ধারাবাহিকঃ কুরুপাণ্ডব কথা // মৈত্রেয় মিত্র




প্রথম পর্ব


ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর বিবাহ

মহাত্মা ভীষ্ম তাঁর তিন ভাইপো - ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং বিদুরকে নিজের পুত্রের মতোই প্রতিপালন করেছিলেন উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ করে তাঁদের বাল্য অবস্থা থেকেই লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন পরিশ্রম ও ব্যায়ামে তাঁদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করেছিলেন তাঁরা একটু বড়ো হলে ধনুর্বেদ, গদাযুদ্ধ, অসিযুদ্ধ, গজশিক্ষা, নীতিশাস্ত্র, ইতিহাস, পুরাণ, বেদাঙ্গ সমস্ত বিষয়েই দক্ষ এবং কুশল হয়ে উঠেছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে ধৃতরাষ্ট্র অসাধারণ শক্তিশালী ছিলেন পাণ্ডু ছিলেন ধনুর্বিদ্যায় অতুলনীয় দক্ষ আর বিদুর ছিলেন ধার্মিক সেই সময় তাঁর মতো জ্ঞানী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ভূ-ভারতে অন্য কেউ ছিল না মহারাজ শান্তনুর পুত্র বিচিত্রবীর্য যুবক অবস্থাতেই মারা যাওয়ার ফলে কুরুবংশ প্রায় বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হয়েছিল এই তিন পুত্রের কৃতিত্বে কুরুবংশের সম্মান ও গৌরব যেন নতুন করে ফিরে এল সেই সময় সমস্ত দেশের মধ্যে কুরুজাঙ্গল, সমস্ত ধার্মিকের মধ্যে বিদুর এবং সমস্ত নগরের মধ্যে হস্তিনাপুরই শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছিল
ভাই বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর মহামতি ভীষ্ম এতদিন রাজ্যের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন এখন তাঁর ভাইপোরা উপযুক্ত হয়ে ওঠায় তিনি পাণ্ডুকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করলেন সাধারণত পিতার সিংহাসনের অধিকার হয় জ্যেষ্ঠ পুত্রের ধৃতরাষ্ট্র তিন ভাইয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ, কিন্তু তিনি জন্ম থেকেই অন্ধ ছিলেন তাই তিনি রাজা হতে পারলেন না
রাজ্যের দায়িত্ব মহারাজ পাণ্ডুর হাতে তুলে দিয়ে মহাত্মা ভীষ্ম এবার ভাইপোদের বিয়ের আয়োজনে মন দিলেন পরমাসুন্দরী, সুলক্ষণা এবং কুরুবংশের উপযুক্তা কন্যার জন্যে তিনি দেশ-দেশান্তরে ব্রাহ্মণদূত পাঠালেন কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সংবাদ পেলেন, গান্ধাররাজ সুবলের অতীব সুন্দরী, সুলক্ষণা এক কন্যা আছেন ভগবান শঙ্করের আরাধনায় তিনি শতপুত্রের জননী হবার আশীর্বাদ পেয়েছেন মহামতি ভীষ্ম দেরি না করে রাজা সুবলের কাছে সেই কন্যাকে বধূরূপে প্রার্থনা করে ব্রাহ্মণদূত পাঠালেন মহারাজ সুবল প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন, কারণ পাত্র ধৃতরাষ্ট্র জন্ম থেকেই অন্ধ কিন্তু পরে বংশমর্যাদা, খ্যাতি এবং ধৃতরাষ্ট্রের সংযত ব্যবহারের কথা চিন্তা করে তিনি কন্যাদান করতে রাজি হলেন গান্ধার রাজকন্যা গান্ধারী যখনই শুনলেন তাঁর পিতামাতা তাঁকে অন্ধ পাত্রে সম্প্রদান করতে রাজি হয়েছেন, তিনি মোটা বস্ত্রখণ্ডে নিজের সুন্দর দুই নয়ন ঢেকে ফেললেন তিনি সংকল্প করলেন, পতি অন্ধ বলে তাঁর প্রতি মনে কখনওই যেন অশ্রদ্ধা কিংবা বিরক্তি না আসে
গান্ধাররাজের পুত্র সুলক্ষণা, সুন্দরী বোনকে সঙ্গে নিয়ে কৌরব রাজধানীতে এলেন তারপর মহাত্মা ভীষ্মের অনুমতি নিয়ে শুভলগ্নে ধৃতরাষ্ট্রের হাতে তাঁকে সম্প্রদান করলেন বিয়ের সকল অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর তিনি ভীষ্মের কাছে সসম্মান বিদায় নিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে গেলেন সুশীলা গান্ধারী তাঁর সদ্ব্যবহার দিয়ে ধীরে ধীরে কৌরবদের মন জয় করতে লাগলেন তিনি সর্বদা গুরুজনের সেবা করতেন, সকলের সঙ্গে মিষ্ট কথা বলতেন এবং কখনও কারও নিন্দা বা সমালোচনা করতেন না


কুন্তীর আশ্চর্য ছোটোবেলা

যদুবংশের রাজা শূর ছিলেন বসুদেবের পিতা প্রথমে তাঁর এক পরমাসুন্দরী কন্যা হয়, তাঁর নাম পৃথা রাজা শূরের পিসতুতো ভাই ও পরমমিত্র রাজা কুন্তিভোজ সন্তানহীন ছিলেন রাজা শূর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তাঁর প্রথম সন্তান রাজা কুন্তিভোজকে দান করবেন কন্যা হওয়ার পর নিজের সন্তানস্নেহ সংযত করে রাজা কুন্তিভোজের কোলে তিনি পৃথাকে সমর্পণ করলেন এবং রাজা কুন্তিভোজও কন্যারত্ন পেয়ে মহা আনন্দে নিজ সন্তানের মতোই তাঁকে পরম স্নেহে লালনপালন করতে লাগলেন রাজা কুন্তিভোজের পালিতা কন্যা বলে সকলে তাঁকে কুন্তী বলেও ডাকতেন কুন্তী বালিকা বয়স থেকেই রূপে এবং গুণে সকলকেই মুগ্ধ করে রাখতেন ব্রাহ্মণ এবং গুরুজন সেবায় তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাবতী ছিলেন
একবার মহাতেজা তপস্বী মুনি দুর্বাসা রাজা কুন্তিভোজের ভবনে অতিথি হয়ে এলেন কুন্তীর পরম যত্নে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে এক মহামন্ত্র বর দিয়ে বললেন, “বৎসে, আমি তোমার সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে এই মহামন্ত্র বর দিলাম এই মন্ত্র উচ্চারণ করে যে দেবতাকেই তুমি ডাকবে, তাঁর আশীর্বাদে তুমি সেই দেবতার মতো তেজস্বী পুত্র লাভ করবে
মুনি চলে যাওয়ার পর বালিকা কুন্তী ছেলেমানুষী কৌতূহলে মহামন্ত্র উচ্চারণ করে সূর্যদেবকে ডাকলেন সূর্যদেব সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত হলেন বললেন, “তোমার ডাক শুনে আমি এসেছি, কন্যা এখন কী করতে হবে বলো
কুন্তী খুব আশ্চর্য হয়ে করজোড়ে বললেন, “হে ভগবন, মুনি দুর্বাসা আমাকে এই মহামন্ত্র বর দিয়েছেন এই মন্ত্রের শক্তি পরীক্ষার জন্যে আমি আপনাকে ডেকে ফেলেছি আমার অপরাধ হয়েছে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন
ভগবান সূর্য বললেন, “হে কন্যা, মুনি দুর্বাসা তোমাকে যে মহামন্ত্র দিয়েছেন সেকথা আমি জানি তোমার আহ্বানেই আমি এসেছি অতএব আমার কর্তব্য আমাকে করতেই হবে শান্ত হও, নির্ভয় হও দুশ্চিন্তা করো না
সূর্যদেবের প্রসাদে কুন্তী সূর্যের মতোই তেজস্বী, কবচকুণ্ডলধারী, রূপবান এক পুত্র লাভ করলেন কুন্তী কোলে শিশুপুত্রকে নিয়ে ভাবতে বসলেন, ‘এখন কী করি? এই পুত্রের কথা কি সকলকে বলব, নাকি গোপন করব?’ অনেক চিন্তাভাবনা করে নিজের দোষ গোপন করার জন্যে তিনি পুত্রকে বিসর্জন দেওয়াই স্থির করলেন সদ্যোজাত শিশুকে তিনি নদীর জলে ভাসিয়ে দিলেন কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সেই শিশুকে জল থেকে উদ্ধার করলেন রাধার স্বামী সূত অধিরথ ওই দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন তাঁরা সদ্যোজাত সুন্দর শিশুকে নিজের পুত্রের মতোই লালনপালন করতে লাগলেন পুত্রের নাম রাখলেন বসুষেন


কুন্তী ও পাণ্ডুর বিবাহ

রাজা কুন্তিভোজের ভবনে কল্যাণী কুন্তী যখন বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠলেন, নানান দেশের রাজারা তাঁকে বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন কার হাতে কন্যাকে সম্প্রদান করা উচিত স্থির করতে না পেরে রাজা কুন্তিভোজ স্বয়ংবর সভার আয়োজন করলেন স্বয়ংবর সভায় সকল রাজাদের আমন্ত্রণ করা হত সভায় উপস্থিত রাজাদের পরিচয়, কৃতিত্ব এবং গুণের বর্ণনা দিতেন সেই রাজ্যের রাজদূতেরা তাঁদের কথা শুনে রাজাদের নিজের চোখে দেখে কন্যা যাঁর গলায় বরমাল্য পরাতেন, তাঁর সঙ্গেই কন্যার বিবাহ হত কুন্তী স্বয়ংবর সভায় ভরতবংশ শ্রেষ্ঠ মহারাজ পাণ্ডুকে বরণ করলেন; তাঁর গলায় বরমাল্য পরিয়ে দিলেন কুন্তী মহারাজ পাণ্ডুকে বরণ করে নেওয়াতে অন্যান্য রাজারা সকলে নিজ নিজ রথে চড়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে গেলেন স্বয়ংবর সভায় কুন্তীর পাশে মহারাজ পাণ্ডুকে পত্নী শচীর সঙ্গে দেবরাজ ইন্দ্রের মতো মনে হচ্ছিল
রাজা কুন্তিভোজ বেদের বিধান অনুসারে শুভ লগ্নে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন নতুন দম্পতিকে প্রচুর যৌতুক এবং আশীর্বাদ দিয়ে কন্যাকে হস্তিনানগরে পাঠালেন মহারাজ পাণ্ডু সকল গুরুজনের, মহর্ষিদের এবং ব্রাহ্মণদের আশীর্বাদ নিয়ে সস্ত্রীক নিজের ভবনে প্রবেশ করলেন

মাদ্রী ও পাণ্ডুর বিবাহ

এরপর মহাত্মা ভীষ্ম মহারাজ পাণ্ডুর আরেকটি বিয়ে দেওয়া স্থির করলেন তিনি নিজেই প্রধান অমাত্য, মহর্ষি এবং ব্রাহ্মণদের নিয়ে মদ্রদেশে গেলেন মদ্ররাজ শল্য মহাত্মা ভীষ্মের আসার কথা শুনেই অভ্যর্থনা করে সম্মানের সঙ্গে তাঁকে প্রাসাদে নিয়ে গেলেন সাধারণ কুশল বিনিময়ের পর মহাত্মা ভীষ্ম জিজ্ঞেস করলেন, “হে মদ্ররাজ, শুনেছি আপনার মাদ্রী নামে এক পরম রূপসী বোন আছে আমার ভাইপো রাজা পাণ্ডুর সঙ্গে আপনার বোনের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আমি এসেছি
মদ্ররাজ বিনীতভাবে বললেন, “হে মহাত্মন, আমার বোন আপনাদের বংশে যাবে এ যেমন তার সৌভাগ্য, তেমনই আমার কিন্তু আমাদের বংশে একটি নিয়ম প্রচলিত আছে, সে আপনি নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সে নিয়ম ভালো কি মন্দ আমি বিচার করতে পারব না, কিন্তু আপনাকেও সেই নিয়ম পালন করতে হবে
মহাত্মা ভীষ্ম বললেন, “স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মা কন্যাশুল্কের বিধান করে গেছেন আপনি চিন্তা করবেন না আপনাদের কুলধর্ম আমরা পালন করব
এই কথা বলে মহামতি ভীষ্ম মদ্ররাজ শল্যকে রথ, গজ, অশ্ব, মূল্যবান বসন, অলঙ্কার, মণি, রত্ন, মুক্তা, প্রবাল প্রভৃতি কন্যাশুল্ক হিসেবে দান করলেন মদ্ররাজ সন্তুষ্ট হয়ে সালঙ্কারা ভগিনীকে মহাত্মা ভীষ্মের হাতে সমর্পণ করলেন
হস্তিনানগরে এসে মহামতি ভীষ্ম মাদ্রীকে রাজভবনে রেখে দিলেন তারপর শুভ দিন ও লগ্ন দেখে মহারাজ পাণ্ডুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করলেন কুন্তী ও মাদ্রী দুই সখীর মতোই মহারাজ পাণ্ডুর সঙ্গে সুখে দিন কাটাতে লাগলেন
কিছুদিন পরে মহামতি ভীষ্ম মহীপতি দেবকের পরমাসুন্দরী কন্যার সঙ্গে বিদুরেরও বিবাহ সম্পন্ন করলেন

পাণ্ডুর দিগ্বিজয়

বিয়ের তেরোদিন পর মহারাজ পাণ্ডু গুরুজনের অনুমতি নিয়ে দিগ্বিজয়ে বের হলেন অশ্ব, হাতি, রথ ও পদাতিকএই চতুরঙ্গ সৈন্য নিয়ে প্রথমেই তিনি দশার্ণদেশ আক্রমণ করে সেখানকার রাজাকে পরাজিত করলেন সেখান থেকে গেলেন মগধ মগধের রাজাকে সংহার করে সেখান থেকে গেলেন মিথিলা মিথিলায় বিদেহদের পরাস্ত করে তাঁদের নিজের বশীভূত করলেন তারপর একে একে কাশী, সুহ্ম, পুণ্ড্র প্রভৃতি রাজ্য জয় করে সে সকল রাজ্যের রাজাদেরও বশীভূত করলেন এইভাবে বিশাল এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে তিনি যখন হস্তিনানগরে ফিরলেন তখন তাঁর জয় করে আনা বিপুল সম্পদ - ধন, রত্ন, অজস্র গরু, মহিষ, ঘোড়া, উট, গজের বহর দেখে রাজ্যবাসী আশ্চর্য হয়ে গেল রাজসিংহ শান্তনু এবং ধীমান্ভরতবংশের উজ্জ্বল গৌরব মাঝে কিছুদিন ম্লান হয়েছিল মহারাজ পাণ্ডুর বীর্যে সেই গৌরব আবার ফিরে এল রাজ্যবাসীর আনন্দের সীমা রইল না ভীষ্ম আলিঙ্গন করে আনন্দের অশ্রুতে ভিজিয়ে দিলেন ভাইপো পাণ্ডুকে


পাণ্ডুর বনবিহার

দিগ্বিজয়ের পর বিশ্রামের জন্যে মহারাজ পাণ্ডু দুই পত্নীকে নিয়ে বনে চলে গেলেন সেখানে মৃগয়া করে তাঁরা সুখে দিন কাটাতে লাগলেন কখনও হিমালয়ের দক্ষিণ উপত্যকায়, পাহাড়ের চূড়ায়, কখনও গভীর শালবনে বাস করলেন তাঁর হাতে খড়্গ, ধনুর্বাণ, শরীরে বিচিত্র কবচ আর সঙ্গে দুই পরম কল্যাণী পত্নী তাঁদের দেখে বনবাসীরা দেবতার মতো পুজো করত
একদিন বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে মহারাজ পাণ্ডু এক মৃগ ও মৃগীকে খেলা করতে দেখলেন তিনি তাদের দেখেই পাঁচটি তির ছুড়ে দুজনকেই আহত করলেন ওই মৃগ কোনও সাধারণ হরিণ নয়, তিনি ছিলেন মহাতেজা ঋষিপুত্র পত্নীর সঙ্গে খেলা করার আনন্দে হরিণের রূপ নিয়েছিলেন মহারাজ পাণ্ডুর বজ্রের মতো কঠোর তিরের আঘাতে ঋষিতনয় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বললেন, “হে মহারাজ, আপনি অত্যন্ত ধার্মিক বংশে জন্মেও এমন নির্বোধ এবং পাপের কাজ কী করে করলেন?”
মহারাজ পাণ্ডু বললেন, “রাজাদের শত্রুবধ করাও যেমন কর্তব্য, মৃগয়ায় এসে মৃগ বধ করাও তেমনই কর্তব্য
মৃগরূপী ঋষিতনয় বললেন, “হে মহারাজ, আপনি ঠিকই বলেছেন কিন্তু আমি মৃগ নই, ব্রাহ্মণ আমার নাম মুনি কিন্দম আমি খেলার ছলে মৃগের রূপ ধরেছিলাম আমাকে ব্রাহ্মণ না জেনে আপনি তির ছুড়েছেন, তার জন্যে আপনার ব্রহ্মহত্যার পাপ হবে না কিন্তু পত্নীর সঙ্গে আনন্দের সময় আপনি আমাকে অকারণ বধ করাতে, আপনার ঘোর পাপ হয়েছে সেই ফল আপনাকে ভোগ করতেই হবে আপনারও পত্নীর সঙ্গে আনন্দের সময়ই মৃত্যু হবে
মহারাজ পাণ্ডুকে এই ভয়ংকর শাপ দিয়ে মুনিতনয় কিন্দম মারা গেলেন
মুনি কিন্দমের অভিশাপে মহারাজ পাণ্ডু বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন তিনি অনুশোচনা করতে করতে চিন্তা করলেন - শক্তি, ধনসম্পদ, রাজ্যের অধিকার, মহৎ বংশ সবকিছু থাকা সত্ত্বেও আমি নিজের কর্মদোষে ভয়ংকর দুরবস্থায় পড়লাম বনে বনে মৃগয়া করার দুর্বুদ্ধি থেকেই আমার এমন পরিণতি হল সবকিছু থাকা সত্ত্বেও সন্তানহীন জীবনের মূল্য কী? তিনি স্থির করলেন, সংসার ত্যাগ করে কঠোর তপস্যা করবেন পত্নী এবং অন্যান্য বন্ধুদের ছেড়ে একা একাই ঋষিদের আশ্রমে ঘুরে বেড়াবেন তিনি বাণপ্রস্থ গ্রহণ করবেন
মহারাজ পাণ্ডু দুই পত্নীকে বললেন, “তোমরা হস্তিনানগরে ফিরে যাও সেখানে মাতা অম্বালিকা, পিতামহী সত্যবতী, জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্ম, বিদুর এবং দাদা ধৃতরাষ্ট্রকে বলবে, পাণ্ডু রাজ্য ত্যাগ করে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেছেন, আর গৃহে ফিরবেন না
মহারাজ পাণ্ডুর কথায় কুন্তী ও মাদ্রী বললেন, “মহারাজ, সন্ন্যাস-আশ্রম ছাড়াও অনেক আশ্রম আছে যেখানে পত্নীদের সঙ্গে থেকেও তপস্যা করা যায় আপনি আমাদের সঙ্গে থেকে সংযত মনে তপস্যা করুন আমরাও আপনার সঙ্গে তপস্যা করে মৃত্যুর পর স্বর্গমোক্ষ পেতে চাই আপনি যদি তা না করে আমাদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন, তাহলে আমরা এখনই প্রাণ ত্যাগ করব
অগত্যা মহারাজ পাণ্ডু দুই পত্নীকে নিয়েই বাণপ্রস্থ গ্রহণের সিদ্ধান্ত করলেন তিনি, কুন্তী ও মাদ্রী তাঁদের সকল অলঙ্কার, মূল্যবান বসন, স্বর্ণমুদ্রা এবং যা কিছু সঙ্গে ছিল সব ব্রাহ্মণদের দান করে বললেন, “আপনারা হস্তিনানগরে গিয়ে বলবেন, পাণ্ডু সস্ত্রীক প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছেন তাঁরা কোনওদিন আর নগরে ফিরবেন না
এরপর তাঁরা এক অরণ্য থেকে অন্য অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে গন্ধমাদন থেকে ইন্দ্রদ্যুম্ন সরোবর, সেখান থেকে হংসকূট পার হয়ে শতশৃঙ্গ পাহাড়ে গিয়ে ঘোর তপস্যা আরম্ভ করলেন শতশৃঙ্গবাসী সিদ্ধচারণেরা তাঁকে কেউ পরম বন্ধু, কেউ নিজের ভাই, কেউ বা নিজের সন্তানের মতো মনে করতেন মহারাজ পাণ্ডু সেই স্থানে দীর্ঘ তপস্যা করে সকল পাপমুক্ত হলেন এবং মহাতেজা ব্রহ্মর্ষির মতো হয়ে উঠলেন
একবার শতশৃঙ্গবাসী সিদ্ধ মহর্ষিরা ভগবান ব্রহ্মাকে দেখার জন্যে ব্রহ্মলোকে যাচ্ছিলেন মহারাজ পাণ্ডু তাঁদের বললেন, “হে মহর্ষি, আপনারা সকলে কোথায় চলেছেন?”
মহর্ষিরা বললেন, “আমরা ব্রহ্মলোকে যাচ্ছি আজ অমাবস্যা তিথিতে সেখানে সকল দেবতা, ঋষি এবং পিতৃগণের সমাবেশ হবে আমরা সেখানে যাচ্ছি পিতামহ ব্রহ্মাকে দেখার জন্যে
মহারাজ পাণ্ডু সঙ্গে সঙ্গে দুই পত্নীকে সঙ্গে নিয়ে ব্রহ্মলোকে যাবার জন্যে মহর্ষিদের সঙ্গ নিলেন মহর্ষিরা তাঁকে সঙ্গে আসতে দেখে বললেন, “বৎস পাণ্ডু, আমরা সামনের এই পর্বতশ্রেণী পার হয়ে ক্রমাগত উত্তরদিকে যাব সেই পথ অত্যন্ত দুর্গম, বন্ধুর এবং কষ্টসাধ্য সেই পথের কোথাও দেবতা, গন্ধর্ব, অপ্সরাদের উপবন আছে কোথাও সঙ্গীতজ্ঞ কিন্নরেরা নানান বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গান করছেন এই পথের কোথাও কোথাও নদী, গিরিগুহা, গহ্বর আছে কোথাও গভীর অরণ্য সেই অরণ্যে হিংস্র পশুর ভয়ংকর উপদ্রব কোথাও বা গাছপালা, লতাগুল্মহীন শুষ্ক উপত্যকা এই সকল ভয়ানক প্রদেশে অন্যান্য প্রাণীর কথা দূরে থাকুক, পাখিও যেতে পারে না! সেখানে যেতে পারে শুধুমাত্র বায়ু এবং সিদ্ধ মহর্ষিরা এমন জায়গায় আপনার কিংবা রাজপুত্রীদের কীভাবে যাওয়া সম্ভব? ক্ষান্ত হোন, আমাদের সঙ্গে যাবেন না
মহারাজ পাণ্ডু মহর্ষিদের কথা শুনে অনুতাপ করে বললেন, “হে মহাভাগগণ, আপনারা কেন আমায় নিষেধ করছেন আমি বুঝতে পারছি সন্তানহীন লোকের স্বর্গে কোনও অধিকার নেই মানুষ জন্ম হওয়ামাত্র চারটি ঋণে ঋণী থাকে - দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ এবং মনুজঋণ এই সকল ঋণ প্রত্যেক মানুষের পরিশোধ করা অবশ্য কর্তব্য যজ্ঞ দিয়ে দেবঋণ, বেদপাঠ ও তপস্যা দিয়ে ঋষিঋণ পরিশোধ হয় নিজের সন্তান ও শ্রাদ্ধতর্পণ দিয়ে পিতৃঋণ এবং অহিংস আচরণে মনুজঋণ পরিশোধ হয় হে তাপসগণ, আমি দেবঋণ, ঋষিঋণ এবং মনুজঋণ পরিশোধ করেছি, কিন্তু পিতৃঋণ শোধ করতে পারিনি আমার পক্ষে পিতৃঋণ শোধের উপায় কী?”
সিদ্ধ তাপসগণ বললেন, “হে মহাত্মা, আমরা দিব্যচোখে দেখছি, আপনার দেবতুল্য পাঁচটি সুন্দর পুত্র হবে আপনি ধর্ম অনুসারে পুত্রলাভের আয়োজন করুন আপনার কল্যাণী পত্নীরা অবশ্যই অশেষ গুণসম্পন্ন পুত্রদের মাতা হবেন


কুন্তীর পুত্রলাভ

তাপসদের কথায় মহারাজ পাণ্ডু সন্তানের জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন প্রিয় পত্নী কুন্তীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ আলোচনা এবং তর্কবিতর্কের পর কুন্তী দেবতার আশীর্বাদে পুত্র লাভে রাজী হলেন বিয়ের আগে ঋষি দুর্বাসাকে সন্তুষ্ট করে পাওয়া মহামন্ত্রের কথা তিনি মহারাজ পাণ্ডুকে বললেন সেকথা শুনে মহারাজ পাণ্ডু অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বললেন, “আমরা কোনওভাবেই যেন অধর্মের সঙ্গে যুক্ত না হই আমাদের পুত্র যদি পরম ধার্মিক হয়, তবে আমাদেরও ধর্ম পালন হবে তুমি দেবতাদের মধ্যে অন্যতম ধর্মদেবতার আশীর্বাদ গ্রহণ করো
কল্যাণী কুন্তী শুদ্ধ মনে, শুদ্ধ আচারে মুনি দুর্বাসার মহামন্ত্র জপ করে ধর্মের উদ্দেশ্যে পুজো দিয়ে দেবশ্রেষ্ঠ ধর্মকে আহ্বান করলেন
সূর্যের মতো উজ্জ্বল ধর্মদেব তখনই কুন্তীর সামনে উপস্থিত হলেন কুন্তীর মনের ইচ্ছা শুনে তিনি আশীর্বাদ করলেন পাণ্ডুর প্রথম পুত্র লাভ হল পুত্রের জন্মমূহুর্তে দৈববাণী হল, ‘পাণ্ডুর এই প্রথম পুত্র পরম ধার্মিক, বিক্রমশালী, সত্যবাদী, যশস্বী হবেন এবং যুধিষ্ঠির নামে বিখ্যাত রাজা হয়ে প্রজাদের নিজের সন্তানের মতো পালন করবেন

[কৃতজ্ঞতাঃ মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহের মূল মহাভারতের বঙ্গানুবাদ, প্রকাশকঃ বসুমতী সাহিত্য মন্দির]

অলঙ্করণঃ দীপিকা মজুমদার

(চলবে)

1 comment:

  1. ছোটোদের উপযোগী দারুণ ঝরঝরে লেখা। খুব ভালো লাগল। সঙ্গে দীপিকাদেবীর ইলাস্ট্রেসনগুলিও অসাধারণ।

    ReplyDelete