ছড়াঃ ডাকাতকালীর মাঠে // মানসী পাণ্ডা



ডাকাতকালীর মাঠে

মানসী পাণ্ডা


পালকি চড়ে বউ চলেছে হুহুম-নানার তালে,
লাঠি হাতে বর মহাশয় সামনে পা যে ফেলে
ছয় বেহারার মস্ত তাড়া তড়বড়িয়ে হাঁটে,
আঁধার যেন না নামে ভাই ডাকাতকালীর মাঠে
তাদের সাথী দুই পেয়াদার চোখে তরাস মাখা,
আজ না জানি কপালেতে কী যে আছে লেখা!
মাঠটি ঘেঁষে কালো-দিঘি ছলাৎ ছলাৎ ডাকে,
মিটিয়ে নাও গো তৃষ্ণা ক্ষুধা, বর মহাশয় হাঁকে
ছুঁয়েছে কি ছোঁয়নি মাটি পালকি সমেত বউ,
ঝোপের আড়ে হা রে রে রে ডাক ছাড়ল কেউ
বিশ ডাকাতের হুঙ্কারেতে পড়ল তারা ঘেরা,
হায় রে কপাল আজ বুঝি আর ঘর হল না ফেরা!
ছয় বেহারার পায়ে ছিল না জানি কী বাঁধা,
এক লহমায় উধাও হল মাঠ পেরিয়ে সিধা
পেয়াদা দুই শয্যা নিল আঁকড়ে ধরে মাটি,
বর মহাশয় কাঁপতে থাকেন ফেলে হাতের লাঠি
চক্ষু রাঙা ডাকাত হাঁকে সময় মোদের নাই,
গয়নাগাটি, পয়সাকড়ি সকল কিছু চাই!
একটুখানি বিরোধ যদি করিস মোদের সাথে,
সাঙ্গ হবে তোদের জীবন, সুয্যি যাবে পাটে
এমন সময় পালকি ছেড়ে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে,
নামল ধীরে গয়নামোড়া শ্যামলা একটি মেয়ে
বেনারসি জড়ানো এক খেলাঘরের পুতুল,
কাজলকালো ডাগর চোখ আর খোঁপায় বাঁধা চুল
ডাকাত সবে উঠল হেসে হা হা হা হা রবে,
ডাকাতকালীর ভোগ তবে আজ এই বালিকাই হবে
থমকে গেল বিশ্ব ভুবন বাতাস হল স্থির,
অচল অনড় বরের বুকে বিঁধল ব্যথার তির
ভাঙল কন্যা নীরবতা ক্রুদ্ধ-দীপ্ত স্বরে,
স্পর্ধা তোদের কম নয় তো, দাঁড়াস উচ্চশিরে!
আমার বাবা জোড়াদিঘির রামনারায়ণ রায়,
তাঁর দাপটে বাঘ আর গরু একঘাটে জল খায়
বাবার দাপট সেথা কন্যা, হেথায় শুধু ফাঁকি
চড়াব আজ বলি তোমার বাঁচায় কে বা দেখি!
বদ্ধমুষ্টি কন্যা এখন আগুনরঙা রূপ,
তুলল লাঠি মাথার উপর, ডাকাতরা সব চুপ
বিদ্যুদ্বেগে ঘটে গেল কী যে অলৌকিক,
মেয়ের হাতে ঘুরল লাঠি, ডাকাত চতুর্দিক
ভেঙে পা-হাত, ফাটিয়ে মাথা পড়ল মেয়ের পায়ে,
দোষ করেছি, কর্ মা ক্ষমা, পাপিষ্ঠ সব ছায়ে
ডাকাতকালীর মাঠের পরে একটুখানি গিয়ে,
ডাকাতরা সব পালকি কাঁধে এগোয় মাকে নিয়ে
পালকি চড়ে বউ চলেছে শ্বশুরবাড়ির পথে,
বুক ফুলিয়ে বর মহাশয় চলল পাশে হেঁটে
_____

অলঙ্করণঃ শুভ্রদীপ চৌধুরী

6 comments: