গল্পঃ অশরীরীঃ পিনাকী মুখোপাধ্যায়



রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বাসটা যখন বোলপুর-ইলামবাজার হাইওয়ের ওপর বনভিলা স্টপেজে নিশীথকে নামিয়ে দিল তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তার একটা আলোও জ্বলছে না। ছাতাটা খুলতে খুলতেই আধভেজা হয়ে গেল নিশীথ। বাসটা চলে যেতে ঘন অন্ধকার যেন চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
হাই মাইনাস পাওয়ারের চশমাটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছে বৃষ্টির ছাঁটে। পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমাটা মুছতে গিয়ে দেখল রুমালটাও ভিজে গিয়েছে। কোনওরকমে কাঁচদুটো পরিষ্কার করার পরেও অতল অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই ঠাওর হল না।
তখনই বিদ্যুতের আলোয় চারদিক এক লহমার জন্য আলোকিত হয়ে উঠল। নিশীথ দেখল, হাইওয়ে থেকে বাঁদিকে একটা ছোটো পিচের রাস্তা চলে গিয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি ঝাঁপ-বন্ধ দোকানপাট চোখে পড়লেও কোথাও কোনও লোকজন নজরে এল না।
নিশীথের মনে হল, ঝোঁকের মাথায় এভাবে চলে আসাটা মোটেই বুদ্ধিমানের মতো কাজ হয়নি। কোম্পানির নতুন একটা প্রজেক্টের কাজ দেখতে বোলপুরে এসেছিল সে। কাজ সেরে হোটেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধে উতরে গিয়েছিল। আকাশ জুড়ে সেজে উঠছিল মেঘেরা। বাইরের পোশাক বদলে চা খেতে খেতে নিশীথ চ্যানেল সার্ফ করছিল। মোবাইলটা তখনই বেজে উঠেছিল। টিভির পর্দায় চোখ রেখেই ফোনটা কানে চেপেছিল।
“হ্যালো!”
“গুড ইভিনিং, স্যার। সুমিত বলছি, ‘খোঁজ’ থেকে।”
তখনও খুব একটা উৎসাহ বোধ করেনি নিশীথ। গুড ইভিনিং জানিয়ে বলেছিল, “বলুন সুমিতবাবু, কোনও খবর পেলেন?”
“মনে হচ্ছে পেয়েছি, স্যার।”
“ইজ ইট? কোথায়, কোথায়?” লাফিয়ে উঠেছিল নিশীথ।
তারপর যখন শুনল, বোলপুরের যে হোটেলে সে উঠেছে সেখান থেকে মাত্র আঠারো-উনিশ কিলোমিটার দূরেই থাকে সেই রহস্যময় অশরীরী তখন উত্তেজনায় তার হৃৎস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। এই আশ্চর্য সমাপতন বিস্মিত করেছিল তাকে।
নিশীথের চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল ইলামবাজারের দিক থেকে ছুটে আসা একটা বাসের শব্দে। একবার ভাবল বাস ধরে আজকের মতো ফিরে যাবে বোলপুরে। কাল সকালে না হয় আবার আসবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই বাতিল করে দিল ভাবনাটা। এসে যখন পড়েইছে রহস্যের উদ্ঘাটন আজই করবে।
সুমিত প্রায় ছবির মতো করে বুঝিয়ে দিয়েছে পথনির্দেশ। সে বলেছিল বনভিলার মোড় থেকে ভ্যান-রিকশা পাওয়া যাবে। বাঁদিকের পিচ রাস্তা বরাবর কিলোমিটার খানেক যাবার পর ডানদিকে একটা সেরামিকের কারখানা পড়বে। সেটা ছাড়িয়ে সোজা রাস্তায় আরও কিছুদূর গেলে প্রথম যে লালমাটির রাস্তা ডানদিকে বেঁকে গিয়েছে সেটা দিয়েই যেতে হবে চৌরাশিয়ার জঙ্গলে। জঙ্গলের শুরুতেই বাঁদিকে রাস্তা থেকে একটু ভেতরে পাঁচিল ঘেরা ছোট্ট একটা বাড়ি। রাস্তা থেকেই দেখা যায়। আশেপাশে আর কোনও বাড়ি নেই। সেখানেই…
সুমিত সম্ভবত দিনেরবেলার কথা ভেবেই বলেছিল। সে ভাবতেই পারেনি নিশীথ আজ রাতেই এভাবে চলে আসতে পারে! গ্রামাঞ্চলে এমনিতেই রাত গভীর হয় তাড়াতাড়ি, তার ওপরে এই দুর্যোগ। রিকশা তো দূর অস্ত, একটা কুকুর-বেড়ালও চোখে পড়ছে না।
ইতিমধ্যে বৃষ্টির দাপট কমেছে কিছুটা। এলোমেলো ভেজা হাওয়া অবশ্য জোরেই বইছে। নিশীথের টু-ফোল্ড ছাতা বারে বারেই উলটে যাচ্ছে। ছাতা সামলাতে সামলাতে পিচের রাস্তা ধরে এগোতে থাকে সে। রাস্তার দু’ধারে অতিকায় গাছগুলো বিপজ্জনকভাবে দুলছে। বিদ্যুতের আলোয় মাঝে মাঝে রাস্তার দু’পাশে ছাড়া ছাড়া কিছু বসতি চোখে পড়ছে। দরজা-জানালা বন্ধ আলোহীন বাড়িগুলোকে মনে হচ্ছে যেন পরিত্যক্ত।
নিশীথ যত এগোচ্ছে দু’পাশের জনবসতি তত কমছে, আর বাড়ছে গাছগাছালির ঘনত্ব। হঠাৎ তার মনে হল দুর্যোগের এই অন্ধকার রাত, জনবিরল এই জঙ্গুলে পথ তার খুব পরিচিত। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? শান্তিনিকেতনে সে বার কয়েক এলেও এদিকে তো কখনও আসেনি! ঠিক তখনই মনে পড়ে গেল সবকিছু।

সেও ছিল এক ঝড়জলের রাত্রি। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর সেই যুবক চলেছিল যেন এই পথ ধরেই। তবে সেদিনের সে পথ এমন পিচঢালা ছিল না। এবড়োখেবড়ো পথ ছিল দুর্গম। যেকোনও একটা আশ্রয়ের খোঁজে ছিল ছেলেটা। অন্ধকারে চলতে চলতে কখন যে সে ঢুকে পড়েছিল আগাছা, জঙ্গলে আকীর্ণ এক সঙ্কীর্ণ পথে বুঝতেই পারেনি। কাঁটাঝোপে ছড়ে গিয়েছিল তার শরীরের বিভিন্ন অংশ। ভেজা শরীরে কাঁপুনি উঠে আসছিল থেকে থেকে।
কতক্ষণ পরে সে দেখতে পেয়েছিল বাড়িটা। অবসন্ন পায়ে গেট খুলে উঠে এসেছিল বারান্দায়। বন্ধ দরজার কড়া নাড়তে নাড়তে বলে উঠেছিল, “কেউ আছেন? খুলুন না দরজাটা!”
বেশ কিছুক্ষণ পরে খুলে গিয়েছিল দরজাটা। হাতে লন্ঠন নিয়ে যে এসে দাঁড়িয়েছিল তাকে দেখে চমকে উঠেছিল ছেলেটা। আলো-আঁধারিতে কী ভয়ংকর দেখাচ্ছিল মাঝবয়সী লোকটাকে! ঘোড়ার মতো লম্বাটে মুখ। মাথায়, ভুরুতে, এমনকি চোখের পাতায় অবধি একটাও চুল নেই। বিস্ফারিত দুটো অক্ষিগোলকের মাঝখানে ভীষণ ছোটো দুটো ধূসর মণি স্থির হয়ে আছে। টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো বাঁকা নাকের নিচে অস্বাভাবিক লাল লোকটার ঠোঁটদুটো, যেন রক্ত লেগে আছে! সেই লালের আভাস তার চোখের সাদা অংশটুকুতেও।
লকলকে জিভটা ঠোঁটে বুলিয়ে কেমন করে যেন হেসেছিল লোকটা! ছুঁচলো ঝকঝকে দাঁতগুলো ঝিকিয়ে উঠেছিল। খসখসে গলায় বলেছিল, “পথ ভুলে আসা হয়েছে বুঝি? এখানে আগে যারা এসেছিল পথ ভুলেই এসেছিল।”
কর্কশ শব্দে ডানা ঝাপটে কী যেন উড়ে গিয়েছিল ছেলেটার মাথার ওপর দিয়ে। চমকে উঠেছিল সে। হেসে লোকটা বলেছিল, “ভয় পেলে নাকি হে? ওটা বাদুড়। তোমাকে স্বাগত জানাল।”
কেমন একটা সম্মোহে পড়ে গিয়েছিল ছেলেটা। ঢুকে এসেছিল ঘরের মধ্যে। একটা বোঁটকা গন্ধে গাটা গুলিয়ে উঠেছিল। হাত দিয়ে নাক চেপেছিল সে। লোকটা তখনই ঘুরে তাকিয়েছিল ছেলেটার দিকে। হঠাৎই যেন হেসে উঠেছিল তার ক্ষুদ্র, ধূসর মণিগুলো। বলেছিল, “তোমার ঘেন্না করছে নাকি? আসলে বাদুড়-চামচিকের দল মহানন্দে আস্তানা গেড়েছে এখানে। আজকাল গন্ধটা আমারও আর খারাপ লাগে না।”
দ্রুত নাক থেকে হাত সরিয়ে হাসতে চেষ্টা করেছিল ছেলেটা। তারপর বলেছিল, “আমার খুব তেষ্টা পেয়েছে। একটু জল...”
“দিচ্ছি। কলঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এস। জামাকাপড় বদলে নাও…” বলতে বলতে হঠাৎ ভাঁজ পড়ল অদ্ভুতদর্শন লোকটার কপালে। বলেছিল, “কিন্তু এই দুর্যোগের রাতে তুমি এখানে এলে কী করে বলো তো?”
একটু বুঝি থতমত খেয়েছিল ছেলেটা। তারপর বলেছিল, “বটানির একটা প্রোজেক্ট করছি আমরা ক’জন বন্ধু মিলে। সে কারণেই কিছু লতাপাতা সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে ঢুকেছিলাম। কখন বন্ধুদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছি বুঝতেই পারিনি। ফিরতে গিয়ে দেখলাম পথ হারিয়েছি। চারদিক অন্ধকার করে বৃষ্টি এল... সন্ধে গড়িয়ে রাত নামল... আমি কিছুতেই পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তারপর দূর থেকে একটা আলোর আভাস দেখতে পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে আপনার এখানে চলে এসেছি।”
সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চলে গিয়েছিল লোকটা। খানিক পরে লোকটার তৈরি করা চা আর কয়েকটা বিস্কুট খেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল সে। ওদিকে বৃষ্টি তখন আরও প্রবল হয়ে উঠেছিল। ছেলেটা ভাবছিল কী করে ফিরবে সে! তখনই লোকটা বলে উঠেছিল, “ফেরার কথা এখন আর নাই ভাবলে। চালে-ডালে মিশিয়ে লপসি করব। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”
অবাক হয়ে গিয়েছিল ছেলেটা। ভদ্রলোক কী করে বুঝলেন তার মনের কথা? কিন্তু খিচুড়ির কথায় খিদেটা যেন নতুন করে মালুম হতে লাগল।
খাওয়াদাওয়ার পর একটা স্যাঁতসেঁতে ঘরের তেলচিটে বিছানায় শুতে দেওয়া হয়েছিল তাকে। বোঁটকা গন্ধটা ততক্ষণে অনেকটা গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল ছেলেটার। ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতেও পারল না।
তখন কত রাত জানে না ছেলেটা। কেমন একটা অস্বস্তিতে ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল। খুব গুমোট  লাগছিল। প্রথমে সে বুঝতেই পারছিল না কোথায় শুয়ে আছে! ধীরে ধীরে সব মনে পড়ে গিয়েছিল। ঝড়বৃষ্টি বোধহয় থেমে গিয়েছে। থমথমে  স্তব্ধতা চারদিকে। আর তখনই সে অনুভব করল দারুণ তেষ্টা পেয়েছে তার। অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে এসে দরজাটা খুলতেই চাঁদের আলো গড়িয়ে এসেছিল ঘরের মধ্যে।
বারান্দা থেকে দেখেছিল ফটফটে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে বাগানটা। বৃষ্টি ধোয়া প্রকৃতি প্রায় দিনের মতো ঝকঝক করছে। আর তখনই ভীষণ চমকে উঠেছিল সে। দেখল ভয়ংকর দর্শন সেই লোকটা একটা পেয়ারাগাছের তলায় দাঁড়িয়ে তারই দিকে চেয়ে আছে। হাতছানি দিয়ে ডাকছিল তাকে। গলাটা যেন আরও শুকিয়ে উঠল। কিন্তু কিছু যেন করার ছিল না তার। অমোঘ এক ভবিতব্য যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল তাকে।
লোকটার ধূসর মণিগুলো কী এক খুশিতে যেন জ্বলছিল। লালচে ঠোঁটে হেসে বলেছিল, “অপরূপ এই প্রকৃতিকে দেখে নাও দু’চোখ ভরে...”
মুহূর্তেই যেন কী ঘটে গিয়েছিল! অস্ফুট আর্তনাদে সহসাই সচকিত হয়ে উঠেছিল বনভূমি। ভয় পেয়ে  ডানা ঝাপটে উড়ে গিয়েছিল কিছু পাখি। কতক্ষণ পরে সম্পূর্ণ রক্তশূন্য মানুষটির প্রাণহীন শরীরটাকে বাগানে ফেলে রেখে আলো-আঁধারি বনপথ ধরে এগিয়ে গেছিল যুবকটি। রক্তের ধারা চুঁইয়ে পড়ছিল তার দুই কষ বেয়ে। বহুদিন পরে মিটেছে তার আকণ্ঠ তৃষ্ণা। খল খল হেসে উঠেছিল সে। তার রক্তমাখা দুটো শ্বদন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে…

এত বছর পরেও কাঁটা দিয়ে উঠল নিশীথের গায়ে। অত্যন্ত প্রিয় লেখক হিরণ্ময় চৌধুরীর ‘শিকার’ গল্পটা যখন পড়েছিল তখন সে নিতান্ত কিশোর। সেই গল্পের পটভূমির সঙ্গে অদ্ভুত মিল এই পথের, এই পরিবেশের, এমনকি এই রাত্রিরও। তবে কি চৌরাশিয়ার জঙ্গলকে কেন্দ্র করেই লিখেছিলেন লেখক?
একবার বইমেলায় গিয়ে হিরণ্ময় চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়েছিল নিশীথের। অত্যন্ত  সুদর্শন মানুষটির ব্যবহারে সেদিন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। মনে হয়েছিল তিনি যেন নিশীথের কতদিনের চেনা। নিশীথের আগ্রহে তাঁর ফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা সব দিয়েছিলেন। অভিভূত হয়ে গিয়েছিল নিশীথ।
‘শিকার’ গল্পটা পড়ার পর উচ্ছ্বসিত নিশীথ ফোন করেছিল হিরণ্ময় চৌধুরীকে। তার খুব জানার ইচ্ছে ছিল ভ্যাম্পায়ার সত্যিই আছে কি না। কিন্তু ইচ্ছে পূরণ হয়নি। কারণ ফোন অফ ছিল। তারপর যতবার ফোন করেছে, দেখেছে ফোন বন্ধ। পরের দিকে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর জানান দিতে লাগল, ওই নম্বরটির কোনও অস্তিত্ব নেই। অবাক হয়ে গিয়েছিল সে। মাস খানেক পরে একদিন গিয়ে হাজির হয়েছিল হিরণ্ময় চৌধুরীর শ্যামনগরের বাড়িতে। কিন্তু বাড়ি ছিল তালাবন্ধ। খুব মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল নিশীথের। তারপর আর কোনওদিনই কোনও খবর পাওয়া যায়নি হিরণ্ময় চৌধুরীর। যেন হাওয়ায় মিশে গেলেন মানুষটা। শ্যামনগরের বাড়িতে আর ফিরে আসেননি তিনি। ‘শিকার’ ছিল তার শেষতম গল্প।
দীর্ঘ আট বছর কেটে গিয়েছে। অবসর সময়ে নিশীথ মাঝেমাঝেই একাধিক বার পড়া তাঁর প্রিয় লেখকের গল্পগুলো আবার পড়ে। যখনি পড়ে তখনই হিরণ্ময় চৌধুরীর সৌম্য, সুন্দর মুখটা ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। মনে পড়ে যায় তাঁর সঙ্গমধুর সেই একদিনের উজ্জ্বল স্মৃতি। বিষণ্ণ হয়ে পড়ে নিশীথ।
অবাক করা ঘটনাটা ঘটেছিল ঠিক তিনমাস আগে। একটি প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় অশরীরী ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়েছিল একটি ভৌতিক উপন্যাস। সেটা পড়তে পড়তে চমকে উঠেছিল নিশীথ। লেখার ভঙ্গি, আঙ্গিক, ভাষা দেখে সে নিঃসংশয় হয়েছিল এ-লেখা হিরণ্ময় চৌধুরীর ছাড়া অন্য কারও হতেই পারে না। কিন্তু পত্রিকা অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিল, অশরীরী ছদ্মনামে যে ভদ্রলোক লেখেন তাঁর আসল নাম বিকাশ দাস। তাঁর ঠিকানা অবশ্য জানায়নি পত্রিকা অফিস।
দারুণ একটা টানাপোড়েন চলতে থাকে নিশীথের মধ্যে। তারপরেই নামি তদন্ত সংস্থা ‘খোঁজ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকাশ দাসের ঠিকানা খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেয়। কিন্তু যত দিন যাচ্ছিল হতাশ হয়ে পড়ছিল সে। তারপর আজ সন্ধ্যায় সুমিত যখন তাকে ফোন করে অশরীরীর ঠিকানা দিল, উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠেছিল। সাতপাঁচ না ভেবেই বেরিয়ে পড়েছিল অশরীরীর খোঁজে।
নিশীথের মন বলছে, অশরীরী কিংবা বিকাশ দাস দুটোই আসলে ছদ্মনাম। ছদ্মনামের আড়ালে আসল মানুষটা হিরণ্ময় চৌধুরী ছাড়া কেউ নন। এতদিন পর প্রিয় মানুষটির মুখোমুখি হবার কথা ভেবে উন্মুখ হয়ে ওঠে ভেতরটা। কত যে প্রশ্ন জমা হয়ে আছে মনে। সে আরও দ্রুত পা চালাতে থাকে।
বৃষ্টি ধরে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিয়েছে চাঁদ। আলো আর ছায়া মিলে অদ্ভুত এক অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সেরামিকের কারখানা পেরিয়ে প্রথম লালমাটির রাস্তায় ঢুকে পড়েছে নিশীথ। ওই তো পাঁচিল ঘেরা বাড়িটা। উত্তেজনায় ঘন ঘন শ্বাস পড়তে থাকে। এবার প্রায় ছুটতে শুরু করে সে।
গেটের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। গেটের দিকে পিছন ঘুরে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনিই কি…
নিশীথের পায়ের শব্দ শুনেই বোধহয় ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। চাঁদের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল এক নরকঙ্কালের মুখ। তার এক চোখে গভীর অন্ধকার এক গর্ত, অন্য চোখে হাড় হিম করা রাগী জিজ্ঞাসা। ঠোঁটহীন দৃঢ়বদ্ধ দাঁতগুলো এখুনি বুঝি হেসে উঠবে জান্তব উল্লাসে।

বৃষ্টি থেমে গিয়েছে অনেকক্ষণ। গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে আকাশে। জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নায় বানভাসি জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন হিরণ্ময় চৌধুরী। গত একবছর ধরে আর লেখেন না তিনি। তার আগে দীর্ঘ আট বছর বিরতির পর কেন যে আবার শুরু করতে গিয়েছিলেন লেখা সেকথা ভাবলে আজও বুকটা মুচড়ে ওঠে।
আট বছর আগে যখন তিনি খ্যাতির মধ্য গগনে, হঠাৎ করেই নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন একদিন। নিজের ইচ্ছেয় কেউ হারিয়ে যেতে চাইলে তাকে কি খুঁজে পাওয়া যায় সহজে? হিরণ্ময় চৌধুরীকেও পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে পাঠক মনে ঝাপসা হয়ে এসেছিল তাঁর স্মৃতি।
সবসময়ের সহায়ক বিকাশকে নিয়ে হিরণ্ময় চলে এসেছিলেন বীরভূমের দারন্দা গ্রামে। বেশ কয়েকবছর আগে চৌরাশিয়া জঙ্গলের ধারে উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে শখ করে একটা বাড়ি বানিয়ে রেখেছিলেন তিনি। ইট-কাঠ-পাথরের ঘেরাটোপে থাকতে থাকতে যখন প্রাণ হাঁপিয়ে উঠত, তখন এখানে এসে থেকে যেতেন কিছুদিন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে লোকালয় থেকে বহুদূরে দারন্দা গ্রামের সেই বাড়িই  হয়ে উঠল তাঁর গোপন স্থায়ী ঠিকানা। দিনেরবেলা বাইরে বেরোতেন না তিনি। হাট, বাজার, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস সব সামলাত বিকাশ। শুধু বই পড়ে দিন কাটত হিরণ্ময়ের। এই দীর্ঘ সময় বিকাশ ছাড়া দ্বিতীয় কোনও মানুষের সামনে আসেননি তিনি।
শ্যামনাগরের বাড়িতে চা বানাতে গিয়ে স্টোভ বার্স্ট করে এত বীভৎসভাবে পুড়ে গিয়েছিল হিরণ্ময়ের শরীর, যে দেখত সেই ভয়ে, ঘেন্নায় চিৎকার করে উঠত; বিশেষ করে বাচ্চারা, যাদের জন্য গল্প লিখতেন হিরণ্ময়। মুখে কিছু না বললেও পরিচিত জনেরাও যে তাঁর উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করেন, বুঝতে পারতেন। পাকাপাকিভাবে দারন্দার বাড়িতে এসে থাকার পরিকল্পনা তারপরেই করেছিলেন।
কিন্তু লেখাটা যে তাঁর রক্তে। তাই বিকাশকে সামনে রেখে অশরীরী ছদ্মনামে আট বছরের মাথায়  আবার কলম ধরেছিলেন। তিনি কী করে বুঝবেন তাঁর এমন পাঠকও আছে, দীর্ঘ বিরতিতেও যে ভুলতে পারেনি তাঁকে! অশরীরীর লেখা পড়ে যে ধরে ফেলেছিল এ-লেখা হিরণ্ময় চৌধুরী ছাড়া আর কারও হতেই পারে না।

একবছর আগে সে এসেছিল তার প্রিয় লেখকের খোঁজে। কিন্তু আগুনে ঝলসানো হিরণ্ময় চৌধুরীর ভয়ংকর রূপ সহ্য করতে পারেনি সে। প্রচণ্ড ভয়ে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তার হৃৎপিণ্ডের শব্দ।
বইমেলায় মাত্র একবার দেখা হয়েছিল ছেলেটির সঙ্গে। তবুও প্রিয় পাঠককে চিনতে পেরেছিলেন হিরণ্ময়। গভীর শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তারপর থেকে একদিনের জন্যও আর কলম ধরেননি। ধরতে পারেননি।
হঠাৎই  সচকিত হয়ে ওঠেন  হিরণ্ময়। উঠোনের জমা জলে ছপ ছপ শব্দ উঠছে না? কেউ কি হেঁটে আসছে পায়ে পায়ে? আজই তো সেই দিন। একবছর আগে এমন দিনেই তো…
ভাবতে ভাবতে উত্তেজনায় সারা শরীর কণ্টকিত হয়ে ওঠে। কী এক দুরাশায় দরজার দিকে ছুটে যান হিরণ্ময়।
_____



3 comments:

  1. খুব সুন্দর লেখা। গল্পের শেষটা পাঠককে নিজের মতো করে ভেবে নেওয়ার সুযোগ দিয়ে গল্পটাকে আরও ভালো, আরও আধুনিক আকার দেওয়া হয়েছে।

    ReplyDelete
  2. অসাধারণ দাদা। কি অসম্ভব সাসপেন্স ক্রিয়েট করেছ!

    ReplyDelete
  3. খুব সুন্দর হয়েছে দাদা।

    Tapas Kapat

    ReplyDelete