প্রচ্ছদ

প্রচ্ছদঃ মৈনাক দাশ

জীবনের গল্পঃ ভুটো // দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী



ভুটো

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী




মোহনগঞ্জ থানায় মোয়াজ্জম হোসেনের একটি বড়ো ঘোড়া ছিল এলাকার যে সমস্ত দিকে জেলা বোর্ডের ভালো রাস্তা আছে, সেদিকটায় যেতে হলে এটাকেই নিয়ে যাওয়া হত জলা জায়গা বলে আর অন্য সময়ে বেশিরভাগ এলাকায় ভালো রাস্তা ছিল না বর্ষার সময়ে সব জায়গাতেই নৌকায় যাওয়া হত আর অন্য সময়ে ক্ষেতের আল, বিলের ধার (কান্দা), ইউনিয়ন বোর্ডের সরু রাস্তা - এই ছিল যাতায়াতের পথ সরু পথের প্রায় জায়গাই ভাঙা আর সেখানে বারোমাসই জল থাকে তাই এই ভাঙা জায়গার উপর দিয়ে মাঝে মাঝে বাঁশের সাঁকো করে দেয় বোর্ড থেকে বড়ো ঘোড়া এইসব জায়গায় নিয়ে যাওয়া খুবই অসুবিধা তাই তেথুলিয়া কাছারি থেকে বিধুবাবু আমাদের ব্যবহারের জন্য একটি সাদা ভুটিয়া ঘোড়া দিয়েছিলেন এটা নিয়ে চলতে খুব আরাম বোধ হত কিছু কিছু রাস্তাঘাটও ওর বেশ জানা ছিল আমরা ওকে আদর করে ডাকতামভুটো টুকটুক করে চলত কোনও পথই তার অগম্য ছিল না আমাকে খুব ভালোবাসত ইউনিফর্ম পরে ওর কাছে এসে দাঁড়ালেই ও বুঝে নিত, বাইরে যেতে হবে ঘাড়-গলা চেটে দিত, মুখামৃত ছড়িয়ে দিত পোশাকের উপর ভুটোকে কিন্তু কোনওদিনই আমি ভুলতে পারব না ভালোবাসার মর্যাদা ও রক্ষা করেছিল আমাকে এক ভীষণ বিপদের মুখ থেকে রক্ষা করে
সেই কথাই বলছি

একটানা দশ বছর পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন থানায় কাজ করেছি সরকারি কর্তব্য-কার্য সম্পাদনে শিথিলতা এলেই বিবেকে বাঁধত তাই কারও কোনও উপদেশ-নির্দেশ মানা যেন স্বভাববিরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই স্বভাব রয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গে এসেও সবাই বলত একগুঁয়ে এই একগুঁয়েমির জন্য কতবার যে কত বিপদের সম্মুখীন হয়েছি তার ঠিক নেই নাজিরনগরের দাঙ্গা থেকে তো অনায়াসেই সরে আসতে পারতাম উপদেশ তো পেয়েছিলাম স্থানীয় বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে কুলিয়ার চরের নৈশ অভিযানে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ঝড়ের মধ্যে পড়ে আত্মরক্ষার প্রচেষ্টাও তো অনায়াসে এড়িয়ে যাওয়া যেত পরবর্তীকালে এরূপ ঘটনা ঘটেছে অনেক
ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার তখন এইচ. . সাবাইনআই বি থেকে বদলি হয়ে ময়মনসিংহ জেলার চার্জ নিয়েছেন সিনিয়র চাকুরিতে কলকাতা, হাওড়া ও চব্বিশ পরগণা জেলাতেই বেশি কাজ করেছেন মফঃস্বল জেলায় এসে ঠিক মন বসাতে পারছেন না প্রায়ই থানা পরিদর্শনে বেরুচ্ছেন
হঠাৎ একদিন কাগজ পেয়ে গেলাম সাহেব মোহনগঞ্জ থানা পরিদর্শনে আসছেন আমরা তো অবাক ব্যাপার কী? সাধারণত ইস্ট ডিভিশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারেরই তো আসার কথা যা হোক, ওসব ভেবে কোনও লাভ নেই যথাসাধ্য রেকর্ডপত্র ঠিক করা গেল হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল অবশ্য এতে আবগারি দোকানের মালিক শ্যামবাবুর কৃতিত্ব বেশি অভিজ্ঞ লোক প্রস্তাব করলেন, পরিদর্শনের তৃতীয়দিন মোহনগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এক সভায় সাহেবের সাথে মিলিত হবেন তাঁকে অভিনন্দন জানাবার জন্য আর চতুর্থদিন তেথুলিয়া বিলে নিয়ে যাওয়া হবে পাখি শিকারে ঠিক হল, আমি তেথুলিয়া কাছারি গিয়ে বিধুবাবুর সাথে আলাপ করে সব বন্দোবস্ত করে আসব
সেই অনুসারে সাহেব আসার দিন দুই আগে বেলা প্রায় এগারোটার সময়ে ভুটোকে নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম বিকাল প্রায় চারটার সময়ে তেথুলিয়া কাছারি পৌঁছে গেলাম বিধুবাবু কাছারিতেই ছিলেন উনি শুনে খুব খুশি হলেন এবং শিকারের দিন সব বন্দোবস্ত করে রাখবেন বললেন
কথায় কথায় সন্ধ্যা হয়ে গেল আমাকে যে ঐদিন যত রাতই হোক থানায় ফিরতে হবে, সেকথা ভুলে গেছিলাম আমি উঠে দাঁড়াতেই বিধুবাবু রেগে বললেন, “তুমি যদি যাবেই তবে আরও আগে রওনা হলে না কেন? কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে এই কুখ্যাত বিলে প্রায় চার মাইল পথ যেতে হবে বিলের ধার ধরে স্থানে স্থানে একাধিক পথ রয়েছে ভুল করলে রাত্রে থানায় ফিরতে পারবে কি না সন্দেহ
বিধুবাবুর স্ত্রীও শুনে নিষেধ করলেন বললেন, “কাল খুব ভোরে রওনা হলেই হবে সামান্য সময় দেরি হলে আর ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজ রাজত্ব চলে যাবে না ওদের যখন যাবার সময় হবে তখন পুলিশ কেন, মিলিটারিও ধরে রাখতে পারবে না
আমি হেসে বললাম, “তা নয় জানেন তো, পুলিশ সাহেব নতুন এসেছেন জেলায় কীরকম হবেন জানি না থানায় অনেক কাজ করা বাকি আছে সুরেনদা কীরূপ খেয়ালি লোক মোয়াজ্জমের অসুবিধা হয়, আমি চাই না তাছাড়া আমার নিজেরও ভবিষ্যৎ আছেআমার সেই একগুঁয়েমি স্বভাবটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলথানায় যখন বলে এসেছি তখন যাবই
বিধুবাবু আর আপত্তি করলেন না খুব তাড়াতাড়ি করে কিছু খাইয়ে দিলেন এখন সমস্যা হল ভুটোকে নিয়ে ভুটো এই কাছারির একজন সভ্য এখানে তার এক সাথী আছে তার সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় তাদের নিভৃত আলাপ তখনও শেষ হয়নি তাছাড়া ও ধরে নিয়েছিল, এখানে রাত্রে থাকব তাই যেতে একটু আপত্তি কাছে এসে ঘাড়, মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “চল, থানায় যাব
ভুটোর মেজাজ গরম হয়ে গেল আমার মুখে চোখে ওর মুখামৃত ছড়িয়ে দিয়ে ঘোরতর আপত্তি প্রকাশ করল আমি ওর কানের কাছে মুখ এনে আদর করে বললাম, “চল না, থানায় অনেক কাজ আছে
এই বলে উঠে বসলাম বিধুবাবু একটা লোক দিয়ে কিছুদূর বিলের পথে এগিয়ে দিলেন কিছুটা চলার পর বিলে ফিকে জ্যোৎস্নার মতো দেখা গেল গ্রাম-দেশ, তাও আবার নির্জন বিলের জায়গা তেথুলিয়ার হাটের দিন তবুও কিছু লোক চলে এবং আশেপাশের রাস্তা ধরে নিজ নিজ গ্রামে ঢুকে পড়ে আজ কিন্তু তাও দেখছি না না, ঐ তো দূরে আলো দেখা যাচ্ছে নিশ্চয়ই লোক চলছে আমি ভুটোর গতিবেগ বাড়িয়ে দিলাম আলোটা মাঝে মাঝে নিভে যাচ্ছে হতে পারে কোনও ঝোপঝাড়ের আড়াল হেতু ওরকম হচ্ছে একটা জায়গায় এসে দু-তিনটি রাস্তার সংযোগস্থলে এসে পড়লাম কই, দিনের বেলা তো এই জায়গাটা দেখিনি! ভুটো আপনা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই আলো অনোন্যপায় হয়ে আমি সেই আলোর দিকেই ভুটোর গতি নির্দেশ করে দিলাম ভুটো কিন্তু মুখামৃত ছড়িয়ে আপত্তি জানাল আমি মস্ত এক ভুল করে বসলাম ওকে বুঝতে না পেরে জোর করে ওকে সেই আলোর দিকেই চালিয়ে দিলাম
আধঘণ্টা চলার পর এখন সেই আলো কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল একটা বিষয় তখন আমার মনে হল, এই যে এত জোরে ঘোড়া চালিয়ে এলাম, আলো তো সেই সমান দূরে থেকে যাচ্ছিল এখন আর দেখছি না কেন? আর পথই বা পাচ্ছি না কেন? তাহলে কি আলেয়ার আলো? রাত্রে বিলে তো এরূপ হামেশাই দেখা যায় পথচারী একে দেখেই চলতে চলতে শেষে পথ হারিয়ে বিলের জলে নেমে পড়ে আর উঠতে পারে না পরে আতঙ্কে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় এরূপ একটি অপঘাত মৃত্যুর তদন্তও আমি করেছি আমি ভুটোকে থামিয়ে দিলাম পোশাক পরা, বিশ্বস্ত ঘোড়ার উপরসঙ্গে রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র মনের জোর হারালে এই বিলে সারা রাত্রেও আর পথ পাব না
আবার আলো এবার আর ভুল নয় বুঝে নিয়েছি ভুটোর সমস্ত শরীর ঘেমে গিয়েছে আমার ইউনিফর্ম এই শীতেও ভিজে গিয়েছে বলগা টেনে ঘুরিয়ে দিলাম ভুটোকে ও বুঝতে পারল চিনে চলে এল সেই রাস্তার সংযোগস্থলে তারপর আমি আর ওকে কোনও নির্দেশ না দিয়ে ইচ্ছামতো চলতে দিলাম কিছুক্ষণ এদিক ওদিক দেখে নিয়ে আপন ইচ্ছায় চলতে লাগল সে কতক্ষণ চলেছে জানি না কারণ, তখন আমার মাঝে মাঝেই তন্দ্রায় চোখ বুজে আসছিল রেকাবের ভেতর পা ঢুকিয়ে দিয়ে বলগা শক্ত করে হাতে বেঁধে দিলাম পড়ে গেলে যেন ভুটো বুঝতে পারে
অনেকক্ষণ চলার পর ভুটো শব্দ করে দাঁড়িয়ে গেল চেয়ে দেখি, একটি বড়ো বাড়ি একজন বৃদ্ধ মুসলমান হ্যারিকেন হাতে করে বাইরের দিকে আসছে আমাকে পোশাক পরা ঘোড়ার উপর দেখে হকচকিয়ে গেল বললাম, “মিঞা সাহেব, এটা কোন গ্রাম?”
বলল, “অতিথপুর, বারহাটা থানা
মোহনগঞ্জ থানা কতদূর?”
ক্রোশ ছয়েক হবে
সামনেই অতিথপুর রেল স্টেশনের সিগন্যাল লাইট দেখা গেল বললাম, “আমি মোহনগঞ্জ থানার ছোটো দারোগা বাংলা-ঘর আছে? রাত্রে থাকব
এই বলে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম ভুটো চুপচাপ দাঁড়িয়ে চোখ বুজল মিঞা সাহেব সেলাম জানিয়ে আমাকে বাংলা-ঘরে নিয়ে এল তারপর একটি চাদর নিয়ে এসে তক্তপোষের ওপর পেতে দিল বলল, “রাত্রি আর বিশেষ নেই আমি আজানের নমাজের জন্য মসজিদে যাই
এই বলে সে চলে গেল আমি চোখ বুজে একটু ঘুমোতে চেষ্টা করলাম ট্রেনের শব্দ শুনে বুঝলাম, ভোর চারটার ট্রেন মোহনগঞ্জ থেকে ছেড়ে এসে অতিথপুর পেরিয়ে গেল ট্রেনের মতো আমার মনের মধ্যে আজ রাতের অভিযানের সম্ভব অসম্ভব চিন্তারাশি হু হু করে প্রবেশ করে আবার ঐ ট্রেনের মতোই বেরিয়ে যেতে লাগল কাছেই মসজিদ থেকে আজানের সুউচ্চ রব ভেসে আসছিল এই বাড়িরই মালিক মিঞা সাহেব তার প্রাণের আবেগ তারস্বরে খোদাতাল্লার দরবারে পৌঁছে দিচ্ছে সেই স্বর অনুসরণ করে আমার মনও যেন চলল কোন এক অজানা লোকে
বিধুবাবু ও তাঁর স্ত্রী এসে গেছেন শাসনের ভঙ্গীতে বলছেন, “কত নিষেধ করলাম, শুনলে না এখন বুঝলে তো, বয়স্কদের কথা মানতে হয় সেই থানায় তো যেতে পারলে না কত কষ্ট পেলে তবে ভগবানের কৃপায় এ-যাত্রা রক্ষা পেয়ে গেছ তুমি যে অশরীরী আত্মার পাল্লায় পড়েছিলে, তোমার উপর যাঁর অনুগ্রহ আছে সে যে সেই আত্মার চেয়ে কত শক্তিশালী তার প্রমাণ হয়ে গেল
বিধুবাবুর স্ত্রী আমার শিয়রের কাছে বসেছিলেন বললেন, “এই একগুঁয়েমির ফল এই নিয়ে কতবার হল?”
বললাম, “এই তিনবার তিনবারই যমরাজার প্রাসাদের সিংহদ্বারে আমার অদ্ভুত পোশাক দেখে ঢুকতে দেয়নি
তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আমরা কেউ ঘুমোতে পারিনি, বুঝলে? তাই গরুর গাড়ি করে পেছন পেছন ছুটে এসেছি ভুটো তোমাকে নিয়ে সারারাত ঘুরেছে ও যে কিছুতেই রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিল না আমরা তোমাকে ধরতে না পারলেও আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষা তোমাকে স্পর্শ করেছিল
বিধুবাবু ও তার স্ত্রী চলে গেলেন আমি তাদের ভালোবাসার গভীরতা অনুভব করছি
ধ্যানমগ্ন রাত্রি ফিকে জ্যোৎস্নায় তার অঙ্গের শোভা বিকীর্ণ হচ্ছে সম্মুখে বিলের জলরাশি তাতে বহুযুগের পদ্ম ও অন্যান্য জলজ লতাগাছ প্রস্ফুটিত ফুল নিয়ে অপেক্ষা করছে ধ্যান শেষ হলেই অর্ঘ্য রচনা করবে কোথাও কোনও সাড়াশব্দ নেই আলেয়ার আলোর আরতি আমাকে পথ দেখাচ্ছে পাছে কেউ ধ্যান ভঙ্গ করে, তাই আমি অশ্বপৃষ্ঠে সমস্ত বিল পরিক্রমা করছি হঠাৎ আজানের দীর্ঘ নির্ঘোষে জানিয়ে দিল, ধ্যান শেষ এইবার ছুটি
বাইরে কাদের কথায় ঘুম ভেঙে গেল দেখি, দীর্ঘ পক্ব শ্মশ্রু বাড়ির মালিক আমার দিকে তাকিয়ে দেখছেন ঘুমের রেশ তখনও কাটেনি আমার যেন মনে হল, এই দরবেশই আমাকে সেই অশরীরী আত্মার প্রকোপ থেকে মুক্ত করে তাঁর বাড়ি এনে আশ্রয় দিয়েছেন দুইজন চৌকিদার এসে গেছে একজন ভুটোকে মাঠে নিয়ে গিয়ে কচি ঘাস খাওয়াচ্ছে আরেকজন হাতমুখ ধোবার জল নিয়ে এল চৌকিদারের থেকে জানলাম, বাড়ির মালিকের নাম আফসারুদ্দিন হাজী দুবার হজ করেছেন তবুও নিজে চাষাবাদে এখনও ছেলেদের সাহায্য করেন বড়ো গৃহস্থ এরূপ সৎলোক এ-তল্লাটে নেই
মুখ ধোওয়া শেষ হয়েছে দেখি, হাজী একটি ছেলেকে সঙ্গে করে তিন-চারটি পাত্র করে দুধ, মুড়ি, গুড় ইত্যাদি নিয়ে এসেছেন খেতে খেতে আমার মুখে নৈশ অভিযানের গল্প খুব মন দিয়ে শুনলেন বললেন, “দারোগা সাহেব, এরূপ কোনওদিন আর করবেন না এই বিলে প্রতি বৎসরই দুই-তিনটি দুর্ঘটনা হয় পুলিশ হলেও তো আপনাদের ভিতর মানুষের আত্মা রয়েছে আপনার অল্প বয়স...” – ইত্যাদি
আমি হাজী সাহেবকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালাম
ভুটোকে নিয়ে এল সারারাত্রির ধকল সে সামলে নিয়েছে এখন বেশ তাজা বুঝলাম, হাজী সাহেব ওকেও ভালো খাবার দিয়েছেন আমার কাছে এসে আমাকে আদর করল আমিও প্রতিদান সেরে উঠে বসলাম প্রায় দশটায় থানায় পৌঁছে গেলাম মোয়াজ্জম দেখেই বলে উঠল, “আমি জানি ঠাকুর, তুমি তেথুলিয়া গেলে আর আসতে চাও না
কথা শুনে আমার উত্তর দেবার প্রবৃত্তি হল না ভুটোকে ছেড়ে দিয়ে বাসায় চলে এলাম
_____

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী (১৯১৬২০০৬) স্বাধীনোত্তর ভারতে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন ১৯৬৩ সালে রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত Indian Police Medal ও ১৯৭২ সালে 25th Independence Anniversary Medal লাভ করেন ১৯৭৬ সালে অবসরগ্রহণের পর নিজের পুলিশ-জীবনের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করা শুরু করেন সেখান থেকে অংশবিশেষ এই প্রথম প্রকাশের জন্য দেওয়া বর্তমান আখ্যানটির স্থান পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশ) ময়মনসিংহ জেলার মোহনগঞ্জ থানা, কাল ১৯৪০সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

অলঙ্করণঃ রুমেলা দাস

গল্পঃ ম্যাঁওটা // শুভ্রা ভট্টাচার্য



ম্যাঁওটা

শুভ্রা ভট্টাচার্য


ম্যাঁও
ম্যাঁওটা আবার ডাকল, মা আমি একটু দেখব?”
খবরদার নিনি, তুমি এখান থেকে এক পাও নড়বে না চুপটি করে বসে খাও আমি যেন এসে দেখি তোমার খাওয়া হয়ে গেছেএই বলে মা হাত ধুতে রান্না ঘরের দিকে গেল
মুহূর্তের মধ্যে নিনি চেয়ার থেকে নেমে একবার রান্নাঘরে উঁকি মেরে দেখে নিল যে মা বাসন ধুচ্ছে এই সুযোগ হাতছাড়া করা চলে না মা ফিরে এলেই আর তাকে যেতে দেবে না সে দ্রুত ভাতের থালাটা হাতে নিয়ে বাগানের দিকে উঁকি দিল বেড়ালছানাটা বাগানের মধ্যে ইতস্তত ঘুরঘুর করছিল নিনি মুখে চুক চুক শব্দ করতেই ওর দিকে ঘুরে তাকাল তারপর আবার ম্যাঁও-মিঁউ করে কান্না জুড়ল
নিনি একদলা দুধ দিয়ে মাখা ভাত ওর সামনে দিল দুধের গন্ধ পেয়ে হামলে পড়ে ম্যাঁওটা কপ কপ করে সবটা ভাত খেয়ে নিয়েই আবার নিনির দিকে তাকিয়ে ম্যাঁও ধরল বাচ্চাটার খুব খিদে পেয়েছে বোঝাই যাচ্ছে নিনি একমুহূর্তও দেরি না করে আরও একটা ভাতের দলা ওর দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই বাচ্চাটা এমন করে দলাটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল যে ওর মাথা-নাকময় দুধে ভাতে মাখামাখি হয়ে গেল নিনি আর একটু হলেই হি হি করে হেসে ফেলছিল আর কী কোনওমতে মুখে হাতচাপা দিয়ে হাসিটা আটকাল এরপর সারাটা দিন মায়ের কাছে অনেক বকুনি খেল নিনি
আজ বাবার কাছে সব বলব তোমার দুষ্টুমির কথা তুমি দিন দিন ভীষণ অবাধ্য হয়ে উঠছ
মালতীমাসি শুনতে পেয়ে দৌড়ে আসে মালতীমাসি পাশেই বাবুদাদাদের বাড়িতে কাজ করে বয়সে অনেক বড়ো হলেও নিনির মাকে বৌদি বলেই ডাকে মাঝে মাঝেই মাসি তাদের বাড়ির গাছের গন্ধরাজ লেবুটা, লঙ্কাটা এনে দেয় নিনির মাকে মাও মালতীমাসিকে ভালোবেসে এটা সেটা দেয়
ব্যাপার-স্যাপার শুনে মাসি মাকে বলল, “ছাড়েন না, বৌদি! অতটুকুন মাইয়া ভুল কইরা ফ্যালছে অনেক বকলেন তো! আর বইকেন না দ্যাখেন তো বাচ্চা বিড়ালডারে কী সুন্দর সাদা রঙ ফট ফট করে খাওন দিয়া তো পুণ্যি করছে গো শুধুমুধু রাগ কইরেন না মাইয়াডার উপ্রে
মাসির কথায় মা একটু শান্ত হল শেষমেশ কিন্তু বাবা ফিরতেই নালিশ জমা পড়ল মজার ঘটনা হল, বেড়ালছানাটাকে বাবার খুব মনে ধরল ভালো লাগবে নাই বা কেন? অমন সুন্দর ধবধবে সাদা বেড়ালছানা দেখলে কার না মায়া হয়? কাজেই নিনির দিকের পাল্লা ভারী হল শেষপর্যন্ত মাকে রাজি করানো গেল ম্যাঁও হয়ে উঠল এ-বাড়ির নতুন সদস্য
ম্যাঁও এখন নিনির বেস্ট ফ্রেন্ড নিনি যা বলে ম্যাঁও শোনে, ম্যাঁও যা বলে নিনি শোনে
নিনি রোববারে সক্কাল সক্কাল ম্যাঁওকে নিয়ে পার্কে চলল মা তো রেগে কাঁই
তোমার পড়াশুনা নেই? ভুলে গেছ যে সামনের মাসেই তোমার অ্যানুয়াল এগজাম?”
কিন্তু মা, ম্যাঁও তো বলেছে আজকে না পড়তে তাই তো আমরা পার্কে যাচ্ছি
মা তক্ষুনি বাবাকে নালিশ করল, “শুনলে তোমার মেয়ের কথা? তার বেড়াল তাকে পড়তে মানা করেছেন, তাই মহারানি পার্কে বেড়াতে যাচ্ছেন
শুনে বাবা তো হেসেই খুন

একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টসে নিনি একশো মিটার দৌড়ে নাম দিয়েছে স্পোর্টসের দিন সকালে নিনি লাল গেঞ্জি, ট্রাউজারস পরে মাঠের জন্য রেডি মা ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করে নতুন লাল রঙের স্পোর্টস শু রেডি করে রেখেছিলেন নিনির জন্য বেরনোর সময় সেটা পরতে গিয়ে দেখে ম্যাঁও ওটার ওপর অ্যা করে রেখেছে নিনির তো কাঁদোকাঁদো দশা
তুই আর পটি করার জায়গা পাসনি? আমার জুতোটার ওপরেই করে দিলি? এখন আমি কী পরব?”
শেষ অবধি গজগজ করতে করতে সেই পুরনো নীল জুতোটাই খুঁজে বের করল মা
দৌড়ে থার্ড হল নিনি ফার্স্ট হতে না পারার একরাশ দুঃখ নিয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের মুখে যে বিরাট লম্বা বক্তৃতাটা সে হাঁ হয়ে শুনল তার সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় যে, নিনিরা মাঠে চলে যাওয়ার পর মা লাল জুতোটা ধুতে গিয়ে দেখে ডান পায়ের জুতোটার মধ্যে একটা বিষাক্ত তেঁতুলবিছে জলের স্রোতে সুড়সুড়িয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে কাজেই নিনি যদি সেই জুতো না দেখে পরত তাহলে একটা বড়োরকম বিপদ হত আজকে
এরপর থেকে মা আর ম্যাঁওকে বকে না কিন্তু নিনি বকা খায় সারাক্ষণ দুষ্টুমি করার জন্য নিনির এখন ক্লাস ফাইভ স্পোর্টসে ফার্স্ট হতে না পারলেও সে ক্লাস ফোরের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে দেখিয়েছে এখন তার পড়াশুনার বিরাট চাপ সারাদিনে মাত্র দু-তিন ঘণ্টা ছাড়া আর সময়েই পায় না ম্যাঁওয়ের সাথে গল্পটল্প করার ম্যাঁওটাও এখন বেশ বড়সড় নাদুসনুদুস দেখতে হয়েছে সেও বিশেষ পাত্তাটাত্তা দেয় না নিনিকে বেশিরভাগ সময়েই সে লেজ ফুলিয়ে গম্ভীরপানা মুখ করে নিনির পড়ার টেবিলে শুয়ে থাকে কখনও আবার নিনি স্কুলের জন্য ইস্ত্রি করে রাখা জামাটা খুঁজতে গিয়ে দেখে সেটা গায়ে জড়িয়ে ম্যাঁও বাঙ্কের এ-মাথা থেকে ও-মাথা অবধি দিব্যি ক্যাট-ওয়াক প্র্যাকটিস করছে
দেখতে দেখতে ক্লাস ফাইভের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা এসে গেল পরীক্ষার একমাস আগে থেকে টিচাররা প্রত্যেক দিন একেকটা সাবজেক্টের ওপর ক্লাস টেস্ট নিচ্ছেন মাও এখন নিয়মিত দুবেলা সময় দিয়ে নিনিকে সমস্ত পড়া করিয়ে দিচ্ছেন আগামীকাল ইংলিশ ক্লাস টেস্ট নিনিকে যেহেতু ইংলিশ অনেকবার পড়ানো হয়ে গেছে তাই মা ওকে নিয়ে অঙ্ক করাতে বসল আর তক্ষুনি নিনি কোলবালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ল ওর অঙ্ক করতে ভালো লাগছে না, ইংলিশই পড়বে মা ওকে জোর করে তুলে বসিয়ে কিছু অঙ্ক করতে দিয়ে ম্যাগি বানাতে গেল রান্নাঘরে সেই তালে নিনি ম্যাঁওকে ডেকে নিয়ে বসাল ওর পাশে ম্যাঁও গম্ভীর পদক্ষেপে এসে অঙ্কের বইয়ের গুণিতকের পাতার উপর বেশ গুছিয়ে বসল ওর নিচে চাপা পড়ে গেল ইংলিশ টেক্সট বুকটা
এদিকে মা ম্যাগি বানিয়ে এসে পড়ল বলে কিন্তু ম্যাঁওকে কিছুতেই অঙ্কের পাতা থেকে সরানো যায় না সে তখন চার পা ছড়িয়ে অঙ্কের বইয়ের উপর শুয়ে মা এসে এই কাণ্ড দেখে হেসেই অস্থির
বেশ হয়েছে এই বেলা আমাকে কয়েকটা গুণিতকের অঙ্ক করে দেখাও তো
নিনি তো হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে বসল
মা বোঝালো, “দেখো নিনি, তুমি তো সবসময় ম্যাঁওয়ের কথা শোনো তুমিই তো বলো যে ম্যাঁও সব ঠিক বলে দেখো, ম্যাঁও-ও চাইছে যে তুমি এখন অঙ্ক করো তুমি ম্যাঁওয়ের কথা শুনবে না?”
নিনি বুঝল, আর তার কোনও যুক্তি খাটবে না সে বেশ বিপাকেই পড়েছে অতএব চোখের জল মুছে মনে মনেম্যাঁও তোর মজা দেখাচ্ছি, দাঁড়াবলে বাধ্য মেয়ের মতো অঙ্ক কষতে বসল
পরদিন স্কুলে দারুণ মজার ব্যাপার ঘটল ইংলিশ টিচার হঠাৎ অ্যাবসেন্ট হয়ে গেলেন পরিবর্তে সেই ক্লাসে অঙ্কের টিচার চলে এসে সারপ্রাইজ ম্যাথস টেস্ট নিলেন নিনির বন্ধুরা কেউই অঙ্কের জন্য প্রস্তুত ছিল না উপরন্তু টিচার বেশি করে গুণিতকের প্রশ্নমালার অঙ্কগুলোই করতে দিলেন সে তো সব উত্তর দিতে পারল টিচার নিনির খাতার উপরভেরি গুড গার্ললিখে দিলেন নিনি বাড়িতে ফিরে ম্যাঁওকে জড়িয়ে ধরে নাচতে আরম্ভ করল

হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা খুব ভালো হওয়ায় বাবা-মা ঠিক করল, পুজোর ছুটিতে তারা নিনিকে নিয়ে গ্যাংটক যাবে কিন্তু মুশকিল হল ম্যাঁওকে নিয়ে
ম্যাঁও কেন আমাদের সাথে যেতে পারবে না, বাবা? তুমি ওর জন্য টিকিট কাটোনি?”
টিকিট কাটলেও ম্যাঁও আমাদের সাথে গ্যাংটক যেতে পারবে না, সোনা কারণ, গ্যাংটকে বরফ পড়ে ম্যাঁওয়ের ঠাণ্ডা লেগে যাবে
আমরা ম্যাঁওকে সোয়েটার পরিয়ে নিয়ে যাব
তবুও ম্যাঁওয়ের বরফ সহ্য হবে না ম্যাঁও ঠাণ্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়বে
নিনি গ্যাঁট হয়ে বসে রইল ম্যাঁওকে না নিয়ে সে কিছুতেই যাবে না আর তাছাড়া ম্যাঁও আমাদের সঙ্গে না গেলে এখানে একা থাকবে কী করে? ম্যাঁওকে খেতে দেবে কে?
ফোন করা হল নিনির সব বন্ধুবান্ধবদের কিন্তু তাতে কোনও সুবিধে হল না কারও বাড়িতে কুকুর রয়েছে তো কারও বাড়িতে পাখি কেউ জিজ্ঞেস করে, “নিনি, তোর ম্যাঁও গিনিপিগ খায় না তো?” তো কেউ বলে, “না বাবা, না, আমার বাড়িতে অ্যাকোয়ারিয়াম-ভর্তি মাছইত্যাদি আত্মীয়স্বজন আর পাড়াপ্রতিবেশীদের মধ্যে হঠাৎ বেড়ালে অ্যালার্জিটা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ল অনেক অনুনয় বিনয়ের পর পাশের বাড়ির বাবুদাদাদের বাড়িতেই ম্যাঁওকে রাখার একটা বন্দোবস্ত করা গেল মালতীমাসিই বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাঙাপিসিকে রাজি করাল
এদিকে গ্যাংটকে ঘুরতে গিয়েও নিনির মন পড়ে রইল কলকাতায় ম্যাঁও এখন কী করছে? ঠিকমতো খাচ্ছে কি না? এইসব প্রশ্নে প্রশ্নে বাবার ফোনের বিল বাড়তে থাকল কেনাকাটায় তার আর মন নেই ফেরার দিন নিনি অস্থির হয়ে যায়, কতক্ষণে তারা কলকাতায় ল্যান্ড করবে

বাড়ি ফিরে দেখে সে এক হুলুস্থুলু কাণ্ড রাঙাপিসি লাঠি নিয়ে তাড়া করেছে ম্যাঁওকে ম্যাঁওয়ের পায়ে চোট লেগেছে বলে সে বেচারি কোনওমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে লাঠির ঘা থেকে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে শত বকা খেয়েও যে বেড়াল মুখে দুয়েকটাম্যাঁও-মিঁউছাড়া আর কোনও রা করেনি, সে আজকে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে মা-বাবা ছুটে গেল তাকে বাঁচাতে  রাঙাপিসির তখন সে কী প্রচণ্ড রাগ! নিনিরা ঠিক সময়ে না পৌঁছলে বেড়ালটাকে বোধহয় মেরেই ফেলত ইতিমধ্যে মালতীমাসিও চলে এসেছে সবাই মিলে কোনওক্রমে তাকে নিরস্ত করে কী ঘটেছে জানতে চাইল
এমন কী করেছে ও যে এভাবে মারতে হল?” মা জানতে চাইল
রাঙাপিসির জবাব শুনে তো সবাই থ রান্নাঘরে গিয়ে দেখাল, মেঝেতে ছত্রখান হয়ে গড়াগড়ি খাওয়া মাছের ঝোলের বাটি, মাংস-ডাল-তরকারি মায় ভাতের হাঁড়িটা অবধি ম্যাঁও নাকি এই কাণ্ড করেছে আজ সন্ধ্যায় রাঙাপিসির ছেলে আর বৌমা ফিরছে লন্ডন থেকে তাই রাঙাপিসি দশ-বারো পদ রান্না করিয়েছেন বাড়ির রান্নার বউকে দিয়ে সমস্ত গুছিয়ে রেখে উনি লুচির জন্য উপকরণ কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন আর তাড়াহুড়োয় রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন ঘরে ফিরে দেখেন ম্যাঁও রান্নাঘরের খাবার খেয়ে সমস্ত ফেলে দিয়ে একাকার কাণ্ড করে ছেড়েছে এই বলে রাঙাপিসি হায় হায় করতে আরম্ভ করল
ম্যাঁও এরকম ঘটনা কখনও ঘটায়নি নিনির মা-বাবা অত্যন্ত অপমানিত হয়ে নিনি আর ম্যাঁওকে নিয়ে ঘরে ফিরে এল নিনি তো একটানা কেঁদেই চলেছে ম্যাঁওকে যেভাবে মারা হয়েছে তাতে ওর আর উঠে দাঁড়াবার মতো গায়ের জোর পর্যন্ত নেই অনেকক্ষণ একভাবে কোঁকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে কেবল ওরা তড়িঘড়ি ওকে নিয়ে ভেটেরিনারি হাসপাতালে ছুটল
নিনির মা কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজি নয় যে ম্যাঁও এরকম একটা কাণ্ড ঘটিয়েছে রাঙাদি নিশ্চয়ই ম্যাঁওকে ঠিকঠাক খেতে-টেতে দিত না তাই বেচারি খিদের চোটে এই কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে নাহলে নিনিদের বাড়িতে এত বছরে একদিনও ম্যাঁও রান্নাঘর থেকে কিচ্ছুটি চুরি করেনি তো! কিন্তু তাই বলে একটা অবলা জীবকে এভাবে মারবে? আপন খেয়ালেই নিনির মায়ের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “ছিঃ!”
ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালেন শুধু মারেনি, সাথে কিছু খাইয়েছেও চিকিৎসায় ম্যাঁও কিছুতেই সাড়া দিচ্ছে না ওর পেট ওয়াশ করে দেখতে হবে কী গেছে পেটে নিনির বাবা তো প্রচণ্ড ক্ষেপে গেছে নিনির মা বলল, এসব কথা যেন নিনি কোনওভাবেই জানতে না পারে
ঠিক তক্ষুনি বাবার একটা ফোন এল ফোনের ওপাশের কথা শুনতে শুনতে চোয়াল কঠিন হচ্ছিল তার মা জানতে চাইলে বলল, “আমরা চলে আসার পর মালতীদি এঁটো খাবারগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিতে গিয়েছিল ফেলার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা রাস্তার কুকুর হামলে পড়ে খাবারগুলো খাচ্ছিল আর সেসব খেয়ে কুকুরগুলো ওখানেই শুয়ে পড়ে মালতীদি তক্ষুনি সেই খবর জানায় রাঙাদিকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে ওদের রান্নার বৌটাকে ও স্বীকার করেছে যে ও-ই নাকি কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রেখেছিল সব খাবারের মধ্যে বিদেশ থেকে ছেলে আসছে, তাই আজ রাতেই সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে বড়োরকম দাঁও মারার তালে ছিল
ম্যাঁওয়ের পেট ওয়াশ করা হয়েছে নিনিরা ঘরে এসে দেখে, ম্যাঁও রানির মতো ঘুমিয়ে রয়েছে ওটির বেডে ওর শরীরের ধবধবে সাদা লোমগুলো ফ্যানের হাওয়ায় ফুরফুর করছে
ম্যাঁও তাকাচ্ছে না কেন? ও কি ঘুমোচ্ছে, মা? আমরা ওকে কখন বাড়ি নিয়ে যাব?”
মা সস্নেহে হাত বোলাল ম্যাঁওয়ের শরীরে বলল, “হ্যাঁ সোনা, ম্যাঁও ঘুমোচ্ছে ওর খুব অভিমান হয়েছে তো আমাদের উপর, তাই চোখ খুলছে না ওকে আর ডেকো না ঘুমোতে দাও
_____
অলঙ্করণঃ দীপিকা মজুমদার