গল্পঃ সাহারায় শিহরন // দীপ্তজিৎ মিশ্র


সাহারায় শিহরন

দীপ্তজিৎ মিশ্র



পোচকানওয়ালা

রাত প্রায় দশটায় বাড়ি ঢুকলেন মিঃ পিলু পোচকানওয়ালা ক্যানিং স্ট্রিটের অফিস থেকে সন্ধ্যা সাতটায় বেরিয়ে সল্টলেকে ফিরতে এতক্ষণ লাগে না কিন্তু রাস্তায় আজ দূর্গা মাঈ কি ভাসানের এত্ত ভিড় যে জ্যাম অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি অথচ প্রাইভেট অফিস যেতেই হবে যদিও তিনি মালিক, তবে এখনও রোজ অফিস যান নিতান্ত অসুস্থ না হলে কামাই করেন না
বাড়ি ফিরেই আগে খোঁজ করলেন ছেলের গিন্নি বললেন, ছেলে নাকি কমপ্লেক্সের ঠাকুর ভাসানে গেছে
ওফ্‌, ইয়ে লড়কা ভি না!” নরম গদিতে ভারী শরীরটাকে এলিয়ে দিলেন মিঃ পোচকানওয়ালা ছেলের এই সর্বক্ষণ বাইরে থাকার ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেন না তিনি ছেলেটা তাঁর কোনও কথা না শুনে নিজের ইচ্ছেয় যা খুশি করে বেড়ায়
সেদিক দিয়ে পোচকানওয়ালা ছেলেকে একরকম প্রশ্রয় দিয়েছেন নামকরা ইংরেজি স্কুলে পড়িয়েছেন, যখন যা চেয়েছে তার অভাব রাখেননি, কিন্তু ছেলে বখে যাবে না, এই ভরসা তাঁর আছে কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিটা অন্য সেটা নিয়ে আলোচনার জন্যই তিনি ছেলেকে খুঁজছিলেন তা বেশ, তিনি ভাবনায় থাকুন, ততক্ষণে আমরা পোচকানওয়ালা মশাইকে একটু চিনে নিই
পোচকানওয়ালা ব্যবসায়ী মানুষ পৈতৃক সম্পত্তি হিসাবেই ব্যবসাটা পেয়েছেন বলা যায় পেট্রলের ব্যাবসা একটা ছোট্ট পেট্রল পাম্প দিয়ে শুরু করার পর এখন সৌদি আরবেপোচকানওয়ালা অ্যান্ড কোং’-এর নাম যথেষ্ট পরিচিত কিন্তু ব্যাবসায় উন্নতি হলেই শত্রুও তৈরি হয় সৌদি আরবের তেল সম্রাট যাকে বলা হয়, সেই ওমর শেখেরশেখস গোল্ডেনকোম্পানির পরেই পোচকানওয়ালার কোম্পানির নাম হলেও সৎভাবে ব্যাবসা করেন বলে বর্তমানে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে যে অচিরেই সৌদি আরবের শ্রেষ্ঠ তেল কোম্পানি হিসেবেপোচকানওয়ালা অ্যান্ড কোং’-এর নামই শোনা যাবে
তা সে ব্যাপারে তো ওমর শেখও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না সে এর আগে দু-তিন বার মিঃ পোচকানওয়ালার সঙ্গে সরাসরি কথা বলে ব্যাবসা তুলে নেওয়ার জন্যে পোচকানওয়ালা ব্যবসায়ী মানুষ তার ওপর স্পষ্টবক্তা তিনি পরিষ্কার বলেন, “আপনিও ব্যাবসা চালান, আমিও চালাই মানুষের পছন্দের ওপরেই তো আমাদের ব্যাবসার ওঠাপড়া  নির্ভর করে!”
এতে ওমর শেখ খেপে গিয়ে বলে তাঁর ব্যাবসা, ফ্যামিলি সব শেষ করে দেবে তা সে পারেও টাকার কুমির হওয়ায় কোনও কিছুরই তার অভাব নেই এই হুমকির পর পোচকানওয়ালার একটা পেট্রল পাম্পে ব্লাস্ট হয়, একটা এক্সপোর্টেশন অয়েল ট্যাঙ্কারের অ্যাক্সিডেন্ট হয় পোচকানওয়ালা খুব ভালো জানেন এটা ওমর শেখের কাজ কিন্তু প্রমাণ নেই
এরপর বলা তো যায় না, তাঁর পরিবারের কেউ আক্রান্তও হতে পারে তাই ছেলেকে নিয়ে এত চিন্তা
ঠিক সেই সময়েই টুং টাং শব্দে বেজে উঠল ফোন অপরিচিত নম্বর দেখে, “হ্যালো, পোচকানওয়ালা হিয়ার,” বলতেই ওপারের বক্তব্য শুনে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল তাঁর উঠে পড়লেন তিনি গিন্নিকে এখনই কিছু জানানোর দরকার নেই এখন আগে একজনেরই পরামর্শ দরকার - প্রখর রুদ্র

প্রখর রুদ্র

গড়িয়ার এক বহুতল এগারোতলায় একটি ফ্ল্যাটে ইন্টারকম বেজে উঠতেই একটা ভারী গলা বলে উঠল, “প্রখর রুদ্র স্পিকিং
অন্যপ্রান্তে শোনা গেল সিকিউরিটি গার্ডের গলা, “সাবজী, এক বাবুজি মিলনা চাহতে হ্যায়
কে?”
কোই মিঃ পোচকানওয়ালা, কহ রহে হ্যায় কি থোড়ে হি দের পহলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট হুয়া হ্যায়
ঠিক আছে পাঠিয়ে দাও
এর প্রায় মিনিট দুয়েক বাদে মিঃ পোচকানওয়ালা ওপরে এসে বেল বাজাতেই প্রখরবাবুর চাকর তুখোড় দরজা খুলে দিল সেই সঙ্গে সোফা থেকে ভেসে এল প্রখর রুদ্রের গলা, “আসুন, একটু কষ্ট পেতে হল প্লিজ বি সিটেড
পোচকানওয়ালা প্রখর রুদ্রের নাম শুনেছিলেন, কিন্তু চাক্ষুষ করেননি ফুটের ওপর লম্বা এই সুস্বাস্থ্যবান মানুষটাকে দেখে একরকম একটু ভেবলে গেছিলেন তিনি
প্রখরবাবু সেটা দেখেও না দেখার ভান করে বললেন, “আসলে অনেক উটকো লোক ঢুকে পড়ে তাই এই ইন্টারকম সিস্টেম যাক গে, কী ব্যাপার বলুন
পোচকানওয়ালা বলা শুরু করলেন, “হামার নাম পিলু পোচকানওয়ালা, ক্যানিং স্ট্রিটে হামার অফিস পেট্রল কা বিজনেস
পোচকানওয়ালা! ক্যানিং স্ট্রিট! আপনার মূল ব্যাবসা তো সৌদি আরবে
জী হাঁ এটা জাস্ট একটা ব্রাঞ্চ অফিস হামার বছরের ছয়মাস সৌদি আরবেই কাটে লেকিন ইন্ডিয়াতে তেল ইমপোর্টেশনের জন্য আবার এটাই মেন অফিস
, তা আপনার তো ওমর শেখের সঙ্গে কী একটা গোলমাল চলছে না?”
ওহি লিয়ে তো আপনার কাছে এসেছি, প্রখরবাবু
মানে? ওরে বাবা! ওর অনেক পলিটিক্যাল কানেকশান আপনি কি আমাকে মুশকিল আসান পেয়েছেন নাকি? ওমর শেখকে ঠান্ডা করা সস্তার কাজ!”
আরে নহি নহি পুরা বাত তো সুনিয়ে পহলে!”
বলুন
পোচকানওয়ালা পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন
সব শুনে প্রখরবাবু বললেন, “হুম, তা আমি কেন? পুলিস তো বেটার
নহি ওমর শেখের সারা ওয়ার্ল্ডে চর আছে হামি পুলিসের কাছে গেছি শুনলে হামার বেটার ক্ষতি হতে পারে ওহি লিয়ে হামি আপনার কাছে এলাম আপনি যো কুছু করুন, হামার বেটা ফেরত চাই
হ্যাঁ, সে তো দেবে বলেছেই আপনি আরবে ব্যাবসা ছেড়ে দিন
পোচকানওয়ালা এবার রেগে গেলেন বললেন, “হামি ওতো কোষ্টো কোরে তাহলে বেওসাটা কেন দাঁড় করালাম, প্রখরবাবু? না আরব হামি ছাড়ব না লেকিন হাঁ, লক্ষ্মী মাঈ অগর হামার ওপর গুসসা হোন, হামার বেওসা না চলে, তো ঠিক আছে লেকিন অ্যায়সে হামি ছাড়ব না
মানে চোরের ওপর বাটপাড়ি করতে বলছেন?”
ওসব হামি জানি না, আপনি হামার কাম করে দিবেন, হামি প্যায়সা দিব
আপনি বিচলিত হবেন না খামোখা আমার ওপর রাগ দেখিয়ে তো লাভ নেই! এক কাজ করুন, আপনার ট্রাভেল এজেন্ট আছে?”
জী, জরুর
আমাকে কালকের মধ্যে ইউ...-র টিকিট করে দিতে পারবে?”
জী, হাঁ একদম ফার্স্ট ক্লাস কা টিকিট পেয়ে যাবেন
আমার মেল আইডি জানেন তো?”
হাঁ
আপনি টিকিট আর ডিটেল আমায় মেল করে দিতে বলবেন আর…”
অউর?”
আমি ওখান থেকে মেল করার বারো ঘন্টার মধ্যে আমার ইজিপ্টের টিকিট চাই
জী?”
ওমর শেখ তো ইজিপ্সিয়ান, বলা যায় না কিছুই আমার মন বলছে ইজিপ্ট ইজ কলিং
তো ফির আপ সিধা ইজিপ্ট হি যাইয়ে না!”
না, আরবের ব্যাপারটা ফেলে দিতে পারছি না দেখছি
জী, ঠিক হ্যায় অউর আপকা ফিস? অ্যাডভান্স?”
এখন লাগবে না, কাজ শেষ হোক, তারপর আপনি এখন আসুন
ঠিক হ্যায়, ম্যায় কাগজাত কা ইন্তেজাম করতা হুঁ
পোচকানওয়ালা চলে গেলেন প্রখরবাবুও উঠলেন কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে

এয়ারপোর্টের পথে

পরদিন সকাল নটা নাগাদ ওলা ক্যাবে দমদম এয়ারপোর্ট যাত্রা শুরু করার পর নিজের মিনি ল্যাপটপটাতে কিছু ডিটেল চেক করতে করতে কেসটার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করছিলেন প্রখরবাবু
এই পোচকানওয়ালা লোকটা বড্ড গুলিয়ে দেয় সব একবার বলছে সৌদি আরব, একবার বলছে আরব আমিরশাহী নেহাত নামকরা লোক, তাই বাঁচোয়া চট করে ধরে ফেলা গেল যে ওর বক্তব্য আমিরশাহী ওখান থেকে সৌদি আরব কী ভদ্রলোক হেঁটে যান নাকি?
নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে ফেললেন প্রখরবাবু ভিসা এত অল্প সময়ে পাওয়া যায় না, কিন্তু খ্যাতনামা গোয়েন্দাদের সেই সুবিধেটুকু থাকে প্রখরবাবু খ্যাতিমান হলেও সেই নেটওয়ার্ক তাঁর গড়ে ওঠেনি কাজেই তাঁর গোয়েন্দাগিরির গুরু প্রদোষ মিত্রের কাছে যেতে হল কাল পোচকানওয়ালা চলে যাবার পর সোজা রজনী সেন রোডে চলে যান তিনি
সাতাত্তর বছরের বৃদ্ধের জীবনীশক্তি এখনও প্রবল সেই সঙ্গে প্রবল তাঁর মান্যিগন্যিও সব শুনে সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা ফোন করে বললেন, “প্রখর, তুমি কাল কনসাল অফিসে দশটা নাগাদ গিয়ে মিঃ সেনগুপ্তর সঙ্গে দেখা কোরো ও আমার ক্লাসমেটের ছেলে গিয়ে আমার নাম করলেই হবে তোমার ফ্লাইট কটায়?”
সকাল সাড়ে এগারোটা
আবুধাবি থেকে ব্রেক করতে হবে কানেকটিং ফ্লাইট কটায়?”
রাত নটা
বেশ, মাঝের সময়টা একটু ঘুমিয়ে নিও জেট-ল্যাগটা কেটে যাবে তোমাকে আমিরশাহী সম্পর্কে দুটো বইয়ের পিডিএফ মেল করে দেব পড়ে নিও মন দিয়ে আর কোনও সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ কোরো যদি আমি ব্যস্তও থাকি, তাহলে তোপসেকে নির্দ্বিধায় সমস্যা খুলে বলবে, -ও এখন ভালো গোয়েন্দা হয়ে গেছে
হুঁ,” বলে চলে এসেছিলেন প্রখরবাবু আসলে গোয়েন্দাগিরিতে আসার ইচ্ছে তাঁর ছিল না তিনি যখন জন্মাননি তখনই লালমোহনবাবু তাঁর নাম দিয়ে অনেকগুলো লেখা লিখে ফেলেছেন বাবা-মাও আর নাম খুঁজে পাননি, এই নামটাই রেখেছিলেন! স্কুলে বন্ধুরা খুব খ্যাপাত আর কাকতালীয়ভাবে প্রখরবাবুর স্বাস্থ্য, গলার স্বর, সবই ক্রমে জটায়ু-বর্ণিত প্রখর রুদ্রের মতো হয়ে উঠছিল তখন একদিন গিয়ে প্রখরবাবু প্রদোষবাবুর সঙ্গে দেখা করে সব বলে তাঁর থেকে গোয়েন্দাগিরির প্রাথমিক পাঠগুলোর তালিম নেন ও তপেসবাবুর সহকারীও ছিলেন কিছুদিন এখন প্রখর রুদ্র নিজেই কিছু কেস সলভ করে বেশ জনপ্রিয়
ইতিমধ্যে একদিন জটায়ুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন প্রদোষবাবু উনি সব শুনে ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “তবেই বলো প্রখরভায়া, আমি যদি ওরকম পাওয়ারফুল লেখা না লিখতুম আজ তুমি গোয়েন্দা হতে? নাকি ফেলুবাবুর স্নেহধন্য হওয়ার সু্যোগ পেতে? হে হে
হঠাৎই উল্টোডাঙা ছাড়ানোর পর গাড়ির মিররে দেখলেন একটা কালো টয়োটা ফলো করছে তাঁর গাড়িকে ওমর শেখের লোক! বাব্বা! খুব ভালো নেটওয়ার্ক বলতে হবে কিন্তু মতলবটা কী? দেখ যাক এয়ারপোর্ট অবধি

বেদুইন!

এয়ারপোর্টে ক্যাব ছেড়ে দেওয়ার পর প্রখরবাবু একটু আড়ালে সরে গেলেন গাড়ি থেকে কে নামে দেখার জন্য দেখলেন, গাড়ি থেকে নামল একটি বেদুইন! গাড়ির নম্বরটাও নোট করে রাখলেন তিনি স্মার্টফোনে পরে এই গাড়ির ডিটেল কাজে লাগতে পারে
কিন্তু বেদুইন কেন? ছদ্মবেশ! দেখা যাবে পরে আগে মিঃ সেনগুপ্তর সঙ্গে দেখা করে নিজের জিনিসপত্র বুঝে নেওয়া যাক
মিঃ সেনগুপ্তর কাছে গিয়ে আশাতীত আপ্যায়ন পেলেন প্রখরবাবু সব নিয়ে ফেরার সময় বেদুইনের ব্যাপারটা ছোট্ট করে বললেন প্রখরবাবু সেই সঙ্গে বললেন, “দরকার পড়লে পরে আবার আসব কিছু মনে করবেন না তো?”
না না মনে করব কেন? ফেলুকাকুর ছাত্রকে হেল্প করছি, এ তো আমার পরম সৌভাগ্য!”
হেসে লাউঞ্জে বেরিয়ে এসে দেখলেন বেদুইনটি বসে কফি খাচ্ছেআলাপ করেই দেখা যাক না, আমার সন্দেহটা ঠিক না ভুল’ - মনে মনে ভেবে এগিয়ে গেলেন প্রখরবাবু
এক্সকিউজ মি
ইয়েস?”
ক্যান আই সিট হিয়ার? উড ইউ মাইন্ড?”
আই হ্যাভ নট রিজার্ভড দ্যাট সিট, ইফ ইউ ওয়ান্ট, ইউ মে
বসলেন প্রখরবাবু বড্ড কড়া ব্যবহার হলেও গন্তব্যটা জানতে হবে তাই আবার বললেন, “সো? হোয়্যার আর ইউ গোয়িং? আবুধাবি? অর অ্যানিহোয়্যার এলস?”
নান অফ ইয়োর বিজনেস,” বলে চলে গেল বেদুইন
এর নামটা জানতেই হবে বেদুইনকে নজরে রাখলেন প্রখরবাবু ফার্স্ট কল শুরু হয়েছে প্রখরবাবু ঠিক করলেন, সেকেন্ড কলে রিপোর্ট করবেন এই কলে আগে লোকটার নাম জানতে হবে
কর্নেল নিকলসন, জেমস ট্যাংকারডন, ফারুখ সিদ্দিকী... উঠে পড়েছে বেদুইন ফারুখ সিদ্দিকী! লোকটার ডিটেল জানতে হবে তো! প্রখরবাবু মিঃ সেনগুপ্তের অফিসের দিকে ছুটে চললেন
কী ব্যাপার! রিপোর্ট করেননি?” প্রখরবাবুকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন মিঃ সেনগুপ্ত
সেকেন্ড কলে করব এই ফারুখ সিদ্দিকী, মানে ওই বেদুইনটার ডিটেল চাই আমার সঙ্গে একই ফ্লাইটে আবুধাবি যাচ্ছে
কম্পিউটারে কয়েকটা বোতাম টিপতেই বেরিয়ে এল তথ্য স্ক্রিনে চোখ বুলিয়েই মাথায় হাত প্রখর রুদ্রর একে তো চোখছাড়া করা যাবে না এই বদমেজাজী মিশরীয়টাই ওমর শেখের কাছে পৌঁছোনোর চাবিকাঠি আর এটা কোনও সম্ভাবনা নয়, নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে যে এর কাজ প্রখরবাবুকে ফলো করা
ভাবতে ভাবতে লাউঞ্জে ফিরে আসতেই শুনতে পেলেন সেকেন্ড কল শুরু হয়েছে তাঁর নামও ডাকা হল প্রখরবাবু আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগলেন রিপোর্টিং কাউন্টারের দিকে
আবুধাবিতে নামি, তারপর তোমার ব্যবস্থা করছি ফারুখ সিদ্দিকী’ - মনে মনে বলে পায়ের গতি বাড়ালেন প্রখরবাবু

আবুধাবিতে ধোবিপাট

প্লেনে আর কোনও সমস্যা হয়নি আবুধাবিতে প্লেন যখন ল্যান্ড করল, প্রখরবাবু হাতঘড়িতে দেখলেন বিকেল চারটে দশ ভারতীয় সময় স্মার্টফোনে আবুধাবির সময় ঠিক করে নিলেন দুপুর দুটো চল্লিশ কানেকটিং ফ্লাইটের সময়টা উনি ভুল করে প্রদোষবাবুকে আবুধাবির সময় বলে ফেলেছিলেন রাত নটা ভারতীয় সময় রাত সাড়ে দশটা হাতে তার মানে প্রায় চার ঘন্টার মতো সময় আছে প্রদোষবাবুর পাঠানো বইগুলোর মধ্যে একটা ছিল ট্যুর গাইড সামনাসামনির মধ্যে একটাই ভালো হোটেল আছে ভাইসরয় ইন্টারন্যাশনাল সেখানে আপাতত গিয়ে
ভাবনায় ছেদ পড়ল প্রখরবাবুর ফারুখ সিদ্দিকীর কথা ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি বেদুইনমশাই চুপচাপ কেটে পড়ছিলেন প্রখরবাবু চুপচাপ তাঁকে ফলো করলেন কিন্তু সমস্যা হল, ট্যাক্সিতে উঠে কী বলবেন দুম করে তো আর কোনও ড্রাইভারকে বলতে পারেন না যে অমুক ট্যাক্সিটাকে ফলো করুন তাই কপাল ঠুকে বলে দিলেন গন্তব্য YAS আইল্যান্ড খানিকটা অনুমানও ছিল এবং তাঁর অনুমানটা সঠিকই হল ফারুখের ট্যাক্সিও গিয়ে থামল YAS আইল্যান্ডের গেটে
বেদুইনবাবু যদিও খেয়াল করেছিলেন, প্রখরবাবুর ট্যাক্সিটা পেছন পেছন আসছে তাই তিনি আন্দাজ করেছিলেন যে প্রখরবাবু তাকেই ফলো করে আসছেন তাই গেটওয়ে দিয়ে খানিকটা যাওয়ার পরও যখন দেখলেন প্রখরবাবু বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে তাঁকে ফলো করে চলেছেন তখনই একটা কাঁচা কাজ করলেন তিনি
হঠাৎ করেই বেদুইনবাবু ছুটতে শুরু করায় একটু হকচকিয়ে গেলেও প্রখরবাবু সময় নষ্ট করলেন না ব্যাটা যখন ধরেই ফেলেছে তখন আর লুকিয়ে লাভ নেই স্প্রিন্ট টানা শুরু করলেন তিনিও
ছুটতে ছুটতে রাস্তায় একটি শপিং মল পড়ল সেখানে ঢোকার পর ক্রমশ ব্যবধানটা কমতে লাগল হঠাৎই প্রখরবাবু ছুটতে-ছুটতেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন বেদুইনকে এবার বেদুইন সোজাসুজি চার্জ করল তাঁকে
বেচারা প্রখর রুদ্রকে চিনত না খাঁটি ভারতীয় কুস্তির ধোবিপাট আছাড়ে কুপোকাত হল বেদুইন আবার প্রখরবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “হু সেন্ট ইউ?”
ইউ নো হিম ভেরি ওয়েল
ওমর শেখ?”
আর কোনও উত্তর না দিয়ে ফারুখ সিদ্দিকী পালিয়ে গেল একে ওকে ধাক্কা দিয়ে ইতিমধ্যে চারপাশে ভিড় জমে উঠেছে দুজন সিকিউরিটি এসে তাঁকে নিয়ে গেলেন ম্যানেজারের ঘরে
প্রায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অল্প অল্প করে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করে যখন বেরোলেন, স্মার্টফোনের ঘড়িতে তখন সাতটা ত্রিশ আর দাঁড়ানোর বা হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হওয়ার সময় নেই এখানে একটা ক্যাফেটেরিয়া আছে দেখেছিলেন গাইড ম্যাপে ওখানে হাল্কা করে কিছু খেয়ে নিয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছোতে হবে এই ফারুখ সিদ্দিকী আর জ্বালাতন করবে না আশা করা যায় পা চালালেন প্রখর রুদ্র

জেড্ডায় গোলমাল

ডিং ডং ফ্লাইট এস.ভি. ৮২০৩ হ্যাজ জাস্ট অ্যারাইভড ডেস্টিনেশন জেড্ডা দ্য প্যাসেঞ্জারস আর রিকোয়েস্টেড টু রিপোর্ট অ্যাট কাউন্টার নাম্বার থ্রী
উঠে পড়লেন প্রখর রুদ্র একটু আগেই এসে পৌঁছেছিলেন এয়ারপোর্টে প্লেনে উঠে পড়া যাক আশা করা যায় যে আর জ্বালাতে আসবে না তবুও সতর্ক থাকা ভালো তাই আগেভাগেই রিপোর্টিং সেরে বোর্ডিং পাস নিয়ে প্লেনে উঠে পড়লেন প্রখরবাবু ক্রমে ঘড়ি বলল নটা প্লেন ডিলে করল না যথাসময়ে টেক অফ করল একবার প্রখরবাবু চারপাশটা ঘুরে দেখে নিলেন না, সন্দেহজনক কেউ নেই আর বেদুইনবাবুর তো টিকিও দেখা যাচ্ছে না বেশ, অন্তত ঘন্টা তিনেকের জন্যে নিশ্চিন্ত
বলা বাহুল্য, সম্পূর্ণ নির্বিবাদেই ল্যান্ড করলেন জেড্ডায় প্রখরবাবু জেড্ডার সময় আবুধাবির থেকে এক ঘন্টা পিছিয়ে প্রখর রুদ্র ঘড়িতে দেখলেন বাজে রাত একটা কুড়ি ভারতীয় সময় স্মার্টফোন বলছে রাত এগারোটা পঞ্চাশ ওটাকে একঘন্টা পিছিয়ে জেড্ডার সময় সেট করে নিলেন তিনি
এবার হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেওয়ার পালা ইন্টারনেটে একটা হোটেল দেখেছেন তিনি গ্র্যান্ড পার্ক হোটেল
দু-তিনজন ড্রাইভারকে বলতে তারা বলল রিজার্ভড এরপর একটা প্রাইভেট ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলতেই সে নিয়ে যাবে বলল উঠে পড়লেন প্রখরবাবু এখানকার গাড়িতে এই একটা সুবিধা সবই এয়ার কন্ডিশনড বেশ খানিকটা যাওয়ার পর বুঝতে পারলেন, একটা মিষ্টি গন্ধ তাঁর নাকে আসছে আসলে শরীরটা ক্লান্ত লাগছিল অনেকক্ষণ থেকেই এবার যেন গা-হাত-পা ঝিমঝিম করছে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলতে গিয়ে অবশ হয়ে গেলেন
এবার ট্যাক্সি ড্রাইভার পেছন ফিরল তার মুখে একটি গ্যাস মাস্ক গাড়ি ফিরে চলল এয়ারপোর্টের দিকে একটা হন্ডা অ্যাকর্ড প্রখরবাবু গাড়িতে ওঠার সময় থেকে ট্যাক্সিটাকে ফলো করছিল এখন সেও গাড়িটা ঘুরিয়ে নিল ড্রাইভারের মুখে হাসি ট্যাক্সি ড্রাইভারটিকে শুধু তার রিওয়ার্ডটা ধরিয়ে দিলেই আপাতত জেড্ডাপর্ব সমাপ্ত

গন্তব্য মিশর

অচৈতন্য প্রখরবাবুকে নিয়ে ট্যাক্সি ফিরে এল এয়ারপোর্টে ট্যাক্সিটা ফিরে আসতেই হঠাৎই এয়ারপোর্টে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল দুজন সিকিউরিটির পোশাক পরা লোক এগিয়ে এলেন সঙ্গে আরও তিনজন লোক পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা কোনও হাসপাতালের লোক সঙ্গে তাদের স্ট্রেচার প্রখরবাবুকে স্ট্রেচারে শুইয়ে হাতে স্যালাইন লাগিয়ে দিতেই সিকিউরিটিদের একজন বলে উঠলেন, “হারি আপ প্লেন উইল টেক অফ উইদিন টোয়েন্টি মিনিটস
সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততাটা আরও বেড়ে গেল স্ট্রেচারটা তুলে নিয়ে তারা প্রায় ছুটে চলল প্রাইভেট রানওয়ের দিকে একটা এ.টি.আর ৪২ অপেক্ষা করছিল শুধুমাত্র প্রখরবাবুকে প্লেনে তুলে নেওয়ার জন্য পাইলট তৈরিই ছিলেন অল ওকে সিগন্যাল পাওয়ামাত্র টেক অফ করলেন

এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটা দেখছিলেন একজন বছর পঞ্চাশের প্রৌঢ় প্লেন টেক অফ করার পরই পায়ে পায়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন আরেক কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক
স্যর, চপার ইস ওয়েটিং অ্যাট হেলিপ্যাড মে উই প্রোসিড?”
প্রশ্নটা প্রৌঢ়কে করতেই তিনি বললেন, “ইয়েস, উই শুড ফলো মিঃ রুদ্রাস প্লেন লেটস গো
এগোতে লাগলেন দুজনেই ভি.আই.পি. হেলিপ্যাডের দিকে সিকিউরিটিরাও তাঁকে দেখে আড়ম্বরে স্যালুট ঠুকল দেখে বোঝা গেল বেশ মাননীয় কোনও ব্যক্তি এই প্রৌঢ় হ্যাঁ, ইনিই ওমর শেখ এবার ডেস্টিনেশন কায়রো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট

সাহারা!

গাড়ির ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙল প্রখরবাবুর নিজেকে একটা ভ্যানের মধ্যে আবিষ্কার করলেন তিনি তাঁর সঙ্গে রয়েছে আরও পাঁচজন লোক
প্রখরবাবু দেখলেন তাঁকে বাঁধাও হয়নি, শুধু স্মার্টফোনটা কেড়ে নেওয়া হয়েছে ঘড়িতে ভারতীয় সময় দেখলেন ভোর পাঁচটা কী ব্যাপারটা হল! ভোর পাঁচটা! এতক্ষণ কোথায় ছিলেন তিনি? গাড়িতে একটা গন্ধে ঘুমিয়ে পড়া অবধি তাঁর মনে আছে তারপর কী হল? এরাই বা কারা? বন্ধু না শত্রু? কোথায় যাচ্ছেন তিনি এখন? প্রশ্নের চোটে মাথা ভার হয়ে উঠল
অগত্যা কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেললেন, “হেই, হুইচ প্লেস ইট ইস?”
উত্তর এল, “কায়রো, ইজিপ্ট
যাক, তাহলে এদের কথা বলতে আপত্তি নেই তাহলে দু-চারটে প্রশ্ন করা যেতে পারে তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, “হোয়্যার আর উই গোয়িং?”
সাহারা শেখ--ওয়েসিস
হুম আর ইউ ওয়ার্কিং ফর?”
ওমর শেখ
হোয়্যার ইজ হি নাও? ইউ ব্রট মি হিয়ার ফ্রম জেড্ডা, মেকিং মি আনকনশাস ওয়াজ হিজ অর্ডার!”
ইয়েস
আই ওয়ান্ট টু মিট উইথ হিম রাইট নাও
উই উইল বি অ্যাট আওয়ার ডেস্টিনেশন উইদিন ওয়ান অ্যান্ড হাফ আওয়ার দেন ইউ ক্যান মিট উইথ হিম
ক্যান আই হ্যাভ মাই ল্যাপটপ অ্যান্ড স্মার্টফোন ব্যাক?”
সরি উই হ্যাভ নো অর্ডার
এবার প্রখরবাবু রেগে গেলেন মামদোবাজী নাকি! অর্ডার নেই মানে! সামনে রাখা আছে দেখছেন, তবুও নিতে পারবেন না! প্রখরবাবু নিজে এগিয়ে গেলেন স্মার্টফোনটা তুলে নিতে এবার সবাই মিলে লাফিয়ে উঠল তাঁকে আটকানোর জন্য ভ্যানের মধ্যে প্রায় একরকম খন্ডযুদ্ধ লেগে গেল বেশ খানিকক্ষণ চলার পর যে লোকটি এতক্ষণ তাঁর সঙ্গে কথা বলছিল, সে একটা রিভলভার প্রখরবাবুর দিকে তাক করে বলল, “হেই মিস্টার, ইউ উইল গেট রিটার্ন ইওর বিলংগিংস অ্যাট রাইট টাইম নাও বি সাইলেন্ট ডোন্ট মেক মি টু শুট
প্রখরবাবু বুঝলেন, ঝামেলায় পড়েছেন চুপ করে বসাই ভালো

ওমর শেখ

ভ্যানটা আরও প্রায় ঘন্টা খানেক চলার পর অবশেষে একটা মরুদ্যানের সামনে এসে থামল থামার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় রাজার মতো প্রখরবাবুকে আপ্যায়ন করে ভেতরে নিয়ে যেতেই সেই জেড্ডা এয়ারপোর্টের বৃদ্ধের গলা ভেসে এল, “প্লিজ মিঃ রুদ্র, কাম ইন
প্রখরবাবু একটু হকচকিয়ে গেলেন ব্যাপারটা কী? সাসপেক্টের বাড়িতে এরকম অভ্যর্থনা! বৃদ্ধ বলে চললেন, “এভাবে আপনাকে আনার জন্য দুঃখিত আসলে ফারুখ আমারই লোক, কিন্তু ওর ওপর অর্ডার ছিল যেন জেড্ডায় না পৌঁছোনো অবধি আপনার সঙ্গে কথা না বলে তা আপনি আবুধাবিতেই বেচারাকে এমন কাবু করলেন যে সে আর আসতেই চাইল না কাজেই আমাকে প্ল্যান পাল্টাতে হল
এবার প্রখরবাবু মুখ খুললেন, “আপনি এত ভালো বাংলা বলেন?”
ওই একরকম আঠেরোটা ভাষা শিখেছিলাম বাংলা তারই মধ্যে একটা
তা বেশ, কিন্তু এভাবে ধরে আনার কারণ কী?”
ঐ যে বললাম, এছাড়া আর কোনও রাস্তা ছিল না
তা আমার জিনিসপত্র, বিশেষত আমার ল্যাপটপ আর ফোন ফেরত পেতে পারি কি?”
জরুর জরুর আপনার সব জিনিস গেস্ট রুমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেখানে চলে যান, ফ্রেশ হয়ে নিন ঘন্ট দুয়েক বাদে আমার লোক আপনাকে নিয়ে আসবে তারপর সব বলব যে কেন আপনার সঙ্গে আমি কথা বলতে ইচ্ছুক
প্রখরবাবু বেরিয়ে এলে একজন স্থানীয় ভৃত্য ওকে নিয়ে গেল গেস্ট রুমে
ইফ এনিথিং রিকয়ার্ড, কাল মি বোয়ানা আই অ্যাম ডিয়েগোগেস্ট রুমে পৌঁছে দিয়ে এই কথা বলে সে চলে গেল
প্রখরবাবু ঠিক করলেন, এসব ঘটনা আগে প্রদোষবাবুকে জানানো দরকার ল্যাপটপে ইন্টারনেট ফেল হলেও ফোনে দেখলেন ওয়াই-ফাই কানেকশন করে দেওয়া হয়েছে ওমর শেখের চ্যালারাই করে দিয়ে গেছে হয়তো নাহ্‌, ফোনটাতে এবার প্যাটার্ন লক চাপাতে হবে কে জানে পুরো ঘেঁটেছে কি না ফোনটাকে যাক গে, আগে প্রদোষবাবুকে সব জানানো যাক স্মার্টফোনে জি-মেল খুলে টাইপ করা শুরু করলেন তিনি

অঙ্ক গুলিয়ে গেল

যথাসময়ে এসে প্রখরবাবুকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হল ওমর শেখের কাছে প্রখরবাবু এসে পৌঁছোতেই ওমর শেখ বললেন, “জানি প্রখরবাবু, জানি আপনার মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছে প্লিজ অ্যালাও মি টু এক্সপ্লেন আমি জানি, পোচকানওয়ালা আমার নামে আপনাকে কী বলেছে বলেছে যে আমি ওকে বিজনেস ছেড়ে দিতে হুমকি দিয়েছি কী? তাই তো?”
প্রখরবাবু থ কী জাতীয় লোক রে বাবা! নিজের কীর্তি আবার ফলাও করে বলছে!
ওমর শেখ বলে চললেন, “ব্যাপারটা ঠিক আমি স্বীকার করছি কিন্তু কারণটা অন্য পোচকানওয়ালা অসৎ বিজনেস করতে এসে বিভিন্নভাবে মানুষকে ঠকায় আমি ওকে একবার নয়, তিন-তিন বার ভালো করে বুঝিয়েছি যে অসৎভাবে ব্যাবসা হয় না আমার বয়স হয়েছে কুছ তো এক্সপেরিয়েন্স হ্যায়! ইয়ে তো মানেঙ্গে না আপ! আমার কথায় কানই দেয়নি সে
সেই জন্য তাঁর ছেলেকে কিডন্যাপ করলেন আপনি?” প্রখরবাবু বাধা দিয়ে বললেন
শুনেই ওমর শেখ খেপে গেলেন, “ক্যায়া? অ্যায়সা বোলা হ্যায় উওহ? সত্যি করে বলুন তো মিঃ রুদ্র, আপনি ওকে উদ্ধার করতেই এসেছেন কি না?”
আপনার ভাবনা নির্ভুল
তার মানে পোচকানওয়ালা আপনাকেও বেওকুফ বানিয়েছে প্রকাশ! এ প্রকাশ!”
একটি বছর তেইশ বয়সের ছেলে ভেতরে ঢুকল তাকে দেখিয়ে ওমর শেখ বলতে শুরু করলেন, “মিলিয়ে ইসসে প্রকাশ পোচকানওয়ালা আপনার ক্লায়েন্টের মিসিং সান এবার আপনার ডিটেকটিভ সেন্স কী বলে? যে আমার বন্দী হবে তাকে আমি এভাবে খোলা ছেড়ে দেব?”
প্রখরবাবু অপ্রস্তুত আমতা আমতা করে বললেন, “তাহলে আমাকে এভাবে পাঠানোর মানে কী?”
বুঝিয়ে বলছি বসুন
ওমর শেখ যা বললেন তা মোটামুটি এই -
তিনি আগেই বলেছেন, পোচকানওয়ালা অসৎ কিন্তু তাঁর ছেলে ভারি ভালো বাবা যখন তার হাতে ব্যাবসার দায়িত্ব দিতে চাইলেন, সে নিলও কিন্তু ক্রমে ভেতরে ঢুকে বাবার কীর্তি বুঝতে পারল সে বাবাকে অনেকবার বোঝায়, কিন্তু পোচকানওয়ালা নিজের সিদ্ধান্তে অটল অগত্যা আমাদের কাহিনি যেখান থেকে শুরু হয়েছে তার আগেরদিন বাপ-ছেলেতে চরম ঝগড়া হয় যার ফলে পরেরদিন প্রকাশ এখানে চলে আসে বড়োলোক বাপের ছেলে হাতে টাকাও ছিল পুরো এক কাপড়ে এখানে এসে ওমর শেখকে সবকথা খুলে বলে তাতে ওমর শেখ সঙ্গে সঙ্গে নিজে পোচকানওয়ালাকে সব জানান তাতে তিনি প্রখরবাবুকে রিক্রুট করে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন - এক, ছেলেকে ফেরানো, দুই, প্রখরবাবুর ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে ওমর শেখকে জেলে পাঠিয়ে নিজে মার্চেন্ট কিং হয়ে বসা
কাহিনি শেষ করে ওমর শেখ বললেন, “সব গুলিয়ে গেল তো?”
হুম আমাকে একটু সময় দিন আমি আপনাকে আজ রাতে জানাব আমার সিদ্ধান্ত
মানে ইন্ডিয়ান টাইমে?” ওমর শেখের মুখে কৌতুকের হাসি
মনে মনে অপ্রস্তুত হলেও সেটা বুঝতে না দিয়ে প্রখরবাবু উঠে পড়লেন মুখে হাসি রেখে বললেন, “রাত আটটা ইন্ডিয়ান টাইম

নৈতিক মন্ত্রণা

ঘরে এসে প্রখরবাবু মেল খুলে দেখলেন প্রদোষবাবু মেল করেছেন তাতে কোনও আপডেট না দেওয়ার জন্য যেমন প্রখরবাবুকে বকাবকি করেছেন, সেই সঙ্গে বলেছেন মেল চেক করে সঙ্গে সঙ্গে খবর দিতে খবর না পাওয়া অবধি তাঁর মেল আই-ডি সবসময় থাকবে
প্রখরবাবু টাইপিং শুরু করলেন প্রায় ঝাড়া একঘন্টা ধরে সব ঘটনা টাইপ করে লিখে পাঠালেন তার প্রায় আধঘন্টা বাদে প্রদোষবাবু রিপ্লাই দিলেন, “হুম
এরপর যে কথোপকথনটা হল, সেটা কথোপকথন আকারেই লিখছি
কী বুঝলেন?”
বুঝলাম যে ওমর শেখ কোনও মিথ্যে বলছে না
কী করে বুঝলেন?”
ওর কথায় একচুল ফাঁক পাইনি প্রত্যেকটা কাজের জন্য একটা করে নির্দিষ্ট কারণ ছিল
এবার আমি কী করব?”
মহাভারতে একটা কথা বলা হয়েছিল, ধর্মের জয় হোক এখানেও তাই হবে
বুঝলাম না
পোচকানওয়ালা তোমাকে বলেছে ওঁর ছেলে ফিরিয়ে দিতে তাই তো?”
হ্যাঁ
তুমি কীভাবে তাকে ফিরিয়ে আনবে সেটা তোমার ব্যাপার নাকি তিনি বলেছেন ওমর শেখকে পুলিশে দিতে?”
না তা বলেননি
ফাইন তাহলে তুমি ওঁকে ওঁর ছেলে ফিরিয়ে দাও
কিন্তু কাজটা কি ঠিক হবে? আপনার কথার খেই রাখতে গেলে বলতে হয় আমি তো সেই অধর্মেরই সাপোর্ট দিচ্ছি!”
আহ্‌! তুমি বড্ড ছটফট করো এইজন্যেই মুশকিলে পড়ে যাও শোনো পোচকানওয়ালা তোমাকে রিক্রুট করেছেন তাঁর ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু তারপর সে যদি আবার কায়রোতে চলে আসে, তাহলে তোমার কিছুই করার নেই
বাহ্‌! দারুণ বুদ্ধি তো! যাই, ওমর শেখকে বলি গিয়ে
দাঁড়াও আবার হড়বড় করছ তুমি কী ভাবছ? ব্যাপারটা এতটাই সোজা? ছেলে তোমার সামনে দিয়ে সটকে পড়ল, তুমি বাধাও দিলে না, মক্কেলের হুকুম তাকে ফের ধরে আনার, তাও মানলে না, মক্কেল ছেড়ে দেবে? প্রাণসংশয় হয়ে যাবে যে! তাছাড়া ছেলেটি যে আবার কায়রোতে ফিরবে, তার টাকাটা যোগাবে কে? তুমি?”
তাহলে?”
শোনো, ওমর শেখকে গিয়ে এই ব্যাপারটা বলবে তাঁর কোলকাতার চরদের কাছে নিশ্চয়ই পোচকানওয়ালার বিরুদ্ধে প্রুফ রয়েছে! তারা যেন সেগুলো নিয়ে গিয়ে বিধাননগর ইস্ট থানার ওসি চৌধুরীকে দেয় আমি ওকে বলে রাখব যেন অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট রেডি রাখে কারণ, প্রুফগুলো জেনুইন এদিকে তোমরা, মানে তুমি আর ওই জুনিয়র পোচকানওয়ালা, কাল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতায় ইন করবে
ফ্লাইট টাইম?”
এত বোকা কেন? ওমর শেখের চপারটা কাজে লাগাও আমি চৌধুরীকে বলে রাখব যেন তোমাদের ট্যাক্সিতে দমদম থেকে ফলো করে জুনিয়র পোচকানওয়ালা বেরিয়ে এলে পুলিশ ঢুকবে বাড়িতে বাকি রয়ে গেল তোমাদের সেফটি পারিজাতকে মনে আছে?”
কে পারিজাত? পারিজাত বক্সী? ব্যোমকেশ বক্সীর ভাইপো?”
হ্যাঁ, হ্যাঁ ওই বুড়ো হাড়ে এখন অস্ত্রের ব্যাবসা ধরেছে লাইসেন্সড যদিও ওর সঙ্গে যোগাযোগ করো কাল এয়ারপোর্ট থেকে বেরোনোর পর ওর কাছ থেকে দুটো বেরেটা নেবে একটা ফুল লোডেড, সেটা তোমার জন্য আর অন্যটায় শুধু কার্তুজ ভরা থাকবে সেটা তোমার মক্কেলপুত্রের জন্য বুঝলে?”
একটা প্রশ্ন এখান থেকেই তো নিয়ে যেতে পারি আমি
পারো, কিন্তু কাস্টমস ধরবে না? লাইসেন্স সঙ্গে করে নিয়ে গেছ তুমি? ওই ছেলেটার লাইসেন্স আছে? মাথায় ছোটোখাটো ফ্যাক্টগুলো কবে আসবে?”
তাই তো, এটা তো ভেবে দেখিনি
কিছুই ভেবে দেখো না আমি চললাম, যোগাযোগ রেখো হুটপাট করে কিছু করবে না আর পারিজাতের সঙ্গে এখনই যোগাযোগ করো এই সময়টা ও অনলাইন থাকে
প্রদোষবাবুর নামের পাশে সবুজ বাতি নিভে গেল প্রখরবাবু নতুন মেল-আইডি টাইপ করা শুরু করলেন, পি--আর-আই...

কলকাতাতে ধুন্ধুমার

ওমর শেখের অনুমতি পেতে বেশিক্ষণ লাগেনি তবে তিনি বলেছিলেন যে প্রাইভেট চপার ওয়েট করবে প্রকাশকে নিয়ে আসার জন্যে সময়মতো তাঁর কলকাতার লোক এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাবে থানায় তাকে সবাই চেনেও কারণ, সেই যাবে পোচকানওয়ালার বিরুদ্ধে প্রুফ নিয়ে প্রখরবাবুর পরিকল্পনা ও নিখুঁত সময়জ্ঞানের জন্য প্রায় কাঁটায় কাঁটায় সকাল দশটায় পরেরদিন প্রাইভেট চপার ল্যান্ড করল দমদম এয়ারপোর্টে
পারিজাত বক্সীও এককথায় রাজি হয়ে গেছিলেন টাকাপয়সার কথা জিজ্ঞাসা করতেই জিভ কাটা স্মাইলি পাঠিয়ে বললেন, “অনেকদিন গোয়েন্দাগিরির সঙ্গে যোগাযোগ নেই, আবার তার অংশ হতে পেরেছি, এটাই আমার পারিশ্রমিক
কাস্টমসের ঝামেলা পেরিয়ে বাইরে আসতেই প্রথম দেখা হল পারিজাত বক্সীর সঙ্গে তিনি নিজে এসেছিলেন বন্দুক দেওয়ার জন্য প্রখরবাবুর হাতে একটা দিয়ে বললেন, “এটা ফুললি লোডেড
আর অন্যটা প্রকাশ পোচকানওয়ালার হাতে দিয়ে বললেন, “হ্যান্ডল উইথ কেয়ার, মাই চাইল্ড নো ফিয়ার, দিস ওনলি কনটেইন দ্য গান পাউডার
তাকে সেফটি ক্যাচ ইত্যাদি খোলাও শিখিয়ে দিলেন এরপর প্রখরবাবুর দিকে ফিরে বললেন, “ওসি চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তোমার প্ল্যানমতোই ব্যাপারটা যাবে, কিন্তু একটা জায়গা আমি একটু বদল করেছি মাস্টার পোচকানওয়ালা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুলিশেরই একটা গাড়িতে এখানে ফিরে আসবে সেই সময় ও বন্দুকটা যেই থাক গাড়িতে তাকে দিয়ে দেবে সেটা পরে যদিও তোমার কাছেই রিটার্ন আসবে, তারপর তুমি আমায় দুটো বন্দুক একসঙ্গে ফেরত দিও
প্রখরবাবু হেসে পারিজাত বক্সীকে বিদায় দেওয়ার পরই দেখা গেল দুজন ভদ্রলোক প্রখরবাবুকে দেখে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছেন ওসি চৌধুরীকে দেখে প্রখরবাবু এগিয়ে গেলেন
ওয়েলকাম হোম মিঃ রুদ্র,” চৌধুরী বললেন, “মিট মাই কলিগ, সাব-ইন্সপেক্টর শ্রীবাস্তব আপনি যে ট্যাক্সিতে যাবেন তার পেছনেই আমাদের মারুতি আপনাকে ফলো করবে অলরেডি পোচকানওয়ালার ম্যানসনের আশেপাশে ও ভেতরে আমাদের লোক চলে গেছে প্রকাশবাবু বেরিয়ে এলে ম্যানসন থেকে শ্রীবাস্তব ওকে এসকর্ট করে নিয়ে যাবে দমদম এয়ারপোর্ট সেখানে ওমর শেখের লোকের হাতে ওকে তুলে দিয়ে তবে ওর ছুটি সেরকমই কথা হয়েছে
বেশ, তবে শুরু করা যাক অভিযান,” বলে প্রখরবাবু ট্যাক্সি ডাকলেন
যতক্ষণে তাঁরা সল্টলেক পৌঁছুচ্ছেন সেই ফাঁকে বলে রাখা ভালো, পোচকানওয়ালা জানেন যে প্রখরবাবুরা আসছেন প্রখরবাবুরা বলতে প্রখরবাবু আর প্রকাশ তিনি নিজেই আনতে যাবেন বলেছিলেন, কিন্তু এয়ারপোর্টে হুজ্জতি হবে এই ভেবে প্রখরবাবু বারণ করেন

প্রখরবাবু পৌঁছতেই দরজা খুললেন পোচকানওয়ালা নিজেআইয়ে প্রখরবাবু, আইয়ে,” বলে খুব আপ্যায়িত করলেন
ভেতরে গিয়ে বসতেই প্রখরবাবু বললেন, “এই নিন মিঃ পোচকানওয়ালা, আপনার পুত্র এবার পালালে আর আমার দায়িত্ব নেই
জী, জরুর জরুর এ গিরধারী, এ লোচন, সবহি কো লেকে আ,” বলে পোচকানওয়ালা হাঁক দিতেই ভেতর থেকে প্রায় পালোয়ানসম ছজন লোক বেরিয়ে এল তিনি প্রকাশকে দেখিয়ে বললেন, “ইসে বান্ধকে ঘর মে রখ দে, কহি ভাগনে ন পায়
সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ তার বন্দুক বার করে বলল, “কোই আগে ন আনা তো জান চলি যায়েগি পিতাজী, পিছলিবার ন বাতা কর গ্যয়া থা, ইসবার বাতা কর হি যা রহা হুঁ ম্যায় কায়রো যা রহা হুঁ, যব সুধরেঙ্গে তব লওটুঙ্গা
পোচকানওয়ালা থ প্রখরবাবুর চোখেমুখে প্রশংসা অসাধারণ টাইমিং! পোচকানওয়ালা বললেন, “ইয়ে ক্যয়া! প্রখরবাবু, পকড়িয়ে উসে
আমি তো বলেইছিলাম, এবার বেগড়বাঁই করলে আমার দায়িত্ব নেই তবে ও তো চলে যেতে চাইছে হি ইজ এ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া সেক্ষেত্রে আপনি ওকে আটকালে অ্যাজ অ্যানাদার রেসপন্সিবল সিটিজেন, আমি আপনাকে আটকাব
প্রকাশ বেরিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু সেই সময় কেউ একজন ওকে লাঠি দিয়ে মারতে গেল বেচারা জানত না যে প্রখরবাবুর হাতেও রিভলবার চলে এসেছে তাঁর নিখুঁত শুটিংয়ে সে হাত চেপে বসে পড়ল
প্রকাশ বেরিয়ে যাওয়ার পরও পোচকানওয়ালা বেশ হম্বিতম্বি করছিলেন ওসি চৌধুরী এসে পড়ায় হতভম্ব হয়ে গেলেন প্রখরবাবু বললেন, “আর কেন, মিঃ পোচকানওয়ালা? বুঝতে তো পারছেনই যে ফাঁদে পড়েছেন
এবার শিশুর মতো হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন পিলু পোচকানওয়ালা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ঠিক হ্যায়, ম্যায় কনফেস করতা হুঁ ইয়ে সব মেরা হি কিয়া করায়া হ্যায় মেরে লিয়ে হি মেরা বেটা মেরে এগেনস্ট মে গ্যয়া মেরি বিবি কো কাল বতানা হি পড়া কি পরকাশ কাঁহা হ্যায়, উওহ ভি সুন কর মুঝে দোষ দেতে হুয়ে চলি গ্যয়ি
কেঁদেই চললেন পোচকানওয়ালা প্রখরবাবুর আর কোনও কাজ নেই, যা করার এবার পুলিশই করবে তিনি আস্তে আস্তে নেমে চললেন গ্রাউন্ড ফ্লোরের দিকে
_____
অলঙ্করণঃ বিশ্বদীপ পাল

1 comment: