গল্পঃ ভূতের নাম হারু মন্ডলঃ শুভ্রদীপ চৌধুরী




মাদারগঞ্জ হাটে একটা ভয়ংকর কাণ্ড হল।
রোজকার মতো রবিবারের হাট সকাল থেকেই গমগমে ছিল। দুপুরের দিকে সবে ঝিমিয়ে এসেছে, ঠিক তখন নগেন মুদির দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল হারু মন্ডল। আগের মতো তার বাঁহাতে ঢাউস ব্যাগ আর ডানহাতে লম্বা ফর্দ।
নগেন সবে বাড়ি থেকে আনা ভাত, মাছের ঝোল বের করে খেতে বসেছে, এমন সময় সামনে হারু মন্ডলকে দেখে তার শরীর কাঁপতে লাগল, গলা শুকিয়ে এল। সে ফ্যাসফ্যাসে গলায়, “ভূত, ভূত,  ভূ-উ-ত” বলে চেঁচাতে শুরু করল।
আশ্চর্য কাণ্ড, সঙ্গে সঙ্গে হারু মন্ডল মিলিয়ে গেল!
হারু মন্ডল মাস খানেক আগে এক দুপুরে মারা গেছেন। সেদিনটাও ছিল রবিবার, হাটবার। হাটে আসবার জন্য তার ঢাউস ব্যাগ আর ফর্দ নিয়ে রওনা হয়েছিল, পৌঁছুতে পারেনি। সেই মৃত মানুষ দুম করে হাটে এসে হাজির হলে যা যা হতে পারে তাই হল।
সুবল নাপিত সকাল থেকে আটান্নটা জনের দাড়ি আর এগারো জনের চুল কাটার পর হাত ফাঁকা হতেই ভাবল নিজের দাড়িটা এবেলায় কেটে ফেলা যাক। সেই কাজেই সে ব্যস্ত ছিল। ঠিক সে সময় হারু মন্ডল তার সামনে এসে বলল, “তা গোঁফটা সরু করে ফেললে যে সুবল।”
গলা শুনে সুবলের হাত কেঁপে গেল। ফলে ডান পাশের গোঁফের কোনও চিহ্ন আর থাকল না। সে অবস্থায় সামনে হারু মন্ডলকে দেখে সে পড়িমরি করে দৌড় দিল।
শ্যামল ঘোষ গরম গরম জিলিপির উপরে ঠাণ্ডা জিলিপি মিশিয়ে রাখছিল খদ্দের নেই দেখে। দুম করে সামনে ভারী গলায় কে যেন বলল, “কাজটা কি ঠিক হচ্ছে?”
সামনে তাকাতেই শ্যামল ঘোষ দেখল তার সামনে আর কেউ নয়, হারু, হারু মন্ডল!
শ্যামল ঘোষ জ্ঞান হারাল।
এসব খবর চারদিকে ছড়িয়ে গেল। হাট কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁকা হয়ে এল। সন্ধের পরও যে হাট গমগম করত তা এখন অন্ধকারে ঢাকা। একটা মাত্র দোকানে শুধু টিমটিম করে জ্বলছে লন্ঠন। হারু মন্ডলের হাসি পেল। খুব হাসল। দুনিয়া থেকে সাহসী মানুষ শেষ হয়ে গেছে। লজ্জা লাগে। ছিঃ! ভূত হতে পারে, কিন্তু কাউকে ভয় দেখানোর মতো ছোটোখাটো কাজে বিশ্বাস নেই। বেঁচে থাকতে যেমন একজন ভালো মানুষ ছিল, ঠিক তেমন ভালো ভূত হয়েই থাকবে। সে উড়ে গিয়ে দাঁড়াল একমাত্র আলো-জ্বলা দোকানটার সামনে। দেখল, চায়ের দোকান। একটা বাচ্চা ছেলে চায়ের কাপ মাজছে। বয়স বড়োজোর দশ-বারো হবে। হারু মন্ডল তার সামনে গিয়ে বলল, “চা হবে?”
ছেলেটি মুখ না তুলেই বলল, “না, হবে না।”
ছেলেটা তার দিকে একবারও তাকাল না দেখে হারু মন্ডল অবাক হল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আবার হারু মন্ডল বলল, “আজ হঠাৎ হাট উঠে গেল যে!”
ছেলেটি এবার মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “ভূত বেরিয়েছে।”
“তা তুমি ভয় পাও না?”
“কীসের?”
“ভূতের!”
“না, আমি ভয় পাই না।”
“কেন?”
“বাবা বলেছে এসব ভূত-টুত সব বাজে কথা।”
“বাজে কথা! ধরো, এখন আমি যদি তোমায় প্রমাণ করে দিই যে ভূত আছে! তবে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবে? দেখবে, কেমন করে আমি মিলিয়ে যেতে পারি? ভয় পাবে না তো?”
“আমি ভয় পাই না।”
“এই দেখো আমি কেমন মিলিয়ে যাচ্ছি!”
হারু মন্ডল সত্যি সত্যি মিলিয়ে গেল।
আশ্চর্য! ছেলেটি একদম অবাক হল না! সে আবার একমনে চায়ের কেটলি মাজতে লাগল। শুধু তাই নয়, বিড়বিড় করতে লাগল, “কাজের সময় এসে কিছু মানুষ এমন জ্বালাতন করে! বাবা আসার সময় হয়ে এল। এখনও কত কাজ বাকি! মিলিয়ে গেছে বেশ হয়েছে। থাকলেই বকবক করত। কিছু মানুষ এমনই হয়, কাজ নেই শুধু বকবক করে যায়। বাবা বলেন, কথা কম, কাজ বেশি।”
এতটুকু পুঁচকে একটা ছেলে আস্ত একটা মানুষ মিলিয়ে গেল তবুও অবাক হল না! এও সম্ভব! ভেবে হারু মন্ডল কূলকিনারা পেল না। ছেলেটির চোখেমুখে ভয়ের চিহ্ন নেই।
পরীক্ষা করবার জন্যই আবার বলে উঠল, “আমি কিন্ত চলে যাইনি। মিলিয়ে গিয়ে দেখছি তোমায়। শুনতে পাচ্ছ?”
ছেলেটি এবার বিরক্ত হল। রাগ রাগ গলায় বলল, “ওসব মিলিয়ে যাওয়া জাদু আমি অনেক দেখেছি। আমার দোকানে তিনজন বড়ো বড়ো জাদুকর চা খেতে আসে। তাদের একজনের বাকি বেশি হলেই আমায় জাদু শেখায়। ফুলের রঙ বদল, ভৌতিক বল, মোমবাতি রহস্য, ডিমের নাচ, জ্যান্ত ছবি...  এমন কত খেলা শিখেছি! এসব মিলিয়ে যাওয়া জাদু দেখিয়ে আমায় চমকে দিতে পারবে না।”
হারু মন্ডল হতাশ হল। যা যা করবে, এই ছেলেটি ভাববে, জাদু! সে খানিকটা হেরে যাওয়া গলায় বলল, “ডিমের নাচটা কেমন করে হয়?”
“ওটা আপনি জানেন না? তবে শুনুন। প্লেটে ডিম নিয়ে মন্ত্র পড়লেই ডিম নাচতে শুরু করে। মন্ত্রটা হল,
এক দুই তিন।
ধিন ধিন ধিন।।
তিন চার পাঁচ।
শুরু ডিমের নাচ।।
“অসম্ভব! এই মন্ত্রে নাচতেই পারে না। নিশ্চয়ই কিছু কারসাজি আছে যা তোমাকে বলেনি জাদুকর।”
“বলেছে। এর জন্য ইলেকট্রিক হিটার, টেবিল আর পারদ লাগবে। এর বেশি বলে দেওয়া ঠিক হবে না।”
“ভয় নেই, আমি জাদুকর নই। কৌতূহল হল তাই জানতে চাইছি।”
ছেলেটি বলল, “আপনি খুব বকবক করতে পারেন। যান। অন্য সময় বলব। আজ নয়। এক্ষুনি বাবা চলে আসবে। এসে আপনার সঙ্গে কাজ ফেলে গল্প করছি দেখলে মনখারাপ করবে। বাবা বলেন, হাতের কাজ ফেলে রাখবি না। ওদিকে মা একা বসে আছে।”
হারু মন্ডল বলল, “তোমার বাবা কি প্রতিদিন তোমায় নিতে আসেন?”
“না, নিতে আসেন না। দেখতে আসেন। এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখেন। দুয়েকটা কথা বলেন, তারপর চলে যান।”
“কোথায় যান?”
“যেখান থেকে আসেন।”
“মানে?”
“এই দোকানটা বাবা তৈরি করেছিলেন। আমি হাটের দিনগুলোতে আসতাম। বয়াম থেকে বিস্কুট বের করে খেতাম। বাবা গুনগুন করে গান করতেন। আমার খুব ভালো লাগত।”
“তারপর?”
“একদিন বাবার খুব জ্বর হল। হাসপাতাল থেকে আর বাবা ফেরেননি। এরপর আমি এই দোকানটা চালাই। কত কে ভয় দেখাতে আসে। কেউ বলে দোকানঘর তুলে দেব, কেউ চা খেয়ে বলে পয়সা দেব না, কেউ টাকা চায়।
“এইরকম একরাতে দোকানে বসে খুব কাঁদছিলাম, তখন বাবা এসেছিলেন। এসেই বললেন, আমি সবসময় তোর সঙ্গে আছি ভাববি। প্রতি রাতে দোকান বন্ধের আগে আসব। কাউকে ভয় পাবি না। মনে রাখবি, ভয় পেলে ভয় পেতেই থাকবি। দেখছেন, কেমন ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে? বাবা আসবার আগে এমনটা হয়। আপনি যান।”
ছেলেটির কথা শুনে হারু মন্ডল আর অদৃশ্য থাকতে পারল না। ফিরে এল আগের মতো। ছেলেটির আপত্তি না শুনে দুধ জ্বাল দেওয়া বড়ো কড়াইটা ঘস ঘস করে মাজতে বসল।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ শুভ্রদীপ চৌধুরী

1 comment: