গল্পঃ কুয়াশার রঙ // মানসী পাণ্ডা



কুয়াশার রঙ

মানসী পাণ্ডা


সুধন্যস্যার আজকেই খুব দেরি করল ছুটি দিতে ওদিকে বুড়িদি এসেছে অষ্টমঙ্গলায় সৌমেনদাকে নিয়ে ওদের সাথে তিতিরের সন্ধ্যারতি দেখতে যাওয়ার কথা মন্দিরে
হাঁপাতে হাঁপাতে দরজায় ধাক্কা দিল তিতির চন্দ্রাকাকিমা দরজা খুলেই বলে উঠল, “এই দেখ, তুই এত দেরি করলি, অপেক্ষা করে করে এইমাত্র ওরা বেরিয়ে গেল
আর কেউ গেছে বুড়িদিদের সাথে?”
রনি-বনি আর তোর দাদা, দিদি
রনিদা আর বনিদা বুড়িদির দুই ভাই, মহা বিচ্ছু তিতিরের জীবনটা জ্বালাতন করে রেখেছে এই গায়ে আরশোলা ছেড়ে দেয় তো, এই পেয়ারাগাছে চড়িয়ে পালিয়ে আসে কিছু না পেলে শক্ত শক্ত পড়া ধরে তোচন আর মিতির-তিতিরের আপন দাদা-দিদি, তারাও এতটা অত্যাচার করে না
দুমিনিট ভেবে নিল তিতির বাকিরা থাকতে ও শয়তানদুটো তেমন সুবিধা করতে পারবে বলে মনে হয় না
কাকিমা, আমি গেলাম একছুটে গিয়ে ওদের ধরে ফেলব
তিতির, অন্ধকার হয়ে গেছে, অতটা ফাঁকা রাস্তা একা একা যাস নাকাকিমার নিষেধ অগ্রাহ্য করেই এক দৌড় দিল তিতির পাড়া ছাড়তেই কালো পিচের রাস্তা সোজা চলে গেছে মন্দির মাঝে কোনও ঘরবাড়ি নেই, শুধুই দুদিক বিস্তৃত ধানের ক্ষেত রাস্তার ধারে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কিছু ঝোপঝাড় আর বড়ো বড়ো গাছ পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে গোল হয়ে ফটফটে জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর তবে ধানক্ষেত থেকে শীতের কুয়াশা পাক দিয়ে উঠে এসে সমস্ত স্বচ্ছতাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে
পিচে পা দিয়েই তিতিরের উত্তেজনার পারা ঝট করে খানিকটা নেমে গেল কাউকেই তো কাছেপিঠে দেখা যাচ্ছে না আশেপাশের ঝোপঝাড়ের ঝুপকো ছায়াগুলো আবছায়া হয়ে বাতাসের সাথে সাথে নড়ছে একলা ঘরে থাকতে যার সাহসে কুলোয় না সে কি পারবে একলা যাওয়ার এত বড়ো ঝুঁকিটা নিতে! পারলে রনিদা-বনিদার কাছে তার ভীতু বদনাম তো ঘুচবেই, এমনকি নতুন জামাইবাবুর কাছে সম্মান ও যথেষ্ট বাড়বে, সেটাই তাকে যা ভরসা দিচ্ছে
বড়ো একটা শ্বাস টেনে মাথার স্কার্ফটা টেনেটুনে বেঁধে পা চালাল তিতির পা এতটাই ভারী লাগছে যে নড়তেই চাইছে না এরকম গতিতে চললে সারারাত কেটে গেলেও মন্দিরে আর পৌঁছানো হবে না ওর
যাবে নাকি বাড়ি ফিরে যাবে ভাবতে ভাবতে একটু ঠাহর করে দেখে তিতিরের মনে হল দূরে কয়েকটা মানুষের অবয়ব বোঝা যাচ্ছে, টুকরো-টাকরা দুয়েকটা কথার আভাসও ভেসে আসছে আচমকা মনের বল ফিরে পেয়ে শরীরটা হালকা হয়ে গেল তিতিরের, গতিবেগও বেড়ে গেল সে জ্যোৎস্নায় প্রায় সাঁতরে পৌঁছে গেল ওদের কাছে ঐ তো রনিদা সবার পেছনে দিদি, বুড়িদি আর সৌমেনদা ঠিক তার আগে সামনে হাঁটছে দাদা আর বনিদা, সবার আড়ালে ও দুজনকে ভালো দেখা যাচ্ছে না তাল  মিলিয়ে রনিদার পাশে পাশে হাঁটতে শুরু করল তিতির
কেউ কোনও কথা বলছে না ভর সন্ধেবেলা, তিতির যে এতখানি রাস্তা একা পেরিয়ে এল সে ব্যাপারে বাহবা তো দূর, ব্যঙ্গ করেও কোনও মন্তব্য করছে না, ব্যাপারটা কী হল! হুঁ হুঁ বাবা, তিতিরের সাহস দেখে সব ক্যাবলা বনে গেল নাকি! কুয়াশাটা আরও ঘন হয়ে নেমে এসেছে ভালো করে সবার মুখগুলোও দেখা যাচ্ছে না ওদের মুখে যে কী ভাব খেলছে সব ধোঁয়াটে আবরণের আড়ালে!
এদিকে তিতিরের বুকে সাহসের ফানুসটা ফুলেই চলেছে আর পারছে না সে তার এই অসম সাহসী অভিজ্ঞতাটা সবার সাথে ভাগ না করে থাকতে মুখ খুলতে গিয়ে শুনল বুড়িদি বলছে, “ঐ নদীতে পা ডুবিয়ে বসতে আমি খুব ভালোবাসি
বুড়িদি কীসব বলছে! নদী তো এখান থেকে প্রায় মাইল চারেক, মন্দির পেরিয়ে অনেকটা গিয়ে রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে তা বুড়িদি যায়ই বা কখন আর পা-ই বা ডোবায় কখন! স্কুটিটা নিয়ে যদি বা যায়, কাকু-কাকিমা মানা করে না?
ঠিক তক্ষুনি দিদি বলে উঠল, “আমি তো ওখানে সাঁতার কাটি - কুয়াশায় মিশে গিয়ে ডুবসাঁতার, চিৎসাঁতার…”
এরা বলে কী? মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না তিতিরের দিদি নদীটা এখনও অবধি চোখে দেখেছে কি না সন্দেহ, সে সাঁতার কেটে ফেলল!
তিতির কিছু বোঝার আগেই সৌমেনদা ছাড়া বাকি সবাই হরিনামে গলা মেলানোর মতো করে এক সুরে বলতে শুরু করল, “আমরা নদীতে সাঁতার কাটি, পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় সাঁতার কাটি, কুয়াশা মেখে সাঁতার কাটি
হচ্ছেটা কী এসব! , এবার তিতির বুঝতে পেরেছে, সৌমেনদা নতুন মানুষ, তাই তাকে যত্তসব ভুলভাল গপ্পো শুনিয়ে পরে মজা নেবে তিতির আর পারল না, ধমকে উঠল, “তোমরা মিথ্যে কথা কেন বলছ, সৌমেনদা বিশ্বাস করো না ওদের কথা
মিথ্যে কোথায়! আমিও তো মাঝরাত্তিরে সাঁতার কাটতে খুব ভালোবাসি
নতুন গলায় এ-কথাটা শুনে তিতির কেমন একটা অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল তবুও জোর গলায় বলতে চাইল, “তোমরা ভুলভাল বলে বোকা বানাচ্ছ
তুই ঠিক জানিস তো তোর নিজের কোনও ভুল হচ্ছে না? তুই যাদের সাথে যাচ্ছিসতারাঠিক তারাই তো?”
রনিদার কথায় টলে গেল তিতির চমকে ওঠে ভালো করে দেখে চারদিকটা সে চলা থামিয়েছে তিতিরের আশেপাশেরতারাওতখন স্থিরতারাঠিক কজন, তিতির ঠিক করে সংখ্যাটা বুঝে উঠতে পারে না তারপরতারাতিতিরকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করল সে চলার মধ্যে নেই কোনও মানুষী স্বাভাবিকতা ঘাড় বেঁকিয়ে, হাতগুলো সামনে ঝুলিয়ে, পা টেনে টেনে ধীরলয়ে সঙ্গে একটা গুনগুনানি সুর মন্ত্রের মতো গেয়ে চলেছে সে সুর তিতিরের অন্তরাত্মাকে শরীর থেকে টেনে ছিঁড়ে বার করে আনতে চাইছে সে টান অস্বীকার করার ক্ষমতা তিতিরের নেই তাদের বৃত্ত ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে এবার ছুঁয়ে ফেলবে তিতিরকে শেষ চেষ্টার মতো তিতির দেখতে চায় তাদের মুখগুলো আবছা আলোয় একটু চেনা আদল পেলেও বেশিটাই অচেনা ঠেকে
বুকের ভেতর তিতিরের সাহসী ফানুসটা ফট করে ফেটে সাহসগুলো বাতাস হয়ে বেরিয়ে গেল নাক-কান দিয়ে এক পলকের জন্য চোখের সামনেটা পুরো কালো আর কালো ভালো করে দেখতে চায় তিতির, সত্যিই তো, আশেপাশেরতারাএখন এঁকেবেঁকে গলে মিশে যাচ্ছে কুয়াশায় এখন সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে শুধু সাদা কুয়াশা এ যে শুধু কুয়াশা নয়, কুয়াশা মানেতারা তিতির এলোপাথাড়ি ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে দেখল কোনওদিকেই কোনও শেষ নেই, কুয়াশা ওকে টেনে নিচ্ছে আরও গভীরে অসম্ভব একটা ঠাণ্ডা স্রোত তার সোয়েটার ভেদ করে, চামড়া ভেদ করে ঢুকে হাড় ছুঁয়ে তৈরি করছে নিয়ন্ত্রণহীন কাঁপুনি তিতির ডুবে যাচ্ছে অনেকদূরে কোথাও
অতলে তলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে একটা হাত তাকে ধরে ফেলল বহুদূর থেকে যেন অনেকগুলো গলা তিতিরকে ডাকছে, “তিতির, এই তিতির, মজা করছিলাম তো!”
বুড়িদি ভয় পাওয়া গলায় বলে ওঠে, “কী হবে এখন, মেয়েটা যে অজ্ঞান হয়ে গেল!” তারপরেই ধমকে ওঠে, “যত নষ্টের গোড়া এই রনিটা! সব বিদঘুটে পরিকল্পনা ওর মাথা থেকেই বেরোয়
হ্যাঁ, তা এখন বলবি বৈকি দিদি তখন তো সবাই ঐ পরিকল্পনায় সায় দিলি, আর দোষের বেলা আমি!” রনি প্রতিবাদ করে
দোষ আমাদের সবার, কিন্তু তোর বেশি রনিধরা গলায় মিতির বলে, “ও যখন ছুটে আসছিল তুইই পেত্নী ভেবে ভয় পেয়ে বুড়িদির আঁচল ধরলি যেই না দেখলি তিতির, অমনি তোর মাথায় দুষ্টুবুদ্ধির পাখা গজিয়ে গেল, আমরাও ওটুকু সময়ে সবটুকু না ভেবেই তোর ফাঁদে পা দিলাম
তর্ক-বিতর্ক ছেড়ে সবাই এখন চেষ্টা করো দেখি মেয়েটার জ্ঞান ফেরানোরসৌমেনদার বকুনিতে সবাই তিতিরের হাতের তালু, পায়ের তলা ঘষতে থাকে আর ক্রমাগত তিতিরের নাম ধরে ডাকতে থাকে
কুয়াশা যে বড়ো শান্তি দিচ্ছে তিতিরকে স্বপ্নের বিছানা পেতে তাকে ডাকছে আয়, ঘুমিয়ে পড় কিন্তু কারা যে বড়ো গোল করছে, তিতিরকেই ডাকছে যেন তিতির ওখান থেকে ফিরবে কি ফিরবে না ভাবতে ভাবতে চোখ খুলল কুয়াশা বেশ পাতলা হয়ে গেছে এখন ঘোলাটে কুয়াশার মতো খুব চেনা কটা অবয়ব ঝুঁকে পড়ে তাকে ডাকছে খুব আদর করে কিন্তু তিতির ঠিক করে উঠতে পারে না কার কাছে যাবে বড্ড চেনা ঐ ঘোলাটে কুয়াশা, নাকি রহস্যময় সাদা কুয়াশার কাছে
_____
অলঙ্করণঃ বিশ্বদীপ পাল

2 comments: