের পেট ব্যথা হয়নি ঠিকই, কিন্তু মাথা ভনভন আর কান কটকট করতে শুরু করেছিল। নেহাত অনেকগুলো অঙ্ক হোমওয়ার্ক ছিল, তাই তাড়াতাড়ি পড়তে বসে গেছে, নইলে একবার গিয়ে ঠিক দেখে আসত সে মহাশয় কে। কবরেজমশাইকে এমন তেড়ে প্রশ্ন করে!
চয়নের এই কথার মাঝখানেই দেখি সাগরদা প্রাণপণে সাইকেল চালিয়ে ওর বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আমরা মাঠ থেকেই চেঁচিয়ে উঠলাম, “ও সাগরদা, দাঁড়াও, দাঁড়াও, অত জোরে সাইকেল চালাচ্ছ কেন?”
সাগরদা সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে কোনওরকম বলল, “কবরেজমশাই আচ্ছা লোকের পাল্লায় পড়েছেন। বলছে তো শরীর খারাপ, জ্বর, পেটে ব্যথা, কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে না! কী গলা রে বাবা! শুনলে যেন মনে হয় মেঘ ডাকছে! কবরেজমশাই কিছু জিজ্ঞেস করবেন কী, মুখ খুলতেই দিচ্ছে না। একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। এটা কী, ওটা কেন দিচ্ছেন! কবরেজমশাই তিনদিন পরে আসতে বলেছিলেন, কিন্তু আবার আজই এসে হাজির হয়েছে। চাঁপাপুকুরের লোক নয়। পাশের গ্রাম থেকে এসেছে, কবরেজমশায়ের সুখ্যাতি শুনে। কিন্তু...” সাগরদা যেন কিছু ভেবে কীরকম শিউরে উঠল তারপর বলল, “যাও না, যাও, গিয়ে দেখে এসো,” বলে আবার সাইকেল চালিয়ে বোঁ করে চলে গেল।
আমরাও আর দেরি না করে কবরেজমশায়ের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। কিন্তু গিয়েও তাকে দেখতে পেলাম না। চলে গেছে। লক্ষ্মণদাদা গাছে জল দিচ্ছিল বলল, কবরেজমশাই শুয়ে আছেন।
শুনে তো আমরা হাঁ। সন্ধে হব হব, এই সময়ে কবরেজমশাই শুয়ে আছেন!
লক্ষ্মণদাদা বলল, “আর শোবেন না! যা একজন রোগী আসছে রোজ! আমি তো দেখিনি, ভেতর থেকে শুধু কথা শুনেছি, তাতেই ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি, এবার না কবরেজমশাই এত কথার চোটে রেগে গিয়ে এক কাণ্ড করেন! কবরেজমশাই এমনিতে ঠাণ্ডা মানুষ, রাগ-রোষ বিশেষ করেন না, অসুস্থ লোকের ওপর তো নয়ই, সে বারবার এলেও নয়, কিন্তু একবার রেগে গেলে বড়ো ভয়ংকরযাও যাও, তোমরা সব বাড়ি যাও দিকিনি এখন। আমি যাই, আদা দিয়ে বেশ করে চা করি, সঙ্গে খানিক মুড়ি নিয়ে যাই, দেখি যদি কবরেজমশাই খান।”
আমরা চলে এলামব্যাপার বড়োই অদ্ভুত লাগল। অসুস্থ মানুষ এলে কবরেজমশাই কক্ষনও ফেরান না, সে গভীর রাতে এলেও না তাই এসব সহ্য করছেন বুঝলাম।
পরেরদিন শুনলাম, কবরেজমশায়ের মনমেজাজ নাকি খুব খারাপ, রোগী দেখতেই চাইছিলেন না। চাঁপাপুকুরের সবাই এক বাক্যে বলল যে এরকম কথা এই প্রথম শুনছে। ভদ্রলোককে দেখতে আমাদের খুব ইচ্ছে। আজ শনিবার, ইস্কুল হাফ ছুটি হবে। ইস্কুলেই ঠিক হয়ে গেল, তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে আমরা বিকেল থেকেই কবরেজমশায়ের বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করব।
ঠিক তো করলাম, কিন্তু যা ঠিক করা হয় তা কি সবসময় হয়? মোটেই না। আজও হল না। বিকেল হতে না হতেই আকাশ ভেঙে এমন বৃষ্টি নামল যে আমরা বাড়ি থেকে বেরোতেই পারলাম না। যখন বৃষ্টি থামল তখন সন্ধে প্রায় সাতটা। রাস্তায় জায়গায় জায়গায় জল জমে গেছে। এর মধ্যে বেরোতে চাইলে আমাদের যা অবস্থা হবে সে আর কহতব্য নয়।
রবিবার সকালে জানা গেল, অবস্থা আরও খারাপ। সেই ভদ্রলোক বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর এসেছিলেন, এই জল কাদা ঠেঙিয়ে! রোগী এলে কবরেজমশাই ফেরান না, গতকালও ফেরাননি ওঁর হাজার প্রশ্ন সহ্যও করেছেন, কিন্তু তার ফল ভালো হয়নি। আজ সকালে যারা কবরেজমশায়ের কাছে গেছিল তারা বলল, এ যেন সেই কবরেজমশাইই নন, কীরকম যেন হয়ে গেছেন। এর থেকে দশটা কথা বলতেন সেও ভালো ছিল।
আমরা তখনই ঠিক করে নিলাম, আজ সন্ধেয় আমরা কী করব। হাজার হোক আমরা চাঁপাপুকুরের ছেলে, আমাদের তো একটা কর্তব্য আছে। অন্য গ্রামের একটা লোক এসে দিনের পর দিন আমাদের কবরেজমশাইকে এরকম অপমান করে যাবে আর আমরা সহ্য করব! কক্ষনও নয়।
বিকেল থেকে যদিও খুব মেঘ করেছিল, কিন্তু আমাদের আর আটকানো গেল না। মাঠে খেলব না, বন্ধুদের কারুর বাড়িতেই থাকব বলে বেরিয়ে পড়লামজয় দেখেও রেখেছে, মেঘ প্রথম পুবদিক থেকেই হতে শুরু করেছিল, এখন প্রায় পুরো আকাশেই ছাড়া ছাড়া। বৃষ্টিতে ভিজে সর্দিকাশি হলে তো সেই কবরেজমশায়ের কাছেই যেতে হবে, তাই আগে থেকে খেয়াল করে রাখা ভালো।
সাগরদা আজ দুপুরেই বাড়ি চলে গেছে আর আসবে না বলে গেছে, চয়ন খবর দিল আমাদের। আমরা দল বেঁধে সাগরদার বাড়ি গিয়ে ওকে পাকড়াও করলাম। ভদ্রলোককে চিনিয়ে দিতে হবে তো। সাগরদা তো প্রথমে যেতেই চায় না বলে, “কবরেজমশাই কি লক্ষ্মণদাদা দেখলে বিপদ হবে বলবে, আমি শুধু শুধু কাজ কামাই করেছি।”
অনেক কাণ্ড করে তাকে রাজি করালাম আমরা বললাম, “তুমি দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের শুধু চিনিয়ে দেবে।”
সবে কবরেজমশায়ের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছেছি, দেখি এক ভদ্রলোক বেরিয়ে যাচ্ছেন বাড়ি থেকে দেখেই সাগরদা বলল, “ওই যে, ওই যে, চলে যাচ্ছে ওই যে সাদাকালো চেক শার্ট,” বলেই উল্টোমুখে দে দৌড়।
আমাদেরও চোখে চোখে ইশারা হয়ে গেল। গ্রামের মধ্যে তো কিছু করা যাবে না, কিন্তু যেই গ্রাম পেরিয়ে পোড়ো মন্দিরের মাঠে গিয়ে পড়বে অমনি বাছাধন মজাটি টের পাবেন। আমাদের মুখোশ-টুখোশ সব রেডিই আছে। দু’জন ওর পেছন পেছন যাব, বাকিরা শর্টকাট রাস্তায় আগেই মাঠে পৌঁছে যাবতিনজন গাছে উঠে থাকবে। সবাই পৌঁছলেই চারদিক থেকে ঘিরে ধরে ভয় দেখাব। পরিষ্কার বলা হবে, কবরেজমশাইকে দেখাতে এলে এত প্রশ্ন করা চলবে না, ওঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে আর চুপচাপ ওষুধ নিয়ে চলে যেতে হবেআজ যা মজা হবে ভাবতেই মনটা খুশি খুশি হয়ে গেল।
আমি আর চয়ন যাচ্ছিলাম পেছন পেছন। ভদ্রলোক দেখলাম আগুপিছু না দেখে এক মনে হাঁটেন। মাঠে পৌঁছলাম এক সময়। সৌরভ শিস দিল গাছের মাথা থেকে। অন্যরাও মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমি আর চয়ন দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে সবে অন্যদের ইশারা করতে যাব ভদ্রলোককে ঘিরে ফেলতে, ওমা, দেখি ভদ্রলোকই নেই! নেই মানে নেই! যাকে বলে এক্কেবারে হাপিস! আমরা তো থ! সৌরভরাও গাছের ওপর থেকে নেমে এসেছে। খুব মেঘ করেছে, অন্ধকার হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে সামনে একটা লোককে দেখতে পাব না! আর তক্ষুনি বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। আমরাও দে দৌড়। দৌড়তে দৌড়তেই শুনলাম, জয় জোরে জোরে রামনাম জপ করছে।
চয়নদের বাড়িই আগে পড়ে। আমরা হুড়মুড়িয়ে সেখানেই ঢুকে পড়লাম। দেখি বটুজেঠুও আছেন, চয়নের বাবার সঙ্গে কথা বলছেন।
“বিশু শুয়ে আছে, থাক, শুয়ে থাক, ঘুমোক। এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটল, মানে এরকম ও বড়ো একটা ঘটে না। তিনদিন এরকম হল, মন অশান্ত হওয়া স্বাভাবিক,” বটুজেঠু বললেন।
আমরা তো ওঁর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না।
সৌরভ সাহস করে জিজ্ঞেসই করে ফেলল, “কী হয়েছে কবরেজমশায়ের?”
“সে এক অদ্ভুত ব্যাপার!” বললেন বটুজেঠু, “পাশের গ্রামে অনন্ত বিশ্বাস বলে এক ভদ্রলোক আছেন। আছেন নয়, ছিলেন। এই ক’দিন হল মারা গেছেন, ছেলের কাছে কলকাতায়। ওঁর ছেলে আর আমার ছেলে আবার বন্ধু ছিল। তা আজ হঠাৎ অনন্তবাবুর ছেলের সঙ্গে দেখা হল, সেই বলল ওঁর মারা যাওয়ার কথা। কলকাতায় গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। খালি গ্রামে ফিরতে চাইতেন বলতেন, ‘আমাকে একবার কবরেজমশায়ের কাছে নিয়ে চল, আমি ভালো হয়ে যাব।’ অনন্তবাবু এর আগের বিশুর কাছে এসেছেন। আমাকে বলেছিলেন একবার, ‘কবরেজমশায়ের ওষুধের তুলনা হয় না, কিন্তু উনি বড়ো অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করেন।’ সে যাই হোক, ওঁর আর এ-যাত্রা গ্রামে ফেরাও হয়নি, বিশুর কাছে আসাও হয়নি। এদিকে বিশু বলছে, গত তিনদিন ধরে নাকি অনন্তবাবু ওর কাছে আসছেন, আজও নাকি এসেছিলেন। লক্ষ্মণও বলল, কে এক বাবু এসে নাকি বিশুকে খুব জ্বালাচ্ছে। ঘোর কলি, ঘোর কলি! নাহলে দেহত্যাগের পরেও দেহের আধিব্যাধি নিয়ে বিচলিত হওয়া! নারায়ণ নারায়ণ!” এই অবধি বলেই বটুজেঠু আমাদের দিকে তাকালেন “তোরা সবক’টা একসঙ্গে কোত্থেকে? মাথা ভেজা, জামাকাপড়ও ভেজা, বৃষ্টিতে কোথায় গেছিলিস?”
আমাদের গলা তো আগেই শুকিয়ে গেছে, হাত-পা প্রায় ঠাণ্ডা হওয়ার দশা কোনওরকমে ঢোঁক গিলে বললাম, “খেলতে গেছিলাম, কিন্তু বৃষ্টি এসে গেল।”
এরপর কবরেজমশাই দু’দিন রোগী দেখেননি। ঘর থেকেই বেরোননি! চয়ন জুতোর বাক্সের পিচবোর্ড কেটে তার ওপর লাল কালি দিয়ে বড়ো বড়ো করে ‘আজ কবরেজমশাই রোগী দেখিবেন না’ লিখে বারান্দায় টাঙিয়ে দিয়েছিল। কবরেজমশাইই বলেছিলেন।
দু’দিন পর থেকে অবশ্য সব আবার আগের মতোই চলতে লাগল। কবরেজমশায়ের বাড়িতে আবার সেই রোগীর ভিড়। শুধু দেখা গেল, কবরেজমশাই আর অত প্রশ্ন করছেন না। তবে ওষুধ যেন আগের থেকেও আরো ভালো হয়ে গেছে। নুটুপিসের যে অত বাতের ব্যথা, কবরেজমশাইও তাকে এতদিন ঠিক বাগে আনতে পারছিলেন না, নতুন ওষুধ দু’বার খাওয়ার পরই অনেকটা কমে গেছে।
_____
অলঙ্করণঃ রাখি পুরকায়স্থ

2 comments: